বর্ণমালার সাতকাহন
পর্ব
২১
যেদিন ট্রেনে চড়লাম সেদিন মৃত্যুপথযাত্রী শাশুড়ির মুখের সেই অনির্বচনীয় উদ্ভাসিত মুখ দেখে সব সংঘাত ভুলে গেলাম। সংঘাত!
হ্যাঁ সংঘাত। জীবন এক আশ্চর্য বিস্ময।
শাশুড়ির ক্যান্সার ধরা পড়ার আগে ঠিক চার মাস আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই সময় এম. কম
পড়ি, গোল দিঘীর পাড়ে বসে অকথা কুকথার আড্ডা, কল সেন্টারে সাতশ টাকার উপার্জন বেকার
অলস স্বামীর সঙ্গে নিয়ত দ্বন্দের মধ্যে দুপুরে ঘরে ফিরে শোনা গেল সেই ক্ষণ থেকে আর
আমার বা আমাদের দুজনের অন্ন বন্ধ এক সংসারে। এক পেট খিদে, নিজস্ব কোনো সরঞ্জাম নেই
আলাদা সংসার করার, সে কথা কল্পনাতেও ছিল না, সেই মধ্যান্হে, তখনও ঘুলঘুলিতে চড়াইপাখিরা
পালক খসিয়েছিল সেদিনও কুলফিওলা গেল গলি দিয়ে, সেদিন একা গোটা পৃথিবীর বুকে নিঃসহায়
ক্ষুধার্ত এক অনভিজ্ঞ সদ্য যুবতীর সেই নিরন্ন জীবন সাদা কালো ছবির মতো মনের দেরাজে
এখনও পড়ে আছে। মাঝ দালানের এপার ওপার দুটি এক পরিবারের থাকা। এভাবে তিনমাস কাটল। তারপরে
আবার এলো বাঁক। গোটা সংসারের চাবি উঠে এল নেহাত নভিস একটি মেয়ের হাতে।
যাইহোক, শাশুড়িকে নিয়ে এই প্রথম
ও শেষ দূরযাত্রায় অনেক মজার স্মৃতি সাজিতে রাখা আছে। শাশুড়ির গলায় ক্যান্সার ধরা
পড়েছিল শেষ পর্যায়। ক্রমে সব রকম খাওয়া বন্ধ। যে সময় হরিদ্বার হৃষিকেশ ভ্রমণে যাওয়া
সেই সময় তিনি শুধু তরল এবং গলা খাবার খেতে পারেন। তাই তাঁর জন্য খাবারের ব্যবস্থা
করা ছিল কঠিন। তারই মধ্যে হরিদ্বারের একটি হোটেল মালিকের কথা মনে থেকে গেছে। তীর্থযাত্রীদের
ব্যস্ত ভিড়ে ঠাসা হোটেলে তিনি সযত্নে মার আহারের বিশেষ ব্য়বস্থা করতেন এবং সেই খাবারের
জন্য একটি পয়সাও ধার্য করেননি। এই বাড়ির লোকেরা যতটা খাদ্যরসিক ছিলেন ততটা তাঁদের
উদর শক্তিশালী ছিলো না। একরাত্রে হরিদ্বারের শুনশান গলিপথে আমরা ঘুরে বেড়াচ্ছি। নির্জন
গলির দুপাশে রাবড়ির দোকান, বড় বড় এরমোনিয়ামের ডেকচি থেকে রাবড়ির সুগন্ধ। কোথাও
ছানা মাখা হচ্ছে কোথাও দুধজ্বাল দেওয়া। সেদিন শাশুড়ি হোটেলের ঘরেই ছিলেন। হঠাৎ আবিষ্কৃত
হলো দুই শশুর গায়েব। খোঁজ খোঁজ এদিক ওদিক। অনেক অনুসন্ধানের পরে দেখা গেল শ্বেতশুভ্র
ধুতি পাঞ্জাবি পরিহিত দীর্ঘ শীর্ণ দুই বৃদ্ধ লুকিয়ে লুকিয়ে রাবড়ি সাঁটাচ্ছেন মনের
সুখে। আমরা সামনে যেতেই বামাল সমেত ধরা পড়ে একেবারে বেকায়দায়। একজন যতটা ধরল মুখে
পুরে হোটেলের দিকে পলায়ন করলেন আরেকজন পাঞ্জাবির পকেটে বাকি রাবড়ি পুরে শ্যালকের
পশ্চাদ্ধাবন করতে চেষ্টা করলেন। টাকা মেটাতে গিয়ে দেখা গেল বেশ ভাল পরিমাণেই সাঁটিয়েছেন
ওই ঘন খাঁটি রাবড়ি। মা ভয়ঙ্কর রেগে নানা বিশেষণে ভূষিত করতে লাগলেন ওঁদের। মোটামুটি
পথেই একেবারে কাপড়ে চোপড়ে, তাঁদের পেট জিহ্বা অপেক্ষা একেবারেই বেজুত সুতরাং সারারাত
সেবার আমরা হোটেলের ঘর পরিস করতে লাগলাম।
ঘটনাচক্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের এম
কম ডিগ্রী প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে পেলাম চাকরি। আমার স্বামি ন যযৌ ন তস্থৌ। তখন শশ্রুমাতা
একেবারে শয্যাশায়ী। বেতের চেয়ারে ওয়েলক্লথ পেতে বসিয়ে দেওয়া হতো তিনি বাংলা সিরিয়াল
"মাতৃভূমি"দেখতেন।তারপর সেও বন্ধ। আমার বাবাকে ভাইফোঁটা দিতেন। দেখে গেলেন
সেদিন আর কথা হলো না কথা তখন বন্ধ হয়ে গেছে হাত দুটি ধরে রইলেন কিছু মুহূর্ত, চোখের
কোল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল অশ্রু। দুপুরে গান
শোনাতে বললেন,লাল মেঝেতে আমি, সামনে হারমোনিয়াম শাশুড়ি মা মা বলে সত্যি নিজের মা
ছাড়া কাউকে ভাবিনি কিন্তু কেউ একজন সবচেয়ে বেশি কাছের বন্ধু স্বজন বা আরো কাছের কেউ
বিবাহ পরবর্তী গ্লানিময় জীবনে যিনি নতুন প্রায় কিশোরী বধূকে অন্ধকার ভাঙা প্রাসাদে
ভয় দেখাতেন ভর হওয়ার বিকট বেশে এলোচুলে, না না প্রকার উত্যক্ত করতেন, অথচ সেদিন গলা
থেকে সুর হারিয়ে গেল
"একা মোর গানের তরী ভাসিয়েছিলেম
নয়ন জলে
সহসা কে এলে গো এ তরী বাইবে বলে
..."
সন্ধ্যার শেষে অলক্ষ্যে নিভল বাতি। অনেক দিন ধরে জানা কিছুও যখন মুখোমুখি হলে অদ্ভুত একটা শূন্যতা ছেয়ে যায় চারিদিকে।
শাশুড়ির শখের পৃথক থাকার সেই দু
তিন মাসে নতুন বাসন কিনে রান্না করা শুরু হলো। ফোড়ন প্রভৃতি নানা টেকনিক্যাল বিষয়
আগে এবং পরে দুই মায়ের কাছে শেখা কিন্তু সেই সময় নভিস হাতে যেদিন প্রথম মাংস রান্না
করেছিলাম প্রেসার কুকারে সেদিনের ছবিটি স্মৃতিতে অম্লান। টাইটানিকের জাহাজডুবির মতো
এক সাগর জলের নিচে সমুদ্র শয্যায় পড়ে কয়েকটি মাংসের টুকরো ও আলু। না আছে স্বাদ না
সুগন্ধ। সেদিন আমার একমাত্র ছোট্ট ভাইটি গম্ভীর মুখে খেয়ে নিয়েছিল সবই শুধু বলেছিল
পরেরবার জলটা একটু কম দিতে। দিদির প্রতি সেই অপত্য স্নেহ আজও একই রকম থেকে গেছে।
ভাইটিকে আমার শশ্রুমাতা ও শশুরমশাই
খুবই স্নেহ করতেন আমার অপরিণত ও ধৈর্যহীন ব্যবহার ব্যতিরেকে। সে এলে তাঁদের দুজনের
মাঝে ঘুমোত। আমার শ্বশুরমশাই তাঁকে কত যে গল্প শোনাতেন! শাশুড়ির কাছে বসে সন্ধ্যায়
স্কুলের পড়া করত। অথচ নেহাত সেই বালক যখন এই পৃথকন্নের সময় এসেছিল আশ্চর্য উপেক্ষা
দেখেছি তাঁদের। দুটোই সত্য। জীবন এমনই বৈপরিত্যে পূর্ণপ্রাণ।
শোবার ঘরের সামনে নিমগাছটা বহু
কিছুর সাক্ষী। কত যে না বলা কথা তার সাথে, তাহার সাথে। বোধশক্তি কমে আসছিল শ্বশুরের
বাড়ছিল ব্রেন টিউমারের চাপ। ইস্কুল থেকে ফিরতে দশ মিনিট দেরি হলে চলে যেতেন বিজন সেতুর মোড়ে, পথে পথে জিজ্ঞেস করতেন আকুল
হয়ে আমার বউমা এখনও ফেরেনি। অথচ পুত্র সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন। এক সকালে চাকরি যাবার
প্রস্তুতির মাঝে চলে গেলেন সেরিব্রাল এট্যাকে। তখন শরীরে নতুন বীজ। তাঁর যাওয়া আমায়
দেখতে দেওয়া হলো না। আমি সেই প্রাচীন বাড়ির পশ্চিমের জানলার গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে নিম
গাছটার দিকে নির্নিমেষ অভিমানে তাকিয়ে রইলাম, সকলেই চলে গেল আমায় ছেড়ে আমার কেউ
রইল না। এই ভেবে খুব কাঁদলুম। পুবের ফটক থেকে হাল্কা চাপা হরিধ্বনি তুলে চলে গেলেন
এবাড়ির কর্তা। আমার মনে পড়তে লাগল চান করতে চাইত না লোকটা, নখ কাটত না খাবার ছুঁড়ে
ফেলে দিয়ে এগরোলের দোকানে গিয়ে বলত বউ খেতে দেয় না যদিও তারা আমায় শৈশব থেকে চিনত
তাই নালিশ আমি শুনতাম, কত যে বকাবকি, শাসন চেঁচামেচি ওই বোধহীন লোকটাকে ট্যাকল করতে
গিয়ে করেছি সেকথা ভেবে শুধু সেইদিন নয় অদ্যবধি কষ্ট পাই।
তাই পথে ঘাটে বোধশূন্য মানুষ দেখলেই
একটা অব্যক্ত কষ্ট হতে থাকে।
বালিগঞ্জ বাড়ির ইতিকথা শেষ হবে
আরো কয়েকবছর পর।
আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা তথা
পরিকাঠামোর ওপর কোনোদিন শ্রদ্ধাশীল না থাকায় কখনও শিক্ষক হতে চাইনি। এম কম পরীক্ষা
ভালভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার পর গবেষণার সুযোগ পেয়েও অর্থাভাবে করা গেল না। চাকরিটা তাই
বাঁচাল ভরাডুবির শশুরভিটে।
তবে এই স্থায়ী চাকরি পাওয়ার আগে
একটি চাকরী করি দু তিনমাসের এবং তারপরে মাস ছয়েক ডেপুটেশন ভ্যাকেন্সিতে ভবানীপুরে
একটি সরকারি স্কুলে বাণীজ্য শাখার দিদিমণি হয়ে।
গ্রান্ট স্ট্রীটে একটি ছোট্ট ঘুপচি
ঘরে একটি টেলিফোনের সামনে সারাদিন বসে থাকতে হতো। সামনে একটি খাতা একটি পেন। বিভিন্ন
ধরনের ফোন আসত তার নং ও বিষয় লিখে রাখতে হতো। অঢেল এই সময়ে আজ যখন সময় পিছলে যাচ্ছে
মুঠো গলে পড়ে যাচ্ছে তখন মনে হয় ওই সময়টা শব্দকে সরিয়ে না রাখলে উপন্যাস লেখা হয়ে
যেত হগ মার্কেট চৌরঙ্গী গলির তৃণমূলস্তরের যাপনচিত্র নিয়ে। আমার সঙ্গে আরেকটি বিবাহিতা
বয়েসে বড় মেয়েও কাজ করত অন্য শিফ্টে। জামির লেনে তার ভাড়ার এক কামরার ঘরটি ছিল
ভারত সেবাশ্রমের উল্টোদিকে। অনেক সময় আমরা টাকা ও পেট বাঁচাতে সেখানে দুপুরের ভোগ
খেতাম আসনপিঁড়ি হয়ে বসে। তবে সেটি বড় কথা নয়। ইন্টারেস্টিং বিষয় এটাই যে মেয়েটি
সম্ভবত লিপিকা যার নাম ছিল, তার ওখানের এক সাধুর সঙ্গে খুবই নিকট সম্পর্ক ছিল। সেই
সূত্রে এক সন্ধ্যায় তার ঘরে যাওয়ার সৌভাগ্য হলো। ভাবলাম ধর্মকথা শুনব। কিন্তু গিয়ে
আমি তো থ। কী নেই সেই ঘরে। ওই ছোট্ট ঘরটি ঠাসা বিরাট বড় ফ্রীজ থেকে শরীর ডোবা নরম
সোফা,ডিভান রঙিন টিভি ও বালাস ব্সনের সমস্ত উপকরণ প্রস্তুত। হয়ত আজ আর আশ্চর্যের নয়
কিন্তু বিশ বছর আগে ঐ সত্যিই অকল্পনীয় ছিল। যিনি পার্থিব আসক্তি ত্যাগ করে কৃচ্ছসাধনের
জীবন যাপন করেন জীব সেবায় ও ঈশ্বর সাধনায় অথবা সেরকমই আশা করা হতো সেখানে এমন বিলাসী
সাধু ও তাঁর তরল কথাবার্তা শুনে মন তিক্ত হয়ে গেছিল। হয়ত এ আমার সাবেকি ধারনার ফল
কিন্তু তার পরে বহুবার প্রচলিত ও প্রসারিত ধর্মের যে ভণ্ডামি ও নীতিহীনতা দেখেছি তাতে
ক্রমে সরে গেছি জনপ্রিয় উপাচার কেন্দ্রিক তথাকথিত ধর্ম থেকে।
(ক্রমশ)
0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন