কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১৩৮

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১৩৮

রবিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬

শিবাংশু দে

 

মান্নাম্যানিয়া অথবা অপূর্ব প্রেমের রাগ ভাটিয়ার


 

আজ বেঁচে থাকলে তাঁর শরীরের বয়স হতো একশো ছয় বছর। কোনও চর্চা-বিশ্লেষণ করবো না, শুধু স্মরণটুকুই লিখে রাখি। 

ভার্সাটাইলের বাংলা 'বহুমুখী'। ব্যপ্তিটা ঠিক ধরা যায় না এই প্রতিশব্দে। ভারতীয় সঙ্গীত ও তার বৈচিত্র্যের ব্যপ্তিকে আকাশ বা সমুদ্র কোনও প্রতীকেই যথেষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। তিনি ছিলেন সেই নীহারিকাপ্রতিম ব্যাপ্তির অলখ নিরঞ্জন। কতো রকম গান, কতো ভিন্নমুখী, কতো ভিন্ন পারদর্শিতার মাইলফলক অর্জন করে গেছেন সারাজীবন। শুধু নিজের জন্য নয়, আমাদের মতো নির্গুণ শ্রোতাদের হাত ধরে পৌঁছে দিয়েছেন তাঁর ভালোবাসার রাজপ্রাসাদে। মুগ্ধতার কোনও যুক্তি হয় না। তাই মুগ্ধতা এতো আনন্দ দেয় মানুষ'কে। যুক্তি আমাদের সহজ'কে চেনায়। অনিবার্যকে গ্রহণ করতে প্রেরিত করে। যুক্তির তাড়না সহজসত্য'কে প্রতিষ্ঠিত করে দৈনন্দিন দেওয়া নেওয়ার নশ্বর জগতে। কিন্তু যেভাবে মানুষের মৃত্যু হলেও মানব থেকে যায়, সেভাবেই দাতা বা গ্রহীতার মৃত্যু হলেও মুগ্ধতাটি থেকে যায়। মানুষের সভ্যতায় বিস্ময়বোধ প্রধান চালিকাশক্তি আর মুগ্ধতাবোধ শেষ অর্জন। তিনি আমাদের মুগ্ধ করেছেন, করে চলেছেন কতোদিন ধরে। একজন শিল্পীর এর থেকে বড়ো সার্থকতা আর কী হতে পারে? এই অপূর্ব প্রেম বিধাতা যাঁদের নসিব করেছেন তাঁরা ধন্য। তাঁরা কেউ শিল্পী, কেউ শ্রোতা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অলীক সীমারেখাটি অদৃশ্য হয়ে যায়। কে রাজা, কেই বা ভিখারি, কে তার খোঁজ রাখে? আমি এমন একটা প্রজন্মের মানুষ যারা নসিব করে এই সব শিল্পীর অর্জিত পুণ্যের ছায়ায় বড়ো হয়েছে। আমরা কৃতজ্ঞ।

অজয় চক্রবর্তী একবার একটি আড্ডায় বলেছিলেন, তাঁর একটি অনুষ্ঠানে মান্না দে গান শুনতে এসেছিলেন। শেষ হবার পর তিনি অজয়বাবুর কাছে এসে বলেন, “এ জন্মে তো গানটা শেখা হলো না, পরের জন্মে আপনার মতো কারুর কাছে বসে গানটা একটু শিখতে হবে”। তখন অজয়বাবু তাঁর পা ছুঁয়ে বলেন, আজকের অজয় চক্রবর্তী গান শুরু করেছিলো মান্না দে'র অনুকরণ করতে করতেই। শ্যামনগর থেকে কলকাতা, তাঁর প্রাথমিক পরিচয় তৈরি হয়েছিলো, 'ঐ যে ছেলেটা, ভালো মান্না দে'র গান গায়' এই ভাবেই। সারা ভারতবর্ষে কতো লক্ষ গাইয়ে যে ‘মান্নাদা'কে বিগ্রহ বানিয়ে সঙ্গীতচর্চা শুরু করেছেন বা সারাজীবন ধরে তাঁর প্রতি সেই একই মাত্রার শ্রদ্ধা নিয়ে মজে রয়েছেন, তার বোধহয় কোনও ইয়ত্তা নেই। জগজিৎ সিং, সুরেশ ওয়াডকর, যীশুদাস, উস্তাদ আমজাদ আলি খান, কীভাবে ‘মান্নাদা'র গুণমুগ্ধ, তার কিছু পরিচয় ব্যক্তিগতভাবে দেখেছি।

মান্না দের গান অনেকের মতই, ব্যক্তি আমার সঙ্গীতচিন্তার অনেকটা জায়গা অধিকার করে রাখে। ওঁর গাওয়া বাংলা ও হিন্দি গান, যা বাজারে পাওয়া যায়, প্রায় সবই আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে। এছাড়া রয়েছে ওঁর কয়েকটি অনুষ্ঠান, আমার নিজস্ব টেপ করা সংগ্রহ। কখনো সময় সুযোগ পেলে শুধু ওঁর গান নিয়ে কিছু লেখার ইচ্ছে রইলো। আসলে অনেক কিছুই লেখার আছে, তাই সেই সব গান নিয়ে কোনও প্রস্তুতিহীন আলোচনায় যাবার ধৃষ্টতা করতে পারি না।

শুধু কিছু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ। ছোটোবেলা থেকেই অনেকের মতো ওঁর গান নকল করার চেষ্টা করেছি। সে তো শিব গড়িতে বাঁদরই হতো। কিন্তু বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে একটা উৎসাহব্যঞ্জক পরিহাস কাজ করতো। এভাবেই একটা একটা প্র্যাক্টিক্যাল জোক বাজারে ছড়িয়ে পড়ে, মান্না দে, শিবাংশু দের সম্পর্কে জ্যাঠা। যে সব বন্ধু লেগ পুল করতে এইসব রটনা করেছিলো তারা আবিষ্কার করে গুজবটি বেশ গভীরে চলে গেছে। কলেজে পড়তে অবাঙালি বন্ধুরা একেবারে কনভিনস্ড ছিলো যে ব্যাপারটি সত্যি। এর ফলে যেকোনও অবকাশেই, যেখানে আমি উপস্থিত আছি, 'কানু ছাড়া গীত নাই' গোছের একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়ে যায়।

'আমাদের দেশের সাধারণ শ্রোতারা, অন্যান্য দেশের শ্রোতাদের মতই 'ন্যাচরাল' গায়কদের অধিক পক্ষপাতী। হেমন্ত, কিশোর, মুকেশ। কিন্তু এমন সফিস্টিকেটেড সাঙ্গীতিক ক্ষমতা আর তৈয়ারি নিয়ে সাধারণ শ্রোতাকে বেঁধে রাখার ক্ষমতা এদেশে মান্না ছাড়া আর কেউ দেখাতে পারেননি। এখনও তাঁর নাম মানুষের মনে কী ধরনের উন্মাদনা আনে তা আমি দেখেছি। হায়দরাবাদেও যেকোনও অনুষ্ঠানে আমার কাছে শুধু মান্না দের গান শোনানোর আদেশ আসতো। সে ফর্ম্যাল বা ইনফর্ম্যাল, সব রকম পরিস্থিতিতেই। গত বেশ কিছুদিন ধরে নববর্ষ, বিজয়া সম্মেলনী জাতীয় যেসব অনুষ্ঠানে গাইতে হয়েছে, সব জায়গাতেই শ্রোতারা সমস্বরে মান্না দের চল্লিশ পঞ্চাশ বছর আগে গাওয়া গান শুনতে চেয়েছেন। কোনও কটাক্ষ না করে বলি, আজকের বাংলা গানে এমন কি কোনও পারফর্মার আছেন যাঁর গান দশ বছর পরেও কেউ শুনতে চাইবে?

শেষ যে অভিজ্ঞতাটি হয়েছিলো হায়দরাবাদের বৃহত্তম বাঙালি প্রতিষ্ঠান, বঙ্গীয় সংস্কৃতি সঙ্ঘের বিজয়া সম্মেলনিতে। খুব ব্যস্ত ছিলুম অফিসে সেদিন। বাড়ি না ফিরেই অফিস থেকে সোজা পৌঁছেছিলুম সেখানে। কিন্তু পৌঁছোতেই সব্বাই মান্না দে শোনানোর জন্য যে রকম আদেশ করতে থাকলেন, আমি নেহাৎ অপ্রস্তুত। ওঁর গান গাওয়ার আগে একটা ন্যূনতম প্রস্তুতি লাগে। এভাবে হয় না। একটু বিরক্তই লাগছিলো। কিন্তু হঠাৎ মনে হলো এঁরা তো আমাকে শুনতে চাইছেন না, এঁরা 'মান্না দে'র গান শুনতে চাইছেন। নববর্ষে, বিজয়া সম্মেলনীতে বাঙালিরা মান্না দে শুনবেন না তো কীই বা শুনবেন! খোদ পশ্চিমবঙ্গের হালহকিকৎ জানি না, তবে প্রবাসের বাঙালিরা তো এখনও মান্না দে'র নামেই কসম খেয়ে থাকেন।

বিজাতীয় কামিজ পাৎলুনে, অফিসের পোষাকে স্টেজে। আমার একান্ত সঙ্গী 'পাকড়াশি বাবু কা পেটি' সঙ্গে নেই। তবে গুরুকে স্মরণ করে প্রথম কলেজ জীবনের গানটি, 'ও কেন এতো সুন্দরী হলো'। কী গাইলুম আমি নিজেই ভালো জানি, কিন্তু শ্রোতারা রীতিমতো হর্ষিত। তারপর একজন প্রবীণ শ্রোতা এসে আদেশ করলেন, আমি যেন 'আমার না যদি থাকে সুর' শোনাই তাঁকে একবার। এই গানটির সঙ্গে একটু সজল অনুষঙ্গ রয়েছে আমার। আমার এক ঘনিষ্ট বন্ধুর মা যখনই দেখা হতো, এই গানটি আমার থেকে শুনতে চাইতেন। অকালে দেহাবসান হয়েছে তাঁর। এই গানটি তাঁর স্মৃতির সঙ্গে ওতোপ্রোত হয়ে আছে। গানটি খুব সহজ নয়। মন্দ্র থেকে তারায় সুরের প্রচুর যাতায়াত। কিন্তু তবু অক্ষম চেষ্টা ছিলো কিছু।

এই অভিজ্ঞতা আবার আমাকে শেখালো, মানুষ শুনতে চাইছেন মান্না দের গান, আমার ভূমিকা শুধু তাঁদের স্মৃতিটিকে ট্রিগ্যার করা। আমার মূল্যহীন গান তাঁদের নিয়ে যাচ্ছে মান্না দে নামের একটা সুরের সমুদ্রের কাছে, এইটুকুই সন্তুষ্টি আমার।

বড্ডো বেশি 'আমি' প্রসঙ্গ এসে গেলো। বন্ধুরা মার্জনা করবেন। আসলে মান্না দে'কে নিজের অস্তিত্ত্বের থেকে আলাদা কোনও সন্দর্ভ হিসেবে ভাবিনি কখনও। তাই এই আত্মনাম বারবার, গর্হিত অভ্যেসটি লেখার মধ্যে চলে আসে। পঞ্জিকার একটা তারিখ তাঁর জন্মদিন। কিন্তু তিনি প্রতিদিনই আমার জন্য জন্ম নেন গান হয়ে, সুর হয়ে, আবহমান প্রতিশ্রুতি হয়ে। অন্তত আমার জন্য তিনি এক নৈসর্গিক স্নিগ্ধ মাত্রা। হয়তো তাঁর গান শোনার জন্যই আরো দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে লোভ হয়। "মানুষের মতো ক্ষোভময় বেঁচে থাকা।"


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন