কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১২৮

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১২৮

বৃহস্পতিবার, ২০ মার্চ, ২০২৫

প্রদোষ ভট্টাচার্য

 

বড় পর্দায় হিন্দী ছায়াছবি (তৃতীয় পর্বঃ ১৯৬৭-১৯৬৯ / ৭০)

 


প্রসঙ্গ ১৯৬৬-তে মুক্তি পাওয়া কিন্তু আমার ১৯৬৭-তে দেখা তীসরী মঞ্জিল সে কী রুদ্ধশ্বাস রহস্যের আখ্যান, তার সঙ্গে শাম্মী কাপুরের স্বতঃস্ফূর্ত ‘কমিক টাইমিং’! দিল্লীর মেয়ে সুনীতা (আশা পারেখ) জেনে এসেছে যে তার দিদি রূপা ‘রকি’ নামে মুসৌরির এক হোটেল গায়ককে প্রেম নিবেদন করে প্রত্যাখ্যাতা হয়ে ওই হোটেলেরই তিনতলা থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। দিদির মৃত্যুর প্রতিশোধ নেবার উদ্দেশ্য নিয়ে ডেরাডুন যাবার ট্রেনে অনিল কুমার নামে এক যুবকের সঙ্গে সুনীতার বাকবিতণ্ডা হয়। পরে মুসৌরির সেই পার্ক হোটেলেই অনিলের গান শুনে মুগ্ধ হয় সুনীতা আর একই সঙ্গে ড্রামবাদক রকিকেও দেখে। কিন্তু রূপার মৃত্যু কি আত্মহত্যা ছিল? আর অনিল কুমারই তো আসলে ‘রকি’, যে এখন সুনীতার প্রেমে পাগল! ওদিকে রূপার বাগদত্ত রমেশও (প্রেম চোপরা) সুনীতাকে বিয়ে করতে চায়! রকির পরিচয় এবং বন্ধুত্ব হয় স্থানীয় বিত্তবান কুমারসাহেব মহেন্দ্র সিং-এর (প্রেমনাথ) সঙ্গে । এর মধ্যে আছে হোটেলে রকির সহগায়িকা এবং নর্তকী রুবি (হেলেন), যে রকির আশেপাশে অন্য মহিলা দেখলে ক্ষিপ্ত হয়। রকি/অনিল এবার রুবিকেই রূপার হত্যাকারিণী মনে করে তার ঘরে ঢুকে তাকে নিজের অপরাধ স্বীকার করাতে গেলে এক অজানা হন্তারকের গুলিতে রুবির মৃত্যু হয়। পুলিশ ইন্সপেকটার দাস (ইফতেখার) রকিকে বলেন যে (১) রূপা আত্মহত্যা করেনি, তাকে তিনতলা থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, এবং (২) রুবির ঘরে রুবি নয়, রকিই ছিল হত্যাকারীর লক্ষ্য! মস্তিস্ক ধাঁধানো রহস্য কাহিনী।

এর ওপর এলো এক অপেক্ষাকৃত অল্পখ্যাত সুরকার রাহুল দেব বর্মণের সুরে একের পর এক দুর্দান্ত সব গান, মহম্মদ রফি আর আশা ভোসলের গলায়! ছবিটা এত ভালো লেগেছিল যে কিছু দিন পর বাবাকে ধরে দ্বিতীয়বার বসুশ্রীতে দেখার টিকিট কাটলাম। এতে মা যারপরনাই ক্রুদ্ধ হলেন, আমার মতোই শাম্মী কাপুরের ভক্ত বাবা আর যাবার সাহস পেলেন না, শেষ অবধি জীবনে প্রথম কোন হিন্দী ছবি দু’বার দেখলাম সেই দাদার সঙ্গে। বক্স অফিসে ১৯৬৬ সালের হিন্দী ছবির মধ্যে তীসরী মঞ্জিল আছে চতুর্থ স্থানে।

সেই বছরেই মনে হয়, সেই কাকা-কাকীমা, যাঁদের বিয়েতে ডেরাডুন আর দিল্লী যাওয়া হয়েছিল, তাঁরা কলকাতায় আমাদের কাছে বেড়াতে এলেন। তাঁদের কাছে আবদার ধরলাম তীসরী মঞ্জিল ছবির সব গান সম্বলিত এল পি রেকর্ডের। আমাদের রাসেল স্ট্রীট-এর বাড়ি থেকে প্রথমে গেলাম রফি আহমেদ কিদোয়াই রোডের ‘মেলডি রুম’-এ, যেখান থেকে বছর দুয়েক আগে বাবা রেকর্ড প্লেয়ার কিনে দিয়েছিলেন। তাঁরা জোর গলায় বললেন, “হ্যাঁ, আছে,” কিন্তু খুঁজে পেলেন না। মনে পড়ে, সেলসম্যান একটু কাতর ভাবে প্রশ্ন করলেন, “আর কিছু দিতে পারি? ‘ছোটিসি মুলাকাত’?” আমার উত্তর, “না আআআআআআ!” এরপর, নিশ্চয়ই রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের ‘মেলোডি’-তে, এবং সেখানেও পাওয়া গেলো না! তাঁরাই বললেন, “একবার আমাদের গোল পার্কের দোকানে দেখুন তো!” প্রসঙ্গত, রেকর্ডের খোঁজে বেরিয়েছি ইস্কুল থেকে ফিরেই, কিছু না খেয়ে! রাসবিহারী বা গোল পার্কে যেতে তো বাসই ভরসা। এবার ‘পিত্ত কুপিত’ হয়ে বাসের জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বমি! কিন্তু প্রবল ইচ্ছাশক্তির জয়! গোল পার্কে, সম্ভবত উৎপল চক্রবর্তী “আছে, আছে,” বলে বাক্সের পর বাক্স ঘেঁটে অবশেষে বার করলেন ‘কভারে’ শাম্মী কাপুর-আশা পারেখের সাদা-কালো ছবি দেওয়া লং প্লে রেকর্ড! আর এরকম অসাধারণ রেকর্ডিং আগে কখনো শুনিনি! প্রথমেই ছবির শুরুতে যে সাস্পেনস-পূর্ণ আবহ সঙ্গীত ছিল সেটি, যার শেষে পর্দায় দেখেছিলাম তিনতলা থেকে রাস্তায় এসে আছড়ে পড়ছে এক নারীর দেহ! এরপর ছবির প্রথম গান, ‘ও হাসীনা’, কিন্তু গানের আগে ছবির সাউন্ড ট্র্যাক থেকে শাম্মী কাপুর, আশা পারেখ, এবং অন্যান্য কিছু চরিত্রের দীর্ঘ সংলাপ। কোন গানই ৭৮ বা ৪৫ গতির রেকর্ডের মতো সংক্ষেপিত নয়, কী কথায় কী যন্ত্রসঙ্গীতে। আমার নিজের সবচেয়ে প্রিয় ‘ও হাসীনা’, ‘দীওয়ানা মুঝ সা নেহী’, আর ছবির শেষ গান ‘তুমনে মুঝে দেখা’, বলা বাহুল্য, তিনটিই মহম্মদ রফির গলায়, প্রথমটিতে সহশিল্পী আশা ভোসলে। বিচিত্র সুর এবং স্বরক্ষেপ ছিল ছবির দ্বিতীয় গানে, ‘আজা, আজা, ম্যাঁ হুঁ প্যার তেরা’, রফি ও আশার যুগল কণ্ঠে। রেকর্ড কভারের পেছনদিকে দেওয়া ছিল সুরকারেরও ছবি।

এর পরে প্রিয়ায় দাদা আমাকে আর মাকে নিয়ে গেলেন ১৯৬৫ সালের, বক্স অফিসের বিচারে পঞ্চম সফলতম রঙিন ছবি, গাইড দেখতে। বোঝাই যাচ্ছে, এটি ছিল ছবির পুনর্মুক্তি। ষাট, এমনকি সত্তরের দশকেও এইভাবে অনেক পুরোনো বাংলা এবং হিন্দী ছবি দেখার সুযোগ মিলত। এখন জানি যে ঠিক গাইড-এর আগে দেখা তীসরী মঞ্জিল-এর পরিচালকই গাইড-ও পরিচালনা করেছিলেনঃ বিজয় আনন্দ! ছবির শেষে নায়কের (দেব আনন্দ) মৃত্যুকালে তার দুই সত্ত্বার – দৈহিক ও আধ্যাত্মিক – মিথস্ক্রিয়া অভিনব লেগেছিল, মা-ও বলেছিলেন যে একটা ভালো চেষ্টা করা হয়েছে ছবিটিতে, যদিও দেব আনন্দ ও ওয়াহিদা রেহমানের একাধিকবার আলিঙ্গনাবদ্ধ হওয়া তাঁকে বিরক্ত করেছিল! শচীন দেব বর্মণ সুরারোপিত গানগুলি এককথায় অসাধারণ। দাদার এক বন্ধু তাঁকে অনেক আগেই ৭৮ গতির রেকর্ডে ‘তেরে মেরে সপনে’ আর অপর দিকে ‘দিন ঢল যায়ে’ উপহার দিয়েছিলেন। তাছাড়া দিল্লীর এক রেস্তোরাঁয় ‘কাঁটোঁ সে খীঁচ কে ইয়ে আঁচল’ গানটিও শুনেছিলাম। এবার সেগুলির দৃশ্যায়ন দেখলাম, এবং অন্যান্য গানগুলিরও। এখন মনে হয় শুধু গানগুলি পরপর শোনা আর দেখাই সবচেয়ে ভালো!আমাদের বাড়ীতে খবরের কাগজ আসতো ইংরেজী স্টেটসম্যান। তার সাপ্তাহিক চলচ্চিত্র সমালোচনায় মূলধারার হিন্দী বা বাংলা ছবি অতি কদাচিৎ কল্কে পেত। এই বিরল প্রশংসা মনে হয় পেয়েছিল ওই ১৯৬৭-তে মুক্তিপ্রাপ্ত, এবং বক্স অফিসে চতুর্থ সফলতম ছবি, বি আর চোপড়ার রঙিন হামরাজ। চোপড়া সাহেব অনেক ছবি করেছেন যা গতানুগতিক হিন্দী ছবির থেকে কিছুটা স্বতন্ত্র। দাদা আমাকে নিয়ে হামরাজ দেখতে গেলেন বেন্টিঙ্ক স্ট্রীটের ‘ওরিয়েন্ট’ প্রেক্ষাগৃহে।

আপাত-কেন্দ্রীয় নারী চরিত্র, দার্জিলিং-নিবাসিনী মীনা (ভিমি) একজন সৈন্যদলের অফিসার রাজেশের (রাজকুমার) সঙ্গে সম্পর্কে জড়ায়। কিন্তু সে তো তার বাবাকে বলতে শুনেছিল যে তিনি কখনোই মেয়ের বিয়ে কোন সেনানীর সঙ্গে দেবেন না; মেয়ে যে জামাইয়ের সঙ্গে ‘লেফট-রাইট’ করতে-করতে তাঁকে ছেড়ে চলে যাবে! রাজেশ যায় যুদ্ধে এবং নিখোঁজ হয়। সন্তানসম্ভবা মেয়ে বাবার আশ্রয়ে ফিরতে বাধ্য হয়। প্রসবের পর বাবা দুঃখের সঙ্গে মেয়েকে জানান যে তার সন্তান মৃত অবস্থাতেই জন্মেছে! মেয়ে পরিণত হয় এক বিষাদ-প্রতিমায়।

সৈন্যদলের ক্যাম্পে এবার অনুষ্ঠিত হয় এক সঙ্গীতানুষ্ঠান যেখানে গাইতে আসে এক জনপ্রিয় গায়ক-অভিনেতা কুমার (সুনীল দত্ত) । সে ধীরে ধীরে মীনার প্রতি আকৃষ্ট হয়, এবং অবশেষে, বাবার পূর্ণ এবং সোৎসাহ সমর্থনে সে কুমারকে বিয়ে করে তার সঙ্গে বম্বেতে সংসার পাতে। চার বছর পর নিজের মৃত্যুশয্যায় বাবা মেয়েকে জানান যে সে কোন মৃত সন্তান প্রসব করেনি! তার কন্যাসন্তান এক অনাথ আশ্রমে মানুষ হচ্ছে, কিন্তু তিনি মীনাকে অঙ্গীকারবদ্ধ করেন যে সে কুমারকে নিজের পূর্ব ইতিহাস – বিয়ে, সন্তান – সম্বন্ধে কিছুই বলবে না। মীনা সেখানে গিয়ে মেয়ে সারিকাকে (অভিনয়ে স্ব-নামে সারিকা) ঘরে নিয়ে আসে আর কুমারকে জানায় যে যেহেতু তারা সন্তানহীন, সে সারিকাকে দত্তক নিতে চায়। কুমার অসম্মত হওয়ায় মীনা সারিকাকে আবার অনাথ আশ্রমে ফেরত পাঠাতে বাধ্য হয়। কিন্তু কুমারের অজান্তে সে সারিকাকে মাঝে মধ্যেই বাড়ীতে নিয়ে এসে মেয়ের সঙ্গে সময় কাটায়।

হঠাৎ কুমার-মীনার বাড়ীতে মাঝেমাঝেই রহস্যময় ফোন আসা শুরু হয় যা মীনা আতঙ্কগ্রস্তভাবে কেটে দেয়। আমরা এও দেখি যে মীনা কুমারের বিভিন্ন সঙ্গীত বা নাটকের অনুষ্ঠানে যাওয়া নানা অজুহাতে এড়িয়ে গিয়ে একটি হোটেলের এক নির্দিষ্ট ঘরে যাওয়া শুরু করেছে যেখানে তার অপেক্ষায় থাকে এক বিশেষ ছাঁদের জুতোজোড়া পরা কোন ব্যক্তি। কুমার একাধিক সূত্র পেয়ে স্ত্রীকে পরকীয়ায় রত বলে সন্দেহ করতে শুরু করে। তার সন্দেহ এমন পর্যায় পৌঁছোয় যে একবার ওথেলো নাটকে নাম ভূমিকায় অভিনয় করতে করতে কুমার তার ডেসডিমোনা-রূপিনী সহ-অভিনেত্রী শবনমকে (মমতাজ) প্রায় গলা টিপে মেরে ফেলতে উদ্যত হয়!

এবার কুমার পুণা যাবার নাম করে বাড়ী ছাড়ে আর রাতে ছদ্মবেশে বাড়ী ফিরে দেখে দরজা খোলা। কিছু করবার আগেই সে শোনে বন্দুকের গুলির আওয়াজ। ছুটে গিয়ে ওপরে পৌঁছে কুমার মেঝের ওপর দেখে মীনার গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ! ঘটনাস্থল থেকে একটি ঘরের নম্বরসহ চাবির রিং কুড়িয়ে নিয়ে হতবুদ্ধি কুমার ফিরে আসে যে হোটেলে সে ছদ্মবেশে উঠেছিল।

পুলিশ অফিসার অশোক (বলরাজ সাহনী) কুমারকেই সন্দেহ করেন। এদিকে কুমার চাবির রিং যে হোটেলের, সেখানে গিয়ে জানতে পারে যে মীনাকে ফোন করছিল তার প্রথম স্বামী রাজেশ যে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিখোঁজ হলেও বেঁচে ফিরেছে। মীনা তার সঙ্গেই দেখা করতে আসত। দুজনে মিলে তাদের কন্যাকে অন্তত রাজেশের কাছে ফিরিয়ে দেবার ব্যবস্থা করছিল কারণ মীনার পক্ষে অবৈধ সন্তান মানুষ করা অসম্ভব।। রাজেশ এও বলে যে মীনা খুন হবার আগে সারিকার সঙ্গে খেলছিল এবং পুরো ঘটনাই বাড়ীর ‘মুভি ক্যামেরা’য় ধরা আছে।

কুমার, রাজেশ, এবং কুমারকে ধাওয়া করে ইনস্পেকটর অশোক উটিতে এসে পড়েন, যেখানকার অনাথ আশ্রমে সারিকা মানুষ হয়েছিল। আশ্রমের মেট্রনের কাছ থেকে জানা যায় যে সারিকাকে নেবার ব্যাপারে মীনা ছাড়াও অতি আগ্রহী ছিল তেজপাল (মদন পুরী) নামে এক ব্যক্তি, সম্পত্তি-সংক্রান্ত স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে যার দত্তক সন্তানের প্রয়োজন ছিল। তেজপালের বাড়ীতে সবাই গিয়ে পড়লে সে সারিকাকে নিয়ে পালাবার চেষ্টা করে, কারণ মুভি ক্যামেরার দৃশ্যে স্পষ্ট যে সেইই মীনাকে খুন করে সারিকাকে নিয়ে পালিয়েছিল। দুইপক্ষের গুলিবৃষ্টিতে রাজেশ নিজের মেয়েকে রক্ষা করতে সক্ষম হয় বটে কিন্তু তেজপালের গুলিতে সে অবশেষে মারা যায়। ইন্সপেকটার অশোকের গুলিতে তেজপাল নিহত হয়।

মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত কুমার সহকর্মী শবনমকে জানায় যে মীনার দর্শকাসনে অনুপস্থিত থাকার এই মর্মান্তিক কারণ জানার পর সে তার অভিনয় ক্ষমতা হারিয়েছে। প্রত্যুত্তরে শবনম কুমারকে দেখায় মীনার নির্দিষ্ট আসনে বসে আছে তার মারই প্রতিভূ – সারিকা!

সাম্প্রতিক ছবিটি আবার দেখতে দেখতে মনে হল যে নির্মাতা সেই ষাটের দশকের মূলধারার রীতি মেনে একটা ভাল ‘থ্রিলার’-কে অতি-দীর্ঘায়িত করে ফেলেছেন, কিছু তখনকার কালে প্রত্যাশিত ‘মশলা’ ঢুকিয়ে, মূলতঃ গানের মাধ্যমে। আমরা যখন ছবিটি দেখতে যাই, তখনই শুনেছিলাম যে একটি গান বাড়ানো হয়েছে। সেটি, এবং কুমার-মীনার দার্জিলিঙের পাহাড়ে প্রেমলীলার আরেকটি গান বাদ গেলেই ভালো হত।

ছবিটি বছরের শ্রেষ্ঠ হিন্দী কাহিনীচিত্র হিসেবে জাতীয় পুরষ্কার পায়।

মোটামুটি এইরকম সময়েই ইস্কুলে ১৬ মিমি পর্দায় দেখেছিলাম ১৯৫৩ সালের সফলতম ছবি, সাদা-কালো আনারকলি, জাহানারা-র মতোই আংশিক ইতিহাসাশ্রিত বিয়োগান্ত প্রেম কাহিনী, তফাৎ এই যে যে চরিত্রের নামে ছবি, সেই নর্তকীর বাস্তবে কোন অস্তিত্ব ছিল কিনা সন্দেহ। নাম ভূমিকায় ছিলেন বীণা রায়, সম্রাটপুত্র সেলিম প্রদীপকুমার। কিছু বিখ্যাত গান ছিলঃ লতা মংগেশকরের গলায় ‘ইয়ে জিন্দগী উসীকী হ্যায়’, সঙ্গীত সম্রাট তানসেন এবং আনারকলির দ্বৈত গান ‘জাগ দর্দ-এ ইশক জাগ’, যে গানে তানসেনের কণ্ঠ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, এবং যে গানের রেকর্ড বাড়ীতে ছিল। এছাড়া অপ্রত্যাশিতভাবে পেলাম নেপথ্যে হেমন্তকণ্ঠে ‘জিন্দগী প্যার কী দো চার ঘড়ী’ । ছবির শীর্ষসঙ্গীতও যে হেমন্তকণ্ঠেই সে কথা অনেক পরে জেনেছি।

স্কুলে দেখা আরেকটি উল্লেখযোগ্য হিন্দী ছবি হলো ১৯৫৫ সালের ষষ্ঠ সফলতম ছবি, সাদা কালো ইনসানিয়ত, ১৯৫০ সালের তেলেগু ছবি পাল্লেতুরি পিল্লা-র রূপান্তর। এক গ্রামে মাঝে মধ্যেই হানা দেয় অত্যাচারী রাজার সৈন্য, লুটপাটের উদ্দেশ্যে। এইরকম এক হামলার দিন গ্রামের মেয়ে দুর্গা (বীণা রায়) রাজার সেনাপতি ভানুপ্রতাপের (দেব আনন্দ) গালে সপাটে চপেটাঘাত করে তাকে ‘নির্লজ্জ’ আখ্যা দেয়। এই আঘাত ভানুর মধ্যে পরিবর্তন আনে, সে রাজার প্রাসাদ ছেড়ে যোগ দেয় গ্রামবাসীদের সঙ্গে। এবার দুর্গার ভালোবাসা কে পাবে? ভানু না গ্রামের ছেলে মঙ্গল (দিলীপকুমার)? আর অত্যাচারী রাজা কি কাউকেই ছেড়ে কথা বলবে? এটি একমাত্র হিন্দী ছবি যাতে হিন্দী ছবির তিন নক্ষত্রের (রাজ কাপুর, দিলীপকুমার, দেব আনন্দ) দু’জন একত্র হয়েছেন। (ঠিক এইভাবেই ১৯৪৯ সালের আন্দাজ হলো একমাত্র ছবি যাতে রাজ কাপুর আর দিলীপকুমার একসঙ্গে আছেন) । অনেক পরে জেনেছি যে ছবির শেষ গানের কণ্ঠ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের।

ছবিটি সম্বন্ধে শুনেছিলাম যে ‘জিপ্পু’ নামের শিম্পাঞ্জীটি (মানে তার ট্রেনার) – ছবি জুড়ে যার প্রচুর মজাদার কীর্তিকলাপ আছে, যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রাজার হাত থেকে দুর্গা-ভানুর শিশুপুত্রকে টুক করে কেড়ে নিয়ে যাওয়া – নাকি এক লক্ষ টাকা পারিশ্রমিক পায়, যা শুনে দিলীপকুমার নাকি ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন যে যথাসময়ে তিনিও এক লক্ষ টাকা নেবেন, এবং অবশেষে ১৯৬৪ সালের লীডার ছবিতে নাকি ওই অঙ্কেরই পারিশ্রমিক তিনি পেয়েছিলেন।

ইংরাজী ছবির কথা বলার সময় উল্লেখ করেছিলাম যে সেন্ট লরেন্স স্কুল থেকে প্রতি বছর Rector’s Day-তে সেন্ট জেভিয়ার্সের প্রেক্ষাগৃহে ৩৫ মিমি প্রোজেকশানে ছবি দেখাবার ব্যবস্থা হতো। ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৭ অবধি ইংরেজী ছবিই দেখানো হয়েছিল (১৯৬৩-তে অবশ্য ইংরেজীতে ‘ডাব’ করা জাপানী অ্যানিমে ছবি Magic Boy) । ১৯৬৮-তে এই রীতি ভেঙে দেখান হলো বাংলা ছবি পান্না কারণ তাতে নাম ভূমিকায় ছিলেন সেন্ট লরেন্সেরই উঁচু ক্লাসের ছাত্র রমাপ্রসাদ বণিক। ১৯৬৯-এ কোন অজ্ঞাত কারণে নির্বাচিত হলো দক্ষিণী সুপারহিট রামুডু ভীমুডু-র (১৯৬৪) হিন্দী রূপান্তর, ১৯৬৭ সালের রঙিন রাম ঔর শ্যাম। দ্বৈত ভূমিকায় দিলীপকুমার, তাঁর দুই নায়িকা ওয়াহিদা রেহমান ও মমতাজ, আর প্রতিপক্ষ সেই প্রাণ। দেখতে মন্দ লাগেনি, তবে সেই তখনই মনে হয়েছিল, একাধিক গান বাদ গেলে মূল গল্পটা আরও জমিয়ে উপস্থাপনা করা যেত! ১৯৬৭-র বক্স অফিসে ছবিটি ছিল দ্বিতীয় স্থানে। সোভিয়েত রাশিয়াতেও ছবিটি বাজার মাত করে। ভারতে যেখানে রাম ঔর শ্যাম ছিল দ্বিতীয় স্থানে আর হামরাজ চতুর্থ জায়গায়, রাশিয়াতে হামরাজ ছিল বাজারে এক নম্বর আর রাম ঔর শ্যাম দু’ নম্বর! দিলীপকুমার শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে ফিল্মফেয়ার পুরষ্কার পান।

এইরকম সময়ে ধর্মতলা স্ট্রীটের ‘নিউ সিনেমা’ নামক সিনেমা হলে জীবনে প্রথম এবং শেষবার সপরিবারে যাওয়া হয়। এই হলটিতে, এবং ওই একই রাস্তায় ‘অপেরা’ নামক হলে, আসতো যাকে বলে বি-গ্রেড হিন্দী ছবি, যেমন আজাদ অভিনীত হিন্দী টারজানের সব ছবি, দারা সিং অভিনীত মূলত কুস্তি দেখানোর ছবি, যার মধ্যে স্মরণীয় ১৯৬৯ সালে নীল আর্মস্ট্রং চাঁদে পা রাখার পর দারা সিং অভিনীত চাঁদ পর চড়াই, অথবা ১৯৬৬ সালে অপেরায় মুক্তিপ্রাপ্ত জাপানী গডজিলার দেশী ভাইকে নিয়ে ছবি গোগোলা! আমাদের নিউ সিনেমা অভিযান অবশ্য হয়েছিল মা-র ইচ্ছেয়, তাঁর প্রিয় ছবি, ১৯৫২ সালের সাদা-কালো বৈজু বাওরা (ওই বছরের দ্বিতীয় সফলতম ছবি) দেখার জন্য। নাম ভূমিকায় ভারত ভূষণ, নায়িকা গৌরীর ভূমিকায় মীনাকুমারী, তানসেনের রূপে সুরেন্দ্র, সম্রাট আকবর বিপিন গুপ্ত, এবং হরিদাস স্বামী রাই মোহন। ছবির সম্পদ নৌশাদের সুরে একের পর এক রাগাশ্রয়ী, এবং কিছু লোকসঙ্গীত-ভিত্তিক গান। নায়ক-নায়িকার কণ্ঠ যথাক্রমে রফি ও লতা, যদিও ছবির শীর্ষবিন্দুতে, যখন আকবরের সভায় তানসেন আর বৈজুর মধ্যে সঙ্গীত প্রতিযোগিতা হচ্ছে, তখন দুজনের কণ্ঠ যথাক্রমে ওস্তাদ আমীর খাঁ এবং ডি ভি পালুসকর।

১৯৬৮-তে নির্মিত হিন্দী ছবির, আমার ধারণা, একটি বা বড়জোর দুটি দেখেছি ওই বছরে, আরেকটি, আমার স্মৃতি বলছে, ১৯৬৯-এ দেখা। সবচেয়ে ভালো লেগেছিল গণেশ অ্যাভিনিউয়ের হিন্দ সিনেমায় শাম্মী কাপুর, রাজশ্রী, প্রাণ এবং মমতাজ অভিনীত রঙিন ব্রহ্মচারী। ১৯৬৮-র আগে হিন্দ-এ এসেছি বাবার সঙ্গে ১৯৬৬-তে, রাতের শো-তে লরেল হার্ডির স্বল্পদৈর্ঘের ছবির সংকলন Troubleshooters দেখতে। এই দ্বিতীয় ও আজ অবধি শেষবার দাদার সঙ্গে ব্রহ্মচারী-সঙ্গ করতে।

ব্রহ্মচারী (শাম্মী কাপুর) বম্বেতে নিজের বাড়ীকে বানিয়েছেন অনাথ শিশুদের আশ্রয়স্থল। তাঁর আয়ের উৎস হোটেলে গান করা (দিল দেকে দেখো, তীসরী মঞ্জিল) আর ফটোগ্রাফি। সম্ভবত কোন পত্রিকার সম্পাদক তাঁকে বলেন যে তাঁর আশ্রিত বাচ্চাদের ছবি অনেক ছাপা হয়েছে, এবার নতুন কোন বিষয় নিয়ে ছবি দিতে। শহর ঘুরতে ঘুরতে ব্রহ্মচারী দেখেন এক মহিলা (রাজশ্রী) সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে উদ্যত। তিনি হাঁইমাই করে মহিলাকে আটকান। বেশীর ভাগ আত্মহত্যায় উদ্যতদের মতো মহিলা ঠোঁট ফুলিয়ে বলেন, “আমাকে বাধা দেবেন না, আমি মরতে চাই!” ব্রহ্মচারী উত্তরে বলেন, “আরে, কে আটকাচ্ছে আপনাকে? আপনিই আমার নতুন ছবির বিষয়! একটু চুল এলোমেলো করে দাঁড়ান, ছবিটা তুলে নিই, তারপর লাফ দিন জলে। ছবিটা ছাপা হলে পাঁচশো টাকা পাব!” বেশ মজার ব্যাপার। মহিলা তো এই উত্তর শুনে ভ্যাঁ করে কান্না শুরু করেন। “ক্ষিদে পেয়েছে তো?” প্রশ্ন করেন ব্রহ্মচারী। “তা, আমার সঙ্গে আসুন, খেতে দেব, তারপর কিন্তু আবার এখানে এসে ঝাঁপ!”

নিজের ‘ব্রহ্মচারী আশ্রম’-এ মহিলাকে এনে জানা যায় যে তাঁর নাম শীতল চৌধুরী। তিনি বাল্যকাল থেকে প্রতিবেশীর ছেলে রবির (প্রাণ) বাগদত্তা। কিন্তু তাঁর নিজের অবস্থা খারাপঃ বাবা-মা মৃত, আর রবি এখন বড়লোক হয়ে গিয়ে শীতলকে প্রত্যাখ্যান করেছে। সেই অপমানে এবং আর্থিকভাবে প্রায় নিঃস্ব হওয়ায় শীতলের এই আত্মহত্যার চেষ্টা। এবার ব্রহ্মচারী প্রস্তাব দেন যে তিনি শীতলকে শিখিয়ে-পড়িয়ে রবির উপযুক্ত করে তুলবেন (উৎস বার্নার্ড শ-র পিগমেলিয়ন নাটক, তার থেকে হওয়া মাই ফেয়ার লেডি, আর ১৯৬০ সালে শহরের ইতিকথা ছবি যাতে উত্তমকুমার মালা সিনহাকে ঠিক এইভাবে ‘শহুরে’ করে তোলার দায়িত্ব নিয়েছিলেন; ব্রহ্মচারীর চিত্রনাট্যকার একজন বাঙালী, শচীন ভৌমিক!)। রবির সঙ্গে বিয়ে হলে শীতল ব্রহ্মচারীর আশ্রমটি যে বিশ হাজার টাকায় বন্ধক পড়ে আছে সেই অর্থ দিয়ে ব্রহ্মচারী এবং তাঁর আশ্রিত শিশুদের উৎখাত হওয়া থেকে বাঁচাবেন।

এরপর অনেক নাটকীয় ঘটনা ও ঘাতপ্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে ব্রহ্মচারী আর শীতলের বিয়ে হয়, শিশুরা তাদের ‘দিদি’র মধ্যে পায় তাদের সকলের মা-কে। লম্পট রবিও অবশেষে তার বান্ধবী রূপাকে (মমতাজ) – যাকে সে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং যার অবৈধ সন্তান রূপা বাধ্য হয়ে রেখে এসেছিল ব্রহ্মচারী আশ্রমের বাইরে – স্ত্রীর সম্মান দিতে বাধ্য হয়।

খুবই মনোগ্রাহী ছবি, শাম্মী কাপুর তাঁর স্বভাবগত ‘স্টাইলে’ বেশ উপভোগ্য অভিনয় করেছেন, খলনায়ক প্রাণও তাঁর স্বভাবগত রীতিতে রবির চরিত্রের বহুগামী, স্বার্থপর, প্রয়োজনে হিংস্র, অবশেষে ব্রহ্মচারীর হাতে বেদম মার খেয়ে আপাত-অনুতপ্ত দিকগুলি ফুটিয়ে তুলেছেন। মনে পড়ে, এক জায়গায়, পার্কে খেলতে খেলতে আশ্রমের একটি ছেলেকে সাপে কামড়ায়। শীতল তাড়াতাড়ি তার পায়ের ক্ষত থেকে বিষ শোষণ করে ছেলেটিকে বাঁচান কিন্তু কিছুটা বিষ গিলে ফেলায় মৃত্যুমুখে পতিত হন। ছেলেটি তখন আশ্রমে ঠাকুরের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে বলে, “আমার প্রাণ নিয়ে নাও, আমার দিদিকে বাঁচতে দাও।” সেই ১১ বছর বয়সে এই দৃশ্য দেখে অঝোরে কেঁদেছিলাম – সেই ১৯৬৫/৬৬-তে বাংলা পরিবর্তন দেখার সময় যেমন। দাদা আমার এই ভাবাবেগ দেখে বেশ মজা পেয়েছিলেন।

গানগুলি – হজরত জয়পুরী এবং প্রয়াত শৈলেন্দ্রের লেখা, শঙ্কর-জয়কিষণের সুর, মহম্মদ রফি, এবং একটি দ্বৈত গানে রফি এবং সুমন কল্যাণপুরের, কণ্ঠ – অত্যন্ত সুখশ্রাব্য । ছবিটি ব্যবসার হিসেবে ১৯৬৮-র সপ্তম সফলতম, এবং ষষ্ঠদশ ফিল্মফেয়ার পুরষ্কার অনুষ্ঠানে শ্রেষ্ঠ ছবি, শ্রেষ্ঠ অভিনেতা (শাম্মী কাপুর), শ্রেষ্ঠ কাহিনী (শচীন ভৌমিক), শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক, শ্রেষ্ঠ নেপথ্য গায়ক (মহম্মদ রফি), এবং শ্রেষ্ঠ গীতিকার (শৈলেন্দ্র) – এই ছটি শ্রেণীতে জয়ী হয়। এমনকি, পশ্চিমবঙ্গেও বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন হিন্দী বিভাগে রূপা-রূপিনী মমতাজকে শ্রেষ্ঠ সহ-অভিনেত্রী, শঙ্কর-জয়কিষণকে শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক, এবং এম এস শিণ্ডেকে শ্রেষ্ঠ সম্পাদক হিসেবে পুরস্কৃত করে। ছবির কাহিনী নিয়ে তামিল ও তেলেগু ভাষায় দুটি ছবি হয়, এবং ১৯৮৭ সালের সফল ছবি মিঃ ইন্ডিয়া-র গল্পের ওপর ব্রহ্মচারী-র প্রভাব আছে মনে করা হয়।

হয় এই বছর বা ১৯৬৯-এ দেখি এই ১৯৬৮-তেই তৈরি, ১৯৫২ সালের বাংলা ছবি পাশের বাড়ী-র রূপান্তর (রঙিন)পড়োসন। এই প্রথম দাদা নিয়ে যান কলকাতা কর্পোরেশনের কাছে ‘সোসাইটি’ সিনেমা হলে। গল্প সবাই জানেন। হাবাগোবা ছেলে ভোলা (সুনীল দত্ত) পাশের বাড়ীর মেয়ের (সায়রা বানু) প্রেমে পড়ে, কিন্তু সে এতই লাজুক যে মেয়েটিকে সে কথা সে জানাতে অক্ষম। মেয়েটি যেহেতু বাড়িতে গানের মাস্টারের কাছে গান শেখে, তাকে গানের মাধ্যমে আকৃষ্ট করা যেতে পারে, কিন্তু ভোলার গলায় তো সুর নেই। অতএব তার বন্ধুরা মিলে তাকে জানলার সামনে রেখে পেছন থেকে, তাদের মধ্যে যে গায়ক (কিশোরকুমার), তাকে দিয়ে গান গাইয়ে মেয়েটিকে শোনায়। কিন্তু মেয়েটির গানের মাস্টারও (মেহমুদ) যে মেয়েটির প্রতি আকৃষ্ট! অতএব ভোলা (আদতে তার গায়ক বন্ধু) আর গানের মাস্টারের মধ্যে লেগে যায় গানের প্রতিযোগিতা। তখন ছবিটি খুব মজার লেগেছিল, তবে কয়েক বছর আগে আবার দেখে মনে হয়েছে বড্ড মোটা দাগের এবং উচ্চগ্রামের অভিনয়, বিশেষ করে কিশোরকুমারের। এর অন্যতম কারণ আশির দশকে বাংলাদেশ টিভিতে বাংলা ছবিটি আংশিক দেখা। কি পাশের বাড়ী, কিপরিবর্তন, কি কানামাছি, কি ছদ্মবেশী, হিন্দীতে রূপান্তরিত হলেই (পড়োসন, জাগৃতি, গোলমাল, চুপকে-চুপকে), বোধহয় হিন্দী ছবির দর্শকের ‘ভিন্ন রুচি’র কথা ভেবে, এমনকি বাঙালী পরিচালকেরাও (সত্যেন বসু, হৃষীকেশ মুখোপাধ্যায়) তুলনায় স্থূলতর উপস্থাপনার পথে হাঁটেন।

পড়োসন ছিল ১৯৬৮-র ষষ্ঠ সফলতম ছবি। রাহুল দেব বর্মণের সুরে গানগুলিও হিট করেছিল। এখানে একটি গান নিয়ে এক মজার ইতিহাস আছে। বাবা একদিন ভোলটাস-এর অফিস থেকে ফিরলেন একটি ৭৮ গতির সেনোলা কোম্পানীর রেকর্ড নিয়ে। তাঁর এক কর্মচারী দুখানা গান রেকর্ড করে তাঁকে উপহার দিয়েছে। একদিকের গান ছিলঃ ‘যদি নাম না জানো, বলবে কী? / এই নাম কি তাই যে বলতে হয়? / আর সেই নামে কেউ না ডাকলে/ পথে একলা একলা চলতে হয়!’ গায়কের নাম রেকর্ডে ছিল ‘মানস কুমার’। পরে রেডিওতে এবং পড়োসন দেখে বুঝি, গানের সুর হলো ‘মেরে সামনেওয়ালী খিড়কী মে’-র (কিশোরকুমার)! গানটি এতই জনপ্রিয় হয় যে ১৯৭১ সালে বাংলা ছদ্মবেশী-তে অনুপ ঘোষালকে দিয়ে পুরো গানটিই সম্ভবত জহর রায়ের মুখে রাখা হয়েছিল। জনপ্রিয় হিন্দী সিনেমার গানের সুরে বাংলা কথা বসিয়ে নতুন গান করার রীতি তো ষাটের দশকে খুবই চালু ছিল। রেকর্ডের উল্টোদিকের গান – ‘মরমিয়া যেও না, একটু শোনো’ – ছিল ১৯৬৭ সালের শাগির্দ ছবি থেকে রফির গলায় হাসির গানের সুরঃ ‘বড়ে মিয়াঁ, দীওয়ানে এইসে না বনো’।

১৯৬৮-র আর একটি হিন্দী ছবিই দেখেছি, আবার দাদার সঙ্গে। চৌরঙ্গীর ‘রক্সি’ সিনেমায় মার্ক টোয়েনের ১৮৮১ সালের উপন্যাস The Prince and the Pauper এবং তার থেকে হওয়া ১৯৫৪ সালের তেলেগু ছবি রাজু পেড়া আধারিত রাজা ঔর রঙ্ক। একই দিনে রাজার (বিপিন গুপ্ত) ঘরে আর এক দরিদ্র মানুষের ঘরে জন্ম নেয় দুই পুত্রসন্তান (দ্বৈত ভূমিকায় মাস্টার মহেশ) । ঘটনাচক্রে দরিদ্রের সন্তান রাজা প্রাসাদে যুবরাজের জায়গায় যায় আর যুবরাজ বাস্তব জীবনকে জানতে সাজে দরিদ্রের ছেলে। রাজপ্রাসাদে আছে কুচক্রী সেনাপতি বিক্রম (কমল কাপুর) । বিশেষ করে বাইরের দুনিয়ায় দিশেহারা যুবরাজের পাশে দাঁড়ায় যুবক সুধীর (সঞ্জীবকুমার) যে রাজার দিদি সুজাতাকে (নাজিমা) রাজবাড়ীর পাহারাদারের হাতে শ্লীলতাহানী হওয়া থেকে রক্ষা করে এবং অবধারিতভাবে দুজনের মধ্যে প্রেম জেগে ওঠে। নানা নাটকীয় ঘটনার পর সমস্ত ভুল বোঝাবুঝির অবসান হয়। অনেকদিন পর আবার স্টেটসম্যান কাগজ ছবিটি সম্বন্ধে ইতিবাচক সমালোচনা লেখে, এবং বিশেষ ভাবে উল্লেখ করে দরিদ্রসন্তান রাজার মা শান্তার ভূমিকায় নিরূপা রায়ের অভিনয়ের। লক্ষ্মীকান্ত-প্যারেলালের সুরে ছবির গানগুলিও হিট করেছিল, যেমন কুমকুম অভিনীত রাজনর্তকী মাধবীর মুখে, লতা মঙ্গেশকরের গলায় ‘মেরা নাম হ্যায় চামেলী’। আমি নিজে মেলোডি থেকে কিনেছিলাম ঊষা মঙ্গেশকর ও আশা ভোসলের গলায় (পর্দায় যথাক্রমে শান্তা-নিরূপা রায় ও সুজাতা-নাজিমা) ‘মেরে রাজা, মেরে লাল’। উল্টোদিকেই ছিল লতা মঙ্গেশকরের উল্লেখিত গানটি। ছবিতে আমার বিশেষ ভালো লেগেছিল সঞ্জীবকুমার, অজিত (রাজার বাবা হরিয়ার চরিত্রে), আর কমল কাপুরের মধ্যে তলোয়ারের লড়াই।

১৯৬৯-এই যতদূর মনে পড়ে, আমার হনুমান-ভক্ত দাদার সঙ্গে জীবনে প্রথম, এবং এখন অবধি শেষবার, এস এন ব্যানার্জী রোডের রিগাল সিনেমায় ঢুকেছিলাম হোমি ওয়াডিয়ার হনুমান চালিসা দেখতে। নির্মাতার বিভিন্ন সময়ে করা হনুমানকে নিয়ে ছবি থেকে অংশ নিয়ে পবনপুত্রের শৈশব থেকে রাম ও সীতার অবশেষে অযোধ্যায় সিংহাসনে আরোহণ অবধি কাহিনী দেখানো হয়েছিল। হনুমান যখন শেষে গাইলেন ‘রঘুপতি-রাঘব-রাজা-রাম’, তখন তাঁর কণ্ঠ মহম্মদ রফি। রামসেতু নির্মাণের সময় জাম্বুবানের কণ্ঠ ছিলেন মান্না দে।

১৯৬৯ সালে তৈরি হিন্দী ছবির একটিই দেখেছি। সেটি কিন্তু সম্ভবত ১৯৭০ সালে, সাধারণত হলিউডের প্যারামাউন্ট সংস্থা, এবং মেট্রো-গোলডইন-মেয়র বা ইউনিভার্সাল ইন্টেরন্যাশনাল সংস্থার ৭০ মিমি ছবির, জন্য নির্দিষ্ট, এস এন ব্যানার্জী রোডের ‘এলিট’ সিনেমায়।

১৯৬৬-তে প্রযোজক অসিত চৌধুরী ১৯৬৩-র বাংলা ছবি উত্তর ফাল্গুনী-র হিন্দী রূপান্তর ঘটান মূল ছবির নায়িকা সুচিত্রা সেন এবং খলনায়ক কালীপদ চক্রবর্তীকে নিয়ে, মমতা নামে। পরিচালক অসিত সেন তখনই চেয়েছিলেন ১৯৫৯-এর দীপ জ্বেলে যাই ছবির হিন্দী করতে, কিন্তু তা হয়নি। ষাটের দশকের একেবারে শেষে শরাফৎ ছবির শুটিং-এর সময়ে হঠাৎ হেমন্ত হাজির হলেন অসিত-সমীপে। শঙ্কিত পরিচালক জানালেন তাঁর একটি ছবি প্রায় শেষ, আরেকটি শুরু করবেনঃ ‘এর মধ্যে আপনি ঢুকলে সর্বনাশ।’ (অসিত সেন, স্মৃতির সোনালি রেখা, ১২০) হেমন্ত সহাস্যে বললেন যে অসিত সেনকে ছবিই করতে হবে, এবং সেজন্য কোন অপেক্ষার প্রশ্নই ওঠে না! হেমন্ত ‘এমন একটা জিনিস [বলবেন] যে [অসিতও] অপেক্ষা করতে চাইবেন না … আপনি “দীপ জ্বেলে যাই”-এর হিন্দিটা করবেন।’ (স্মৃতির সোনালি রেখা, ১২০)পরিচালক এক ঘায়ে কুপোকাৎ; তাঁর দুর্বল জায়গায় ঘা দিয়েছেন ততদিনে একটি বাংলা ও ছ’টি হিন্দী ছবির প্রযোজক! তবে নায়িকা চরিত্রে সুচিত্রা সেন ছাড়া কাউকে নেবার কথা অসিত সেন ভাবতেই পারেন না।

এখানেই বাদ সাধলেন প্রযোজক হেমন্ত। ‘কতগুলো ব্যাপারে ওয়াহিদাজির (রহমান) কাছে আমি “ওবলিগেটেড’’ … যদি উনি রাজী না হন, তারপর … সুচিত্রা বা যাঁকে মনে করবেন নেবেন।’ (স্মৃতির সোনালি রেখা, ১২০) জোর ধাক্কা খেলেও অসিত সেন আশায় রইলেন যে ওয়াহিদা নিশ্চয়ই রাজী হবেন না, অতএব ‘ওয়াহিদা না হলে সুচিত্রাকে পাবই।’ (স্মৃতির সোনালি রেখা, ১২১) পরিচালকের দুর্ভাগ্য, ওয়াহিদা এক কথায় রাজী হলেন যে শুধু তাই না, দাবি করলেন যে ওই ‘দারুণ ছবি’র ‘ওই পরিচালককেই’ তিনি চান! (স্মৃতির সোনালি রেখা, ১২১) অসিত সেনের ভাষায়, ‘দুধের সাধ এবার ঘোলেই মেটাতে হবে।’ (স্মৃতির সোনালি রেখা, ১২২) সুচিত্রার পরিবর্তে যিনি এলেন, তাঁর দুটি আবদার অবশ্য মানা হয়নি। এক, তখনকার হিন্দী ছবির রীতি মেনে দীপ জ্বেলে যাই-এর রূপান্তর খামোশী (পলাতক-রাহগীর-এর মতন হিন্দী চিত্রনাট্যকার গুলজারের নামকরণ, অসিত সেনের মতে, ‘খামোশী মানে নীরবতা। ছবির নায়িকার পার্সপেকটিভ থেকে নামকরণটা গভীর অর্থবাহী।’স্মৃতির সোনালি রেখা, ১২২) রঙিন করতে অসিত সেন সম্মত হন নি। তাঁর সিদ্ধান্ত ছিল, ‘ছবির বিষয় ও বক্তব্য কখনোই রঙিন ছবির সঙ্গে “ম্যাচ” করবে না।’ (স্মৃতির সোনালি রেখা, ১২৩) আর মুখ্য পুরুষ চরিত্রে আবার হেমন্ত নির্বাচন করলেন এক নবাগতকেঃ রাজেশ খান্না। এই ব্যাপারে দুটি পরস্পরবিরোধী কথা শোনা যায়। এক পক্ষ বলেন যে রাজেশের নাম নাকি ওয়াহিদাই সুপারিশ করেছিলেন, চেতন আনন্দের আখরী খত (১৯৬৬)ছবিতে রাজেশের অভিনয় দেখে। অপরদিকে হেমন্ত এবং বেলা মুখোপাধ্যায় স্পষ্ট লিখেছেন যে ওয়াহিদা একেবারেই রাজেশকে চান নি। বেলা লিখছেন যে নায়িকা খবর পাঠান ‘হিরো নেহি চলে গা। পহেলে উনকো হটা দিজিয়ে।’ (বেলা মুখোপাধ্যায়, আমার স্বামী হেমন্ত, ১৭৫) এ দাবিও মানা হয়নি। অসিত সেন জানাচ্ছেন যে তখন হেমন্ত, সুবোধ ও শশধর মুখার্জি, শক্তি সামন্ত, প্রমোদ চক্রবর্তী, বি আর চোপড়া প্রমুখেরা ‘ইউনাইটেড প্রোডিউসার্স’ নামক সংস্থার মাধ্যমে নতুন মুখ নেবার প্রতিযোগিতা করছিলেন। রাজেশ খান্না এই প্রতিযোগিতায় জিতে ‘হেমন্তদাদের প্রায় ঘরোয়া শিল্পী’ (স্মৃতির সোনালি রেখা, ১২৩) হয়ে গিয়েছিলেন।

খামোশী ঘিরে ঘটল আরও কিছু নাটকীয় ঘটনা। দীপ জ্বেলে যাই এতটাই সফল হয়েছিল যে সেটির মুক্তির পরের বছরেই, ১৯৬০-এ, তার একটি তেলেগু রূপান্তর বেরোয়, নাম চিভারাকু মিগিলেড়ি, যাতে বাংলার নার্স রাধা মিত্রের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন সাবিত্রী গণেশন। খামোশী তৈরির সময় রাজেশ খান্না অসিত সেনকে জানান যে ওই সময়েই শক্তি সামন্ত শাম্মী কাপুরকে নিয়ে পাগলা কাঁহিকা নামে একটি ছবি করছেন যাতে ওয়াহিদার ডায়ালগগুলো বলছেন শাম্মী কাপুর। হেমন্ত শক্তি সামন্তকে বলেন যে শক্তি যদি একই গল্প নিয়ে ছবি করতে নেমে থাকেন, তাহলে হেমন্ত খামোশী বন্ধ করে দেবেন। শক্তি সম্পূর্ণ মিথ্যাচার করে উত্তর দেন যে তিনি নাকি দীপ জ্বেলে যাই দেখেনই নি! এরপর হেমন্ত জানতে পারেন যে রেমনর্ড ল্যাবরেটরিতে দীপ জ্বেলে যাই-এর একটি ১৬ মিলিমিটার প্রিন্ট রয়েছে এবং শাম্মী কাপুর প্রায়ই ওখানে ছবিটি দেখতে যেতেন।পাগলা কাঁহিকা-র একাধিক দৃশ্য যে দীপ জ্বেলে যাই-এর অনুকরণ তা ছবিটি দেখলেই প্রকট হয়ে ওঠে । যেমন, মানসিক হাসপাতালে নায়ক সুজিতের (শাম্মী কাপুর) চিকিৎসায় নিযুক্ত ডাক্তার শালিনীর এক নার্সকে সুজিতের প্রাক্তন প্রেমিকা সাজিয়ে সুজিতের সামনে হাজির করা (নার্স রাধা মিত্র অবশ্য তাপসের প্রাক্তন প্রেমিকাকেই সশরীরে হাজির করিয়েছিল), সুজিতের সেই মেয়ের গলা টিপে ধরা, শালিনীর সুজিতের খলনায়ক বন্ধু শ্যামকে ভয় দেখিয়ে হাসপাতালে আসতে রাজী করানো (রাধা মিত্র তাপসের প্রেমিকাকেও ভয় দেখিয়েই হাসপাতালে এনেছিল), নায়ক তার (প্রাক্তন) প্রেমিকাকে যে গান শুনিয়েছিল, সেটি ব্যবহার করে তাকে সুস্থ করার চেষ্টা, নায়ক কর্তৃক হাসপাতালের মাথা যিনি, তাঁর কাছ থেকে শালিনী সম্বন্ধে কৈফিয়ত দাবী, ইত্যাদি।

পাগলা কাঁহিকা মুক্তি পেলো খামোশী-র আগে (যদিও উইকিপিডিয়া বলে, খামোশীমুক্তি পায় ১৯৬৯-এ আর পাগলা কহিঁকা ১৯৭০-এ। আমার ধারণা দুটি ছবিরই মুক্তিলাভের বছর ১৯৭০। ১৯৬৯-এ হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রযোজিত পলাতক-এর রূপান্তর রাহগীর মুক্তি পায়। এর আগে কখনো এক বছরে হেমন্ত দুটি ছবি বাজারে ছাড়েননি।) অন্তত এবার ধর্মের কল বাতাসে নড়লো আর ছবিটি দর্শকানুকুল্য থেকে বঞ্চিত হলো। বীস সাল বাদ-এর পর এই প্রথম হেমন্তর ‘গীতাঞ্জলী প্রোডাকশানস’ বেলা মুখোপাধ্যায়ের ভাষায় ‘মাঝামাঝি’ (আমার স্বামী হেমন্ত, ১৭৬) সাফল্যের মুখ দেখলো। শীর্ষসঙ্গীত, হেমন্তকণ্ঠে ‘তুম পুকার লো’ (পর্দায় ধর্মেন্দ্র), এবং রাজেশ খান্নার মুখে, কিশোরকুমারের গলায় ‘ও শাম কুছ অজীব থী’ (এই দৃশ্য ও গানের প্রসঙ্গে পরে আসছি) খুবই জনপ্রিয় হলো। এর ওপর দীপ জ্বেলে যাই অনুসরণ করে হেমন্ত আবহে নিজের গলা ব্যবহার করলেন আর, এটিও বাংলায় ছিল না, যে দৃশ্যে নার্স রাধা হাসপাতালের দেওয়ালে টাঙানো স্বামী বিবেকানন্দের বাণী দেখছে, সেখানে সেই বাণী পাঠ করলেন হেমন্ত। লক্ষ্যণীয় যে ধর্মেন্দ্র অভিনীত ‘দেব’ চরিত্রটি বাংলায় দেবাশিস নামে নাকি করেছিলেন স্বয়ং অসিত সেন। এই চরিত্রের মুখেই ছিল ‘এই রাত তোমার আমার’। হিন্দীতে ‘তুম পুকার লো’-তে হেমন্ত বেশ কয়েক বছর পরে কণ্ঠ দিলেন ধর্মেন্দ্রের নেপথ্যে। ষাটের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে এই যুগলবন্দী শোনা গিয়েছিল হৃষীকেশ মুখোপাধ্যায় পরিচালিত হিন্দী অনুপমা(১৯৬৬) এবং পরিমল ভট্টাচার্য পরিচালিত বাংলা পাড়ি (১৯৬৬) ছবিতে। অনুপমা-র সুরকার ছিলেন হেমন্ত নিজে, আর পাড়ি-রসুরকার সলিল চৌধুরী।

খামোশী আমার বড় পর্দায় দেখা হেমন্ত-প্রযোজিত দ্বিতীয় ছবি। এলিটে ১৯৬৯ বা ১৯৭০-এ দেখেছিলাম এবং, বিশেষ করে ওয়াহিদার অভিনয়ে, মুগ্ধ হয়েছিলাম। অনেক বছর পর, সত্তরের দ্বিতীয়ার্ধে বা আশির গোড়ায় শ্যামবাজারে অধুনালুপ্ত শ্রী প্রেক্ষাগৃহে দেখি ১৯৫৯ সালের দীপ জ্বেলে যাই। অন্যত্র এই দুটি ছবি নিয়ে যা লিখেছিলাম তা এখানে পুনরুদ্ধৃত করছিঃ

... অধুনালুপ্ত শ্রী তে দেখেছি ... ১৯৫৯-র ‘দীপ জ্বেলে যাই’। ১৯৭০ [নাকি ১৯৬৯]-এ ধর্মতলার এলিট সিনেমায় দাদার সঙ্গে দেখেছিলাম হিন্দি ছবি ‘খামোশী’ওয়াহিদা রহমানের অভিনয় খুব ভালো লেগেছিল, আর ছোটবেলার চেনা গান ‘এমন বন্ধু আর কে আছে’র হিন্দী রূপান্তর শুনে মজা পেয়েছিলাম। ১৯৭৬-এর পর শ্যামবাজারে শ্রী প্রেক্ষাগৃহে বসে বুঝলাম যে তখন খুবই ভালো, সুস্বাদু ঘোল খেয়েছিলাম বটে, কিন্তু আসল দুধ ঝরে পড়েছিল সেই ১৯৫৯ সালে! আজও বলি, মহানায়িকা যদি আর একটি ছবিও না করতেন, তা’হ’লেও ‘দীপ জ্বেলে যাই’- এর নার্স রাধা মিত্র তাঁর স্থান বিশ্বের শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীদের মধ্যে নিশ্চিত করে দিয়েছিল তখনই! এমনকি ‘উত্তর ফাল্গুনী’র দেবযানী বা ‘সাত পাকে বাঁধা’র আন্তর্জাতিক পুরষ্কারপ্রাপ্ত অভিনয়কেও আমি রাধা মিত্রের পরে রাখব! ও, বলতে তো হবেইঃ কি বাংলা কি হিন্দি, দুই জায়গাতেই গানের সুরে পাগল করেছেন আমার সেই জীবনদেবতা! হিন্দী রূপান্তরটি তো আবার তাঁরই প্রযোজনা! একবার ‘খামোশী’তে আসল রাধা মিত্রকে রাখার কথা হেমন্ত ভাবতে পারতেন, তবে হিন্দি ছবির প্রযোজক হিসেবে বাণিজ্যিক চাপ ছিল, তাও বুঝি!

দুধ আর ঘোলের তুলনা তাহলে শুধু আমার মাথাতেই আসেনি!

এক নিখুঁত ছোট গল্পের চিত্রনাট্যে শেষের দিকে ঘটেছে এক বিচিত্র ব্যাপার। উৎস-কাহিনীতে পরপর তিনজন মানসিক রুগীকে নার্স মিত্র ‘ভাল করেছে, ফাঁকি দিয়ে নয়, ভালবাসার অভিনয় করে নয়, সত্যিকারের ভালবেসে।’ গল্পের অন্তিম বাক্যঃ ‘হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা আর একজন বেড়েছে। রোগী নয়, রোগিণী। সে রেখা মিত্র।’[1] (সেরা ছবি প্রিয় গল্প,১৪৩) ছবিতে – বাংলা দীপ জ্বেলে যাই এবং হিন্দী খামোশী দুটিতেই – আমরা দেখি যে মুখ্য পুরুষ চরিত্র, খামোশী-তে রাজেশ খান্না অভিনীত অরুণ চৌধুরী, আরোগ্যলাভ করে নার্স রাধার (দুটি ছবিতেই এই নাম) সঙ্গে দেখা করতে চাইছে কারণ সে এই হাসপাতালে তার পূর্বসূরি দেবের মত নয়। দেব প্রেমিকার কাছে নির্যাতিত হয়ে, মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে, রাধার ‘প্রেমাভিনয়ের’ চিকিৎসায় সেরে উঠে আবার সেই প্রেমিকাকেই বিয়ে করতে উদ্যত। অরুণ (উৎস-গল্পে অমর দত্ত) কিন্তু রাধার অভিনয়ের ফলে সত্যিই রাধার প্রতি অনুরক্ত, তার নির্যাতনকারিণী সুলেখার কাছে সে ফিরে যেতে চায় না, স্বপ্ন দেখে রাধাকে নিয়ে সংসার পাতবার। অমর দত্ত সম্বন্ধে লেখক বলেছেনঃ

আগের দু’জন [ছবিতে একজন] রোগীকে কি করে ভাল করেছে রেখা মিত্র [অমর] তাও শুনল। সব শেষে একই উপায়ে নিজের আরোগ্যলাভের ইতিবৃত্ত। নিপুণ মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ এবং সারগর্ভ উপদেশ শিরোধার্য করে গৃহপ্রত্যাবর্তনের উদ্যোগ করল যখন, তখন মনটাই শুধু ভারাক্রান্ত হয়ে আছে ক্লান্তিকর বোঝার মতন। এ ছাড়া আর কোন উপসর্গ নেই। (সেরা ছবি প্রিয় গল্প,১৪৩)

অরুণের সঙ্গে কিন্তু রাধার ঘনিষ্টতা যেভাবে খামোশী-তে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তা পাল্লা দেয় মূল গল্পে হাসপাতালের ঘরে রেখার মানসিকভাবে বিধ্বস্ত অমরকে চুম্বন করার সঙ্গে। পর্দায় এর পরিবর্তে বিন্যাস করা হয়েছে গল্পে এর পরে আসা দুটি বাক্যকে ভিত্তি করেঃ

পরের ক’টা দিনের তুচ্ছতা বাদ দেওয়া যাক। নির্দেশ মতো তাকে [অমরকে] নিয়ে বাইরে বেড়ানো, সিনেমা দেখা, থিয়েটার দেখা। (সেরা ছবি প্রিয় গল্প,১৪৩)

এই ‘বাইরে বেড়ানো’ আমরা দেখেছি গঙ্গাবক্ষে রাধা আর অরুণের নৌকাবিহারে, যার সঙ্গে কবি-গীতিকার অরুণের মুখে শুনেছি ‘ও শাম কুছ অজীব থী’, যার সুর নেপথ্য গায়ক কিশোরকুমারকেও মুগ্ধ করেছিল বলে শোনা যায়। শুনতে-শুনতে অরুণের বক্ষলগ্না হয়ে রাধা বারবার উচ্চারণ করে দেবের নাম। এই দৃশ্য ও গান ১৯৫৯ সালের বাংলা ছবিতে নেই। এটি কাঁর মস্তিস্কের ফসলঃ পরিচালক অসিত সেনের, চিত্রনাট্য রূপান্তরকারী গুলজারের, নাকি প্রযোজক-সুরকার হেমন্তের?

এরপর অরুণ যখন হাসপাতালের বড়কর্তার মুখে শোনে যে রাধা তার সঙ্গে শুধুই অভিনয় করেছিল, তার প্রতিক্রিয়া দেখে আশঙ্কা হয় যে সুলেখার কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়ে অরুণ যে মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়েছিল সেই ব্যাধিতে সে পুনঃপতিত হবে কিনা। একেবারে শেষ দৃশ্যে, যখন উন্মাদিনী রাধা সেই চব্বিশ নম্বর কেবিনে প্রবেশ করছে, তখনও অরুণের আচরণ এই আশঙ্কাকে আবার জাগিয়ে তোলে।

সবশেষে বলি, খামোশী-র শুরুতে হেমন্তের মা কিরণবালা দেবীর ছবির সঙ্গে কোহরা-র পর আবার শোনা গেল হেমন্তকণ্ঠে শ্লোকোচ্চারণ। এর আগের পর্বে উল্লেখিত বিবি ঔর মকান-এ শুধু নীরব ছবিই ছিল।

 



[1]এই নামই পেয়েছি উত্তম ঘোষ সম্পাদিত সেরা ছবি প্রিয় গল্প ( কলকাতাঃ সাহিত্য তীর্থ, ২০০০)  সংকলনে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের নামাঙ্কিত ‘দীপ জ্বেলে যাই’ গল্পে (পৃষ্ঠা ১৩৭-১৪৩)।


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন