![]() |
কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৩৩ |
বাচ্চাকাচ্চা
সদ্য বিয়ে করে ঘরে বউ নিয়ে এসেছে তেজস্বী। বউয়ের নাম উর্মিলা। এটা তার তিননম্বর বিয়ে করা বউ। প্রথমবার বিয়ে করে শর্মিলাকে যখন ঘরে নিয়ে এসেছিল, তখন বেশ আড়ম্বর করেই বৌভাত ও প্রীতিভোজের আয়োজন হয়েছিল। যাবতীয় আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধব হাজির হয়েছিল সেই অনুষ্ঠানে। শর্মিলা দেখতে সুন্দরী ছিল। কথাবার্তা বলত মৃদুস্বরে। বিয়ের আগে কিছুদিন উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের তালিম নিয়েছিল। বিয়ের পরে শ্বশুরবাড়িতে এসেও চর্চা বজায় রেখেছিল। সেই কাকভোরে তানপুরা নিয়ে বসত। সন্ধ্যে একটু গভীর হলেও তানপুরায় আঙুল রাখত। সুরেলা গলায় সারাটা পাড়াকে যেন আচ্ছন্ন করে রাখত। এভাবেই দু’তিনবছর কেটে গেছিল। তারপর আর শর্মিলার গান শোনা যেত না। শর্মিলাকে চোখেও কেউ দেখতে পেত না। শর্মিলা কোথায়? সে কি কোথাও গেছে? প্রশ্ন করলে তেজস্বী ও তার বাড়ির লোকেরা বলত, শর্মিলা তো এখন বাপের বাড়িতে আছে। কেন! বাপের বাড়িতে কেন! বাচ্চাটাচ্চা হবে নাকি? তেজস্বী নিতান্ত উদাস গলায় বলত, বাচ্চা তো ভগবানের দান। তিনি দিলেই হবে।
বছর দুয়েক কেটে গেল, শর্মিলা আর শ্বশুরবাড়িতে ফিরে এলো না। তার বাচ্চা প্রসব করার কোনো খবরও কেউ জানতে পারল না। বরং তেজস্বী দ্বিতীয় বিয়ে করে ঘরে নিয়ে এলো নির্মলাকে। এবারও বৌভাতের অনুষ্ঠান হয়েছিল, কিন্তু সন্ধ্যের প্রীতিভোজের আয়োজন ছিল সংক্ষিপ্ত। খুব কাছের কয়েকজন আত্মীয়স্বজন আর বন্ধুবান্ধব আমন্ত্রিত ছিল সেই প্রীতিভোজে। নির্মলা দেখতে খারাপ নয়, তবে শর্মিলার মতো সুন্দরী নয়। কণ্ঠস্বর একটু মোটা ও কর্কশ। তাতে কোনো সমস্যা হয়নি, কেননা নির্মলা গান শেখেনি, বরং নাচ শেখার স্কুলে ভর্তি হয়েছিল। কত্থক ক্লাসে। তা ঘরে নাচ প্র্যাকটিস করলেও বাইরের কারও তা জানার কথা নয়। তবে আড়ালে কান পেতেও নূপুরের আওয়াজ কেউ শুনতে পায়নি। কিন্তু সেটা ততটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয়, বরং বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তার সন্তান প্রসবের খবর। প্রত্যাশিত এই খবরটা পেয়ে তেজস্বী ও তেজস্বীর বাড়ির সবার খুশি হবারই কথা। এমনকি প্রতিবেশীদের কাছেও এটা আনন্দসংবাদ। কিন্তু দেখা গেল খবরটা জেনে সবার কপালে ভাঁজ পড়ল, চোখের দৃষ্টি সংকুচিত হলো, ঠোঁটের কোণে তীর্যক হাসি লটকে পড়ল। বিয়ের পর ছ’মাসের মাথায় বাচ্চা! তাই আবার হয় নাকি! তা হতে পারে, যদি প্রিম্যাচুয়র ডেলিভারি হয়ে থাকে। কিন্তু বাচ্চার সাইজ তো বেশ বড়সড়! ওজনও যথেষ্ট। শরীরে কোনো খুঁতই নেই। তাহলে! নির্মলাকে বাচ্চাসহ তড়িঘড়ি তার বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। সেখানেই বাচ্চা বড় হোক।
তেজস্বীর বাড়িতে এবার সত্যি সত্যিই দুর্ভাবনা ঘনিয়ে এলো। একান্নবর্তী পরিবার। তেজস্বীর জ্যাঠা, বাবা ও কাকার পরিবার একই বাড়িতে মিলেমিশে থাকে। এখনও একটাই হাঁড়িতে সবার ভাত রান্না হয়। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, বংশরক্ষা করা। জ্যাঠা ও কাকার কোনো ছেলে নেই, সব মেয়ে। আবার তার বাবার কোনো মেয়ে নেই, মাত্র একটাই ছেলে তেজস্বী। সুতরাং এখন বংশরক্ষার যাবতীয় দায় ও দায়িত্ব তেজস্বী ও উর্মিলার ওপর। উর্মিলা সব শুনে ভড়কে গেল। রীতিমতো ঘামতে শুরু করল।
0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন