কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১২৮

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১২৮

বৃহস্পতিবার, ২০ মার্চ, ২০২৫

গৌরাঙ্গ মোহান্ত

 

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের তাৎপর্য : বাঙালির অর্জন




আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসটি ভাষার বৈচিত্র্য, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষার মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণে  ভূমিকা পালন করে। মাতৃভাষার দীপ্ত ধারাকে সচল রাখবার জন্য বাঙালির অবিচল অঙ্গীকার ও ত্যাগের দৃষ্টান্ত ভাষা-সংস্কৃতির বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতকে আলোড়িত করেছে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মূল শেকড় প্রোথিত রয়েছে  ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত প্রহরে; তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার্থীবৃন্দ ও সক্রিয় কর্মীগণ ঊর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে চাপিয়ে  দেয়ার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আসেন এবং স্বৈরশাসকের পেটোয়াবাহিনীর গুলিতে তাঁদের কয়েকজনের জীবনপ্রদীপ নির্বাপিত হয়। তবে ভাষাতাত্ত্বিক অধিকার সংরক্ষণের জন্য তাঁদের আত্মোৎসর্গ পৃথিবীর সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে অপরিমেয় আলোর বিচ্ছুরণ ঘটায়।

বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন একটি শ্লাঘ্য সংশ্লেষকে  উপস্থাপন করে যার ভেতর ভাষা, আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক বোধ অনুস্যূত। আমাদের চৈতন্যে যে বার্তাটি অনির্বাণ হয়ে থাকে তা হলো, ভাষা নিছক যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষা ঐতিহ্য, প্রজ্ঞা ও সামষ্টিক স্মৃতির আধার এবং মাতৃভাষা সংরক্ষণের ভেতর দিয়ে আমরা স্বকীয় সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে সুরক্ষিত রাখি।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের মাধ্যমে বাঙালির অভিজ্ঞতা ভৌগোলিক ও ভাষিক পরিসীমা অতিক্রম করেছে। ভাষার  ক্ষুদ্রত্ব বা বৃহত্ত্বের বিবেচনা মূল্যহীন; ভূমণ্ডলের সমস্ত ভাষার উন্নয়ন ও সংরক্ষণের বিষয়টি এখন তাৎপর্যময় হয়ে উঠেছে। প্রতিটি ভাষার ভেতর দিয়ে মানুষের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, অনুধ্যান ও বিশ্ববোধের উন্মেষ ঘটছে। এ ভাষিক বৈচিত্র্য পৃথিবীর অসংখ্য জনগোষ্ঠীর প্রকাশ-বিভূতিকে প্রমূর্ত করে তুলছে। এ ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই সাহিত্যের ভুমিকা অপরিমেয়। সাহিত্য মানবিক বন্ধনকে প্রতিনিয়ত সুসংহত করছে।

রামানাথ চট্টোপাধ্যায় 'প্রবাসী ও বঙ্গসাহিত্য সম্মেলন' প্রবন্ধে কলকাতায় প্রবাসী বঙ্গসাহিত্য সম্মেলনের দ্বাদশ অধিবেশনের উদ্বোধন উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ লিপিবদ্ধ করেন। ভাষার যোগকে রবীন্দ্রনাথ 'অন্তরের নাড়ীর যোগ' বলে অভিহিত করেন। সে যোগ বিচ্ছিন্ন হলেই 'মানুষের পরম্পরাগত বুদ্ধিশক্তি ও হৃদয়বৃত্তির সম্পূর্ণ পরিবর্তন' ঘটে । রবীন্দ্রনাথ উচ্চারণ করেন, 'বাঙালিচিত্তের যে বিশেষত্ব, মানবসংসারে নিঃসন্দেহে তার একটা বিশেষ মূল্য আছে। যেখানেই তাকে হারাই সেখানেই সমস্ত বাঙালি জাতির পক্ষে বড়ো ক্ষতির কারণ ঘটা সম্ভব। নদীর ধারে যে জমি আছে তার মাটিতে যদি বাঁধন না থাকে তবে তট কিছু কিছু করে ধ্বসে পড়ে; ফসলের আশা হারাতে থাকে। যদি কোনো মহাবৃক্ষ সেই মাটির গভীর অন্তরে দূরব্যাপী শিকড় ছড়িয়ে দিয়ে তাকে এঁটে ধরে, তা হ'লে স্রোতের আঘাত থেকে সে ক্ষেত্রে রক্ষা পায়। বাংলাদেশের চিত্তক্ষেত্রকে তেমনি করেই ছায়া দিয়েছে ফল দিয়েছে নিবিড় ঐক্য ও স্থায়িত্ব দিয়েছে বাংলা সাহিত্য। অল্প আঘাতেই সে খণ্ডিত হয় না।... ইতিমধ্যে বাংলার মর্মস্থলে যে অখণ্ড আত্মবোধ পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে, তার প্রধানতম কারণ বাংলা সাহিত্য।... বাঙালি-চিত্তের এই ঐক্যবোধ সাহিত্যের যোগে বাঙালির চৈতন্যকে ব্যাপকভাবে গভীরভাবে অধিকার করেছে। সেই কারণেই আজ বাঙালি যতদূরে সেখানেই যাক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বন্ধনে বাংলা দেশের সঙ্গে যুক্ত থাকে।' রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভেতর দিয়ে বাঙালির চিত্তক্ষেত্রের অক্ষয় রূপ প্রত্যক্ষ করেন। বিশ্বের অপরাপর ভাষা ও সাহিত্যের মাধ্যমে বিশ্বমানবগোষ্ঠীর চিত্তভূমিও উর্বর ও চিরায়মান হতে পারে।

বিশ্বায়ন, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের মূলে নব্য-ঔপনিবেশিকতাবাদ সক্রিয় থাকবার কারণে স্থানীয় ভাষার বিকাশ রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। অনেক স্থানীয় ভাষা ইতিমধ্যে বিপন্ন ও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে বিধায় বংশানুক্রমে অর্জিত পারিপার্শ্বিক জ্ঞানও হয়েছে অন্তর্হিত। এ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। পৃথিবীতে আনুমানিক ৭০০০ ভাষা চর্চিত হলেও ইউনেস্কো ২৫০০ ভাষাকে বিপন্ন ভাষা হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। বাংলাদেশেও প্রত্যক্ষ করা যায় স্থানীয় ভাষার বিপন্ন দশা; বিপন্ন ভাষাগুলোর ভেতর খাড়িয়া, রেংমিটচা, সৌরা, কোডা, মুণ্ডারি, কোল, মালতো, কুই, খুমি, পাংখোয়া, চাক, খিয়াং, লালেং ও লুসাই উল্লেখযোগ্য। কিছু স্থানীয় ভাষা চিরতরে হচ্ছে অবলুপ্ত। দৃষ্টান্তস্বরূপ উল্লেখ করা যায়, আলাস্কার ইয়াক ভাষার সর্বশেষ স্থানীয় বাচিকা ম্যারি স্মিথ জোনস ২০০৮ খৃষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের কুফল হিসেবে একেকটি স্থানীয় ভাষা থেকে অনেক শব্দও অদৃশ্য হচ্ছে। সাতের দশকে রংপুরের স্থানীয় ভাষায় যে শব্দগুলো প্রাণবন্ত ছিল, সেগুলো রংপুরবাসীর কাছেই এখন প্রায় অপরিচিত। উদাহরণস্বরূপ, উটকুন (কঞ্চি দিয়ে নির্মিত দড়ি পাকানোর যন্ত্র), থৈকর (এক জাতীয় টক ফল), ব্যাদা ( কাঠ ও বাঁশ দিয়ে নির্মিত বড় আকারের নিড়ানি যন্ত্র), পোড় (গোয়ালঘরে সেঁতসেঁতে খড় পুড়িয়ে ধোঁয়া দেবার ব্যবস্থা), নরুন (নাপিতের কাছে রক্ষিত নখ কাটার যন্ত্র), পাকড়া (খড়মের খাড়া কাঠি যা পায়ের আঙুলের সাথে যুক্ত থাকে), কাঁজি (টক পান্তা) প্রভৃতি শব্দাবলির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা যেতে পারে।

বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনসহ বরাক উপত্যকার বাংলা ভাষা আন্দোলন, স্পেনের ক্যাটালান ভাষা আন্দোলন, যুক্তরাজ্যের ওয়েলশ ভাষা আন্দোলন, যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াইয়ান ভাষা আন্দোলন, নিউজিল্যন্ডের মাওরি ভাষা আন্দোলন, স্পেন ও ফ্রান্সের বাস্ক ভাষা আন্দোলনের সাথে যাঁরা একাত্ম থেকেছেন এবং উদ্দেশ্য সাধনের জন্য অমূল্য জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদেরকে আমরা শ্রদ্ধা জানাই। তাঁদের আন্দোলন-কৃতকার্যতাকে সমুন্নত রাখার জন্য আন্তর্জাতিক, রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিরলসভাবে পরিকল্পিত কর্মে ব্যাপৃত থাকা প্রয়োজন। আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে সংখ্যালঘু ও প্রাকৃত জনগোষ্ঠীকে সকল প্রকার নিগ্রহ থেকে সুরক্ষিত রাখা, কিছু সম্প্রসারণবাদী ভাষার ব্যবহার সম্পর্কে সজাগ থাকা, শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির অবিমিশ্র ধারাকে যুক্ত রাখা, শিক্ষাঙ্গনে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে ভাষিক-সাংস্কৃতিক-সামাজিক চেতনা ও মূল্যবোধে উদ্দীপ্ত করা এবং সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে আমরা ভাষার উন্নয়ন ও বৈচিত্র্য সংরক্ষণে ভূমিকা পালন করতে পারি; আর এভাবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা রক্ষা করা সম্ভব।

 

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন