কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১২৮

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১২৮

বৃহস্পতিবার, ২০ মার্চ, ২০২৫

নীতা বিশ্বাস

 

সমকালীন ছোটগল্প


প্রতিবাদ খুন হয়ে যায়…   

শিলাবতী বয়ে চলে। নিজেকে বইয়ে চলে অকাতরে। উতসবে আনন্দে দ্রোহে প্রতিবাদে নাটকের মঞ্চে। শিলাবতী গরিবের মিছিলে, রেডক্রশের মিটিংয়ে, রেডলাইট এরিয়ার মেয়েদের সাথে, এল.জি.বিটি.’দের হাজার ঝামেলায়, রূপান্তরকামীদের সরব দাবীতে। আগুন ওকে ছোঁয় না, নদী ওকে ডোবায় না, ভয় ওকে কাঁপায় না। দিনের শেষে টুং করে একটা ছোট্ট মেসেজ ওকে জিজ্ঞাসা করে, কেমন আছ শিলাবতী? ঠোঁটভরানো মনভরানো হৃদয়ভরানো হাঁসিতে দীপিত হয়ে ওঠে ওর চোখ মুখ। শিলাবতী খাতা খুলে বসে রাতের নিস্তব্ধ অবেলায়। একে অবেলা বলে না শিলাবতী। এটাই তো ওর কাঙ্খিত বেলা। বেলা শেষেও ওর বেলা শেষ হয়না। যেন এক্কেবারে শেষবেলা এলে ওর বেলা শেষ হবে। তার আগে নয়। সারাদিনের জনতা রাতের নির্জনতায় এসে ওকে যে যে প্রশ্ন করে, এই সময় সে তার সাম্ভাব্য উত্তর লিখে রাখে। এটা সে বিশ্বাস করে। এই বিশ্বাস কলমে নিয়ে শিলাবতী অক্ষরে চাষ দেয়, নিড়েন দিয়ে আগাছা সরায়, কর্মাঙ্গন নিকিয়ে নেয়। বছরজুড়ে এই তার উসব উত্ত্র উতসব! এই বয়ে চলা। বছর শেষের শেষ দিনে এমনি করেই মনের কাছ থেকে টুং করে মেসেজ পায়, কেমন আছো শিলাবতী! শিলাবতী উজ্জ্বল, শিলাবতী নির্মল, শিলাবতী নতুন, শিলাবতী নম্র , শিলাবতী কবিতা, শিলাবতী অনুভবি, শিলাবতী মাঠানাম খেলোয়াড়, শিলাবতী মুশকিলআসান। এই খাতে বইতে বইতে শিলাবতী আত্মবিশ্বাসী।

কবে যেন শুরু করেছিল সে নিজেকে বইয়ে দিতে! কোনো কোনো দিন শিলাবতী নিজের ঝাঁপি খোলে। খুলে বসে নিজের সাতকাহন। আজ পর্যন্ত জমে থাকা তার ঝাঁপির চেন খোলে। খুলে খুলে দেখে তার বারোমাসের স্যিলেবাসহীন আত্মকথা। জন্মদিন তো সেই দিনটা, যেদিন হোম বা আশ্রম শব্দটার পবিত্রতার আড়ালে কিছু লোকের লীলাখেলার  আর তছরুপের সন্ধান সে পেয়ে গেছিলো! বাথরুমের জানলা গলে পালিয়ে আসবার দুঃসাহসিক কাজটা সে করে বসেছিল। তখন থেকেই শিলাবতীর মাথায় বসে গেছিলো এই ধারণা যে এতগুলো মেয়ের ভবিষ্যত তার ওপর।

হোমে যতদূর পড়াশোনা করেছিল তাকে কিন্তু বয়ে যেতে দেয়নি শিলাবতী! আঁকড়ে রেখেছিল আর অনেক কাটখড় পুড়িয়ে নিজের পরীক্ষা দিয়ে সে একটা এন.জি.ও তে জায়গা পেয়ে বিনা বেতনে পড়াশোনা চালিয়ে গেছিল। এমনকি তারা শিলাবতীর চাকরির ব্যবস্থাও করে দিয়েছে। সরকারী হোম আর সদ্বুদ্ধির এন.জি.ও’র তফাত বুঝতে পেরেছে বাইরে বেরিয়াই! এই পর্যন্ত এসে নিজেকে তৈরি করে নিয়ে এবার সে নিজের ইচ্ছেতে পরিচালিত হবার সাহস আর ঝুকি নেওয়া। কোনও পদ নয়,শুধু সকলের সাথে মিশে যাবার বাসনা। অনেক হার্ডেলস পার করা, অনেককিছু ঠেকে শেখা। প্রলোভন, থ্রেটনিং কিছুই বাদ যায়নি। তবু লড়ে যাওয়া।

শিলাবতী বুঝে গেছে, ছত্রছায়া মানেই কোন না কোনো ভাবে আপস করা। যেমন মহিলাদের কাছে ছত্রছায়া আরোও অনেককিছু অলিখিত দাবি করে বসার এক অলিখিত চুক্তি।  উচ্চারণহীন নিঃশব্দ হীন সেই চুক্তির ভাষা। চোখের সামনেই তো অহোরহ ঘোরঘুরি করে এইসব ক্ষমতাবান লোভী ছত্রছায়ারা। থানা-পুলিশ গুণ্ডা সমাজবিরোধীরা ছত্রছায়ার কাছে হাত=পা বাঁধা। এইখানে মনে মনে ধন্যবাদ জানায় শিলাবতী তার একদিনের মা-বাবাকে। ভাগ্যিস তারা তাকে ভ্যাটে ফেলে দিয়েছিল! তাই তো শীলাবতী নিজেকে বন্ধনহীন খোলা ভ্যাটের মতো  রাখতে শিখেছে! প্রতিটি নোংরা জঞ্জালকে চিনতে শিখেছে! কত নোংরাকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে মানুষ বানিয়েছে।  চিনতে শিখেছে কত আপাত-পরিষ্কার ঘরেও কেমন নোংরা লালিত হচ্ছে টুপিতে পালক নিয়ে!

আজ বালুরঘাটের সেই মেয়েদের হোমটার পোল খুলে দেবে শিলাবতী। তার আগে থানায় একটা এফ.আই.আর করে যেতে হবে। সেখানকার একটি মেয়ে লুকিয়ে যোগাযোগ করেছে শিলাবতীর সাথে, একজনের মধ্যমে। আর জলজ্যান্ত প্রমান হিসেবে সে লুকিয়ে হাজির হয়েছে ওর কাছে। ওকে নিজের ঘরে আশ্রয় দিয়েছে শিলাবতী। এবার ওর কেস নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া। সারারাত তার কাছে শুনেছে হোমের মেয়েদের কতকিছু নোংরা কাজে  বাধ্য করা হচ্ছে তার ভয়ঙ্কর করুণ কাহিনি। সেখানেও সেই ছত্রছায়ার হাত! মেয়েটির নাম সুরভি। এবার তার পালা ছিল। সে কি করে যে শরীরে মনে শক্তি পেল যে!  লোকগুলোর চোখে মুখে লংকাগুঁড়ো ছুঁড়ে দিয়ে ছাদের কার্ণিশ বেয়ে দেওয়ালে এসে লাফদিয়ে বাইরে নেমে সন্ধ্যের অন্ধকারে পালিয়ে আসতে পেরেছে। সবাই তো এভাবে পারে না! শিলাবতীর মতো কেউ যে প্রতিবাদে এগিয়ে এসেছে, সেটা ভেবেই শান্তি শিলাবতী। বড্ড আশাবাদী সে। তারই মতো ওর মা অথবা করিতকর্মা বাপ ওকে হয়তো নর্দমায় বা ভ্যাটে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল! ওখানে পড়েথাকা মেয়ের নাম সুরভী! নিজের মনেই দু;খের হাসি এসে শিলাবতীকে কাঁদিয়ে দেয়।

শিলাবতী থানায় গেলে থানা স্বভাবিক ভাবেই ডায়রি নেয় না। উল্টে তাকেই হাতকড়া  দেখায়। কারন কি না রাতেই তার নামে হোমের তরফে কেউ এফ.আই.আর করে গেছে।

অপরাধ—বালুরঘাটের সরকারী হোম থেকে অসত উদ্দেশ্যে মেয়ে চুরি করে নিজের কাছে লুকিয়ে রাখা। দারোগাবাবু ব্যাঙ্গ হাঁসিতে মুখ বিকৃত করে রসিয়ে রসিয়ে বললেন, এবার আপনাকে গ্রীপে পেয়েছি ম্যাডাম। বড্ড পাখা বেড়েছিল, না? এবার দেখুন কি হাল হয় আপনার ইত্যাদি ইত্যাদি…

 

              

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন