কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১৩৮

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১৩৮

রবিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬

অঁতোনাঁ আর্তোর কবিতা

 

প্রতিবেশী সাহিত্য

অঁতোনাঁ আর্তোর কবিতা

(ভূমিকা ও ভাষান্তর: গৌরাঙ্গ মোহান্ত)

 


কবি পরিচিতিঃ অঁতোনাঁ আর্তো (১৮৯৬১৯৪৮) ফ্রান্সের মার্সে শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর অভিনেতা থেকে কবি ও প্রাবন্ধিক হয়ে ওঠার দক্ষতা সুবিদিত। তিনি স্বল্প সময়ের জন্য পরাবাস্তববাদ (Surrealism)-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং কিছুদিন এর পরীক্ষামূলক ড্রিম সেন্টারএর দায়িত্বও পালন করেছিলেন। ১৯২৯ সালে, রবার্ট দেশনোর সঙ্গে তাকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। প্রাথমিক পর্বের একটি প্রবন্ধে তিনি “নিষ্ঠুরতার থিয়েটার (theatre of cruelty) এর ধারণা প্রকাশ করেনযেখানে অংশগ্রহণকারীরা সমাজের কোনো কৃত্রিম রীতিনীতির ওপর নির্ভর করবে না; বরং অঙ্গভঙ্গি, দৈহিক চলন ও অন্যান্য প্রাক্ভাষিক সংকেত ব্যবহার করবেন। 'বুর্জোয়া' ধ্রুপদি থিয়েটারের পরিবর্তে নিষ্ঠুরতার থিয়েটারের মাধ্যমে তিনি মানুষের অবচেতনকে মুক্ত করতে এবং মানুষেকে নিজের কাছে উন্মোচিত করতে চেয়েছিলেন।

সভ্যতার বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক রচনার জন্য তাঁর কাজ প্রায়ই সেন্সরের শিকার হয়। তাঁকে সমাজের দৃষ্টি থেকে দূরে সরিয়ে রাখার ব্যবস্থাও গৃহীত হয়। আঠারো বছর বয়সে প্রথম মার্সের একটি মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্রে অন্তরিন হওয়ার পর, জীবনের শেষ পর্বে তিনি হোদেজের (Rodez) একটি আশ্রয়কেন্দ্রে নয় বছর অতিবাহিত করেনযেখানে তাঁকে বারবার শক থেরাপি প্রদান করা হয়। হোদেজ (Rodez) থেকে লেখা একটি পত্রে আর্তো জানিয়েছিলেন, অন্যের জাদুকরি কারসাজিতেই তিনি এমন এক পৃথিবীতে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন, যার সঙ্গে তাঁর কোনো আত্মিক সম্পর্ক নেই; আবার এই পৃথিবী থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথ সৃষ্টি করতে একই সমাজ তাঁকে জাদুর মতো বাধা দিয়েছ । তিনি উল্লেখ করেন তাঁর কাছে কবিতা কোনো শৈল্পিক বিলাস নয়, বরং অস্তিত্বের শর্ত। তিনি কবিতাকে নিজের চারপাশে, জীবনের ভেতরে দেখতে চেয়েছিলেন। এই আকাঙ্ক্ষার মূল্য তাঁকে দিতে হয়েছে চরমভাবেপাগলাগারদে বন্দিত্ব বরণের মাধ্যমে। কবিতাকে তার স্বাভাবিক, দেহগত অবস্থায় বাস্তবায়িত করতে চাওয়াই ছিল তাঁর অপরাধ। মুক্তি পাওয়ার পর তিনি আশ্চর্য সৃজনশীলতায় উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠেন এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাঁর বক্তব্য বিস্তৃতভাবে লিপিবদ্ধ করেন; মানসিক যন্ত্রণায় ক্লিষ্ট হয়েও তিনি নিজের সত্তা ও ভাষার ভেতরে অলৌকিক শক্তির অস্তিত্ব অনুভব করেন। প্যারিসের লেখক ও শিল্পীদের কাছে তিনি গভীর শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। তাঁর প্রধান রচনার মধ্যে L’Ombilic des limbes (১৯২৫), Le Pèse-nerfs (১৯২৫), Le Théâtre et son double (১৯৩৮), Van Gogh et le suicidé de la société (১৯৪৭), Pour en finir avec le jugement de Dieu (১৯৪৮) উল্লেখযোগ্য।

 

বিরামহীন ভালোবাসা

এই তৃষ্ণার্ত জলের ত্রিভুজ,

এই লিখনহীন পথ,

ম্যাডাম, আর এই সমুদ্রে, আপনার মাস্তুলগুলোর দৃশ্য,

যেখানে আমি ডুবে যাচ্ছি।

 

আপনার চুলের সমূহ বার্তা,

আপনার ঠোঁটের বন্দুকের গর্জন,

এই ঝড় আমাকে তুলে নিয়ে যায়

আপনার চোখের জলরেখায়।

 

শেষে তটরেখায় এই ছায়া

যেখানে জীবন একটু বিরতি নেয়, আর বাতাসও,

আর আমার চলার পথে

ভিড়ের সেই ভয়ংকর পদদলন।

 

যখন আমি আপনার দিকে চোখ তুলে তাকাই,

মনে হয় পৃথিবী কেঁপে ওঠে,

আর প্রেমের বহ্নি

আপনার প্রিয়জনের স্পর্শের মতো অনুভূত হয়।

 

মমির প্রতি আহ্বান

অস্থি ও ত্বকের নাসারন্ধ্রগুলো

থেকে আরম্ভ হয় অসীমের অন্ধকার,

আর সেই রঞ্জিত ঠোঁটগুলো তুমি পর্দার মতো টেনে বন্ধ করো।

 

স্বপ্নে জীবন তোমার ভেতর সুবর্ণ পুরে দেয়

জীবন তোমাকে অস্থিশূন্য করে,

এ অলীক দৃষ্টির ফুলগুলোর

ভেতর দিয়ে তুমি আলোর সঙ্গে পুনর্মিলিত হও।

 

মমি ও চক্রাকৃতি, সূচালো হাতগুলো,

যেন তোমার অন্ত্র-অঙ্গপ্রত্যঙ্গ উলটে-পালটে দিতে উদ্যত।

 

সেই হাতগুলোর ভেতরে ভয়াবহ ছায়া পাখির রূপ ধারণ করে।

 

এসব দিয়েই মৃত্যু নিজেকে অলংকৃত করে,

যেন এক আকস্মিক আচার;

ছায়াদের এই ফিসফিসানি,

আর সেই সুবর্ণের ভেতর তোমার কালো অন্ত্রগুলো সাঁতার কাটে।

 

এ পথ ধরেই আমি তোমার কাছে পৌঁছাই,

শিরাগুলোর দগ্ধ পথ বেয়ে;

আর তোমার সুবর্ণ আমার যন্ত্রণার মতো

সবচেয়ে ভয়াবহ ও সবচেয়ে নিশ্চিত সাক্ষী।

 

 

 

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন