ধারাবাহিক উপন্যাস
একটি অপরিকল্পিত হত্যার কাহিনী
(৪১)
প্রেম ফুল আর পরিবার। এই তিন নিয়েই ওর জীবন। হৃদয় বলেছিল ওর মা-কে। যে ছেলে অমন বোহেমিয়ান, পরিবারের প্রতি তার কর্তব্যবোধ দেখলে অবাক হতে হয়। আসলে ভেতরে ভেতরে ও খুব সৎ। সেখান থেকেই ওই কর্তব্যবোধটা এসেছে। ফুলের বাগান নিয়েও তাই ওর মধ্যে কোনও ফাঁকিবাজি নেই। নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে ও পুরোপুরি সচেতন। হ্যাঁ, ওকে কখনওই দায়িত্বহীন বলা যায় না। এতটা এলোমেলো জীবন অথচ দায়িত্ব নেওয়ার বেলায় সবার আগে থাকবে। ওর যত পাগলামো সবই প্রেম আর ফুল নিয়ে। ওই দুটোয় যখন ডুবে যায়, ওর কোনও হুঁশ থাকে না।
মাঝে মাঝে হৃদয়ও শ্রমণের বাড়িতে যায়। অভাবের চিহ্ন চতুর্দিকে। কিন্তু ফুলের কোনও
অভাব নেই। কত রকম ফুল যে জোগাড় করে রেখেছে শ্রমণ!
শ্রমণের মেজদিদি বলছিল, আমাদের বাবা-মা ফুল খুব ভালোবাসতেন। শ্রমণেরও ওই একই রোগ।
এদিকে টাকাপয়সা নেই, কিন্তু ফুল ছাড়া ওর চলবে না...
কী হয়েছিল আপনাদের বাবা-মা-র? হৃদয় জানতে চেয়েছিল।
সে অনেক কথা। মেজদিদি বলেছিল। সোনার দোকান ছিল আমাদের। আমরা সবাই খুব ছোটো ছোটো।
শুধু সবচেয়ে বড়ো দিদির বিয়ে হয়েছিল। সেও অল্প বয়সেই। বাবা-মা হঠাৎ চলে গেলেন। নৌকোডুবি
হয়েছিল। দিদি-জামাইবাবু ভরসা ছিলেন। কালীপুজোর রাতে আগুনে পুড়ে তারাও চলে গেলেন। একমাত্র
মেয়েটিকে রেখে গেলেন আমাদের কাছে। একটার পর একটা দুর্ঘটনা। আমাদের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে
কাকা সোনার দোকানটাও নিজের নামে লিখিয়ে নিলেন। কী করে যে পেরেছিলেন! আমরা তাঁর মুখের
দিকেই তাকিয়েছিলাম। তাঁর ওপরেই ভরসা করেছিলাম। তিনি আমাদের সর্বনাশ করলেন। আমাদের বাবা-মা
ছিলেন খুবই দয়ালু প্রকৃতির। কাকার জন্য তাঁরা অনেক করেছেন। আমাদের পথে বসিয়ে কাকা তার
প্রতিদান দিলেন। সেসব দিনের কথা ভাবলে শিউরে উঠতে হয়। বেঁচে থাকার জন্য আমরা ভাইবোনেরা
কী করিনি! শুধু মাথার ওপর এই ছাদটা ছিল তাই রক্ষে পেয়েছিলাম।
হৃদয় পরে বিশ্রুতকে বলেছিল, এরপরও শ্রমণ সব সময়ে হাসে। ওর মনের মধ্যে সব সময়েই
ফূর্তি আর আনন্দ। জীবনের কী কদর্য আর ভয়ঙ্কর দিকটাই ও দেখেছে। কিন্তু ওর মনের ভেতর
আনন্দ আর খুশীর অফুরন্ত উৎসটি ফুরিয়ে যায় নি। কী দুর্লভই না এই মন!
বিশ্রুত বলেছিল, সেটা শুধু ওর মধ্যেই নয়, পরিবারের কারও মধ্যেই যেন ওই নিষ্ঠুর
ঘটনাগুলো গভীর প্রভাব ফেলেনি। কারও মধ্যে কোনও হতাশা বা অবসাদ নেই। বরং জীবনটা যেন
ওদের কাছে একটা চ্যালেঞ্জ। ভাই-বোনদের মধ্যে অসম্ভব টান ভালোবাসা। সবাই মিলে জীবনযুদ্ধে
ঝাঁপিয়ে পড়েছে। নানা ধরনের কাজ করছে। ওদের মধ্যে ব্যস্ততার যেন শেষ নেই। জীবন নিয়ে
ওদের দৃষ্টিভঙ্গী অসম্ভব পজিটিভ। ওরা সব সময়েই ভালো কিছুর আশা করছে। একটা স্থিতিশীল
ও সুখী জীবনের স্বপ্ন দেখছে। আর সেটা নিজেদের বাস্তব্বোধকে বিসর্জন না দিয়েই। বাস্তবের
মাটিতে পা দিয়েই ওরা লড়াইটা করছে। অসম্ভব পরিশ্রমী ওরা। সৎ ও দয়ালু ওদের মন। ওদের দেখলে
সত্যিই প্রেরণা পাওয়া যায়।
হৃদয় বলেছিল, ওদের আন্তরিকতা খুবই খাঁটি। ওদের বাড়িতে গেলেই সেটা টের পাওয়া যায়।
ওরা কখনই আদর যত্নের বাড়াবাড়ি করে না। কখনই নিজেদের অভাবের কথা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বলে
না। অভাব নিয়ে ওদের মধ্যে কোনও হ্যাংলামি নেই। কোনও মানসিক দৈন্যও ওদের নেই। ওদের মধ্যে
সংকীর্ণতা বা স্বার্থপরতা নেই। নিজেদের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে ওরা সচেতন। আর সেই অন্ধ
গলি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ওদের মধ্যে যথেষ্ট একাগ্রতা রয়েছে। নিজেদের খাটো করে ওরা
কোনও বাড়তি সুবিধা চায় না। নিজেদের প্রাপ্যটুকু পেলেই ওরা খুশী। ঠিক এই ব্যাপারটা কিন্তু
আমি বিহানের বাড়িতে দেখিনি। ওদের বাড়িতে গেলেই ওর বাবা মা ছুটে আসেন। আমাকে দেখে এমন
ভাব করতে শুরু করেন, যেন আমি বিহানের পরিত্রাতা। ওদের অভাবের কোনও শেষ নেই আর সেই অভাবের
জীবনযন্ত্রণার ফিরিস্তি চলতেই থাকে। ওদের মনে কোনও আনন্দ নেই। শুধুই দুঃখ বিষাদ আর
হতাশা। এই নৈরাশ্যের হাত থেকে বাঁচার জন্য ওরা বিহানের দিকেই তাকিয়ে আছেন। আর বিহান
তাকিয়ে আছে আমার দিকে। এটাই ওদের মোদ্দা বক্তব্য। ওরা দুজনে দিয়ে আমাকে ঘিরে বসেন,
দুজনে আমার দুহাত ধরেন। তারপর প্রায় ভিক্ষা চাওয়ার মতো করে বলতে থকাকেন, তুমি একটু
দেখো বাবা। বিশেষ করে বিহানের বাবাকে মাঝে মাঝে আমার অসহ্য লাগে। ক্রোধে আর হতাশায়
ফুঁসতে ফুঁসতে সাদা চুল উড়িয়ে হঠাৎ উনি যখন বিনয়ে একেবারে বিগলিত হয়ে যান, সেই সময়টায়।
লোকটাকে কেন জানি না আম্র একজন পাকা অভিনেতা বলেই মনে হয়।
বিশ্রুত হাসে। বলে, আমাকে সাঁঝ একবার বিহানের ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছিল। ওরা
তো খুবই অবস্থাপন্ন। বিহান ছোটোবেলায় দিনরাত এক করে সাঁঝদের বাড়িতেই পড়ে থাকত। ওদের
বাড়িতেই থাকত, শুত, খেত। বাড়ি ফেরার নাম করত না। সাঁঝকে সে নিজের বোনের চেয়েও বেশী
আপন মনে করত। বিহানের মা-বাবাও সাঁঝকে খুব খাতির করতেন। নিজেদের মেয়ের মতো মনে করতেন।
অন্তত সেভাবেই সবাইকে বলতেন। এইভাবে ওরা নাকি ছেলেটাকে ভিড়িয়ে দেয় বিভিন্ন অবস্থাপন্ন
পরিবারে। একটা সেন্টিমেন্টাল সম্পর্ক তৈরি করে। সেই সম্পর্কের ব্যাপারে মানুষের আস্থা
অর্জন করে। এইভাবে অন্যের ঘাড়ে বন্দুক রেখে বেশ কিছুদিন চলে যায়। ছেলের ব্যাপারে মা-বাবার
আর কোনও দায়িত্ব থাকে না। সেই অবস্থাপন্ন পরিবারটিই দয়া দেখিয়ে সব ব্যবস্থা করে দেয়।
এটা একটা চমৎকার ব্যবসা যা ওরা অনেকদিন ধরেই চালিয়ে আসছে। কোন পরিবারে ছেলেকে ভিড়িয়ে
দিতে হবে সে বিষয়ে ওদের ব্যবসাবুদ্ধির কোনও তুলনা নেই। সেই পরিবারের পালসটি ওরা ঠিকঠাক
ধরে। অনেকদিন ধরে লক্ষ রাখে, খবরাখবর নেয়, তাদের ভেতর দয়ালু মানুষদের চিহ্নিত করে,
তারপর তাদের দয়ামায়ার সুযোগ নেয়। যদিও গোটা ব্যাপারটার মধ্যে একটা করুণ রস আছে, নিজেদের
অভাব দারিদ্রের জন্যই ওরা এরকম হীন পন্থা নিতে বাধ্য হয়, তবু ব্যাপারটাকে মোটেই সমর্থন
করা যায় না। আর তার কারণ হল, যাদের কাছ থেকে ওরা উপকার নেয় তাদের ওরা মোটেই মনে রাখে
না। তাদের প্রতি কোনও কৃতজ্ঞতাও দেখায় না। যে মুহূর্তে ওরা কোথাও বেশী সুযোগ পায়, সেই
মুহূর্তে আগের সম্পর্কটিকে ত্যাগ করে এবং নতুন সম্পর্কটিই তখন ওদের ধ্যানজ্ঞান হয়ে
ওঠে। ওরা আসলে পাক্কা ধান্দাবাজ, সুবিধাবাদী, সুযোগসন্ধানী। সাঁঝদের সঙ্গেও ওরা এটাই
করেছে। যে মুহূর্তে সাঁঝদের প্রয়োজন ফুরিয়েছে সেই মুহূর্ত থেকেই ওদের নিজেদের জীবন
থেকে পুরোপুরি ঝেড়ে ফেলে দিয়েছে। তখন রাস্তায় দেখলেও আর ওদের চিনতে পারে না। এইভাবে
কারও কাছ থেকে দিনের পর দিন ভুরিভুরি সুবিধা নিয়ে গোটা ইতিহাসটাকেই ওরা অস্বীকার করে
বসে, তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে চায়...
কিছুদিন ধরে ব্যাপারটা নিজেও লক্ষ করে হৃদয়। ওর প্রতি বিহানের টান একটু যেন কমের
দিকে। কয়েকদিন আগে একটা ঘটনা ঘটে। সেদিনও বিহান হৃদয়ের সঙ্গেই রয়েছে। হঠাৎ হৃদয় বলে,
বাইরে বেরোবি বিহান? আজ পূর্ণিমা। জ্যোৎস্নায় চারদিক থৈ থৈ করছে। চল, আজ আমরা সারারাত
সমুদ্রের ধার দিয়ে হাঁটি।
বিহান রাজি হয়ে যায়। দুজনে মিলে সমুদ্রের ধার দিয়ে হাঁটতে থাকে। নিজেকে যেন মেলে
ধরে বিহান। এমনিতেই খুব সুন্দর করে কথা বলে ও। সেদিন যেন কথার ফুল ফোটাতে থাকে। অসম্ভব
কবিত্বময় তার ভাষা। বিহান বলে ফুলের কথা। ফুলের প্রতি ওর ভালোবাসার কথা। আবেগে ওর গলার
স্বর কাঁপতে থাকে। চোখ যেন জলে ঝাপসা হয়ে যায়। একটা পাথরের ওপর বসে অনেকক্ষণ ও হৃদয়ের
হাত ধরে থাকে। সেই স্পর্শের উত্তাপে হৃদয় কেমন যেন দিশাহারা হয়ে যায়। ওর শুধুই মনে
হতে থাকে ছেলেটা আমাকে এত ভালোবাসে কেন? কী কারণে?
একটু পরেই ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি শুরু হয়। এতে গোটা পরিবেশ যেন আরও মেদুর আরও মোহময়
হয়ে ওঠে। বৃষ্টিও থেমে যায় এক সময়ে। ততক্ষণে ওরা প্রায় পুরোটাই ভিজে গেছে। তবুও ওরা
হাসতে থাকে। এলোমেলো, অসংলগ্ন কথা বলতে থাকে। বালিতে শুয়ে গড়াগড়ি খায়। একে অপরকে জড়িয়ে
ধরে। তারপর ভোরের দিকে প্রায় টলতে টলতেই ফিরে আসে। ততক্ষণে ওদের সব শক্তি নিঃশেষিতপ্রায়।
সারারাত ধরে অনেক ঝিনুক কুড়িয়েছে বিহান। হৃদয়কে সে সবগুলিই উপহার দেয়। সেই বিশেষ একটি
রাতের স্মারক হিসেবেই দেয়।
হৃদয় ভেবেছিল ওদের সম্পর্কটা এইভাবেই চলবে। কিন্তু বিহান বদলে যেতে থাকে। উপমাকে
সে হৃদয়ের সঙ্গে ভিড়িয়ে দিতে চেয়েছিল। হৃদয়কে মুগ্ধ করেছিল উপমা। কিন্তু নির্মাল্য
ফিরে আসায় হিসেব বদলে গেল।
গোড়ার দিকে আগ্নেয় বিহানকে পছন্দ করত না। ওকে নিয়ে ঠাট্টা তামাশ করত। তুচ্ছ তুচ্ছ
কারণের ওর সমালোচনা করত। বলত, এখানে তুই আসিস কেন বিহান? ফুলের বাগানে? ফুল নয়, তুই
আসিস সমিধার জন্য...
বিহান মুচকি হাসে। তারপর বলে, নিশ্চয়ি। তবে তোকেও আমার খুব পছন্দ।
কেন? জানতে চায় আগ্নেয়।
তোর গভীরতা, দার্শনিকতা, প্রতিভা আমাকে টানে।
ধীরে ধীড়ে আগ্নেয় বিহানের ব্যাপারে নরম হতে থাকে। বিহান শ্লোক লিখতে শুরু করে।
ফুল নিয়ে ওর শ্লোকগুলো পড়ে ওকে যেন নতুনভাবে আবিষ্কার করে আগ্নেয়। বিহানের মধ্যেও রয়েছে
সেই জগৎ আগ্নেয়র যা এত প্রিয়। এক অতীন্দ্রিয় জগতে যেন বাস করে বিহান। কী রহস্য সেই
জগতে আর কী দুর্বোধ্যতা। অসম্ভব দার্শনিক সেই জগৎ। অত্যন্ত গম্ভীর। এই জগতের প্রতি
আকর্ষণই আগ্নেয় আর সমিধাকে একে অপরের কাছের মানুষ করে তুলেছে। এবার ওদের সঙ্গে যোগ
দেয় বিহান। ওদের তিনজনের মধ্যে যেন একটা যোগসূত্র গড়ে দেয় ফুল। এই ফুল খুবই দার্শনিক।
বাকিরা এই ফুলের খবর রাখে না। অন্তত ওদের তাই মত।
কিন্তু শুধু এটাই কারণ ছিল না। বিহানের পর্যবেক্ষণশক্তি বরাবরই খুব তীক্ষ্ণ। ও
লক্ষ করেছিল শ্রমণের ব্যাপারে আগ্নেয় বা অতলান্ত ঠিক সদয় নয়। আর এটাই ওকে ওদের দিকে
আরও বেশী করে ঠেলে দিয়েছিল। হৃদয়ের থেকে দূরে সরতে থাকার এটাও ছিল একটা কারণ। যদিও
একমাত্র কারণ নয়। বিহান ততদিনে নিজের পরবর্তী আশ্রয় খুঁজে পেয়ে গেছে। সমিধা হৃদয়ের
তুলনায় অনেক বেশী ধনী। আর সমিধার মার মন হৃদয়ের মার চ্যে কোনও অংশে কম দয়ালু ও স্নেহপ্রবণ
নয়। বিহান বুঝতে পেরে গেছিল কোত্থেকে ওকে তাঁবু গোটাতে হবে আর কোথায় গিয়ে তাঁবু পাততে
হবে।
(ক্রমশঃ)
0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন