![]() |
সমকালীন ছোটগল্প |
রাজনৈতিক বন্দী
মগজের ভিতর ঝিরঝির বৃষ্টি। অতীত এভাবেই ফিরে আসে, পেয়ে বসে, ছেঁকে ধরে। আনমনা বারান্দায় বৃষ্টিবহুল অলস এক দিন আর মৃদুমন্দ টাইপিংয়ের শব্দ। 'ছররা' বা 'ফিনকি' শব্দে স্মৃতি শোণিতসুরে মথিত হয়ে ওঠে।
কিছুকিছু গানে এমনভাবে গেঁথে থাকে
ছোটবেলা, যেন ছুরি সরালেই অবিরাম রক্ত পড়তে শুরু করবে। পর্যাপ্ত সময় কেটে যাবার পর
আর বোঝা যায় না গানগুলো ভালোবাসি, নাকি নিজের অতীত! এভাবেই কোলেপিঠে বড় হয় সলিপসিজম।
তারপর ছুরি টেনে বার করে আনি দুরারোগ্য ক্ষত থেকে। দেখি, আত্ম-ধ্বংসের বাসনা ঘিরে লতিয়ে
উঠছে আরেক সলিপসিজম। নিস্তার নেই। অগত্যা গুনগুনিয়ে উঠতে হয়ঃ
"ছুঁকে দেখে তো আঁখো কি খামোশিয়া
কিতনি চুপচাপ হোতি হ্যায় সরগোশিয়া
সুনতে হ্যায় আঁখো মে হোতি হ্যায়
অ্যায়সি সদা।"
চোখ খুললে বিকেল। সকালখানা হারিয়ে গেল কোথায়, কীভাবে, কেই বা জানে! মরা চামড়ার গন্ধ হাওয়ায়। বন্ধু কবির বানানো 'শৈশবখানা' শব্দে সকাল সকাল ভাব লেগে আছে, কিন্তু সকাল কই? এই গন্ধে সন্ধ্যা সন্ধ্যা ভাব। ছোটবেলায় এমন গন্ধ পেতাম না তো? ঘনায়মান সন্ধ্যায় ওদের ঝোলানো অবস্থায় পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। সেই মরা চামড়ার গন্ধ নাকে এসে ঢুকছে, শখের বারান্দায়, টাইপিংয়ের মাঝে। সলিপসিজমের বাইরে বেরোতে বলছে।
মরা গুরুর লাশ কিনেছিল ওরা। চামড়া
চেঁছে নিচ্ছিল, মাংসের কাছাকাছি পৌঁছতে। খাবে বা বিক্রি করবে। ঠিক তখনই চড়াও হয়েছিল
গোসেবকের দল। কাট টু গরুর মাংসের জায়গায় মানুষের মাংস। দলিত শরীরের আধপোড়া মাংসের
ওপর চপেটাঘাত করতে করতে সন্ধ্যা নেমেছিল সেদিন।
না, সত্যি বলতে কি, এক্ষেত্রে খুন করা হয়নি ওদের। স্রেফ মারা হয়েছিল, ন্যাংটো করে, মোহল্লার সামনে। মৃত্যুর কথা এল লিখনকল্পনা ঘিরে। দলিতদের পুড়িয়ে মারার ঘটনা এদেশে বিরল তো আর নয়! মৃত গোমাংস থেকে মরা মানুষের পোড়া মাংসের মধ্যেকার ম্যাজিক রিয়ালিটিতে অনেক গল্পের সমাগমসম্ভাবনা রয়েছে।
তা পাঠক প্রশ্ন করতেই পারেন, গল্প
আছে তো গল্প বুনছি না কেন? আসলে বুনতে চাইছি না! গল্পহীন গদ্যে গল্পের নিরাকার ছায়াটুকু
তৈরী করে নিজের সলিপসিজম ভাঙতে চাইছি কেবল। ইনফর্ম করতে চাইছি নিজেকে, ব্যাস। পাঠকের
কি ভূমিকা তবে? পাঠক কি অতীন্দ্রিয়?
গল্প লিখতে বসলেই, উনা, ভীমা কোরেগাঁও, এলগার পরিষদের ঘটনাগুলো তলপেটে একেকটা ছুরির মত বসে যাচ্ছে। কাহিনী নির্মাণকে হত্যা করতে চায় এসকল বাস্তবতা। এদের অভিধানে শৈশব বা যৌবন নেই, আছে কেবল বার্ধক্য: সরকারের বার্ধক্য আর লড়াইয়ের বার্ধক্য। বৃদ্ধ অভিজ্ঞ যোদ্ধারা মিথ্যা কেসে দীর্ঘকাল কারাগারে, কেউ কেউ বিদায় নিচ্ছেন অতিমারীর আকালে। গল্প লিখতে পারছি না। গল্প লেখা যাচ্ছে না। বৃদ্ধ কাহিনী মৃত্যুমুখর।
বৃষ্টিদিনের বারান্দা জানে হয়ত এই লেখার ভবিষ্যৎও কারাগার। গদ্যমাত্রেই পলিটিকাল প্রিজনার। কারুর জানলার গরাদই যে ভাঙেনি! সন্ধ্যার অন্ধকারে আসা সকালের খবরের কাগজের রোল কেউ ছুঁড়ে দিচ্ছে বৃষ্টির বারান্দায়। রোল খুলতে দেখা যাচ্ছে প্রথম পাতার পিছনে একটা আলগা কাগজ। যার গায়ে লেখা:
"জনতার হাতে হাতে ঘোরো তুমি নিশানের মত
দাবির নিশান হয়ে দুলে ওঠো তুমি
হাতে হাতে
হাতের মুঠোয় হও চিৎকার প্রতিবাদ
যত
চিরপ্রতিরোধ হয়ে থাকো তুমি আমার
বরাতে!"
আরেকটা গান যাতে যৌবনের স্মৃতি রেকর্ড করা আছে।
ছুরিটা টেনে বার করে আনি ক্ষতস্থান
থেকে।
রক্তপাত শুরু হয় গল্পের ওপর।
0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন