![]() |
সমকালীন ছোটগল্প |
অদ্বৈতপাট
তখন সন্ধ্যা। নৌকা এসে থামল নবদ্বীপের ঘাটে। ছইয়ের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল মানুষটি। কপালে চন্দনের ফোঁটা, গলায় তুলসীর মালা, পরনে তাঁতের ধুতি। মুখে প্রশান্তি। তুলসী তলায় সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বলে উঠছিল শচীর উঠোনে। গলায় কাপড়ের খুঁট জড়িয়ে দেবতার কাছে জম্মের অভিযোগ উজাড় করে দিচ্ছিলেন সুন্দরী বিষ্ণুপ্রিয়া। এ পোড়া সংসার আর নবদ্বীপের সমাজ কেড়ে নিয়ে গেছে এ জন্মের সুখ, পণ্ডিত নিমাই সন্নেস নিয়েছে।
আই..!
গমগম করে উঠল উঠোনজোড়া অন্ধকার। চমকে তাকালেন বিষ্ণুপ্রিয়া। বাঁশের চাল থেকে ছটফট করে উড়ে গেল চামচিকে দুটো। ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন শচী। কৃশ, লঘু শরীর। মাথার চুলে দারিদ্রের পাক। মাথাটা ঘুরে গেল অল্প? পাদুটো একটু টলে গেল কি? দুয়ারের খুঁটি ধরে দাঁড়ালেন অন্ধকারের গায়ে হেলান দিয়ে।
দীর্ঘদেহী পুরুষটি বিষ্ণুপ্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে শচীর পাদস্পর্শ করলেন। ঘুরেও তাকালেন না ফ্যাকাশে মুখের মেয়েটির দিকে।
তবে কি আরো খারাপ কিছু খবর? ছলকে উঠল বিষ্ণুপ্রিয়ার বুক।
নিত্যানন্দ এসেছেন গঙ্গার ওপারের শান্তিপুর থেকে। সন্ন্যাসী শ্রীচৈতন্য এসেছেন অদ্বৈত গোঁসাইয়ের ঘরে। সেই গোঁসাই যে ফুসলে নিয়ে গেল অমন সোনার মতো ছেলেটাকে। অলস চোখে চাইলেন শচী।
“গৌর যে ডাক পাঠিয়েছেন মা!“ নীরবতা ভাঙলেন নিত্যানন্দ।
নিমাই! শাঁখে ফুঁ দিতে দিতে নেচে ওঠে বিষ্ণুপ্রিয়ার বুক। শচীর অজান্তেই আলতাপরা পা দুটো এসে দাঁড়ায় দরজার ওপারে।
–
হ্যাঁ মা। তোমাকে শান্তিপুর নিয়ে
যেতে প্রভুর আদেশ।
– ওগো, বিষ্ণুপ্রিয়া গোছগাছ করে নাও মা। নিমাই ডেকেছে, শান্তিপুর যেতে হবে।
মামাথা ঝুঁকিয়ে থাকেন নিত্যানন্দ। শচীর উচ্ছ্বাস থিতু হয়ে আসে।
–
না, মা। শুধু আপনাকে নিতে এসেছি। আর
যাবে আপামর ভক্তবৃন্দ। প্রভুর এমনই আদেশ।
পা জোড়া সরে যায় দরজার ওপার থেকে।
“কি কহব রে
সখি আজুক আনন্দ ওর।
চিরদিন মাধব মন্দিরে মোর।।“
প্রবল নাচের আবেশে উথাল পাথাল অদ্বৈতের উঠোন। হরিদাস, মুকুন্দ, শ্রীনিবাসরা ঘিরে আছে গৌরহরি। কৃষ্ণপ্রেমে ভিজে যাচ্ছে রাত, চৈতন্যের লোম অনুলোম। ভক্তরা এসেছে দলে দলে, অভক্তরা এসেছে কৌতূহলে। নদীয়া ভেসে যাচ্ছে চাঁদের আলোয় আর ভক্তির প্লাবনে। আজ নদীতে ভরা কোটাল।
কৃষ্ণা একাদশীর সরু সুতোর মতো চাঁদ উঠেছে আকাশে। আমবাগানের ওপারে জলার বুকে সূর্য ডুবে যাচ্ছে সেদিনের মতো। বৈষ্ণবের দীনতায় দাঁড়িয়ে আছে অদ্বৈত শ্রীপাট। বেলা শেষের আলো এসে পড়েছে পশ্চিমের দেওয়ালে। মোটা থামের ওপর চৌখুপি দালান। দালানের সামনে নাটমঞ্চ। কথক ঠাকুরের গলায় চাঁপা ফুলের মালা। কপালে তিলক চন্দন। হরি নামের মাহাত্ম্য শুনছে মেয়েরা; শুনতে শুনতে মনে পড়ছে কাজলী বাছুরের কথা, তার দুধেল মায়ের কথা, দেওয়ালের ঝাঁপিতে রাখা মুঠো ধানের কথা। দালানের ওপারে কুঠুরি। কুঠুরিতে ঠাকুর অদ্বৈত আর শ্রীচৈতন্য, নিত্যানন্দ। ধূপ জ্বলছে, দুহাত মাথার ওপরে তুলে হরিধ্বনি দিয়ে কেউ কেউ ছুঁয়ে যাচ্ছে বেদী। গঙ্গায় বয়ে যাচ্ছে গ্যালন গ্যালন জল নবদ্বীপ ছুঁয়ে, শান্তিপুরের কোল জুড়ে।
নবীন সন্ন্যাসী চলেছে বৃন্দাবনের পথে । সঙ্গে চলেছেন নিত্যানন্দ, মুকুন্দ, আচার্য হরিদাস। রাঢ় দেশের রুখু মাটি পুড়িয়ে দিচ্ছে গৌরের সোনার চরণ। বাঁশি বাজছে যমুনার কুলে। জলের চিকন কালো স্রোতে গৌর খুঁজছে তাঁর প্রাণের ঠাকুর। ক্লান্ত শ্রান্ত দিন বয়ে যাচ্ছে লু হাওয়ায়। নৌকাখানি দুলছে তাঁরই অপেক্ষায়। বৃন্দাবন যাওয়া হলনা, গৌর এলেন অদ্বৈতর বাড়ি। রান্না করেছেন আচর্য্যানি। বত্রিশ ব্যঞ্জনে ভরেছে বত্রিশ কলার ডোঙা।
“....মধ্যে
পীত ঘৃতসিক্ত শাল্যন্নের স্তূপ।
চারিদিকে ব্যঞ্জনডোঙ্গা আর মুদগসুপ
।।
সার্দ্রক বাস্তুক শাক বিবিধ প্রকার।
পটল কুষ্মান্ড বড়ি মানচাকি আর।।
চই মরিচ সূক্ত দিয়ে সব ফলমূলে।
অমৃতনিন্দক পঞ্চবিধ তিক্ত ঝালে।।
কোমল নিম্বপত্র সহ ভাজা বার্তাকী।
পটল ফুলবড়ি ভাজা কুষ্মন্ড
মানচাকি।।
নারিকেল-শস্য ছানা শর্করা মধুর।
মোচাঘন্ট দুগ্ধ কুষমান্ড সকল
প্রচুর"।।
–“নিমাই!”
উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছেন শচীমা।
অভাবে, অপুষ্টিতে রোগা দূর্বল শরীর। ঠোঁট দুটি নড়ে উঠল অমোঘ উচ্চারণে।
–“মা!”
থেমে গেল নাচের আবেশ। শান্তিপুর জুড়ে নেমে এল সূচপড়া শূন্যতা। সন্ন্যাসের পর এই প্রথম ছুঁয়ে দেখলেন সোনার গৌর। চোখ ছাপিয়ে, দুগাল ভাসিয়ে জলের স্রোত মিশে যাচ্ছে গঙ্গায়। ভিজে যাচ্ছে আচার্য্যর উঠোন। নদের নিমাই জড়িয়ে ধরল মাকে।
–কত রোগা হয়ে গেছিস রে নিমাই! ভালো
করে খাস না বুঝি?
দাওয়ার ওপর পা ছড়িয়ে ফল কাটছেন মহিলা। আপেল, বাতাবি, শসা। কথা শেষে প্রসাদ পাবে গো সবাই। কপালের রসকলিটি যেন একাদশীর চাঁদ। ঠোঁটের চাপা ভাঁজে স্বয়ং শ্রীরাধিকা। রাধাভাবটিই তো আসল গো, তবেই তো কৃষ্ণ দরশন হয়।
প্রসাদ পেয়েছেন হরিদাস, মুকুন্দ গোঁসাই। নিত্যানন্দ খেয়েছেন অঢেল। আচার্য্যর সুখের সীমা নাই। সন্ধ্যা নেমে আসছে আমবাগানের মাথায়। পাখিরা ফিরছে ঘরে। ঝিঁঝিঁপানায় থমকে আছে ঢেউ। খুঞ্চি পেতে মাছ ধরছে দুয়েকটা আদুল গায়ের ছেলে। সন্ধ্যা নামছে শান্তিপুরে অদ্বৈত গোঁসাইয়ের ভিটেয়। শ্রীপাটে তখন হরিনাম উঠছে গুনগুন করে। নাটদালানে বসে থাকা শাঁখাপলার রোগা সরু সরু হাত দু হাত উপরে তুলে কৃষ্ণধ্যানে মুক্তির সন্ধানে। অভাব থেকে মুক্তি, রোগ থেকে মুক্তি, প্রতিদিন ঝুঁকে পড়তে পড়তে বাঁচার চেষ্টা থেকে মুক্তি খুঁজে পাওয়ার আশায় বসে আছে এ ওর গা ঘেঁসে। ভাদ্রের বিকেল ছুটে যাচ্ছে সন্ধ্যার দিকে।
ফিরে যাচ্ছেন মহাপ্রভু, ছত্রভোগের পথে। ফিরে যাচ্ছি ঘরে। পলি পড়া সাদা ধুলোর রাস্তায়। বিষ্ণুপ্রিয়ার সিঁদুরের টিপের মতো সূর্য নেমে যাচ্ছে পশ্চিম দিগন্ত বেয়ে।
কাপড়ের খুঁটে চোখ মোছেন অদ্বৈত, যবন হরিদাস। ধূলায় লুটিয়ে পড়েন শচী। নিমাই ফিরে তাকায়না। সন্ন্যাসীর ফিরে চাইতে নেই। মোহন বাঁশির টানে ছুটে যাচ্ছে নিমাই। গঙ্গার ঘাটে ঘাটে থমকে আছে যমুনার জল। কুঞ্জবনে নূপুরের আওয়াজ ভাসছে মৃদু।
একাহারী বিষ্ণুপ্রিয়া ভূমিশয্যায় চেয়ে থাকে প্রহর শেষের চাঁদের দিকে। বৃন্দাবনের বাঁশি বেজে ওঠে তার শিরায় শিরায় । মোম জোছনায় ভেসে যাচ্ছে শান্তিপুর, অদ্বৈতর উঠোন। দ্রবময়ীর মতো বিষ্ণুপ্রিয়া মিশে যাচ্ছে চাঁদে। নাচতে নাচতে বৃন্দাবনে চলেছেন গৌরশ্রীহরি প্রিয় মিলনের আশে। গান ধরেছেন মুকুন্দ গোঁসাই ....
“রাত্রি
দিনে পোড়ে মন সোয়াথ না পাঙ।
যাঁহা গেলে কানু পাঙ তাঁহা উড়ি যাঙ
।।“
কৃতজ্ঞতা: চৈতন্য চরিতামৃত, চৈতন্য
ভাগবত।
0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন