কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১২৮

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১২৮

বৃহস্পতিবার, ২০ মার্চ, ২০২৫

শর্মিষ্ঠা বিশ্বাস

 

ধারাবাহিক উপন্যাস

দ্য ক্লাউড

 


(নবম পর্ব)   

এইসময়ে মনিরত্না ভরদ্বাজের হাতে কত কাজ। যেমন তিনজনের সংসারে কুটনোকাটা, বাটনা বাটা, শুকনো জামাকাপড়গুলোকে রোদ থেকে তুলে গুছিয়ে রাখা। আর এরপরই চাঁদের আলো-কে নিভু নিভু করে জ্বালিয়ে রাতের রান্নাবান্নার আগে নিজের চুলবাঁধতে বসা। সারাদিনে এটুকুই অবসর মনিরত্নার।

দাওয়া থেকে চুলের গোছা নেমে যাচ্ছে নীচে। যেন নদী। বইতে বইতে আরও নীচে যেখানে জনবসতির কোথাও না কোথাও কোনো না কোনো ব্যবস্থায় দু'জন তিনজন, অথবা কয়েকজনের বসবাসের সমুদ্র। বসবাস মানে একসাথে থাকা, খাওয়া, বচসা, প্রজন্ম তৈরি করা ইত্যাদি ইত্যাদি।

মনিরত্নার চিরুনীর মধ্যে ছেঁড়া চুল দলা পাকিয়ে আছে। আর সেইসব টুকরো চুলের ভেতরে উঁকিঝুঁকি মারছে বিগত জন্মের নানা সময়।

একথা তো ঠিক যে, আজ শরীর না থাকলে-ও সেদিন ওর শরীর ছিলো। ওর শরীরের চিকনাই আকর্ষণে একদিন ময়ূখ মিশে গিয়েছিল মনিরত্নার জীবনের সাথে।

কতই বা বয়স হবে তখন মনিরত্নার? আঠারোর মতো হবে হয়তো! হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার শেষদিনে সকলেই পরীক্ষার হল থেকে বাড়ি ফিরলেও মনিরত্না ভরদ্বাজ ফিরলো না বাড়িতে। পাড়ার দাপুটে ময়ূখ হালদারের চেহারায় একটা হিরো হিরো ভাব। বাইক স্টার্ট দেওয়ার কায়দার সাথে হিন্দি সিনেমার নায়ক শাহরুখ খান-এর কি অসম্ভব মিল!

ঘরছাড়া মনিরত্না ভরদ্বাজ তখন উড়ছে। কখনো দার্জিলিং, তো কখনও পুরীর সমুদ্রের জলে ময়ূখের বাহুবন্ধনীতে খাবি খাচ্ছে ঘর পালানো মেয়েটি।

শরীরের গন্ধ একসময়ে ফিকে হয়। মণিরত্নময় মনিরত্না ভরদ্বাজ নামের হারমনিয়ামটি একদিন বিক্রি হয়ে গেলো দুবাই-এ।

এরপর হাতবদল হয়ে পৃথিবীর নানা দেশ হয়ে আবারও ভারতের মানচিত্রে।

মনিরত্না এমন একটি সুযোগই খুঁজেছিল।  মিলেও গেলো সে সুযোগ।ওদের রেড লাইট এলাকায় বহুদিন বাদে ও সেদিন ময়ূখের মুখোমুখি। আঁশ বটির এক কোপেই নিষিদ্ধ পল্লীর কোয়ার্টারে খুন হয়ে গেলো ময়ূখ হালদার।

মনিরত্না নিজের মুখে স্বীকার করে নিলো যে, সেই খুনি। বিচারে সাব্যস্ত হলো, যতদিন জীবন, ততদিন হাজতবাস। এক বর্ষার অঝোর ধারার রাতে জেলখানার বাথরুমে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে ধোঁয়া হয়ে উড়তে উড়তে পূর্বজন্মের মনিরত্না ভরদ্বাজ বর্তমানে আনন্দের বিজ্ঞাপন কোম্পানির টিনের তৈরি সাইনবোর্ডের বাসাবাড়ির এখন পর্যন্ত একমাত্র নারী।

চুল নেই। তাই চুলোচুলিও নেই। তবুও পুরনো অভ্যাসবশত সে চিরুনী থেকে ছেঁড়া চুলের দলাকে থুঃথুঃ করে ছুড়ে ফেললো অন্ধকারে। বাতাসে ভেজা ভাব থাকায় চুলের দলা মাধ্যাকর্ষণের টানে ধীরে ধীরে এগিয়ে চললো পাতাল অভিমুখে। সেখানে মানুষের বসতির বেঁচে থাকার রসদ রোদে শুকিয়ে অথবা কাচা অবস্থাতেই চলে যায় গোলায় মজুত হতে।

হাওয়ার জোর বেড়েছে। এ-সময় কিছুটা হাওয়া স্টক করে নিতে হবে পোশাকআশাক, খাওয়াদাওয়া ও অন্যান্য কাজের জন্য। অশরীরী ছায়া ছায়া মনিরত্না বাতাসে সুখদুখমাখা চলনকে নিঙড়ে নিঙড়ে তুলছে ঘর গৃহস্থালির অ-প্রাণেদের জন্য। আর ঠিক এমন সময় প্রবলবেগে বৃষ্টি নামলো বিজ্ঞাপনের টিনের বাসাবাড়ির চালে।

উৎপল চিত্রকর কবরখানার মাঠে চলে এসেছে আজ সকাল সকালেই। গতদিনের জলরঙে আঁকা ছবিগুলো প্রদর্শনীতে দারুণ সারা পেয়েছে। দ্যা ক্লাউড- এর নাম ছড়িয়ে পড়ছে ঝর্ণার জলের মতো সভ্যতার পাথরের খাঁজে খাঁজে।

স্ট্যান্ডে আটকানো টানটান করা আর্টপেপার।  উৎপলের পেন্সিলে আঁকা মনিরত্না ভরদ্বাজ পাশ ফিরে শুয়ে আকাশের নক্ষত্র সংলাপ শুনছে...

 (ক্রমশঃ)

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন