![]() |
কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৩৩ |
স্নানযাত্রা
জানলা দিয়ে ফুরফুর করে হাওয়া আসছে। বাইরে আলো। ভেতরেও। সজনেগাছে ফুল। দুএকটা হলুদপাতা এখনও খসে পড়ছে। চারিদিকে ফাগুনের ডাক। নির্মলা ভেবেছিলেন জীবনটা যেভাবে কেটেছে চারদেয়ালের ভেতর সেভাবেই কেটে যাবে, সামান্য আর কটা বছর। স্বামীর মুখটা আর তেমন মনে পড়ে না একথা সত্যি। হলদেটে হয়ে যাওয়া বিয়ের ছবি আর তরুণ রামপ্রসাদের চেহারা দেখে এখন অবিশ্বাস্য লাগে যে এই পুরুষটির সঙ্গে সহবাস করেছেন কখনও এবং সেইহেতু একপুত্র রমেশ আজ চল্লিশ। দুটি নাতনি। কন্যা অর্চনার বিয়ে হয়ে গেছে ইস্কুল পার করে। সেও তিন ছেলেমেয়ের মা, গিন্নিবান্নি। জন্ম থেকে শুরু করে এই পঁচাত্তর বছর বয়স অবধি তিনি দুটি জায়গা চিনেছেন এক, বাপের বাড়ি সিউয়ান আর দুই কলকাতা শহর থেকে একটু দূরে কামারকুণ্ডু। সারাজীবনে বারকয়েক দক্ষিণেশ্বর আর কালিঘাট ছাড়া তাঁর দৌড় এলাকার পড়শিদের ঘর আর বাজারে, তাঁদের স্বামী শ্বশুরের দোকান যা এখন রমেশ আর তার শালা ব্রজেশ্বর দেখাশোনা করে। কিন্তু সেও দুবছর আগের কথা। বাতে পঙ্গু এবং নানা ব্যাধি বাসা বেঁধেছে। বুঝতে পারেন সংসারে বোঝা হয়ে উঠেছেন। এই সংসার যা তাঁর ঘাম রক্ত পূর্ণিমা একাদশী করৌয়া চৌথ আর রাত জেগে সন্তান মানুষ করে শেষ হয়ে গেছে নীরবে তাঁর রূপ, যৌবন, জীবন।
বিছানা থেকে উঠতেও কষ্ট, রোজ পুত্রবধূ
আর নাতির গাল শোনেন, সামনে নয় আড়ালে। তাই গত সপ্তাহে যখন জামাই-ছেলে-মেয়ে আর ব্রজ
এসে বললে সবাই মিলে মাকে নিয়ে কুম্ভে স্নান করতে যাবে, তিনি পাল্টে গেছেন, আনন্দে
দিশাহারা হয়ে গেছেন, বলতে গেলে শরীর অর্ধেক সেরে গেছে উত্তেজনায়।
তারপর এসেছে তীর্থভূমি। আকাশ আর
আকাশের নিচে একটা মস্ত পৃথিবী। একই উদ্দেশ্যে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে চলেছে মহা সমারোহে।
আঁকড়ে ধরেন নির্মলা অন্ধের যষ্টির মত রমেশের হাত।
এত মানুষ আর এত আলো এত বিপুল আয়োজন
দেখে নির্মলা সেদিন হতবাক। না পাপ না পুণ্য না ছেলে না মেয়ে কিছুই মনে ছিল না। ওরা
আছে পাশে আঁচল ধরে, হাত ধরে। ডুবকি দেবার পর সূর্যের দিকে তাকিয়ে সবার মতো হাতজোড়
করে ফিরে দেখলেন সহস্র মানুষ তাঁর আগে পরে। সেখানে চোখে পড়ে না কোথাও রমেশ কিম্বা
তাঁদের দলের কাউকে। ভিড় কমে না। ভিজে কাপড় গায়ে শুকোয়। বসে বসে আত্মমগ্ন হয়ে সূর্যাস্ত
দেখেন নির্মলা আর এক আশ্চর্য র্পৃথিবী।
চারিদিকে ঝলমলে আলোয় রাত এক মহা
উৎসব। নির্মলার তেমন ভয় করছে না এভাবে আত্মীয়বিহীন হয়ে গিয়ে বরং কেমন এক পিঞ্জরমুক্ত
বিহঙ্গের মতো উপলব্ধি হচ্ছে। দূরে টহল দিচ্ছে পুলিশের দল। মূর্খ একেবারে নন নির্মলা।
ঠিকানা বললেই পুলিশ তাঁর মতো বৃদ্ধাকে সযত্নে পৌঁছে দেবে কুলায়ে। নির্মলা তাকিয়ে
দেখছেন প্রয়াগের জল।
তিনি কি আবার ফিরে যাবেন তাঁর বিবর্ণ
ঘরটিতে! নাকি এই স্বাধীনতার স্বাদ উপভোগ করবেন তাঁর শেষের জীবনটুকুতে? হারিয়ে যাবেন
এই সুজলা দেশের জনস্রোতে! ভাবছেন নির্মলাদেবী।
0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন