![]() |
কবিতার কালিমাটি ১৪৩ |
গঙ্গাচড়ার পয়স্তি
গঙ্গাচড়ার পয়স্তি দেখে কল্পনা করা কষ্টকর, এ অঞ্চল
তিস্তার গুহ্যদ্বার থেকে বেরিয়ে পুনর্বার ভূমিজন্ম লাভ করেছে। দক্ষিণ কোলকুণ্ডের মানুষজন
চাষবাস করছেন; স্বত্বলিপিতে তাদের নামের স্থলে রয়েছে জলের দাগ।এখানে আর বন্যা হয় না,
দারিদ্র্যের লক্ষ্মণও দৃষ্টিগ্রাহ্য নয়। বাড়িঘরের নির্মাণশৈলী সুন্দর। কোনো কোনো বাড়ির
ছাদ লাউ পাতার বাইনাচে আন্দোলিত। সবজির প্রাত্যহিক প্রয়োজনে কেউ চটির আয়ুসংকোচন কামনা
করেন না। আনুষ্ঠানিক ভোজের জন্য সবজি কেনা হয়। সাত টাকার বিনিময়ে এক কেজি ফুলকপি পৃথিবীর
শুভ্রতম তক্রপিণ্ডের সৌরভ ছড়ায়। অনেকের বাড়ির পাশে রয়েছে সবজি বাগান। নাপা, ডাঁটা,
পালং, রসুন, পেঁয়াজের ছোটো ছোটো খেতে ইতস্তত ছড়ানো সরষে ফুল। কোনো কোনো সবজি খেতের
পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে মেহগনি। আম, পেয়ারা, নারকেল, সুপারি, বেল, কলা, কুলগাছ প্রকৃতিকে
আস্বাদ্য করে তুলছে। অঞ্চলটির ভেতর নীরবতা; নেটওয়ার্ক প্রায়শ অচল থাকে বলে মোবাইল ব্যবহার
নিয়ন্ত্রিত। ঘরের কাজে অদূরে কেউ বাঁশ কাটে, কর্তনধ্বনির তীক্ষ্ণতা নিমেষে কর্ণপটে
কম্পন জাগায়। কাক, শালিক, ঘুঘুর ডাকে আকাশে উৎকীর্ণ হয় স্বস্তিরেখা। নলকূপের হাতলে
চাপ দিয়ে যে কেউ জলার্থিতার শ্রাব্যতা নিশ্চিত করে। মোটর সাইকেলের গর্জন আর গরু-ছাগলের
চিৎকারে কখনও দীর্ণ হয়ে পড়ে সমস্ত নৈঃশব্দ্য।
এনট্রপি
ক্রমাগতভাবে বিস্তৃত হচ্ছে এনট্রপি আর সময়ের বাণমুখ
ছুটে যাচ্ছে অদৃশ্য রিলের দিকে। রিল স্মৃতিকে সম্মোহিত রাখে বলে সিঁড়ি দিয়ে উঠে অচেনা
দরজার মুখোমুখি হই, নিজের ফ্ল্যাট খুঁজে পেতে দেরি হয়। কল বাটনে চাপ না দিয়েই কখনো
এলিভেটরের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকি। জাদুকর নই বলে এলিভেটর আমাকে উপেক্ষা করে নেমে যায়।
আমি সিঁড়ি বেয়ে নামতে থাকি—একটি প্রবোধ স্বস্তিকর হয়ে ওঠে—সিঁড়ি ভাঙা স্বাস্থ্যের জন্য
ফলপ্রদ। সবজি বাজারে বিটের মূল্য শুনে অন্য দ্রব্য কিনে ঘরে ফেরার পর বিট খুঁজি। অনেক
পরে বিস্মরণ কেটে যায়, আমি বুঝতে পারি ব্যাগে বিট তোলাই হয়নি। অদ্ভুত রিলের টানে পাতা
ঝরে যায়, শূন্য বৃক্ষের স্পন্দনহীনতা দ্বীপের দৃশ্য মুছে ফেলে—হয়ত কোথাও জন্ম-যৌবন-প্রেমের
যাত্রা অভিনীত হয়েছিল। যারা অভিনয় করেছিল এবং যে স্টেজ পদধ্বনির ঔজ্জ্বল্য ছড়িয়েছিল
সবকিছু একটি গহ্বরে আশ্রিত।
চক্রলগ্নতা
রাজপথের পাশে পরিত্যক্ত ত্রিপল দিয়ে দ্রব্যসামগ্রী
ঢেকে রাখা হয়েছে। আমার নাসারন্ধ্রে বিবর্ণ একটি ত্রিপলের গন্ধ ভেসে আসে। শরণার্থী শিবিরে
বাবা যখন সময়ের দাহ্যতাকে বরণ করেছিলেন আমি ত্রিপলের গন্ধে অস্থির হয়ে থাকতাম। এ গন্ধের
ভেতর কী করে বাবা ভাত খেয়েছেন ভাবলে শিউরে উঠি। দৃশ্য দ্রুত অপসৃত হবার পর থাকে মহাশূন্যতা।
একটানা শব্দ অথবা সঙ্গীতের অনুসৃতি মহাশূন্যতাকে বোধগম্য করে তোলে। একটা অবলম্বন ত্রুটিবিযুক্ত
হলে শূন্যতার ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়া যায়। তবে এ যাত্রা ব্যয়সাপেক্ষ। শূন্যতার আপেক্ষিক
সীমা পেরিয়ে ভূপৃষ্ঠে ফিরে আসতে হয়। অরণ্যের শীতল বাতাসে কৌশিক বস্ত্র ওড়ে; বস্ত্রপ্রান্তে
খোদিত পদ্মনাম সরব হয়ে ওঠে আকাশে। পৃথিবী ও শূন্যতার ভেতর ঘুরতে থাকে একটি চক্র—আমার
প্রায়-অদৃশ্য সত্তা চক্রলগ্ন থাকে।
0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন