![]() |
কবিতার কালিমাটি ১৪৩ |
পুরুষ-প্রকৃতি ও কল্কি অবতার
(১)
একটি মুখ খুঁজছে নিখুঁত শ্রবণযন্ত্র। হৃদয়হীন হলেও
শ্রবণশক্তিতে অসীম ধৈর্য, দীঘিতে সূর্যের কিরণ, ঝলমলে আলো। আলো-ছায়ায় ভেসে ওঠে একটি
মায়াবী মুখ, চির আপন চোখে তার নরম ভোরের আলো। অন্ধকারের বুক চিঁড়ে মুখ দেখতে ছুটে যাওয়া-
চির উজ্জ্বল সে মুখ 'সত্যম, শিবম, সুন্দরম'। জ্যোতির্ময় আলোর কাছে পরাজিত জীর্ণ অন্ধকার,
অনুচ্চারিত শব্দেরা কৈ, মাগুর, জিওল শ্বাসরুদ্ধকর।
হৃদয়হীন, অসীম ধৈর্যশালী, শ্রবণশক্তির মায়াবী মুখের
নরম আলো একটি কাঙ্খিত মুখের হৃদয়গ্রাহী হতে পারে নি! সন্দেহাতীত মন, অনুচ্চারিত যন্ত্রণা।
মনে শব্দ শেলের ছোপ- সব লুকিয়ে খুঁজে চলেছে 'সেই' বিশেষ মুখ। অন্ধকারের বুক চিঁড়ে রুদ্রের
সৌম্য প্রশান্তি দেখে 'সৃষ্টি ও ধ্বংসের' প্রতিমূর্তি স্বয়ম্ভু নটরাজ। অবয়বহীন মুখে
নেমে আসা অন্ধকার; একরাশ অন্ধকার বুকের ভেতর। শব্দ-যন্ত্রণার ফট্ ফট্ ধ্বনি- জ্যান্ত
কৈ- মাগুর, জিওলের চঞ্চল কিলবিল... আঁধো আলো-ছায়া মুখে ক্লান্তির বদলে প্রশান্তির হাসি।
'সেই' বিশেষ মুখ হাসির ভার বয়ে চলে গেল বহুদূরে, একটি মুখের খোঁজে যে মুখটি অবিরাম
খুঁজছে নিখুঁত শ্রবণযন্ত্র।
(২)
দেবতা আর রাক্ষসের ভিড়ে চেয়েছে মানবিক মুখ
মরুভূমিতে মরীচিকার জল, মরীচিকার মায়ার ছায়ায়
বাকরুদ্ধ মন, হা-হুতাশ করে একটি মুখ খুঁজে ফেরে
মরীচিকার সহচরীদের যত্নে, রৌদ্র আয়নায়
প্রতিবিম্বিত সাদা-কালো ছোপে ভেসে ওঠে
প্রাচীনকালের ভাগ্য বিড়ম্বিত একটি কঙ্কালের মুখ।
ঠিক যেন 'সেই' বিশেষ মুখের আয়না!
মাথা ও হৃদপিণ্ড নিঁখুত, শরীরের লাল-কালো ছোপ
মৃত্যুর পরে সেও একটি বিশ্বস্ত শ্রবণযন্ত্র খুঁজে
পায়নি!
আস্ত মাথা ও হৃৎপিণ্ডের ভেতর জমে আছে তার
অবর্ণনীয় লাঞ্জনা-গঞ্জনা- বঞ্চনা- তিরস্কার-
অকথ্য কথনের নীরব অনুচ্চারিত ইতিহাসের সুবিস্তীর্ণ
অধ্যায়।
(৩)
একটি মুখ খুঁজছে আরেকটি মুখ
সভ্যতার শুরুতে সেই প্রাচীনকাল থেকে তার এই খোঁজ-
খোঁজ শেষে মুখোমুখি বসবে দুজন
একে-অপরকে বলবে নিজেদের কথা
আয়নারূপী দুটো মুখ-মন
হৃদয়হীন, অসীম ধৈর্যশালী, শ্রবণশক্তির মায়াবী মুখের
নরম আলোর আর তো নেই প্রয়োজন।
শহর নগর বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মন্দির, মসজিদ, চার্চ,
বৌদ্ধিষ্ট টেমপল
ঈশ্বর সেবায় মগ্ন অগুনতি মানুষের ঢল
রক্ত থেকে মন বাঁধে সম্পর্কের বাঁধন
জনসমুদ্রের জোয়ারে ভেসে খেয়া নৌকায় পারাপার 'ইহলোক
থেকে পরলোক'
(৪)
একটি জীবিত ও একটি মৃত মুখ নিজস্ব কথোপকথনের ধারায়
বসে আছে শ্মশানে। জীবিতের সমাজ- সামাজিক মানুষের ক্রিয়াকলাপে অত্যাচারিত, অসহায়ত্বের
করুণ গোঙানির ভাষ্যরূপ- তৈল নিষিক্ত দন্ডের লাল-কালো ছাপ তারও গায়ে এঁকে দিয়েছে সভ্যতার
উচ্চপদ ধ্বনি। জীর্ণ শরীর সয়ে সয়ে স্তব্ধ, শেষে বাকরুদ্ধ, পায়ের চলন তার চিরশান্তির
শ্মশান।
হেলিয়ে দুলিয়ে নিজেকে জুড়ে রাখে মাটিতে। ব্রহ্মাণ্ডের
ভেতর যেমন নবগ্রহ হেলিয়ে দুলিয়ে নিজেকে জুড়ে রাখে আবহমান। কঙ্কালও পৃথিবীতে বসে দেখছে,
সূর্য, চাঁদ, পাহাড়, সমুদ্র, মাটি, গাছপালা, জীবজন্তু- সবকিছু জড়িয়ে স্নেহে আগলে মা
প্রকৃতি যেন চিরকুমারী, অপূর্ব সুন্দরী।
পৃথিবী আজ পরম সুন্দরী না হলেও তার নীচে ঘর বেঁধেছে
ধর্ম। রক্ত নয়, মানবিকতা নয়, রক্ত- মানবিকতার চেয়েও বেশি, ভাষার চামড়ায় গঠিত ধর্ম-মতবাদ।
যত বেশি আদরনীয় নিজ ধর্ম প্রীতি তার কয়েক'শো কোটিগুণ বিদ্বেষ পৃথিবীর অন্য ধর্ম-জাতির
প্রতি।
রাষ্ট্রের অ-নিয়ম বদলে সঠিক নিয়মের পক্ষে উচ্চারিত
কন্ঠ, প্রতিবাদী, সাহসী, বিদ্রোহী, নেতা। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মানেই আজ দেশদ্রোহী।
একজন প্রতিবাদী একজন দেশদ্রোহীর পেছনে মাটিয়ে মুখ
লুকিয়ে কিলবিল করে কাঁকড়ার দল। মেরুদণ্ড সোজা করে ভিড়ের ভেঙে এগিয়ে আসেনি একটি সাধারণ
- অসাধারণ মুখ। হৃদয়হীন, অসীম ধৈর্যশালী, শ্রবণশক্তির মায়াবী মুখের নরম আলো নিষ্প্রভ।
শত শত মুখের সামনে প্রতিবাদের স্বরূপ জ্যন্ত মরুভূমির নীচে করব!
'সেই' বিশেষ মুখটি দেখা যায় হাজার হাজার কাঁকড়ার
ভিড়ে। রক্তাভ চোখ, প্রতীক্ষা জ্যান্তমৃত অসমসাহসী মেধাবী কঙ্কালের।
দেশ তথা সমগ্র বিশ্বে দু' একটি ছাড়া মুখ নেই আর,
নেই সহৃদয়, অসীম ধৈর্যশালী হৃদয়, নেই অচঞ্চল মনের শ্রবণশক্তি- যন্ত্র। যান্ত্রিক মাংসের
বাজারে মুখে মুখে মুখোশ, হৃদয়ে বিষকুন্ড, পরিস্রুত ভাষা অম্লমধুর। মস্তিষ্কের রক্তস্রোতও
হাসিতে মেশানো বিষ কাটারি।
গোটা বিশ্ব ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় কঙ্কাল - ধর্মমোহ
ও ধর্মনিরপেক্ষা, হৃদয়হীন অমানবিকতা, নিজ স্বার্থ ও অন্ধমোহ, অকল্পনীয় লোভ মনুষ্যরূপী
জীব সমাজকে দ্রুত গতিতে অধপতনের মহাসমুদ্রের দিকে বয়ে নিয়ে চলছে। অভ্যুথানের মতো পুনরায়
সমুদ্র গর্ভে নিমজ্জিত হবার সময়- কাল আসন্ন।
(৫)
জীবিত নিরুপায়। সে দৈনন্দিন এক সারিতে চলাফেরা
করে। রাস্তায় 'সেই' বিশেষ একটি মুখ খুঁজে বেড়ায়। যে বিশেষ একটি মুখ খুঁজে বেড়াচ্ছে
নিখুঁত শ্রবণযন্ত্র। মুখ ও শ্রবণযন্ত্রের প্রতীক্ষায় তার অক্লান্ত চোখ দেখে, শরীর ও
জীবনহীন মৃত কঙ্কালের চোখে জল। জলে লেখা-এই ধর্মান্ধতা ও স্বার্থজনিত লোভ যাদের মধ্যে
আছে তারা আমৃত্যু অপেক্ষা করবে, জন্নত ও অমৃতের। সুজলা সুফলা বসুন্ধরা পাপময় নাহলেও
তার জীবনাবসান প্রয়োজন। তার শুদ্ধি ও মুক্তির জন্য 'সেই' বিশেষ একটি মুখের খোঁজ ভীষণ
প্রয়োজন।
জীবিতের চোখে জল। বিড়বিড় ঠোঁটে- যতদিন জনসচেতনতা
ও জনজাগরন সম্পূর্ণরূপে সম্ভব না হচ্ছে, আমিও জীবিত শরীরকে কঙ্কালে রূপান্তরিত করে
'সেই' বিশেষ একটি মুখের খোঁজে বেরিয়ে পড়ি। বাস্তব জীবনাভিজ্ঞতা আহরণ করতে করতে হয়তো
পেয়েও যেতে পারি সহৃদয়-হৃদয়সংবেদী, অসীম ধৈর্যশালী, শ্রবণযন্ত্রশক্তি ও মায়াবী মুখের
নরম আলোয় নটরাজ, যার সুদীর্ঘ তপস্যার দিন শেষ হয়ে এবার পৃথিবীর দিকে দৃষ্টিপাত করবার
সময় চলে এসেছে।
(৬)
ত্রিদেব হস্তক্ষেপের কাল সন্নিকটস্থ। বিশ্ব পিতা
ব্রহ্মার সৃষ্ট সংসারে রুদ্রের তান্ডব প্রয়োজন। প্রয়োজন কারণ সৃষ্টির বীজে লুকিয়ে আছে
ধ্বংস, ধ্বংসের বীজে নতুন সৃষ্টি। বিশ্বের পালনকর্তার মুদিত নয়ন খুলে এবার অবতীর্ণ
হবার কাল। কালচক্র এগিয়ে চলেছে কল্কি অবতারের প্রেক্ষাপটের ভূমিকা লিখতে- সৃষ্টির এক
নতুন অধ্যায়।
'সেই' বিশেষ মুখ, রক্তাভ, নিষ্প্রভ মুখ, রাক্ষস
হৃদয়ে যে হৃদয়হীন, করুণার হৃদয়- হৃদয়সংবেদী, অসীম ধৈর্যশালী, শ্রবণশক্তির মায়াবী মুখের
স্মিত হাস্যের নরম আলোর এখনই তো প্রয়োজন।
পরিশিষ্টঃ-
আসন্ন যুদ্ধের বিষয়ে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মানবিক গুণসম্পন্ন
বিশাল সংখ্যক সৈন্যদল গঠিত হবে। পৃথিবীর কোথাও কোন জীব অথবা জন্তু, যারা প্রকৃত অর্থেই
মানবিক, দয়া পরায়ন, সৎ ও পরোপকারী - তাদের যুদ্ধে আহ্বান করতে হবে। তাদের অস্ত্র হবে
ধীর, স্থির এবং নতমুখে স্নিগ্ধ মধুর হাসি। যারা অস্ত্র ব্যবহার করে যুদ্ধ ও রক্তপাত
করতে উদ্যোত, আমাদের সৈন্যের প্রতিবাদ স্নিগ্ধ হাসির অস্ত্র।
তারা রক্তের স্রোত বইয়ে দিলেও আমাদের সৈন্যদল অস্ত্রের
বিরুদ্ধে তাদের শোনাবে একটি সাধারণ মানুষের জীবনাভিজ্ঞতা। কথার সত্যিতা যাচাই করতে
তাদের শোনানো হবে, বিদগ্ধ মনীষীদের বানী। একদিকে অস্ত্রের ঝংকার আরেকদিকে উচ্চস্বরে
মনীষীদের বাণী প্রচার করে দিকভ্রষ্টদের সঠিক রাস্তায় পরিচালিত করতে হবে।
(৭)
'সেই' বিশেষ একটি মুখ নিয়ে মা পার্বতী আজও কী খুঁজে
বেড়াবে নিখুঁত শ্রবণযন্ত্র!
মহাদেব তপস্যায় বসে ব্রহ্মাণ্ডের অবলোকন করছেন
পাপে ভরা এ ধরায় যুগ্ম মূর্তিতে এসো হে, পুরুষ
ও প্রকৃতি।
0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন