কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১২৮

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১২৮

বৃহস্পতিবার, ২০ মার্চ, ২০২৫

পি. শাশ্বতী

 

সৃষ্টির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ নারীর আদ্যন্ত ভাগ্য

 


(১)

ভারতীয় পুরাণ ও মহাকাব্যের কাহিনি শুধু যে তৎকালীন সমাজের চিত্র তুলে ধরে তাই নয়, তখনকার মানুষের মানসিক গঠন, চরিত্র, ব্যবহারিক জীবনের দর্শন— যেমন শিষ্টতা, উদারতার সঙ্গে সঙ্গে তার ফল এবং চাতুর্য ও শঠতাও। বলা যেতে পারে, সামাজিক জীবনের চলার পথের নানা দিগদর্শন ফুটে উঠেছে ওইসব পুরাণ ও মহাকাব্যের কথায়।

যে সময়ের পৌরাণিক কথা এখানে বলতে চাওয়া হচ্ছে, তখন নারী এবং পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে সম্ভোগ বা অশ্লীল কোনো কাজ স্বেচ্ছাধীন ছিল। একে অপরের সম্মতিতে তার ক্ষণিকের ভালোলাগার মানুষের সঙ্গেও সংসর্গ করতে পারত যতদিন ইচ্ছা। যদিও বিভিন্ন কাহিনিসূত্রে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই সব সম্পর্ক খুব একটা স্থায়ী হত না। অথচ সেই মিলনের  ফসল অধিকাংশ সময়েই শুধুমাত্র তার মায়ের আশ্রয় অথবা বেশ কিছু ক্ষেত্রে পিতামাতা উভয়ের থেকেই পরিত্যক্ত হয়ে লালিত-পালিত হত কোনো ঋষির আশ্রমে। এমনই এক পুরাণ কাহিনি বলছে, চন্দ্রবংশীয় রাজা নহুষের পুত্র যযাতি গুরু শুক্রাচার্যের আদেশ অমান্য করে দানবরাজ বৃষপর্বার কন্যা শর্মিষ্ঠার সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন এবং তিনটি পুত্র উৎপাদন করেছিলেন। কিন্তু গুরু আদেশ অমান্য করায় তিনি গুরুর অভিশাপে জরা প্রাপ্ত হয়েছিলেন। কিন্তু সেই গুরুই তাঁকে বলেছিলেন, যদি অন্য কেউ তার ওই জরাগ্রস্ত অভিশাপ গ্রহণ করে, তাহলে তিনি জরামুক্ত হবেন। ফলে তিনি তাঁর তিন পুত্রকে তাঁর জরা গ্রহণ করতে বজায় একমাত্র কনিষ্ঠ পুত্র তাঁর অনুরোধে সেই জরা গ্রহণ করলে আরও সহস্র বছর তিনি যৌবন ভোগ করেন। শেষে  রাজ্যভার পুত্রদেরর হাতে অর্পণ করে তাঁর বিবাহিত স্ত্রীকে নিয়ে বনে আশ্রমবাসী হন, বাণপ্রস্থের জন্য। এখানে যেটি উহ্য রাখা হয়েছে, সেটি হল অবৈধ ভাবে যযাতি ও  শর্মিষ্ঠার মিলনের ফলে যে তিন পুত্র সন্তানের জন্ম হয়েছিল, তাঁদের মাতৃপরিচয় কখনোই প্রকাশিত হয়নি। আর উল্লেখ্য পরে যযাতি যাকে শাস্ত্রীয় মতে বিয়ে করে ছিলেন, তাঁর একটি কন্যা সন্তান জন্মেছিল। তার নাম মাধবী।

