কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১২৮

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১২৮

বৃহস্পতিবার, ২০ মার্চ, ২০২৫

শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী

 

ধারাবাহিক উপন্যাস

               

হে নেপথ্যচারিণী

 


(২০)   

 

প্রমাদ

পরদিন সকালে তথাগত অধিকারী ছাড়াও আমাদের প্রাতঃরাশ আড্ডায় যোগ দিতে এল মনসুর গাজী। আমি আর সোহরাব তো ছিলামই। আশুদা শুরু করল।

ডাঃ সবিতা আগরওয়াল একটা কথা ঠিক বলেছেন। এই পৃথিবীতে অনিদ্রা কোভিডের থেকেও বড় অতিমারী। তার প্রকোপ থেকে বাঁচতে মানুষ কী না করে। কখনও ওষুধ, কখনও মাদক। নিউরোসার্জারিতে গোল্ড মেডেল পাবার পর সবিতা যখন নানান জায়গায় প্রশংসা পাচ্ছেন, তখন হঠাৎই বাঙ্গালোর নিমহান্সে একটি সেমিনারে এসে তার এই কথা মনে এল। ডাক্তার সবিতা আগরওয়াল কখনও জীবনে দ্বিতীয় হননি। তাই সেই সেমিনার শুনতে শুনতে তার মনে হল, গবেষণাতেই বা তিনি 'দ্বিতীয়' হয়ে থাকবেন কেন? ফলত তিনি সার্জারি ছেড়ে লেগে পড়লেন গবেষণায়। একটা সক্রিয় অব্যর্থ ঘোমের ওষুধ যদি মানুষের হাতে তুলে দেওয়া যায়, তার চেয়ে ভালো আর কীই বা হতে পারে! প্রাথমিক পরীক্ষায় তেমন সাফল্য এলো না।তার ছেলে তখনও স্কুলে পড়ছে। এর ভিতর ঘটে গেল গাড়ি দুর্ঘটনা। তার স্বামী মাথায় চোট পেলেন। তার শল্যচিকিৎসা দেখতে দেখতে হঠাৎ তার বুদ্ধিটা এল। মানুষকে দৈনন্দিন যাপনচক্রে ঘুম পাড়ায় 'মেলাটোনিন' দ্রব্যটি। সেই মেলাটোনিন মানুষের 'পিনিয়াল' গ্রন্থি থেকে নিসৃত হয়। এই পিনিয়াল গ্রন্থিকেই কেউ কেউ মানুষের তৃতীয় নয়ন মনে করেন। এতোদিন বাজারে যে 'মেলাটোনিন' যৌগটি ওষুধ হিসেবে বিক্রি হচ্ছিল তা রাসায়নিকভাবে তৈরি। সবিতা আগরওয়াল প্রথম এই ওষুধের মূল উপাদান মানুষের পিনিয়াল গ্রন্থি কোষ করতে চাইলেন। অর্থাৎ 'হিউম্যান স্যাম্পেল'। কিন্তু তা কী করে সম্ভব! মানবদেহে পিনিয়াল গ্রন্থি একটি অন্যতম গ্রন্থি। তাই নৈতিকভাবে সেই কোষ হস্তগত করা তার পক্ষে অসম্ভব ছিল।

তখন তিনি বেছে নিলেন তার প্রথম হিউম্যান স্যাম্পেল। তার স্বামী। গাড়ি দুর্ঘটনার পর সে তখন জড়ভরত হয়ে গেছে। স্বামীর মৃত্যুর কোনও পোস্ট মর্টেম পাওয়া যায়নি। অথচ ডেথ সার্টিফিকেটে সবিতা আগরওয়াল লিখেছেন সেরিব্রাল হেমারেজ। সেই স্যাম্পেল দিয়ে তৈরি হল 'অস্মিতা'। প্রাথমিক পরীক্ষায় সাফল্য পাবার পর সবিতা ডাক পেলেন দেশের বাইরে। পাড়ি দিলেন স্যুইডেন। সেখানে আলাপ হলো ডাক্তার স্টিফেন উডব্রুকের সঙ্গে। স্টিফেন নিউরোসার্জারির যন্ত্রপাতি নকশা করে দেন। সবিতার জন্য তিনি তৈরি করে দিলেন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন অত্যাধুনিক এক ড্রিল যা একই সঙ্গে মানুষের খুলির ভিতর ঢুকে পিনিয়াল গ্রন্থি থেকে 'স্যাম্পেল' তুলে আনতে পারবে। তথাগত অধিকারীর পাওয়া তথ্য অনুযায়ী স্যুইডেনের সেই যন্ত্রপ্রস্তুতকারক সংস্থার অন্যতম বোর্ড মেম্বার স্টিফেন। সবিতা তার আবেদনে জানিয়েছেন এই যন্ত্র তিনি মানুষের মৃতদেহ থেকে নমুনা আদায় করতে কাজে লাগাবেন। বেশ কয়েকটি ড্রিল এভাবেই তিনি হাতে পেলেন। এদিকে 'অস্মিতা' তখন লাইসেন্স পেয়ে গেছে। বাড়ছে চাহিদা। জোগান দিতে আরও নমুনা দরকার। আর দরকার স্যাম্পেল সংগ্রাহকও। এই সময়ে সবিতার সঙ্গে আলাপ হলো শুভঙ্কর শাসমলের। সর্বানন্দ ঝায়ের তথ্য অনুযায়ী শুভঙ্কর প্রথমে নিমহান্সের কর্মী ছিলেন। ল্যাব টেকনিশিয়ান। কিন্তু পাশাপাশি নিদ্রাহীনতা কাটাতে তিনি মাদকের কবলে পড়েন। কর্তৃপক্ষ তাকে বহিষ্কার করতে বাধ্য হয়। নিদ্রাহীনতাই শুভঙ্করের সঙ্গে সবিতা আগরওয়ালের পরিচয় ঘটালো। কর্মহীন শুভঙ্কর শাসমলকে আশ্রয় দিলেন ডাক্তার সবিতা আগরওয়াল। 'অস্মিতা' তৈরি করতে একজন বিশ্বস্ত সহচরের প্রয়োজন ছিল তার। এরপর তার দরকার ছিল নমুনা আদায়কারী ভিক্টিম। সেই কারণে সবিতা তৈরি করলেন একটি নতুন মোবাইল অ্যাপ। নাম দিলেন 'নিদ্রা'। সেই অ্যাপে নথিভূক্ত হলে জানতে পারা যাবে ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত নানান তথ্য। কেন ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে, ঘুম কীভাবে স্বাস্থ্যকর হয়ে উঠবে আরও। অ্যাপের মূল উদ্দেশ্য অবশ্য সেই ব্যক্তিকে 'অস্মিতা'র প্রতি প্রলুব্ধ করা। বাড়ছিল 'অস্মিতা'র চাহিদা। দরকার আরও কাঁচা মাল। তাই অবশেষে শুভঙ্কর শাসমলকে সবিতা নামালেন এই কাজে। রাতের গভীরে নির্জন কোনও অঞ্চলে ঘাপটি মেরে ড্রিল হাতে অপেক্ষা করত শুভঙ্কর। সবিতার পরীক্ষায় জানা গিয়েছিল 'অস্মিতা'র জন্য যে হিউম্যান মেলাটোনিন দরকার, তা তরুণ বা মধ্যবয়স্কদের ঘিলু থেকে নিলে বেশি কার্যকরী হতে পারবে। এই পরীক্ষার তথ্য অবশ্যই তিনি আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্রে প্রকাশ করেননি।পরে সেগুলি সর্বানন্দ তৎপর হয়ে বাঙ্গালোর পুলিশের সহায়তায় সবিতা আগরওয়ালের ফ্ল্যাটের গোপন কুঠুরি থেকে উদ্ধার করেছে। শুভঙ্করের লক্ষ্য ছিল ওই বয়সের ছেলেমেয়ে। পুলিশের নথি অনুযায়ী বাঙ্গালোরে ঘটে যাওয়া 'ত্রিনেত্র' খুনের ভিক্টিমরা সবাই ওই বয়সের। এরই মধ্যে ঘটল বিপত্তি। এই খুনের অনুসন্ধানে নেমে পুলিশ সিসিটিভিতে আবিষ্কার করে ফেলল সেই কালো চাদরে ঢাকা আততায়ীকে। সবিতা আগরওয়ালের বাঙ্গালোরে থাকা কঠিন হয়ে দাঁড়াল। তাই পুত্র শুভঙ্কর সমেত সে পুরো ল্যাব নিয়ে চলে এল কলকাতা।

'অস্মিতা'র নমুনা সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে সময় একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। যে নমুনা সংগ্রহ করবেন, তার ভিতর অতিরিক্ত আগ্রাসন না এলে খুব দ্রুত এই নমুনা সংগ্রহ করাই যাবে না। অতঃপর জিনিয়াস সবিতা আগরওয়াল নতুন পন্থা আবিষ্কার করলেন। মানুষের মস্তিষ্কে ভয়, শঙ্কা আর অনুভূতির গ্রন্থি 'অ্যামিগ্ডালা'। সেই অ্যামিগ্ডালা  জন্ম থেকেই কারও মস্তিষ্কে না থাকলে যে রোগটি হয়, তার নাম 'ক্লুভার বুচি সিণ্ড্রোম'। এই রোগে ভুগতে থাকা মানুষ ভয়হীন ও চরম আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারে। কোনও অন্যায় করলে তার ভিতর অপরাধবোধ ভা অনুশোচনা তৈরি হয় না। কলকাতায় এসে গোপনে সবিতা আগরওয়াল তৈরি করলেন তার নিজস্ব সেট আপ। বিশ্বস্ত কিছু অপরাধজগতের মানুষকে নিয়ে তৈরি হল তার নিজস্ব দল। প্রথম গিনিপিগ অবশ্যই শুভঙ্কর শাসমল।

এতোটা বলে আশুদা জল খেয়ে নিল খানিকটা। ঘরে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে আমরা শুনছিলাম তার কথা। বললাম।

-শুভঙ্করের মাথায় যে ক্ষত চিহ্নটা ছিল, সেটা কি তবে ওই কারণেই?

আশুদা বলল,"সম্ভবত তাই। যখন আমি ওসলোতে একটা নিউরাসার্জারিতে ওয়ার্কশপ করতে গিয়েছিলাম, তখন দেখেছিলাম, মানুষের মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা বা তার কাছাকাছি গ্রন্থিতে পৌছোতে গেলে ঠিক ওইরকম ইনসিশন দেওয়া হয়।

-তারপর?

আশুদা বলে চলে।

শুভঙ্করের শল্যচিকিৎসা সফল হলো না। বরং প্রাণসংকট ঘটল। অনুসন্ধানে তথ্য বলছে শহরতলির এক অখ্যাত নার্সিং হোমে তাকে ভর্তি করেন সবিতা। আইসিইউ তে ভালো হয়ে ওঠে ধীরে ধীরে। কিন্তু স্মৃতি লোপ পায় সামান্য। তাতে অবশ্য মঙ্গলই হয়। ডাক্তার সবিতা আগরওয়াল কখনও কোনও কাজ অর্ধেক করেন না।স্মৃতি থাকলে শুভঙ্করকে মরতে হতো।

কিন্তু কে হবে নতুন স্যাম্পেল কালেক্টর?বিদেশ থেকে, দেশ থেকে ডাক আসছে। আন্তর্জাতিক স্তরে নিদ্রাগবেষক হিসেবে নাম উঠে এসেছে ডাক্তার সবিতা আগরওয়ালের। সবিতা থামতে জানেন না। তিনি সাফল্য চান। তাই অবশেষে তিনি বেছে নিলেন তার নিজের ছেলেকে। শুভাত্রেয়। খুব মনোযোগ সহকারে সার্জারি সারা হল। শুভাত্রেয়র ক্ষেত্রে অপারেশন সফল হলো! ততোদিনে শুভঙ্কর সেরে উঠেছে। শুভঙ্করের তত্ত্বাবধানে শুভাত্রেয় নিখুঁতভাবে ধাপা ও চৌবাগা অঞ্চলে কয়েকটি স্যাম্পেল জোগাড় করল। পুলিশের খাতায় সেগুলি বেওয়াড়িশ লাশ হলেও আশুদা ময়নাতদন্ত খাতার পাতা উল্টে দেখেছে। প্রতিটি লাশের কপালে ত্রিনেত্র ক্ষতচিহ্ন আছে।

আবার থামলো আশুদা। তথাগতর মনেও হয়তো সেই প্রশ্ন ঘুরছিল যা আমার মনে ঘুরছিল। ডাক্তার সবিতা আগরওয়াল তো একজন মা! একজন 'মা' কীভাবে তার সন্তানকে এভাবে 'জন্তু'তে পরিণত করল? তথাগতর প্রশ্নে আশুদা বিচলিত হল না। ঘরের কেন্দ্রীয় গোল টেবিলে রাখা কালারস্ফিয়ারে আলো জ্বালিয়ে দিল বরং। ঘর সকালের রৌদ্রালোকেও ভরে উঠল বর্ণালী আলোয়। তারপর শান্ত স্বরে বলল।

-সভ্যতার যা চালিকাশক্তি, তাই হলো তার ধ্বংসের কারণ। সেই কারণ মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষা। ডাক্তার সবিতা আগরওয়ালকে তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা অন্ধ করে তুলেছিল। তাই সে তার মাতৃত্ব দেখতে পায়নি। এতোদিন জীববিজ্ঞানীরা যে তত্ত্ব পাঠ আমাদের পড়িয়ে আসছেন, তা আবার পুনঃপাঠের সময় এসেছে। মাতৃত্ব পিতৃত্ব এখন আর শুধুই জৈবিক উত্তরাধিকারের অধীনে নেই। সে এখন আধুনিক চলমানতার চাওয়া পাওয়ার বস্তুতন্ত্রে টিমটিম করে জ্বলা একটি মিসিংলিঙ্ক। নাহলে পরকীয়াগত বাবা মা তাদের সদ্যোজাতকে ভাগাড়ে ফেলে চলে যেতে পারত না। যাক সে কথা।

আশুদা বলে চলে।

শুভাত্রেয় সবিতার স্বপ্ন পূরণ করল। একটি পদ্ধতির পরিবর্তন করলেন সবিতা। দত্তপুকুরে স্টোরহাউজ কেনা হল পুলিশের চোখে ধুলো দিতে। 'নিদ্রা' অ্যাপে নিয়মিত লগ ইন করতে থাকা ছেলে মেয়েদের প্রোফাইল ঘেঁটে ভিক্টিম বেছে নিতেন সবিতা। উদ্দিষ্ট দিনে সেই ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট কোনও জায়গায় আসতে বলা হতো একটি নির্দিষ্ট সময়ে। তার আগে শুভঙ্কর সেই জায়গাটি দেখে আসত সরেজমিনে। কোথায় সিসি ক্যামেরা আছে, পুলিশ থানা, লোকবসতি এইসব। আমার তদন্তে নামার পর প্রথম যে মণিপুরী মহিলাটিকে খুন করা হয়, তার হত্যার জায়গায় সেই কারণেই কোনও সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি। এদিকে কলকাতা পুলিশ তাদের তৎপরতায় 'নিদ্রা' অ্যাপ হ্যাক করে দেখেছে, ভিক্টিমদের প্রত্যেকেই সেখানে নথিভূক্ত ছিল। তাদের কেউ কেউ অস্মিতা সম্পর্কে বিশেষ আগ্রহও প্রকাশ করেছিল। কিন্তু লেক টেম্পল রোডে সোহরাবের আকস্মিক চলে আসা, প্যালিনপশিয়া রোগ থাকার কারণে তার দৃশ্য মস্তিষ্কে ধরে রাখার ক্ষমতা সবিতা আগরওয়ালের জানা ছিল না। সবিতার সঙ্গে পুলিশ সূত্রে জানতে পেরেছি, আফগানিস্তান ও থাইল্যাণ্ডের দুই মাদক ত্রিকোণ, যাকে বলে 'গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল', তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল। তাই তার শাখাপ্রশাখাও বিস্তৃত হয়েছিল অনেকটাই। সোহরাবের কথা তাই থানা থেকে সবিতা আগরওয়াল সহজেই জেনে গেলেন। পুলিশি তৎপরতা, তথাগতর কাজকর্ম আর শেষমেশ আমার এই অনুসন্ধানে জরিয়ে পড়া, কিছুই তার অজানা থাকল না। ফলত তাকে কিছুদিন অনিচ্ছাসত্ত্বেও সংযত হতে হলো। এরই ভিতর কলামন্দিরে অনুষ্ঠানে আমার সঙ্গে সরাসরি দেখা হল সবিতা। সবিতা ভয় পেয়ে গেলেন। তাই আমাকে আর অর্ককে ডেকে পাঠালেন। অর্ককে সামান্য ধন্দ দেখিয়ে আমাকেও একটু বিচলিত করতে চাইলেন। এদিকে ভিতর ভিতর 'অস্মিতা'র সরবরাহ কমে আসছিল। আমি আর অর্ক দত্তপুকুরে নিজেরা গিয়ে দেখে এসেছি সেই বিপুল চাহিদার সামনে ধুঁকতে থাকা সরবরাইকারি স্টকিস্টদের মুখ। এর ভিতরেই ঘটে গেল আশ্চর্য এক ঘটনা। সোহরাব 'নিদ্রা' অ্যাপে যোগ দিল। এ যেন মেঘ না চাইতেই জল। বাকিটুকু সোহরাব বলুক।

দেখলাম সোহরাবের দুই চোখে জল টলটল করছে। দুটো চোখই জবা ফুলের মতো লাল। সে চোখ মুছে বলল।

-আমার এই রোগ। এক দৃশ্য বারবার ভাসতে থাকে চোখের সামনে। চেষ্টা করলেও সরে না। লেক টেম্পলে রোডের হত্যাকারীর হুডে ঢাকা মুখের ঝলক আমার চোখের সামনে ভাসছিল বারবার। ফলে ঘুম উড়ে গেল আমার। এক শিল্পী বন্ধু বলল, 'নিদ্রা' অ্যাপের কথা। যোগ দিলাম। ধাপে ধাপে পেলাম 'অস্মিতা'র খোঁজ। ওরাই আমাকে বলেছিল টলিপাড়ায় যেতে। আমি টাকা অনলাইনে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু যেদিন যাবার কথা, মাথা তুলতে পারছিলাম না কিছুতেই। মধুরা আমার সঙ্গে ছিল। আমরা একসঙ্গে 'ভাসান' নিয়ে একটা সেট সাজাচ্ছিলাম। ও বলল,"তোমাকে যেতে হবে না। আমি যাচ্ছি।" আমি রাজি হয়ে গেলাম। এখন ভাবছি, কেন রাজি হলাম?সেদিন, মধুরা নয়, আমার থাকার কথা ছিল ওইখানে! একবারও ভাবিনি এই 'নিদ্রা' অ্যাপের সঙ্গে এই সিরিয়াল খুনের যোগ রয়েছে। তাই মধুরার মৃত্যুর পরেও ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। গিয়েছিলাম কুমোরটুলি!কাজের ফাঁকে ঘাটের দিকে আসতে বলেছিল অ্যাপ। সেদিন আশুদা না থাকলে...

সোহরাব ভেঙে পড়ছিল। আমি সামাল দিলাম। আশুদা বলল।

-যেদিন সবিতা আগরওয়ালের বাড়ি আমরা গেলাম আমার সন্দেহ হয়েছিল শুভাত্রেয়কে নিয়ে। সর্বানন্দ যখন বলল শুভাত্রেয় নামে কেউ বাঙ্গালোর ঢোকেনি, আর সবিতা আগরওয়ালের বাড়ি সিল করা রয়েছে, তখন বুঝলাম আমার সন্দেহ ভিত্তিহীন নয়। সবিতা আগরওয়াল শুভাত্রেয়কে সন্দেহতালিকা থেকে সরাতে চাইছিলেন। পারলেন না।

আড্ডা ভাঙার সময় হলো অবশেষে। মনসুরকে আলাদা করে ধন্যবাদ দিল আশুদা। সত্যিই মনসুর না থাকলে গতকাল কী যে হতো। তথাগত বলল,"শুভঙ্কর শাসমল কিন্তু এখনও নিখোঁজ। আমরা যাদির গ্রেপ্তার করেছি, সারারাত জেরা করে দেখেছি, কেউ কিছু বলছে না।"

আশুদা ভেবে বলল,"শুভঙ্করকে পেয়ে যাবে খুব শিগগির। তবে ওর বয়ান আমরা আর পাবো বলে মনে হয় না। মন বলছে, ও আর বেঁচে নেই।"

-আর একটা খবর আছে আশুদা। রাতে আপনাকে বিরক্ত করিনি।

-বলো।

-ডাক্তার সবিতা আগরওয়ালের কাল রাতে ম্যাসিভ সেরিব্রাল হেমারেজ হয়েছে। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের পরিমাণ এতোটাই বেশি যে আমাদের ডাক্তারবাবুরা বাঁচার আশা ছেড়েই দিয়িছেন। গতকাল রাতে বাঙ্গুর হাসপাতালে ওনার সার্জারি হয়েছে। এখন অচৈতন্য। আইসিইউ তে।

-হাউ প্যাথেটিক। তবে ওঁকে বাঁচানোর সবরকম চেষ্টা করো। ওঁকে বাঁচালে আন্তর্জাতিক মাদকপাচারচক্রগুলোর সন্ধান পেয়ে যাবে তোমরা। ঘুম আর স্বপ্নের পিছনে দৌড়াচ্ছি আমরা সকলে। আর সেই দৌড়কেই জ্বালানি করে কেউকেউ তাদের স্বার্থসিদ্ধি করছে! আর একটা কথা...

-কী আশুদা?

হঠাৎ আশুদার চোখে সেই পুরাতন বিপন্ন পিতার দৃষ্টি ফিরে এসেছে। এই দৃষ্টি দেখেছিলাম যখন দিনের পর দিন আশুদা ঋকের বিচার চাইতে বেনিয়াপুকুর থানায় ছুটে যেত। আশুদা বলল।

-শুভাত্রেয়কে তোমরা কষ্ট দিও না। ও নির্দোষ। ও যা করেছে, ওর রোগ ওকে করিয়েছে। ওকে ঘুমের ওষুধ দিয়ে শান্ত করে রেখো। প্রয়োজনে আমাকে ডেকো।

-ঠিক আছে আশুদা।

সকলে চলে গেলে আশুদা আবার ফোটোমিটারের সামনে বসে পড়ল। আমি আশুদার কথা মতো ছুটি নিয়েছি। কী করব সারাদিন?ত্রিনেত্র রহস্যর তো সমাধান হলো। অতঃ কিম? আশুদা মন দিয়ে ফোটোমিটার দেখতে দেখতে বলল, "ক্ষিদে পেয়েছে বুঝলি।ক্ষিদে পেলে মাথা কাজ করে না। দুটো বিপরীতগামী রঙের আলোর কম্পাঙ্ক কিছুতেই মেলাতে পারছি না।কী যে করি। চল খেয়ে আসি কোথাও। তারপর একবার অত্রির বাড়ি যাব। ওদের ফোন করে দেখ। সুচন্দ্রা মেয়েটা কেমন আছে কে জানে!"

আমিও আশুদার কথা মতো কাজে লেগে পড়লাম।     

(ক্রমশ)

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন