কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১২৮

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১২৮

বৃহস্পতিবার, ২০ মার্চ, ২০২৫

শান্তিরঞ্জন চক্রবর্তী

 

সমকালীন ছোটগল্প


শর্বরী

যে লোকটাকে বাবা বলে ডাকতে হবে, সে আসলে বাবা নয় শর্বরীর। মাকে এখন ঐ লোকটা সিঁদুর পরাবে। রাগে ক্ষোভে ফুঁসছে মেয়েটা। কত আর বয়স হবে, বছর পনেরো! তা এ বয়সে মেয়েরা অনেক কিছু বুঝতে শিখে যায়। এখন তো মিডিয়ার দৌলতে বারোর আগেই জেনে যায় শরীরের কত রহস্য। না, মাকে তো কোন সময়ে অসংযত হতে দেখেনি সে! কম দিন তো নয়! যেমন শুনেছে, তার জন্মের আগেই মায়ের বিচ্ছেদের মালাটা মিটে গিয়েছিল তার বাবা সম্পর্কের মানুষটার সঙ্গে। মায়ের   তখন বয়স পঁচিশ মাত্র।

ওই মানুষটা ঠকিয়েছিল মাকে। অবশ্য কেউ ঠকাতে চাইলেই ঠকতে হবে নাকি! তা নয়। আসল গন্ডগোলটা হয়েছিল মানুষের উপর দাদুর বিশ্বাসের বাড়াবাড়ির ফলে। কেউ বলে দিল সে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, ব্যস তার কথাতেই সে তাই হয়ে গেল! আরে বাবা মেয়ের বিয়ে দিচ্ছ, এক আধটু খোঁজ খবর করবে না? মাকে লোকটা কেবল ভাওতা দিয়ে গেছে। মা যতবারই বলেছে তাকে মুম্বাই নিয়ে যেতে ততবারই সে বলেছে, সে ছোট একটা ফ্ল্যাট নিয়ে আছে, বছরের বেশীর ভাগ সময়েই তো তাকে জাহাজে জাহাজেই কাটাতে হয়, মাকে নিয়ে তুলবে কোথায়? মা শুনত কথাগুলো তবে বিশ্বাস হত না।  মিথ্যেকে সত্যি সাজিয়ে বললে যেমন শোনায় তেমনই মনে হত মায়ের। মায়ের শ্বশুর শাশুড়ি তাদের ছেলের সাথে একযোগে নেমে যেত আসরে। মায়ের মুম্বাই না যাওয়ার পক্ষে যত রকম যুক্তি সম্ভব  সাজিয়ে রেখেছিল তারা, তবে মায়ের জেদকে প্রতিহত করার মত যথেষ্ট ছিল না সেগুলো।

একসময় বাধ্য হল লোকটা মাকে মুম্বাই নিয়ে যেতে। মা তো অবাক। এ কোথায় তাকে নিয়ে  এসে তুলেছে তার যদিদং হৃদয়ং-- ইত্যাদি বলা স্বামী! আশপাশের লোকজনকে দেখে ভক্তি হয় না মোটেও। মায়ের মনে তো সন্দেহ ঢুকে যাওয়া স্বাভাবিক। একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়র, সে কেন এমন জায়গায় এমন একটা ফ্ল্যাটে থাকবে! মা মুখে বলল না কিছু। দু’দিন পর মা নিজেই বেরিয়ে পড়েছিল। ওই লোকটা ঘরে ছিল না তখন। এখানে ওখানে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎই নজরে পড়ে যায় মায়ের, একটা বইয়ের দোকানে বিক্রেতার আসনে বসে উনি কথা বলছেন একজন কাস্টমারের সঙ্গে। সাইন বোর্ডে ইংরেজিতে লেখা সকল রকম ইঞ্জিনিয়ারিং-এর বই এবং সরঞ্জাম পাওয়া যায়। ওঃ! তবে এই ব্যাপার।  ইঞ্জিনিয়ারিঙের বই বিক্রেতা হয়ে গেল মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। প্লটটা বেশ সাজিয়েছে তো! জিজ্ঞেস করলে নিশ্চিত কোন একটা ভাওতা দিয়ে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করবে। মায়ের মনে তখন থেকেই বিচ্ছেদের ভাবনা জায়গা করে নিল। ভয় হল, কি জানি এই ঠকবাজের মাথায় কি অভিসন্ধি দানা পাকাচ্ছে। মা বায়না ধরল, তাকে ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। লোকটা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল মায়ের দিকে। মা  বলল, মা বাবা, মানে শ্বশুর শাশুড়ি একা রয়েছে, তাদের বয়স হয়েছে, তাই তাদের বেশীদিন একা থাকা ঠিক নয়। লোকটা বিশ্বাস করলো মাকে। মনে মনে বড় আশ্বস্ত বোধ করেছিল সে এই ভেবে যে ধরা পড়ে যায়নি মায়ের কাছে।

ফিরে এলো মা তার মন্ত্র পড়ে বিয়ে হওয়া স্বামীর সঙ্গে। ফিরে এসেই মায়ের বাবা মানে দাদুর কাছে খুলে বলল সমস্ত কথা। মা দাদুকে এ কথাও জানালো, এ লোকটির স্ত্রী হয়ে বেঁচে থাকার অর্থই হল প্রতিদিন মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা। প্রতারণার কথা ভাবতে ভাবতে জীবনে বেঁচে থাকার অর্থই মূল্যহীন  হয়ে যাবে তার কাছে। মৃত্যু ছাড়া আর যে পথটি বাকি থাকে সে হল বিচ্ছেদ। ডেকে পাঠানো হল আলোচ্য ব্যক্তি আর তার মা বাবাকে। তারা কি আর মানতে চায় নিজ অপরাধের কথা? মা ঐ মানুষটির সঙ্গে একসাথে থাকার অনিচ্ছা প্রকাশ করে জানালো, সে ডিভোর্স চায়। না মেনে উপায় ছিল না যে! ঠিক হল, মা তার বাবার সঙ্গেই থাকবে এবং এক বৎসর অতিক্রান্ত হলে ডিভোর্স কেস ফাইল করা হবে মায়ের তরফে।

সে তো হল কিন্তু এর মধ্যেই যে লোকটা মায়ের শরীরে তার স্বামীত্বের অধিকার হাসিল করে নিয়েছে! না, মা পারেনি তার ভিতরে অঙ্কুরিত শর্বরীকে বিনাশ করে দিতে। মাতৃত্বের রহস্য জানে না শর্বরী, কিন্তু মায়ের স্নেহচ্ছায়ায় আজকের শর্বরী হয়ে ওঠা পর্যন্ত এটুকু সে জেনেছে যে, কোন নারীর কাছে সন্তান তার প্রাণের চেয়েও প্রিয়, একথা মিথ্যা নয়।

ডিভোর্সের কেস ফাইল করতে করতে একটি বছর অতিক্রান্ত। এর মধ্যেই পৃথিবীর আলোয় চোখ  মেলল শর্বরী। ঐ পক্ষকে বলা হল এই সন্তানের ভার গ্রহণ করতে। আশংকা সত্য হল। ও পক্ষ নারাজ, তবে একটি শর্তে তারা রাজী হতে পারে, যদি তাদের নামে এককালীন পাঁচলাখ টাকা লিখে দেওয়া হয়। শর্বরীর দাদু কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মী ছিলেন। পেনশন ভোগী। পেনশনের টাকার  অংকটিও কম নয়। দিতেই পারেন, কিন্তু কথা হচ্ছে দেবেন কেন? শর্বরী যখন মায়ের কাছে শুনেছিল এ কথা তখন  ওই লোকটা আর তার পরিবারের উপর ঘৃণায় কুঁকড়ে উঠেছিল শরীর। মায়ের প্রতি মমতা বেড়ে গিয়েছিল আরো কয়েক গুণ।

এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ পনেরোটি বছর। যে লোকটা মাকে কন্যা সন্তান সহ বিয়ে করবার জন্য দিনে দুবার করে ধর্ণা দিয়েছে তার  দাদুর কাছে, সেও কালীমন্দিরে মূর্তির সামনে বসে শর্ত রাখছে। কি সে শর্ত? দাদু’র দেওয়া কথা অনুযায়ী শর্বরী তাকে বাবা বলে ডাকবে এবং শুধু তাই নয় বাড়িখানিও তারই নামে লিখে দিতে হবে। দাদুর সাথে এমনই নাকি কথা হয়েছে তার। বাবা ডাকাটা পরে হলেও চলবে কিন্তু বাড়ি লিখে দেবার শর্তটি এখনি পূরণ না হলে মাকে সিঁদুর পরাবে না সে। দাদু আবার অপাত্রে তার বিশ্বাস অর্পণ করল। কেন রাজী হলেন দাদু এমন একটা লোকের হাতে মাকে তুলে দিতে? হায়! সে নাকি দাদুকে কথা দিয়েছে মায়ের কাছে সে কোনদিন সন্তান দাবী করবে না এবং নাতনীকেই তার সন্তানের চোখে দেখবে। এতটাই উদার! মা আঁচ করতে পেরেছিল লোকটার অভিসন্ধি। দাদুকে বলেওছিল সে কথা? মানতে চাননি দাদু। তার এক যুক্তি, লোকটা কথা দিয়েছে তাকে। কথা? এমন সব দ্বিপদ প্রাণীর কাছে কথার এককানা কড়িরও মূল্য আছে কি? মা বাক্যহীন। বাবার বয়স হয়েছে। যে কোন দিন পরপারের ডাক এসে যাবে, তাই যাবার আগে মেয়ের এবং তার সাথে নাতনীরও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করে যাওয়া। যুক্তিটি অমূলক নয় কিন্তু যে লোকটির উপর ভরসা করে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন তিনি সে যে সুযোগ সন্ধানী স্বার্থপর লোভী মানুষ একটা!

মন্দিরের পুরুত বলছেন, লগ্ন বয়ে যাচ্ছে প্রায়, এক্ষূণি সিঁদুর না পরালে আজ আর সম্পন্ন হবে না বিয়ের কাজ। দাদু অনুরোধ করে চলেছেন ঐ ব্যক্তিকে অনবরত। সেও তার সিদ্ধান্তে অটল। মা  নিশ্চুপ। যেন বলিদানের ছাগশিশু একটি। এবার তো আর  অপেক্ষা করা যায় না! মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে মায়ের শরীর। সম্ভবত উত্তেজনা প্রশমনের প্রতিক্রিয়া। ছল ছল করছে মায়ের চোখ দুটি। এই বুঝি অতি বর্ষণে প্লাবিত নদীর মত মায়ের দু’চোখ উপছে নেমে আসবে অবিরল অশ্রুধারা। মায়ের কথা ভাবতে ভাবতে সহসাই ভাবনা ঘুরে গেল নিজের জীবনের দিকে। কি আশ্চর্য! তার জন্মদাতা আর এই নীচু মনের লোকটার মধ্যে তো কোন পার্থক্য নেই! নিজ সন্তানের দায়িত্ব নেবার মূল্য চেয়েছিল সে পাঁচলাখ টাকা আর এই লোকটা চাইছে বাড়িটা। আবার তাকে দিয়ে বাবা ডাকিয়ে তার উপর  অধিকার হাসিল করতে চাইছে। গর্জে উঠলো শর্বরীর শরীরের প্রতিটি কোষ। উঠে দাঁড়ালো শর্বরী, টেনে তুলল মাকে আসন থেকে। দাদু হাত বাড়িয়েছিলেন বাধা দিতে। ঘুরে দাঁড়ালো শর্বরী। আগুন ঝরছে দু’চোখে। মাকে নিয়ে মন্দির থেকে বেরিয়ে যাবার আগে যেন চাবুকের হিস্‌ হিস্‌ শব্দের মত বলে গেল কথাগুলো, ‘এটা মন্দির নয়, কষাইখানা। একটা মানুষকে কতবার জবাই করবে তোমরা? ভাবো আর প্রশ্ন করো বিবেকের কাছে। চাই না আশ্রয় কারো কাছে। পৃথিবীটা অনেক বড়। কোথাও না কোথাও ঠাঁই খুঁজে নেবই আমরা’।

মায়ের হাত ধরে সটান বেরিয়ে গেল শর্বরী। মন্দিরে তখন শ্মশানের নীরবতা।


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন