কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১২৮

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১২৮

বৃহস্পতিবার, ২০ মার্চ, ২০২৫

নিবেদিতা আইচ

 

সমকালীন ছোটগল্প


দুপুরচন্ডী

দুপুরগুলো জমে। যেমন জমে আমলকি বা কুলের আচার, জেলির বয়ামে পাইন আপেলের স্তর বা শীতের সকালে টিনের কৌটোয় হাঁসমার্কা নারকেল তেল। সফেদ ফেনিল আস্তর বসে যাওয়া দুধের উষ্ণ মগ, যা হাতে নিলে ‘সবটুকু শেষ করতে হবে’ বলা মায়ের রাগী রাগী মুখটা মনে পড়ে যায়, সেভাবে শহরের শরীরে, খানাখন্দে, ভাঁজে ভাঁজে শীতের দুপুরটা জমছে। কমনীয় ভোরের মতো নেমে আসে না বা নিভে যাওয়া সন্ধ্যার মতো আঁচল ছড়িয়ে দেয় না সে। হুল্লোড় তোলা ঝকমকি রাতের মতো সে নেশা ধরায় না, কিন্তু জমাট বাধা এ দুপুরগুলো কখনো কখনো থেমে থাকা জগতসংসারের সবকিছু টালমাটাল করে দিয়ে যায়।

বাথরুমের জানালায় আজকাল যে জলপাইয়ের পাতাগুলো উঁকি দিচ্ছে, এরকম দুপুরে বাউড়ি দম্পতিও সময় অসময়ে তার আবডালে বসে বেজায় ডাকাডাকি করে যায়। তার সাথে যোগ হয়েছে ছোট্ট শরীর নিয়ে সদম্ভে ছুটে চলে কাঠবেড়ালিটা৷

হুঁস! - শব্দটা শুনে বাউড়িটা উড়ে গেল।

আয়নায় নিজেকে দেখে শমীর বিতৃষ্ণা জাগে। চুড়ো করে বাধা খোপায় আর অবিন্যস্ত কাপড়ে রাস্তার ঘুটেকুড়ানি লাগছে তাকে। পানির বিন্দুগুলো চোখেমুখে পরিহাসের কাদা লেপ্টে রেখেছে।

সকালের রাউণ্ড শেষে আইরিন এসেছিল। দুপুরের খাবার খেয়ে ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে দরজা পর্যন্ত চলেও গিয়েছিল। তারপর যে কী থেকে কী হলো শমীও জানে না। সে তখন মাত্র গোসল সেরে এসেছে। চুপিচুপি আলমারি থেকে বের করা লাল রঙের ডুরে শাড়িটার কুঁচি গুছিয়ে নিচ্ছিল। ঘড়িতে তখন দুটোর ওপরে বেজে গেছে। কারণ প্রতিদিনের মতোই বাসন মাজার খালা তার কর্মযজ্ঞের কথা পুরো পাড়াকে জানান দিচ্ছিল।

এমন জমে ওঠা ভরন্ত দুপুরেও, বিশেষ করে ছুটির দিনে তাই কেউ এ বাড়িতে ভাতঘুমে আচ্ছন্ন হতে পারে না। যতটা না ঝমঝম শব্দে থালাবাসনগুলো কলতলায় পড়ে যায়, তার চেয়ে দ্বিগুণ শব্দে বাসন মাজার খালা সেসব জায়গামতো রাখে। রান্নাঘর থেকে কলতলার দূরত্ব হয়ত ছ'ফুট, তবু প্রতিদিন অন্তত একবার সেসব  হাত ফসকে যাওয়া চাই। একটু সতর্ক হতে বলেও লাভ হয় না। হাত পায়ে জোর না পাওয়া চল্লিশোর্ধ্ব মহিলাদের বড় জটিল শারীরিক উপসর্গ।

এইসব হুটপাটে অতিষ্ঠ হবার মতো তেমন কেউ থাকেও না এসময়। শুধু শমীর সারাদিন এ বাসায় শুয়ে বসে কেটে যায়। বারান্দায় বসে রাস্তা দেখতে দেখতে জমতে থাকা দুপুরের মতো, কত কথা ঘুরপাক খায় তার মনে। পথচারীদের চলাফেরা, উঁচুস্বরে বলে ওঠা দুয়েকটা কথা বা হাতপায়ের নড়াচড়া দেখতে দেখতে বেলা বাড়ে।

দেড়তলা এ বাসায় এসে শুরুতে কিছুটা আশাহত হলেও শমীর এখন বেশ ভালোই লাগছে। ওরা এসেছে প্রায় দিন দশেক হল। শহরতলি থেকে একটু বাইরের দিকে এই এলাকা।  দু'পা হেঁটে গেলে পিচঢালা পথের শেষ আর গ্রামীণ রাস্তার শুরু। রাস্তার ওপাশেই ঘাসের জাজিম পেতে রাখা বিস্তীর্ণ মাঠ আর তারই সমান্তরালে সরিষার ক্ষেত। বাসার ধরনটা পুরনো আমলের। রান্নাঘর আলাদা। টিউবওয়েল বসানো চিলতে উঠান।  বারান্দাটা হল সবচেয়ে সুন্দর জায়গা। গত কদিন ধরে দুপুরবেলার ঠিক এই সময়টার রোদ রেলিংয়ের নকশাটাকে ফ্লোরের উপর কপি করে দিয়ে যায়। শমীর মনে হয় স্কেচবুকটায় এ নকশাটা তুলে রাখা দরকার।

আজ অবশ্য বারান্দায় বসা হয়নি এখনো। আইরিন ইভনিং ডিউটিতে চলে যাবার পর সেই যে ফ্লোরে বসে পড়েছে সে, জানেনা কতটা সময় ওভাবেই ছিল। মনে হচ্ছে শরীরের বেশ কয়েকটা হাড়গোড় ভেঙে গেছে। বাম গালে হয়ত পাঁচ আঙুলের দাগও বসেছে। বহুদিন পর এমন হল। আজ অবশ্য ব্যথার ওষুধটা দিয়ে গেছে আইরিন। একবারে দুটো খেতে বলেছে। কপালটা ফুলেছে তো। ভরা পেটে খেতে হবে, সেই নির্দেশনাও দিয়েছে৷ হাতের মুঠোয় নেয়া লাল রঙের ওষুধগুলো দেখতে শমীর মনে হয় ওগুলো ওষুধ নয়, বাচ্চাদের জামার বোতাম। সেই যে কুরুশের লেইস বসানো সাদা জামার বুকে লাল কাপড়ে মুড়ে দেয়া বোতামের ফুল, ঠিক সেরকম। আইরিনের জন্য মা বানিয়েছিল। তারপর শমীও পরেছে সেই জামা।

কেউ হয়ত এসেছে দরজায়। অনিচ্ছাসত্ত্বেও উঠতে হল এবার। ছেলেরা খেলছে রাস্তার পাশের মাঠে। এ বাসায় আসা অবধি শেষ দুপুরের এই দৃশ্য দেখতে বেশ লাগে শমীর। বোগেনভিলিয়ার ফোকর দিয়ে তাকায় সে। হাফপ্যান্ট পরা ছেলেটা উঁকি দিয়ে দেখবার চেষ্টা করছে। রাস্তার ওপারে আরো কয়েকজন। বাইরে তালা ঝোলানো বলে  ইতস্তত করছে কিছুটা। হয়ত দেয়াল বেয়ে উঠে পড়ত কেউ, কিন্তু বারান্দায় শমীকে দেখতে পেয়ে সংযত হল।

ওর খানিকটা সময় লেগে যায় নিচে নেমে গেইট অবধি যেতে। ব্যথাটা বেশ ভোগাবে এবার। বলটা কুড়িয়ে নিয়ে দেয়ালের বাইরে ছুঁড়ে দিতেই দুদ্দার করে ছুটে চলে যায় সবাই। শমী উঠানে কিছুক্ষণ দাঁড়ায়। চারপাশটা খুঁটিয়ে দেখে৷ নতুন খালা প্রায়ই বলে স্যাঁতসেঁতে একটা গন্ধের কথা৷ শমী কিছু টের পায় না। তবে কি ওর ঘ্রাণশক্তি বিগড়ে গেল? সে তো বরং মিষ্টি একটা ঘ্রাণ পায় মাঝেমাঝে। বন্ধুদের সঙ্গে পূজার মণ্ডপে বেড়াতে গেলে যেমন পেতো, অনেকটা সেরকম। আইরিন একথা হেসেই উড়িয়ে দেয়। শমীও জানে এটা হ্যালুসিনেশন ছাড়া কিছু নয়। শুনেছে এ বাসার আগের ভাড়াটেরা ছিল হিন্দু। তাই উঠান ভর্তি জবা, নয়নতারা, শিউলি আর দোপাটির ছড়াছড়ি। সিঁড়িতে পুরনো আলপনাও রয়ে গেছে এখনো।

আইরিন এবার ইচ্ছা করেই শহর থেকে এতদূরে এসেছে। আগের বাসাটা এমন গা এলিয়ে দেয়া ছিল না। ঘুপচি গলির ভেতরে পায়রার খোপের মতো দুই বেড রুম এক বারান্দার বাসা ছিল ওদের। আলো হাওয়ার বড্ড অভাব থাকলেও গা ঘেঁষা বারান্দায় কান পাতলেই পুরো পাড়ার রোজ নামচা জানা হয়ে যেত৷ নার্সিং হোমটাই শুধু পায়ে হাঁটা দূরত্বে ছিল। আইরিন প্রচুর নাইট ডিউটি করেছে তখন। তালাবন্দি ঘরে শমীর রাত কাটত। এভাবে দিন দিন নিজেকেও খাঁচাবন্দি পায়রা বলে মনে হতো ওর। এখন তবু খাঁচার আয়তনটা বেড়েছে। এ বাসায় আসার পর থেকে অসম্ভব সব কল্পনায় সে মাঝেমাঝে দেয়াল টপকে পালিয়ে যাবার কথা ভাবে। চোখের অনুমানে উচ্চতা মাপে দেয়ালের। না, খুব উঁচু তো নয়। রাস্তার ছেলেগুলো ঠিক তরতরিয়ে টপকে যেতে পারে এই উচ্চতা। আর সেই যে ছেলেটা, পুরনো বাসার সরু গলির মুখে দাঁড়িয়ে থাকত বাসা ছেড়ে আসবার শেষ দিনটিতেও, ও কি পারবে এই দেয়াল টপকে ভেতরে আসতে?

এসময় আইরিনের মুখটা মনে পড়ে যায়। আজ ডিউটি থেকে ফিরে তাকেই দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকতে হবে। ভাবতেই শমী ফিক করে হেসে ফেলে এবার। বাইরের তালা খুললেই কি ভেতরে ঢোকা যায়? ভেতরের দিকেও বাধা দেয়ার সুযোগ থাকে।

দিনের অনেকটা সময় ঐ মানুষটাকে নানাভাবে শাস্তি দেবার উপায় বের করেই কেটে যায় শমীর। তারপর যত সময় গড়ায় উলটো দিকের স্রোত ফিরে আসে৷ উসকোখুসকো চেহারা, চোখের কোলে নির্ঘুম রাতের ক্লান্তি, মাস শেষে সাংসারিক খরচের টানাটানিতে জর্জরিত মেয়েটার জন্য বড়ো মায়া  হয় শমীর। বছর খানেক আগেও এমন ছিল না আইরিন। একটা হাসিমুখ, গল্পপ্রিয় মানুষ ছিল সে। তার চিবুকের নিচ থেকে গলা অবধি যে ক্ষতচিহ্ন সে তো হিজাবের আড়ালেই থেকে যায়। কেউ কি এতগুলো বছরেও তার সঙ্গী হতে চায়নি? রোজ যে মানুষটা কাজে বের হয় তার সঙ্গে তো কত রকমের মানুষের আলাপ। তবু এই একলা যাপনের দিন কি ওর ফুরাবেই না কখনো! এসব কথা জানতে চাইবার সাহস হয় না শমীর। এ বাড়িতে আসলে বিয়ের আলাপ হয় না। প্রেমতো নিষিদ্ধ শব্দ। শমী শুধু একবার প্রেম করতে ইচ্ছুক একজনের সঙ্গে আলাপ করেছিল। প্রিটেস্ট এর ঠিক আগে কোচিং সেন্টারে বিতিকিচ্ছিরি পরিস্থিতি হয়েছিল সেদিন। শমীর মনে আছে সবার সামনে আইরিনের সেই মারমুখী চেহারা। অবিন্যস্ত হিজাবের ফোকর দিয়ে বীভৎস ক্ষতচিহ্ন সেদিন অনেকেই দেখতে পেয়েছিল। তখন থেকেই চাউর হয়েছিল -শমীর বোনটা খুব ঝগড়াটে, একেবারে ডাইনি।

মাঝেমাঝে মনে হয় সত্যিই হয়ত আইরিনের হাতে খুব খারাপ কিছু হয়ে যাবে ওর। ঘুমের ভেতর বা অন্যমনস্কতায় ছটফট করে ওঠে শমী। মনে হয় একটা প্রচণ্ড আগুনের হলকায় জ্বলে যাচ্ছে পুরো শরীর। চোখ বুজলেই দেখতে পায় হুডতোলা রিকশায় ছুঁড়ে দেয়া তরল আগুন, যার হলকা ওর আঙুলের ডগা ছুঁয়ে ফসকে গেছে অন্য কারো শরীরে, যার উত্তাপ আজ অবধি দুজনেই বয়ে চলেছে।

সারাদিন এসব টুকরো মুহূর্তের ব্যবচ্ছেদ শেষ হলে খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা শুরু হয় শমীর। হয়ত সেদিন বেরুবার মুখে মানুষটা বলে গেছে আর ফিরব না ঘরে। দেরি হলে তাই দুশ্চিন্তার পারদ বাড়ে। বারান্দায় দাঁড়ালেই শমীর মনে হয় সে ফিরে এলে ছুটে গিয়ে দরজাটা খুলবে। কপাট খুললেই দেখতে পাবে আগুনরঙের শাড়ি পরে ঝলমলে দুপুরচন্ডী ফুলের মতো আইরিন দাঁড়িয়ে আছে।

 

 

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন