কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১২৮

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১২৮

বৃহস্পতিবার, ২০ মার্চ, ২০২৫

তমাল রায়

 

সমকালীন ছোটগল্প


মার্জার সরণীতে সে, তাহারা

আজ ১৫ফাল্গুন, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৪৪৬ হিজরি। শনিবার। বসন্তকাল। মায়ানগরের গোপন কুঠুরিতে বসে যোহরের নামাজ পড়ার পর মুনতাশির সাড়ে পাঁচবারের চেষ্টাতেও সূর্য দেখতে  না পেয়ে বার কয়েক হাই তুলে ক্লান্ত শরীরটাকে গুটিয়ে সুটিয়ে শুয়ে পড়ল। চোখে ঘুম জড়ানো হলেও ঘুম আসে কই! মাথায় হাজার রকমের সাদা কালো দৃশ্য ভেসে আসে। মুনতাশির ভাবছিলো ফেলিস ক্যাটাস মানে বেড়াল প্রজাতির এই অসহায় বন্দীত্বের কথাই! অথচ ক'দিন আগেও তো রাজপথ ছিল তাদেরই দখলে। পথগুলো দেখতে দেখতে কি করে যেন প্যান্থেরা টাইগ্রিস হয়ে উঠেছিল। মিউগুলো বদলে যাচ্ছিলো হালুমে, আর মিছিল সেতু পার করে স্লোগান দিতে দিতে এগিয়ে চলছিলো আকাঙ্ক্ষিত মঞ্জিলের দিকে... অজস্র ক্যামেরা, বুম, গায়ে তখনও বীরের তকমা, কুরুক্ষেত্র লাইভ! মাতা গান্ধারী অবশ্য ততক্ষণে পুস্পকে চড়ে ধাঁ...

সে যাইহোক, তাচ্ছিল্য না করলে একটা গোপন কথা বলব, অবশ্য তাচ্ছিল্য করলেই বা কী! এই উপমহাদেশের মানচিত্রটাই র‍্যাডক্লিফ সাহেবের তাচ্ছিল্যর নমুনা! তার বাইরে আর কে বা কি! যা বলছিলাম, বেড়াল বিশেষজ্ঞ হই বা না হই, বেড়াল নিয়ে এর আগেও অনেক লিখেছি, বেঁচে বর্তে থাকলে পরে আবারও লিখব। কেবল মাঝখানে যে নতুন বেড়ালকে চিনেছি, সেই মায়ানগরের অধুনা বাসিন্দা তার কথা বলতেই আসা, মুনতাশির। মুনতাশির মামুন। মুনতাশির আর পাঁচটা বেড়ালের মতই সাহসী। পাঁচিল বল বা কার্নিশ, সড়ক বা গলিপথ সাহসের সাথেই পার হয়ে যায়। অত দেখা দেখি কিসের! দুধ, ভাত, ডিম, মাংস, পেঁয়াজ,  রসুন কিছুতেই তার তেমন অরুচি নেই। নীলচে ব্রকোলি, সাদা টমেটো বা হলুদ ক্যাপসিকামে তার তেমন আগ্রহ নেই। তবে ফিস আর ফিসি ব্যাপারে আর সব বেড়ালের মতই তার আগ্রহও ব্যাপক ছিল, গত কয়েকমাস যাবৎ তা আরও বেড়েওছিল!

আসরের নামাজ পড়ার পর এ সময়টা মুনতাশির এর প্লাস্টিক এর ছোট্ট বল নিয়ে প্র‍্যাকটিশের সময়। নেতারা বল ছুঁড়ে দিত, মুখে করে সেই বল ধরে নিয়ে আসতে হত মুনতাশিরকে। এটাই দস্তুর। নাকি মুনতাশিরদের পলিটিকাল এবং সোশাল লিডারশীপ ট্রেনিং এভাবেই হত!

আর ঠিক এভাবেই মুনতাশির জুলাইতে পথে নেমেছিল, আর তার অনেক আগেও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনেও সে বাকি বেড়ালদের মতই ছিল, তবে জল টল এগিয়ে দিত। এবারের মত এমন ফ্রন্ট লাইনার নয়। এবারে যে জড়িয়ে পড়ল তার কারণ অনেক, সে কথা পরে বলা যাবে'খন।

তারও আগে বলে নেওয়া ভালো, বাকি বেড়ালের মতই সে তাড়া করলে পিছু হটত, আবার মাছি বা মশা তার সুখ নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটালে ফোঁস করেও উঠত। পাখি দেখলে তেড়ে যেত, কুকুর দেখলে কিছুটা পিছিয়ে এসে জল মাপত! কিন্তু পালাত না। ঠিক যেভাবে বুমরার বল সাকিব ব্যাকফুটে গিয়ে ডিফেন্স করত। র‍্যাদার বাধ্য হত। আবার নিজের লেজ কামড়াতে গিয়ে ঘুরে ঘুরে ঘেমে নেয়ে একসা!

মুনতাশির অতীতে প্রবির (প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়) ছাত্র নেতা ছিল। সে বয়সে যেমন সবাই নেতা হয়ে উঠতে চায়, তেমনই আর কি! পরে কাঠ বেকার। ট্যুইশন পড়ানো, চাকরির পরীক্ষা দেওয়া, আর মুঠোফোনে বিশ্বদর্শন, আর পাঁচটা তার বয়সী বেড়ালের জীবন যেমন! পরে শোনা যায় গার্মেন্টসে নাকি একটা চাকরিও জুটিয়ে ছিল। তারপর? তারপর হাওরের পানি বেড়েছে, কমেছে। যদিও চিতা বা দাফন শেষে মহাশূন্য তবু - গলি, রাজপথ বল বা আখ্যান যে জীবন বাঘের, বেড়ালের, সেতো মায়া আর অনিশ্চিতের ইয়া ঢাউস অমনিবাস! দৈত্যকুলে যদি প্রহ্লাদ তৈরি হয়, বেড়াল কুলের মুনতাশিরেরই বা বাঘ হতে সমস্যা কই? সেভাবেই ঘটনাগুলো জাস্ট ঘটে গেছিল গোদারের ফিল্মের মত করেই জাম্পকাটে।

ওয়ারফিল্মে যুদ্ধক্ষেত্র যেমন হয়-  ঘর বাড়ি জ্বলছে, চাদ্দিক জুড়ে মৃত,অর্ধমৃত, রক্ত-মাংস-রক্ত, চিল শকুন উড়ছে, কুকুর-বেড়াল ট্রেঞ্চে মুখ লোকানোর আগে মৃত মার মুখের কাছে নাক নিয়ে গিয়ে শুঁকছে প্রাণের গন্ধ! সন্তান কাঁদছে কেঁদেই যাচ্ছে, পাচ্ছে কী?

মার্জার-ন্যায় (বড় বাঘ ছোট বাঘ বা বেড়ালদের খায়) শুরু  হল।

এখানে বলে নেওয়া ভালো, রুটির লড়াই; যার সাক্ষী প্রতিটি ডাস্টবিন, তা এখানেও অব্যাহত ছিল! তবু সদর্পে পেছনের পা দুটোকে আরও পেছনে ঠেলে বডিটাকে ধনুকের মত অর্ধবৃত্ত করে সদর্পে হাই তোলাও ছিল! কিন্তু...

মুনতাশির মাগরিবের নামাজ পড়ছিল, পাশে বসে নিজ নিজ প্রার্থনায় ব্যস্ত ছিল রোহিঙ্গা, সনাতনীরা, এবং কিছু কবি সাহিত্যিকরাও যাদের রিম্যান্ডে নেবার পর আর খুঁজে পায়নি আত্মীয় পরিজন। তবে শোনা যায় মায়ানগরের গোপন কুঠুরিতে বন্দী আছে তারা সকলেই। তাদের অপরাধ - তদানীন্তন  বেড়াল প্রশাসনের বিরুদ্ধে মুখ খোলা। কিন্তু মুনতাশির?

মুনতাশির আগস্ট বিপ্লবের নেতা হলেও ভুগোল ইতিহাস সামান্য পড়া বলেই বোধহয় জানে, পালা বদলের ইতিহাস পরবর্তীতে লড়াই ঝগড়া মারপিট ছিনতাই খুনোখুনি লেগেই থাক... সে যাই হোক সেও তো একসময় থামে, তাই না! তারপরই তো কোনো এক পরাক্রমশালী বেড়াল নেতার আগমন ঘটে। এবার কিন্তু থামার লক্ষণ মাত্র ছিল না।  উপরন্তু কিছু বেড়াল নেত্রীর সাথে নেতৃত্ব তালিকা থেকে বাদও পড়ে গেছে মুনতাশিরও। খারাপ লেগেছিল কিন্তু জিজ্ঞেস করলে মুনতাশির উত্তর করেনি। কারণ মুনতাশিরকে বোঝানো হয়েছিল বিপ্লব পরবর্তী সময়ে এসব একটু আধটু হয় আর কি! তা বলে কি বিপ্লব বৃথা!

যাহোক যা বলি বেড়াল নিয়েই, তবু বেড়ালেরও তো নাগরিক পাখিদেরও তো দেখতে দেখতে দেখতেই বড় হওয়া! যেমন কাক!

কাক কাকের মাংস খায় না এটা প্রবাদ না হয়ে প্রমাদও তো হতেই পারে, নইলে সেদিন যখন বেড়াল উপদেষ্টারা পদত্যাগ করে দল গড়লো, সেদিন সন্ধ্যে তখনও তেমন রাত হয়নি, সাতটা বা আটটা,  কায়স্থ পাড়ার মাঝে যে ডোবাটা, পাশেই আশরাফি চাচার গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির পরিত্যক্ত শেড, ওর ঠিক পাশেই পড়েছিল দেহটা। মুনতাশিরের ছোট বোন কামরুন নাহার মিনির ছিন্নভিন্ন দেহ। দু পায়ের মাঝখান থেকে তখনও রক্ত গড়াচ্ছে...

বেড়াল বলে কি মানুষ নয়! পুলিশ কই? আর্মি? মানুষ কই? মানুষ?

মুনতাশিরের প্রৌঢ়া আম্মা মুমতাজ বেগম তখন পুত্রকে ধরে কানতে কানতে বসে পড়ছেন, আর সে কাঁপছে কেবল! ঠিক তখনই কি 'ভয়' এর পুনর্জন্ম হল? যা ছিল গত পনেরোটা বছরের অভ্যেস! ঠিক তখনই মসজিদ থেকে মাইকিং চলছিলো, "অঞ্চলের মানুষ জন, ভাই-বেরাদর যে যেখানে আছেন, আল্লাহর নাম করে যার যা আছে, লাঠি, ঢাল, তরোয়াল সড়কি বল্লম নিয়ে জোট বাঁধুন, আমাদের দাবায়া রাখতে হবে, এলাকায় ঢুকে পড়া ডাকাতদের..." মুনতাশিরের কি তখন প্রফেটের ৭মার্চের ভাষণ মনে পড়ছিল?

ইশার নামাজ শেষ হলে মুনতাশির এর কিছু খাবার কথা, কিন্তু খাবে কি করে! ওর তো মনে পড়ছে ৭১এ খান সেনাদের হাতে নিহত আব্বুর কথা। মিনির কথা বলতে গিয়ে চিৎকার করছিলো আম্মু। আর তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকেও পিটিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলল বিপ্লবী ভাই-বেরাদররা। সময় এলো মুনতাশিরের প্রতিবাদের। পিছু হটতে হটতে পিঠে দেওয়াল ঠেকে গেলে যা করে বেড়াল, সেভাবেই আর মুনতাশিরও চালান হয়ে গেল মায়ানগরের গুম ঘরে!

 

ফজরের নামাজ পড়া শেষ হল। মুনতাশির এর কেমন যেন শীত করছিল। খালি মেঝেতে আর একবার গড়িয়ে নিতে গিয়ে মনে পড়ে গেল, সেই গল্পটা। গল্প নয় সত্যি ঘটনা।

 

এই শতকের গোড়ার দিকের কথা। সাল ২০০৫। মনোবিজ্ঞানের চিকিৎসক গবেষক ও অধ্যাপক ড. দোসার পরামর্শ মত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রোড আইল্যান্ডের স্টিয়ারহাউস নার্সিংহোম এবং রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে নিয়ে আসা হয়েছিল অস্কারকে। নিয়ে আসার কারণ জানতেন ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড.দোসা এবং নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষই কেবল। অস্কারের কাজ ছিল মৃত্যুপথযাত্রী রুগিদের সঙ্গ দেওয়া, যদি তারা একটু ভালো থাকেন। অস্কার সে কাজ সম্ভবত নিবিড় ভাবেই করছিল (করছিল কি?)  নইলে কি করেই সে বুঝতে পারত, কে মৃত্যুপথযাত্রী আর কে নয়? করুণ উপজীব্য কিনা জানা নেই তবে এটা ঘটনা কি করে যেন সে টের পেয়ে যেত কে সত্যি চলে যাবে, আর কে নয়!  অনেকসময়েই এমন ঘটত, তাকে যে রুগির কাছে বসানো হল, সে তার কাছে না বসে চলে গেল তুলনামূলক সুস্থ রুগির কাছে! আর অদ্ভুত ঘটনা হল, তুলনামূলক সুস্থই মারা গেলেন! আর আগের যিনি মুমূর্ষু, তিনি বেঁচে গেলেন। তবে কি অস্কার টের পেত? পাওয়া যায় এমন? যা আপাতভাবে দেখা যায় তা সত্য নয়, ভবিষ্যতের সত্য বদলে যায়! কেমন করে? কার মৃত্যু সন্নিকটে, আর কার নয়? তবে কি রুগীর শরীরের তাপমাত্রার বদলই এই বুঝতে পারার কারণ। এতো গেল ব্যক্তির কথা। আর সমাজ? দৃশ্যমান সমাজের যদি তাপমান কমে আসে, যতই ওপর ওপর ছল্লিবল্লি দেখানো হোক,  তবে কি গোটা সমাজটারই তাপমান ক্রমশ কমে আসছলো?  এরপর?

এর পরও মুনতাশির একা। শয়তানের মত একা, ঈশ্বরের মত একাই। ঠিক একা নয়, সনাতনী, রোহিঙ্গা, পার্বত্য উপত্যকার আদিবাসীরা। তবু তো ভয় ঘিরে ধরে... মুনতাশিরের মনে পড়ছিল এ ধরিত্রীর অন্নজলে প্রতিপালিত গৃহপালিত বেড়াল প্রজাতির ৯৫০০০ বছরের ইতিহাস। ফেলিস ক্যাটাস। ম্যামাল। 'কর্ডাটা! '

এই শেষ শব্দে এসে থমকে গেল দুনিয়া, তবে কি এবার ওরা সামনের দিকে এগোবে...

১...২...৩...৪

উত্তর পেতে সময় লাগবে। আপাতত বলা যাক,

এ কোনো শেক্সপিয়ারের কমেডি বা ট্রাজেডি নয়, বেড়াল জন্মের অভিশপ্ত ভুতের ভবিষ্যতের নিরেট আখ্যান। যার আগে বা পরে যতদূর দেখা যায় অন্ধকার!

আজ ১৬ফাল্গুন, ১৪৩১, রবিবার, ১৪৪৬ হিজরি। প্রথম রমজান।  মসজিদ থেকে  মাগরিবের নামাজের আগের আজান ভেসে আসছে, ক মেয়েরা ক্রমশ জড় হচ্ছে চায়ের দোকানের পাশে, এবার কি তবে বাঘিনী গর্জন...হাতে প্ল্যাকার্ড, মার্জার সরণী জুড়ে আপাতত দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মিনিদের স্লোগান কি মুনতাশির শুনতে পাচ্ছে? হ্যালো মুনতাশির... শুনতে পাচ্ছো?

 

 

 

 

 



1 কমেন্টস্:

  1. দারুণ লেখা! প্রতিবেশী মায়ানগরের দাঙ্গা বিধ্বস্ত সময়ের কিছু চলমান চিত্র! হায় আল্লা, হায় ঈশ্বর, হায় মানবিকতা ......

    উত্তরমুছুন