কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১২৮

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১২৮

বৃহস্পতিবার, ২০ মার্চ, ২০২৫

মৌ চক্রবর্তী

 

ফ্ল্যাশব্যাকে থিয়েটার পাঁচালি … আমাদের বিনোদ - এখনও বেনিয়ার সম্বল-সিম্বল

 


প্রতি,

উনিশ শতকের আটের দশকে নটীদের ইতিহাস শুরু হওয়ার আগেই গোলাপসুন্দরীদের নিজস্ব এক রোজগেরে সমাজ ছিল, পরিচয় ছিল, পেশা ছিল। থিয়েটার তাঁদের নতুন পরিচিতি দেয় যেমন, তেমনই তাঁরাও দীর্ঘ থিয়েটারের অবিচ্ছেদ্য ইতিহাসের জন্ম দেয়। একদিকে, ইতিহাস বাদে জাতির অস্তিত্ব থাকে না। অন্যদিকে ওই সত্যের চারধারে অনেকগুলো বৃত্তের মধ্যে সবচেয়ে ছোট এক বৃত্তের মধ্যে হাঁসফাঁস করা ইতিহাস তাঁদের। কেন এসব লিখছি... এসব তো জানা তথ্য। তবে? সময় নষ্ট করে একুশ শতকের পাঠক বুঝি এই না-দেখা থিয়েটারের কোনও এক দর্শকের... এবং ক্ষুদে শ্রমিকের পাঁচালি পড়বেন?

থিয়েটারের দর্শক থাকলেও পাঠকের সংখ্যা কত?

পাঠক ঠিক কোন জায়গায় তাঁর দেখা খুঁজে পাবেন ... এটা ধরতে-ধরাতেই এই পাঁচালি।

সুধি পাঠক, এই ইতিহাস না-জানা কজন নটীদের? শুধু তাঁদেরও নয়, একথা এতদিনে প্রমাণিত হয়ে গেছে। এ ইতিহাস বাংলা তথা থিয়েটারের তথা সংস্কৃতির। বা, আরও গর্ব করে বললে, তা আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির অংশ। এবং থিয়েটার গবেষণার অংশ।  কারণ, বিজ্ঞানের নিরিখে দেখলে মানুষের জন্ম মানুষেরই থেকে হয়। সেই জন্ম থেকে যদি কলাবিদ্যায় পারদর্শিনীদের আমরা তথা সমাজ পেয়ে থাকে, তাহলে সে তো আনন্দের, গর্বের, অহংকারের।

একথা স্মরণের যে বিনোদিনীর আগেও উনিশ শতকের 'স্টার' অভিনেত্রী ছিলেন।

ধরা যাক তাঁর নাম গোলাপ... গোলাপ যে বেড়ে গায় ...। যার গান শুনতে চাদর-মুড়ি, আজকের হুডি-পরা যেমন, তেমনই... কোনও সমঝদার, বিশিষ্ট দর্শক আসেন। এবং তিনি পরে তা লেখেনও। এভাবেই ক্রমশ এক ইতিহাসের শিরা-উপশিরায় পৌঁছে যাওয়া।

কোন নিরিখে একজন বিনোদিনী হয়ে উঠতে পারেন? সেটা বুঝে নেওয়া যাক্। উচ্চাঙ্গের বিশিষ্ট দার্শনিকের 'আবার করে ভাবো'-- থিওরিতে 'আবার ভাবলে' তো দোষ নেই কোনও। ব্রং, ভাবা মানে আবারও চষে ফেলে উঠে আসবে কত না-দেখা উপাদান। সেসব রসের পরচর্চা নয়। বিশিষ্ট অভিনেত্রীদের জীবন থেকে শেখার এক পাঠ। এই ... এই থিয়েটারের আলোচনায় করতে চাওয়া হচ্ছে।

একুশ শতকের কাছে এটাই একটা চ্যালেঞ্জ, যে মস্ত হয়ে থাকা ওই 'বিনোদিনীর' আকর মৌলিক ভেঙে আর কিছু করতে পারা যায় কিনা? এখানেই আবার ফিরে দেখা, ফিরে ফিরে দেখা।

কবির কথা হয়ে যাচ্ছে হয়তো... থিয়েটারের পাঁচালিতে কবির ঠাঁই? হয় হয়, হইয়েছিল গো। সেসব জানতে গেলে পড়তে হবে পরতে পরতে।

যেকথা হচ্ছিল, বিনোদিনীর আগে কে ছিলেন স্টার? আমি বলি, বিশিষ্ট সংগ্রামী অভিনেত্রী গোলাপসুন্দরী। যেমন করে নিজের স্থান করলেন থিয়েটারে, তারপর নাটক-লেখা। তারপর বিয়ে নামক সম্মান আদায়। এসব কোনও মন্দ মেয়ের উপাখ্যান নয়। শুধুই মনে মনে ভেবে ফেলা নয়, কাজেও করে দেখান। উরিব্বাবা! তখনের কথা ভাবলে গায়ে জ্বর আসে।

গোলাপসুন্দরী থেকে সুকুমারী দত্ত হয়ে ওঠার যে লড়াই, তা কোনও থিয়েটারের লড়াই নয়। এক মেয়েমানুষের লড়াই, তাঁর গায়ে লেগে থাকা উজ্জ্বল ফসফরাস, কোনও স্পর্ধা সে! সে বিপ্লবী। সে থিয়েটারের ম্যানেজার। সে বিবাহিতা স্ত্রী। সে একা-মায়ের উদাহরণ। মনেহচ্ছে এসব পড়ে যে,  ওই শতকে পেরেছিলেন এসব লড়াই করতে? এত প্রতিষ্ঠা যে... তিনি এখন গবেষণার হয়ে রইলেন।

যেখানে রোজকার নারীদের ত্বক আর চুলের বাইরে কোনও সমস্যা বুঝি নেই...। যেখানে নারীদের তকমা পাওয়া মেয়েদের দল, সাজান-পুতুলের খেলায় স্বাধীনতা নামক উপহারটিকে ব্যঙ্গ করে এগিয়ে চলেছে... দেশে-বিদেশে। কিন্তু হে নারী, তোমার তুমি কই?

হে নারী, তোমাকে নিয়ে আরও স্বপ্ন ছিল যে...। তুমি দেখতে পাওনি যে __ একটা বিনোদিনী তৈরি হতে কতটা সময় লাগে? আর বিনোদিনী সিনেমার জন্যে বিনোদিনী তৈরি হতেও...।

এটুকু বুঝি আমরা যে, বিনোদিনী এখন আইকন একুশের সংস্কৃতির, আর একটা ভালো ব্যবসা।

ঠিক যেমন উনিশ–বিশ শতকের হলমালিক-মুৎসুদ্দি-বেনিয়াকূল, থিয়েটারের ব্যবসায় এসেছিল এই কারণেই।

সেখানে মেয়েদের মেয়েদের করা একদল 'এগিয়ে ভাবাদের' সঙ্গে দ্বন্দ্ব বেঁধে যায়। থিয়েটারের মেয়েদের প্রতারণা, অত্যাচারিত, অসম্মানের সঠিক তথ্য কোথাও অনুল্লেখিত থেকে যায়।

যেখানে মেয়েদের সাধারণ সমাজের ঘটনার প্রতিচ্ছবিও একই। তাঁদের জীবনের অবস্থান 'পশু'র ন্যায় বলে উল্লেখ করেছেন তৎকালীন লেখিকারা। এমনকি এক লেখিকা আলিপুরের পশুশালার পশুদের খাদ্যের উল্লেখ করে লিখেছেন, সমাজের বেশিরভাগ মেয়েদের অবস্থা তার চেয়েও খারাপ।

এক্ষেত্রে থিয়েটারের মেয়েদের অবস্থান এবং সাধারণ ভদ্রজনকথিত সমাজের মেয়েদের অবস্থান একই কারণে আখ্যায়িত করার। তা হল, পুরুষের আধিপত্য, অত্যাচার এবং পুরুষ সমাজের কর্তা হয়ে এই দুই শ্রেণির নারীদের অবস্থানের নিয়ন্ত্রক। অর্থাৎ, এঁদের সামাজিক অবস্থান দুই মেরুর হলেও, সমস্যার কারণে তাঁদের একই তত্ত্বের আওতায় দেখা যায়। যেহেতু সমস্যার উৎস লিঙ্গভেদ সাপেক্ষে, তাই স্ত্রী-দের সামগ্রিক অবস্থান ওই একই জ্যামিতিতে...।

আবার ফেরা যাক অভিনেত্রীদের আনা হল কেন তাহলে? স্পষ্ট বোঝা যায় যে, সময়ের পাতায় হিসেবে তখন ওইটাই ছিল স্ট্যাটাস সিম্বল। উনিশ শতকের সমাজের সাপেক্ষে থিয়েটারে স্ত্রীচরিত্র-- স্ট্যাটাস সিম্বল এবং এক বাস্তব ঘটনা হয়ে উঠেছিল তাই। তবুও, এর কেন্দ্রে সমাজের দুই তরফের মতামত লক্ষ্য করা যায়। এক, স্ত্রীলোক আনার বিরুদ্ধে। যথা, স্বয়ং বিদ্যাসাগরমশাই। দুই, স্ত্রীলোক নিয়ে থিয়েটার, পক্ষে কবি নাট্যকার মধুসূদন দত্তের ভোট। যা সাহস জুগিয়েছিল থিয়েটারে স্ত্রীলোক নিয়োগের। এক্ষেত্রেও, দেখা যায়, মত-পার্থক্যের কারণ সমাজের পুরুষদের আচরণ, তাঁদের ভোগবাদী, অত্যাচারী ব্যবহার, যা বিশদে জানতেন বিদ্যাসাগরমশাই। আর নব-সংস্কৃতির দূত মধুসূদন এই সমাজের উন্নতির চেয়ে কালের দাবি মেটাতেই উৎসুক ছিলেন, বোঝা যায়। যদিও, তাঁর জীবিত অবস্থায় এই অভিনেত্রীদের মঞ্চে অভিনয় হওয়া ঘটেনি। তিনি দেখে যেতে পারেননি।

তবুও, নারীর সাধারণ যে সমস্যার পাশাপাশি মঞ্চজাতিকাদের সেই চলার শুরু। এরই মধ্যে জমে ওঠে অধিকারের দাবি, অসাম্যে এবং অসম্মানে। যা, তুলনাত্মক বিচারে, একুশ শতকের সমাজপ্রগতির বিশ্লেষণে আলোচিত হওয়ার দাবি রাখে। কারণ তো অনেক। তবুও, গোলাপসুন্দরী-র থিয়েটার করার জীবনের চেয়েও বেশি আলোচিত হয়ে থাকে তাঁর পূর্ববর্তী জীবন। যেখানে থিয়েটার সমাজের প্রতিফলন হিসেবে ধরা হয়, সেখানে সমাজের ছবি যে বিশেষ তিরস্কারের। যেমন, সুকুমারী দত্ত-কে বিবাহ করার পরও, সন্তান-সহ ত্যাগ করে যাওয়া পুরুষের কথা ভুলে গেলে চলবে না। ত্যাগ করার কারণ সমাজ ও সমাজের সেই মানসিকতা, যা মূল সমাজের মেয়েদের সঙ্গে গোলাপসুন্দরীর সমস্যার তফাত রাখে না।

একইসঙ্গে, বিনোদিনীর টাকায় তৈরি হওয়া থিয়েটারের নাম নিয়ে প্রশ্ন। বি-থিয়েটারের নামকরণ থেকে যে সমাজের কথা দেখা যায়, সেও তো ভোগবাদী পুরুষের আধিপত্যের-নিপীড়নের। যেখানে বিনোদিনী একটি ব্যবহৃত-উপাদানমাত্র।

একই তথ্য মেলে ওইসময়ের প্রাবন্ধিক লেখিকাদের কলমে চিন্তনে ভাবনায়। সমাজ থেকেই জন্ম হয় কুলটা তথা নষ্টা তথা মন্দ মেয়েদের। বিশেষ করে, উল্লেখ করছেন লেখিকা বিনোদিনী তাঁর আত্মকথায়, '... কীভাবে একটি স্ত্রীলোক আপনি নষ্ট হতে পারে, যদি না তার অসহায়তার সুযোগ নিয়ে, প্রেমে ভুলিয়ে, সমাজের অত্যাচার থেকে নিষ্কৃতির স্বপ্ন দেখিয়ে একজন পুরুষ তাকে ভ্রষ্ট না করে।'

আবার বিনোদিনী এও লিখছেন যে, এই সমাজের সেই পুরুষ উচ্চমানের উচ্চবিত্ত এবং সমাজে সেই শিরোমণি। অর্থাৎ, নারীর লাঞ্ছনার ইতিহাস ঘরে ও ঘরের বাইরে একই। মেয়ে সে থিয়েটারের জাতিকা হোক বা কুলবতী। তবে, সামাজিক প্রতিকূলতার মধ্যেও নটীদের দ্বারা তথা গাইয়ে-বাজিয়ে শিল্পী কন্যেদের দ্বারাই রোজগেরে মেয়েদের সূচনা।

এইখানে সাধারণ সমাজের নারীদের তুলনায় অভিনেত্রীদের শ্রেষ্ঠত্ব, বহু ভোগ্যা, পুরুষের লাম্পট্যের পাশাপাশি তাঁরা ইচ্ছাধীন পেশাদার।

যেখানে পৃথিবী জুড়ে নিরীক্ষা চলছে থিয়েটারের মঞ্চ, বিষয় ভাবনা, শৈলী নিয়ে, সেখানে অভিনেত্রীদের অবস্থান পৃথকভাবে নির্ণয় না-করতে পেরে ফের বেনিয়াদের দল একটা ফিলিম বানায়। যেখানে বিনোদিনী একটি নটীর উপাখ্যান শুধুমাত্র। হায় রে সমাজ, দু-শতকের ইতিহাস পরেও ... সীতা কার বাপ নামের প্রশ্ন? ওহে, ফিলিম বানানোর মাননীয় মুৎসুদ্দি, বিনোদিনী এক অভিনেত্রী নন, তিনি একক বা ইউনিট, তাঁর নামে এখনও কোটি বাজেটের সিনেমা করতে হয়, বিক্রি হয় জগতে।

তাই, তাঁকে নিয়ে কাজ করার আগে, একটু সাধারণ সমাজের জ্ঞান থাকার দরকার। তিনি উদাহরণ প্রতিম। তিনি নারী, এখনও লিঙ্গভেদে পারসন বা ব্যক্তি নন। তিনি অভিনেত্রী অ্যাক্টর তথা অভিনেতা নন, অ্যাকট্রেস হন। এটুক মেনেই চলছে থিয়েটারের নারীর কথা উনিশ এবং বিশ শতক থেকে একুশের সমাজের প্রগতির সাপেক্ষে।

শেষে, থিয়েটারের মেয়ে বিনোদিনী, সমাজেরও মেয়ে। তিনি এক, তিনি একক, তাঁকে বুঝতে গেলে সমাজকে বোধকরি আরও সমান্তরাল হতে হবে লিঙ্গ-সাম্যের দিকে। আর তারপর, গোলাপসুন্দরী ওরফে সুকুমারী দত্তকে দেখাতে পারবেন বিনোদিনীর অপরদিকে। সেজন্যে ইতিহাসের পাতায় চক্কর দিতে হবে, হ্যাভ ফান জাতীয় বুড়ি ছোঁয়া ইতিহাস-পাঠে সেটা সম্ভব নয়।

_ ইতি

একুশ শতকের ফ্ল্যাশব্যাক  স্বত্বাধিকারী 

 


2 কমেন্টস্:

  1. যুগান্তর মিত্র২৭ মার্চ, ২০২৫ এ ২:১৮ PM

    অত্যন্ত ভালো লেখা। শুভেচ্ছা মৌ।

    এই লেখায় খুব প্রয়োজনীয় প্রশ্ন উঠে এসেছে। লিঙ্গসাম্যই শুধু নয়, বিনোদিনী বা সুকুমারীদের সম্পর্কে শ্রদ্ধা রেখেই ইতিহাস পুনর্গঠন করা জরুরি। এ তো আমাদেরই ঐতিহ্য। একে লালন করতে হবে আমাদেরই।

    উত্তরমুছুন