মহিলা, শাস্ত্রাচারী ঋষি ও ঋষি পত্নীরা ছাড়া নারীদের পরিচয় তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। তাই শর্মিষ্ঠাও কখনো তাঁর তিন পুত্রের মা হিসাবে জনসমক্ষে স্বীকৃতি পায়নি। কারণ মা তো শুধুই গর্ভধারণের আধার, তার পরিচয় অন্য কোন কাজে লাগে? আর শুধু পরিচয় কেন, তখন বেশির ভাগ রমণীর কোনো স্বতন্ত্র অস্তিত্বই থাকত না। তারা পিতার অধীন বা পতির অধীন থাকত। আবার অনেকেই স্বয়ম্বরা হত।

এবার আসা যাক মাধবীর জীবনবৃত্তান্তে। এক বসন্তের সকালে, মাধবী তখন সদ্য যুবতী, রাজপুরীর বাগানে প্রিয় সখীদের সঙ্গে সে ব্যস্ত ফুল  কুড়োতে, রাজসভায় ডাক পড়ল তার।  গম্ভীর মুখে সিংহাসনে বসে তার বাবা যযাতি। চিন্তিতও। সামনে ঋষির বেশে এক দিব্যকান্তি যুবক, তাঁর পাশে এক মহাবলশালী পুরুষ। মহাবলশালী পুরুষটি মাধবীর পরিচিত। তিনি মাধবীর  পিতৃসখা গরুড়। আনত  প্রণাম জানাল মাধবী দু-জনকেই।

সামান্য মন্দ্র স্বরে রাজা বললেন, “শোনো মাধবী, সখা গরুড় ঋষি গালবকে আমার কাছে নিয়ে এসেছেন। ঋষি গালব আমার কাছ থেকে এমন কিছু চান, যা এঁরা দেশে দেশে ঘুরেও পাননি।”

বিস্মিত মাধবী। এজন্য তাকে  কী প্রয়োজন ?

এরপর যযাতি অকম্পিত স্বরে ঋষিকে বললেন, “মুনিবর, এই মুহূর্তে আপনার প্রার্থনা পূরণ করার সঙ্গতি আমার নেই। কিন্তু বিষ্ণুসখা কিংবা আপনার মতো ব্রহ্মর্ষিকে নিরাশ করা আমার অন্যায় হবে। আপনি এক কাজ করুন, আপনার প্রার্থিত আটশো অশ্বের বদলে আমার কন্যা মাধবীকে নিয়ে যান। আমার কন্যাটি অতি সুশীলা, রূপবতী। আশা করি একে পেলে আপনার অভীষ্ট পূর্ণ হবে।”

"হে ধরিত্রী দ্বিধা হও। এ কী লজ্জা! এ কী শোনালেন জন্মতাত? ঘোড়ার বদলে আমি?” মনে মনে ভাবতে ভাবতে লজ্জায় মাটিতে মিশে গেল মাধবী। যেন বিশ্বাস হয় না নিজের কানকেও? তার কোনো মতামত নেই, তার সত্তাটুকুও পিতার কাছে মূল্যহীন। সে কি তার পিতার কাছে শুধুমাত্র পণ্য?

বাবার কথার মাথামুণ্ডু কিছুই মাথায় ঢুকছিল না মাধবীর। প্রশ্ন করাও যাবে না কিছু, সে অধিকারও তার নেই। বিহ্বল চোখ জন্মদাতার মুখ থেকে ঋষি গালবের দিকে পড়ল। আজ থেকে তার প্রভু বদল হল?  তিনি ক্ষত্রিয় বীর নন। মনে মনে ভাবল মাধবী, ক্ষত্রিয় না হলেও, এমন বিদ্বান সর্বাঙ্গসুন্দর পুরুষ জীবনের সঙ্গী হিসাবে পাওয়া তো ভাগ্যের কথা। সাধারণত  মেয়েরা তো মনে মনে এমন একজনকেই স্বপ্ন দেখে থাকে। তাই প্রাথমিক কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা কাটিয়ে সম্বিত ফিরল মাধবীর।

অন্দরমহলে খানিক কান্নাকাটিও হল। দাসীরা কাঁদল, সখীরা কাঁদল, মা কাঁদলেন, বিমাতা শর্মিষ্ঠা কাঁদলেন। সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এক বস্ত্ৰে ঋষি গালবের সঙ্গে রাজপ্রাসাদ ছেড়ে পথে নামল রাজদুলারী সুন্দরী সর্বসুলক্ষণা মাধবী।

পিতৃসখা গরুড়  গেলেন পথান্তরে। চলা থামে না। নীরব গালব। পিছনে কম্পিত হৃদয়ে সলজ্জ মাধবী। মনে মনে প্রস্তুত করছে নিজেকে। এক লহমায় পিতার আদেশে রাজ বিলাসবৈভব সব ভুলে কাটবে তপোবনে। ঋষি গালবের যোগ্য করে তুলতে হবে নিজেকে। তিনিই যে এখন থেকে মাধবীর ইহকাল-পরকাল। তার আরাধ্য। তার স্বপ্ন, ভাগ্য সব— সব। সংশয় জাগে তার এত সহজেই নিজেকে সমস্ত কিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে তো। তার মনে হয়  গালবের প্রেমে সে অধির।  কাঙ্ক্ষিত পুরুষ গালব। আর কাঙ্ক্ষিত পুরুষ পেলে তার জন্য মেয়েরা সব করতে পারে। হাঁটছে তো হাঁটছেই। পথ আর ফুরোয় না।  রাজধানী পার হয়ে লোকালয় এল। তারপর ছোট্ট অগভীর বন। বনের শেষে ধীরগতি নদী বয়ে চলেছে কুলকুল শব্দে। পথশ্রমে ক্লান্ত ঋষি নদীর কিনারে এক শিংশপা গাছের নীচে বসেছেন। একটু দূরত্ব রেখে সসঙ্কোচে মাধবীও। গালবের নীরবতা বৃক্ষছায়ায় অসহ্য লাগছিল। অথচ নিজে থেকে কথা বলার সাহসও হচ্ছে না তার। এক সময়ে মরিয়া হয়ে নীরবতা ভাঙল মাধবী, “ঋষিবর, আমি কি আপনার সেবা করব?”

গালব হাসলেন সামান্য। মাথা নেড়ে বললেন, “না। দরকার নেই। একটু পরেই উঠব আমরা'।

কী মধুর কণ্ঠস্বর! মাধবীর মরমে পশিল,  অন্তঃকরণ শিহরিত হল।

সে বিগলিত স্বরে বলল, “আমরা কি নদীর ওপারে যাব? আপনার আশ্রম কি এখান থেকে বহু দূর?”

অথচ উদাস দৃষ্টিতে উত্তর দিচ্ছে গালব, যেন মাধবী তার অভীষ্ট নারী নয়, যেন নিরুপায় হয়ে পথচলা এই নারীর সঙ্গে। ঈষৎ লাস্যমধুর স্বরে মাধবী বলে, “আপনি এত গম্ভীর কেন ঋষি? আমাকে কি আপনার পছন্দ নয়?”

বিরক্ত হলেন গালব। ক্ষণেক তাকে দেখেই আবার তাঁর চোখ নদীতে। রুক্ষ স্বরে বললেন, “শোনো যযাতির কন্যা, এটা রঙ্গ-রসিকতার সময় নয়। তুমি কি জানো, কী কারণে তোমায় নিয়ে এসেছি?”

আর-একটু চপলতা প্রকাশ করে পরিস্থিতি সহজ করতে চাইল মাধবী। চাইল গালবের জড়তা ভাঙতে। এই নির্জনে দুটি নবযৌবনের দূরত্ব মুছে ফেলতে।

"জানি। আটশো ঘোড়ার বদলে আপনি আমায় গ্রহণ করেছেন।"

“ভুল। আটশো ঘোড়ার বদলে নয়, আটশো ঘোড়ার জন্য তোমাকে আনা হয়েছে। অর্থাৎ বুঝতে পারছি রাজা যযাতি তোমায় সব কথা খুলে বলেননি!” একথা বলেই পলকের জন্য কিছুটা যেন অন্যমনস্ক হয় পড়লেন গালব। উঠে পড়লেন, পায়ে পায়ে গেলেন নদীর ধারে, আঁজলা ভরে মুখে-চোখে জল ছেটালেন। ফিরে এসে দাঁড়ালেন মাধবীর সামনে। তারপর দৃঢ় স্বরে বললেন, “স্পষ্ট কথা স্পষ্টভাবে শুনে নাও যযাতির কন্যা। আমি তোমাকে গ্রহণ করার জন্য আনিনি। অন্তত এই মুহূর্তে। আমার জন্য তোমায় একটা কাজ করতে হবে। কঠিন কাজ।”

এই কথা শুনে মাধবীর হৃদয় ভয়ার্ত পাখির বুকের মতো থর থর। অস্ফুটে বলল সে, “আজ্ঞা করুন ভদ্রে।”

“গুরু বিশ্বামিত্র আমার কাছে আটশোটি দুর্লভ ঘোড়া গুরুদক্ষিণা চেয়েছেন। এমন ঘোড়া, যাদের গায়ের রং ধবধবে সাদা, কিন্তু একটি কান শ্যামবর্ণ। অযোধ্যার রাজা হর্ষশ্বেরের কাছে এমন ঘোড়া আছে শুনেছি। তবে খবর পেয়েছি তিনি তা এমনি-এমনি দেবেন না। বিনিময়ে হর্ষশ্বর এমন এক নারী চান যে তাঁকে রাজচক্রবর্তী পুত্র উপহার দিতে পারে। …আমি এখন তাঁর কাছেই যাব। যদি তিনি তোমাকে পছন্দ করেন, তবে তাঁর হাতে তোমাকে তুলে দিয়ে আমার ঘোড়া সংগ্রহ করব।"

বাকরুদ্ধ মাধবী— এ কী বলছেন গালব? মুহূর্তে তোলপাড় করে ওঠে তার হৃদ। এ তো এক ধরনের বিপণন! কন্যার জীবনের সুরক্ষার প্রতি পিতার এ কোন দায়বদ্ধতা! এ তো সুরক্ষার পরিবর্তে নিধন। সদ্য মুকুলিত ফুলের কুঁড়ির মতো আপন হৃদয়ে যে স্বপ্ন, যে

আশাব্যঞ্জক ভবিষ্যতের জাল সে বুনতে শুরু করেছিল, মুহূর্তে সেসব ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। মনে মনে বলে ওঠে, 'নারী হতে পারি, কিন্তু মানুষ তো বটে। আমি কি শুধুই পণ্য? ইনি আমাকে ভাড়া খাটাতে চান? ছিঃ ছিঃ! এ তো পতি নামের কলঙ্ক। একেই কিনা সে সাধিত পুরুষ মনে করছিল এই কিছুক্ষণ আগেও?’

সম্বিত ফিরতেই সোজাসুজি তাকিয়ে প্রশ্ন করল মাধবী, “আমার বাবা এসব জানেন?”

“অবশ্যই। তিনিই তো আমাকে এই পরামর্শটি দিলেন।”

আরও বিস্মিত মাধবী। রাগে দুঃখে, অভিমানে চোখে জল এসে গেল তার— ইনিই তার জন্মদাতা!

কোনওক্রমে বলল, “তার মানে এখন আমায় অযোধ্যায় জীবন কাটাতে হবে, হর্ষশ্বরের শয্যাসঙ্গিনী হয়ে?”

“হুঁ। অন্তত যতদিন না তুমি একটি পুত্র সন্তান প্রসব করো, ততদিন।”

গালব ঠোঁটে এক বিচিত্র হাসি ফুটিয়ে কোমল স্বরে বললেন, “তারপর আমি তোমাকে ফেরত নিয়ে আসতে পারি। অবশ্য আনতেই হবে। আমি যখন তোমার দায়িত্ব…”

আশ্চর্য নারীর মন! কথাটা শুনেই এর পরেও কোথা থেকে যেন এক আশার দীপ্তি জ্বলে উঠল তার বুকে। কে এক কুহকিনী কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, ‘কাঙ্ক্ষিত পুরুষকে বিপদে সাহায্য করাই নারীর ধর্ম।’

মনে পড়ে গেল স্বামীর বিপদে সর্বতোভাবে সাহায্য করা নারীর ধর্ম— আজন্ম লালিত এমন শিক্ষার কথা ও আরও কত কী।

মনকে বোঝাল সে— ঘেন্নাপিত্তি ভুলে, চোখ-কান বুজে ক-টা দিন কাটিয়ে দে, তারপর তো গালব তোরই। এরপরই তো নিরবচ্ছিন্ন নিষ্কণ্টক এক অপার জীবন তোরই প্রেমাস্পদের সঙ্গে।

সত্যিই ধন্য এই আশাকুহকিনী, ধন্য পুরুষের প্রতি নারীর আকর্ষণ!

আবার শুরু হল  যাত্রা। নদী, পাহাড়, অরণ্য, জনপদ পার হয়ে  সন্ধ্যার মুখে তারা পৌঁছল অযোধ্যায়। রাজা হর্ষশ্বেরের সভায় মাধবীকে নিয়ে প্রবেশ করলেন গালব। প্রস্তাবটি রাখলেন রাজার কাছে।

হর্ষশ্বের খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন মাধবীকে। যেমন ভাবে কোনো বিক্রয়যোগ্য পশুকে দেখে কোনো বণিক, অনেকটা তেমনি ভাবে। যেন ঠকে না যান। বেশ কিছুক্ষণ দেখার পর রাজার মুখে হাসি ফুটল, “নাঃ, বলতেই হয় এ মেয়ে ভারী সুলক্ষণা। মনে হচ্ছে আমি যা চাই, এ তা আমায় দিতে পারবে।… কিন্তু আপনার শুল্ক তো আমি পুরোপুরি মেটাতে পারব না মুনিবর। ও রকম ঘোড়া আমার আছে বটে, তবে মাত্র দুশো। এতে কি আপনার চলবে?”

হায় নারী ! কোথায় তোমার মর্যাদা। এ যে রীতিমত দরাদরি!  গা ঘিনঘিন করে উঠল মাধবীর। এ কার হাতে তুলে দিলেন তার পিতা খ্যাতিমান যযাতি। যে পিতার কন্যা হয়ে তার গর্বের অন্ত ছিল না। দাঁতে দাঁত চেপে তবু দাঁড়িয়ে আছে মাধবী, শুধু গালবের মুখ চেয়ে।

গালবের মুখ পাংশু হয়ে গেছে। না না। সদ্য প্রাপ্তা নারীরত্নের কথা ভেবে নয়, অন্য চিন্তায়। একান্তে ডাকলেন মাধিবীকে। অস্থির স্বরে বলে উঠলেন, “এখন আমার কী হবে যযাতির কন্যা? গুরুদক্ষিণা মেটাতে না পারলে আমি যে পাতকী হব! নাঃ তোমাকে দিয়ে আমার কোনো কাজই হল না। আমার সারা জীবনের শ্রম, তপস্যা সব নিষ্ফল হয়ে গেল।”

কথাক-টি তিরের মতো মর্মস্থল ভেদ করল মাধবীর। ক্ষণিকের জন্য পাথর হয়ে যাওয়া হৃদয়ে বিন্দু বিন্দু মায়া জমছিল ওই মানুষটির জন্য। শুধু এটাই মনে হচ্ছিল কিভাবে তাকে চিন্তামুক্ত করা যায়। চিন্তামুক্ত হলে তবেই সে-হৃদয় মাধবীর জন্য উন্মুখ হবে। হাতের কাছে রমণীরত্ন থাকা সত্ত্বেও সে কী অসহায়! ইহলোক আর পরলোকের ভাবনায় কী কাতর!

মনোকষ্ট চেপে রেখে বলেই ফেলল সে, “এর তো সহজ সমাধান আছে ঋষি। আপনি দুশো ঘোড়ার বদলেই এঁর কাছে আমাকে রেখে যান। ছেলে হতে তো বছর খানেক সময় লাগবেই, এর মধ্যে আপনি খোঁজখবর করুন আর কোন কোন রাজার কাছে এমন ঘোড়া পাওয়া যায়। ভাড়াখাটাই যখন আমার মতো মেয়েমানুষের নিয়তি, তখন নয় আর ক-টা রাজার সঙ্গেও শোব। আপনারও প্রাপ্য ঘোড়া মিলে যাবে।”

প্রস্তাব মনঃপূত হল গালবের। কিন্তু শ্লেষটুকু ধরা পড়ল না তার কাছে। মাধবী ভেবেছিল বিদ্রূপের কষাঘাতে আহত হবেন ঋষি, চৈতন্য ফিরবে তাঁর।  মাধবী ভাবে মনে মনে– প্রচলিত যে  সাত-পা একসঙ্গে হাঁটলে সঙ্গী নাকি বন্ধু হয়। সে যদি জঙ্গলের পশু হয়, তবুও। ঋষি গালবের সঙ্গে এই ক-দিনে লক্ষ পা হেঁটেছি আমি, এককণা দুর্বলতাও কি আমার জন্য জমেনি তাঁর মনে? বন্ধুর মনোবেদনা বুঝতে পারবেন না, ঋষি কি এতই প্রজ্ঞাহীন? নাঃ, গালবের মুখে যন্ত্রণার চিহ্নমাত্র নেই। বরং তিনি মাধবীর প্রস্তাবে পুলকিত হয়ে উঠেছেন, উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে মুখমণ্ডল। কিন্তু পরক্ষণেই ম্লান হয়ে গেল আবার। কপালে ভাঁজ ফেলে তিনি বললেন, “উপায়টা মন্দ বলোনি। তবে এতেও সমস্যা আছে। তুমি তো রাজবংশের মেয়ে। জানো না, রাজারা কুমারী মেয়ে পছন্দ করেন? এক রাজার সঙ্গে বছরভর কাটানোর পর অন্য কোনো রাজা তোমায় নেবেন?”

হায় ভাগ্য! ধন্য পুরুষ। ভাড়াখাটার মেয়েছেলেও চাই, টাটকা কুমারীও চাই!

সামান্য ছলনার আশ্রয় নিয়ে  হেসে বলল মাধবী, “এই কথা? এ তো কোনো সমস্যাই নয়। অতি শৈশবে এক ব্রহ্মবাদী ঋষিকে আমি সেবায় তুষ্ট করেছিলাম। তিনি আমাকে একটা অদ্ভুত বর দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, প্রতিবার সন্তান প্রসবের পর তুমি আবার কুমারী হয়ে যাবে।”

হতবাক গালব বলে ওঠেন, “এও কী সম্ভব?”

ভাগ্যের হাতে পরাজিত সহাস্য মাধবী মুখে বলে, “হয়, আপনাদের মতো পুরুষরা বর দিলে সবই হয়। সবই তো আপনাদেরই ইচ্ছা নির্ভর। চাওয়া নির্ভর।” আর মনে মনে বলে, 'শত শাস্ত্র অধ্যয়ন করেও আপনি কী অজ্ঞ ঋষি! এত জানেন আর এটুকু বোঝেন না, শরীর তো দূরের কথা, হৃদয়ে একজনের জন্য প্রণয় জাগলেই নারী আর কুমারী থাকে না!’

(ক্রমশ)


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন