কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১৩৮

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১৩৮

রবিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬

রাজর্ষি কুন্ডু

 

সমকালীন ছোটগল্প


প্রতিদিন একদিন কতদিন

আমরা সত্যই বুঝতে পারি না অন্যরা আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন; এই মাত্র যা ছিল সূর্য্য, বিজলি, নিম্নচাপ, আম্র-বকুল, সামান্য তামাশা, ভগবান আর না করুণ রইলো খালি কন্ঠ বিকৃতি আর এত বিশদ গোঙানি, আমাদের নিঃশ্বাসের স্বর আর আমরা উপেক্ষা করতে পারি নাই, ভগবানের বিচিত্র লীলায় আমাদের ধৈর্য্যের প্রান্ত দেখা যায়, শিশুরা দিগন্ত আঁকতে শিখেছে রাক্ষসের ভয়ে ও ভয় থেকে বাঁচতে।

শুরুতেই দূর্ঘটনা ঘটে যেত। হরিপালে এক পরিবার ট্রেনে উঠতে গেছে, বাপটা উঠে পড়েছে, অমনি ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে, মেইন লাইনে শুরুর সাথে সাথে এক্সেলেরাশন নেবে, মেয়েটার হাত ধরে টেনে তুলতে গ্যালো, বউ তখনও প্লাটফর্মে ছুটছে, ভাগ্যিস মেয়ের হাতটা বাপ ছেড়ে দিয়েছে ট্রেন স্পিড তোলার আগেই! ভেতরে হকারেরা বলছে আপনি ওমন করে ছেড়ে দিলেন! টেনে তুলতে হয়! লোকটা হঠকারিতাতেও নিজের দূর্বলতা ভুলে যায়নি। টেনে তোলার ক্ষমতাই তার ছিল না। সকাল আমি শুরু করেছি হালকা চিনি দেওয়া লিকার চা আর দুটো থিন এরারুট বিস্কুট দিয়ে। তখন জয়ন্তী কাকিমার ওপর মোছা হয়ে গ্যাছে। পুটুস নীচে বিস্কুট খাচ্ছে। ওর একেকদিন একেক মতি। আজ ছুটির দিনেও অফিস যেতে হবে! অন্যদিন হলে হাজার প্রতিজ্ঞার পরেও নড়ে যেতাম। আজ বই কেনার দিন। আজ বৃষ্টিতে সাদা হয়ে গেলেও, যাবো। আমি গোয়েন্দা হলে লোকটাকে ফলো করতাম। মেয়ে, বউ উঠতে পারলো না তার কোনো উত্তাপ নেই, চুপচাপ দরজায় দাঁড়িয়ে বিড়ি ফুঁকে যাচ্ছে। বউয়ের এই শাড়ি তো ট্রেনে তার  স্বামীকে তুলতে আসার না! মেয়ের মাথায় প্রজাপতি ক্লিপ। জলযাত্রীর চ্যাংড়াগুলো গাঁজা খেয়ে আউট কখন লোক উঠছে ওদের পায়ে মাড়িয়ে কোনো বিকার নাই গরুদের মতো চোখ খুলে শ্বাস ছেড়েই আবার ব্যাক টু ঝিমুনি। কিন্তু, অপরাধীদের বিপক্ষে নই, আমি। মহাভারতে ভগবান  অপরাধ আটকানোয় যে  ছল রচনা করেছেন তা যুদ্ধের পক্ষের, তিনি মাফ করেছেন শিশুপালের একশত অপরাধ, আল্লাহ শয়তানকে পাঁচলক্ষ বছরের ইজারা দিয়েছেন, কবে কেয়ামত আসবে সেদিন তার বিচার। মানুষের ইতিহাস বেইমানির ইতিহাস, মানুষের ইতিহাস ষড়যন্ত্রের ইতিহাস। সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ কী, নারী নিগ্রহ, প্রাণী হত্যা, থাক! এ লোক খুব জোর পরকীয়া করবে। লোকটা একটা অদ্ভূত কোণে, ট্রেনের, দাঁড়িয়ে আছে যেখানে অন্ধকার সর্বোচ্চ, নিলয়দা আমার ছোটবেলায় মেয়ে, আনন্দ, মাধ্যমিকের নাম্বার নিয়ে যে যে ইনফেরিওরিটিগুলো পরে আমায় বললো, হাসাহাসি করেই, এই লোকও নিলয়দাদের থিওরিতে তাই, যে লোক ইনফিরিওরিটি লোকাচ্ছে না সে বুদ্ধিমান, নিলয়দাদের সমস্যা আছে, এই লোক তার ছেঁড়া ক্যাম্বিসের জুতো কায়দা করে আড়ালে রেখেছে যেন তার পা পবিত্র পাঁকে ডুবে আছে গোড়ালি ছাড়িয়ে অথচ তার বাকি পায়ে স্পষ্ট ভক্তি নয়, ভয়। পাঁচ বছর আগে হলে ওকে ফলো করতে শ্রীরামপুর স্টেশানে নেমে যেতাম ওর পিছু পিছু। নিলয়দা আমায়, জিনাকে ডিরেক্ট বললো দীপেন্দ্রনাথের ‘অশ্বমেধের ঘোড়া’ পড়, বললো অপূর্ব, সিদ্ধার্থদের বলিস। আমি আকাশে কিঞ্চিৎ মেঘ, তুমিই ডাইরেক্ট বলো না ক্যানো, এরা ‘অশ্বমেধের ঘোড়া’ আমার আবিষ্কার ভেবে নিজেদের পিছিয়ে পড়া লোকাতে আবার দশটাকার ঢং চোদাবে! আমি অবশ্য নিলয়দাকে বলিনি যে গল্পটা আমার পড়া, দীপেন্দ্রনাথ আমাদের পড়তে বলেছিল পূর্বাশা সরকার, সিদ্ধার্থর মনে থাকতে পারে তাঁকে, তিনি আমাদের কলেজের কমিউনিকাটিং ইংলিশ পড়াতেন, আমাদের ফার্স্ট ইয়ার শেষ না হতেই কলেজ ছেড়ে দিয়েছিলেন। এখনও আমার তাঁকে মাঝে মাঝে দেখতে ইচ্ছে করে, একটু গল্প করতে ইচ্ছে করে। তাঁর ঋজু পিঠের ওপর যে সুদৃশ্য চুল, আমি ধরে নিই তিনি মন দিয়ে কথা শুনবেন আমার তখন আমি কিছুই জানতাম না, বুঝতাম না সেই ফার্স্ট ইয়ারে। সিদ্ধার্থর মনে না থাকলেই বা, নিলয়দাদের হাজারটা ভালর মধ্যে হাজারটা খারাপ পাওয়া সম্ভব, সিদ্ধার্থকে বলতেই বললো তুমি কারো এসোসিয়েশানে থাকতে পারো না। একটা সত্যি চাপা দিতে দুতিনটে আলাদা সত্যিও লাগতে পারে, সত্যর এই এবসার্ডিটির প্রতি মানুষ প্রশ্নহীন, আমি মনে করি কৌতুহলহীন অনুগত্যতা। নিলয়দা হলে পাক্কা জিগ্যেস করতো এই এই এবসার্ডিটি বললে মানে কী? এবসার্ডিটির মানে হলো স্বেচ্ছাচারিতা বা পবিত্রতা বা ইমানুয়েল কান্টের বয়ানে ‘সিন্থেটিক এ প্রায়রি’। সিদ্ধার্থকে সিগারেট অফার করেছিলাম। (মনে মনে) বলেছিলাম লেওড়ার মত মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ো!


নিলয়দার থেকে আমি দূরে থাকতে চাই। তিনি যে কালচারাল লাইনে দিন চালান মানে এই আমি ও  অন্যরা টাইপ, সেখানে গুরুমারা বিদ্যা শেখা আমি কোনোদিন তাঁকে জিজ্ঞেস করিনি, কাক্কু এই যে বললেন এনাটমি, এই যে বললেন ম্যাজিক, এই যে বললেন ক্যাওশ, না থাক! তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা, ভক্তি, অপছন্দের আড়ালে তাঁর প্রতিই একটা আনরিকুইটেড ভালবাসা আছে। জিনা তো আমাদের পাঠসশালায় বাকিদের থেকে একটু বুদ্ধিমান, সেও বোঝেনি। মেয়ে বলে তার প্রতি আমার প্রত্যাশা বেশী। জিনাকে এই প্রত্যাশার কথা প্রকাশ্যে বলিও। আমার বলার একাধিক কারণ আছে। কিন্তু, দেখি বলা শুরু ও শেষে জনা ও বাকিরা দাঁত বার করে হাসছে। একমাত্র জিনাকেই হাসলে একটু সুন্দর দেখায়। অবশ্য আমি কি মনে করি নিলয়দার থেকে জিনাদের আমিই ভাল ভিশান দেবো সমাজ, ইভেন রাজনীতি সম্পর্কে? তারা যদি এটা বুঝে থাকে তাহলে সঠিক বোঝেনি, মৃত্যুর আগের দিন অব্দি আমি নিলয়দার স্নেহ, সাহচর্যে থাকতে চাই। এরকমটা চাইতো অমিতাভ, তারপর সিনারিও থেকে সে ভ্যানিশ হয়ে গ্যালো! নিলয়দাকে দেখলাম নিরুত্তর, খানিকটা নিরূপায় ভাবে নির্লিপ্ত। সিদ্ধার্থের সাথে যোগাযোগ আছে অমিতাভদের, আমি বন্ধুত্ব জ্বালানো বা নেভাতে চাইনি কোনোদিন। জিনা বলে আমি নিলয়দাকে নকল করছি, জিনাকে বললাম তুমি বর্হেসকে নকল করতে চাওনা? মার্সেল প্রুস্তকে? নকল করতে চাওয়া অনেক সময় দিশার সন্ধান দেয়, জিনার আরো তলিয়ে ভাবা দরকার না! আমাদের মধ্যে সেই সবচেয়ে বেশী ইম্প্রেসিভ। আমি মনে করি আমার থেকেও বেশী। পূর্বাশা সরকারের অভাবটা আমি মাঝে মাঝে জিনাকে দিয়ে মিটিয়ে নিই? কিন্তু পূর্বাশাদির সাথে আমার দূরত্ব যেটা তো দুটো আলাদা মানুষের একই স্বপ্নের মধ্যের দূরত্ব! সেটা তো কোনো মেয়েকে আপনি বলে ডাকার দূরত্ব!  দিনটা জঘন্য যাচ্ছে, বুঝতে পারলাম বালি হল্টে দাঁড়িয়ে পা ব্যথা হয়ে যাওয়ার পর, গলা ছেড়ে কান্নার উদ্যোগ নিলেও দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, দাঁড়িয়ে আছি তেইশ এ বাসের অপেক্ষায়, এটা বালি ব্রিজের পুরানো রাস্তা ওপাশে নিবেদিতা ব্রীজের টোল, ওটা কত নাম্বার হাইওয়ে জানি না, তারপরে বালিহল্ট স্টেশান, এখানের ম্যাক্সিমাম স্পিড লিমিট চল্লিশ, আর আমি বালি- বেলানগরের সাথে গুলিয়ে একবার একশো ত্রিশ বলে দিয়েছি স্নেহাশীষ ধরে ফেলবে না, ওর একটা লক্ষ্য জীবনের আমার ভুল ধরা, স্টেশানের ওপাশে পাথফাইন্ডার কোচিং সেন্টার উঁকি মারছে হরিতকি গাছের আড়ালে, দেখা যায় তার ছাদের বিচিত্র এন্টেনা সব, আমাদের শৈশবের ক্লাস করতে আসা বিপ্র, শীর্ষেন্দুদের কথা মনে পড়ে, ওদের কথা আজ বলবো না, খালি একটা তেইশএ বাস খালি দেখতে পাচ্ছি না! ডান দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে আমি আর সোজা চাইতে পারছি না কি! আমার পাশে কাকুর মুখে শ্বেতি তার মুখের দিকে অন্তত  তিন মিনিট লক্ষ্য করে, তা বিরক্তি নাকি অবিশ্বাস নাকি সন্দেহ নাকি হতাশা নাকি বিদ্রুপ যতক্ষণ না তিনি আবার বিড়ি ধরালেন লাইটার জ্বেলে, আমি না ভেবে বসি তাঁর চশমার কাচে আমারই মুখ, একটা সিগারেট ধরাতে মুখটা ফের তেঁতো হয়ে গ্যালো, একটা দূরপাল্লা দাঁড়াতেই, আসছে মোহনপুর, এগরা থেকে, বাপরে এতো আরেকটু হলে উরিষ্যাই ঢুকে যায়,  সিগারেট ফেলে জিগাই নারকেলবাগান, বলতেই সে বলে না দাদা বাগুইয়াটি, কেষ্টপুর দিয়ে যাবো, ফিরে এসে দেখি সিগারেট জ্বলে যাচ্ছে, পাশের কাকা উঠে গ্যালো! কয়েকটা দূরপাল্লার বাস আসছে, হলদিয়া, খড়গপুরের দিক থেকে এরা কি কলকাতার ভেতরে লোক তোলে না! আজ আমার শাটলে যাওয়ার পয়সা লাই কয়েন টয়েন মিলিয়ে ক্যাশ সত্তর খুব জোড় একশোর একটু কম, ডিজিটালে নিতে ওদের একশো নকশা! বেসরকারী মিনিগুলোয় বাসে ছাদে মাথা ঠেকে ছাদে, বেশী লম্বা হবার একটাই সুবিধা মেয়েদের একটু নজরে পড়ে তাছাড়া কাল ওয়েদার ক্যামন যাবে জানতেও পারি না বেঁটে লোকেদের মতনই; বেকার বাসে, ট্রেনে বসতে কষ্ট; অন্তত ঘন্টা দেড় ঠায় রোদে দাঁড়িয়ে বাস আর নেই, বাস আছে কিন্তু ওতে আমি উঠবো না এরকম তিন চারটে বাস ছেড়েছি। দাঁড়িয়ে যাওয়ার এক পর্যায়ে মনে হচ্ছিলো বাদ দিই অফিস, নেহাত আজ বই কেনার দিন। সরকার কী কিছু ভাবছে আমাদের কষ্ট নিয়ে, বেসরকারি বাস মাফিয়াদের বাস আমায় চেনাতে হবে না, আমাদের তারকেশ্বরে দেখিনি আর! সংহতির সব বাস প্রাইম টাইমে, এই করে মা তারা উঠেই গ্যালো, শিবশক্তি তাদের রুটে বাস আদ্দেক করে দিয়েছে! মাননীয় সরকার, আপনি জনহিতকল্পে কিছু মাল্লু ছাড়ুন, আমরা যে রোদে দাঁড়িয়ে লইট্যা শুঁটকি হয়ে গেলাম, দক্ষিণে আবার কড়া মেঘ ধরেছে বৃষ্টি নামলে আজ কলেজ স্ট্রীট ক্যান্সেল, ফাক, বেরোলাম ক্যানো বে!
  বাসে উঠলামই, সরকারি না, ডানকুনি করুণাময়ী রুটের ফাঁকা একটু লেট হবে তবে কোমর ধরে গ্যাছে তো! সিদ্ধার্থরা স্নেহাশীষের নাম দিয়েছে মাস্টার! হাঃহাঃ! অপূর্ব, জিনা, রমেন প্রথমে কেউ বোঝেনি, সিদ্ধার্থই পরে নামকরণের মানে ব্যাখ্যা করলো, জিনা মাস্টার শুনেই মুখ চেপে হেসেছিল, তার সাথে স্নেহাশীষের বন্ধুত্ব বেশী, তাই কি সে বেশী চেনে তাকে?

কলেজে আমাদের দেড় বছরের মাথায় পূর্বাশা সরকার রিজাইন দেন। তারপরে আমাদের আলোচনায় ওঁকে পূর্বাশাদি বলে ডাকতে শুরু করি। সিদ্ধার্থেদের সাথে তখন আলাপ নেই। তবে ওকে চিনতাম আমাদের ডিপার্টমেন্টের সিনিওর কথাদির সাথে ওর কিছু একটা চলছিল। ওরা এক মিড সেম স্কিপ করে দার্জিলিং ও গ্যালো। আমি তখন হাফ সাহিত্যে, হাফ ক্রিকেটে একটা ডিলিউশানাল হ্যাপিনেশ মাথায় নিয়ে ঘুরছি, ক্রিকেট থেকে রোজগার উলুদার হয়ে খেললে পার ম্যাচ দেড়শো, সুকনা জিমখানার  হয়ে দুইশো, আড়াইশো, জিমখানার মালিক রোহিতদা আবার টূর্নামেন্ট জিতলে এক ক্রেট বিয়ার, যাও বাচ্চারা উদযাপন করো, তবে উলুদার ভালবাসার সাথে আমি অন্তত এগুলো গুলিয়ে ফেলি না। নুর্বাংযের টিমটার সাথে রুবাইদার সাথে আমার পার্টনারশিপটা, যখন আমি আউট হলাম তখন সাত রান বাকি দশ বল, সেখানে থেকে পাঁচ উইকেট ঝরে গ্যালো শরতের শিউলি ফুলের মতন। চামটা টি এস্টেটের টিমের এগেইন্সটে রাজার ওই মন্সটরাস ইনিংস। আমি, উলুদা সুকনা হস্পিটালের পেছনে বসলাম রক্সি নিয়ে সাথে ফ্রায়েড মোমো, ঘাসের বিছানায় আকাশের দিকে চেয়ে দেখি উল্কা। সুকনা ফরেস্টের টিমকে হারিয়ে আমারা তরাই কাপ জিতলাম, রোহিতদা বিয়ারের সমুদ্রে ভেসে গ্যালো, সেই নেশা থেকেই আমরা ফের সুকনা হসপিটালের পেছনে রক্সি নিয়ে। ঘাসের বিছানা থেকে আকাশে দেখি কমেট। আমি আমার প্রেম করার জীবন পার করে হাজার টক্সিসিটির কনভারসেসান, লওড়া, লসুন পার করে জয় পরাজয় নিয়ে উলুদার রক্সি কিনে বসা মনে করছি সামনে হুইস্কির সাথে সোডা, আরো সামনে অপু, আরো আরো সামনে কোনো মেয়ের সুন্দর পেছন, আমার নাকে ভেসে আসছে ঘুরে বেড়ানো স্পিরিটের ঘ্রাণ, অপুকে বলছি বর্ষায় রাম খেতে ভাল লাগে না? অথচ আজ আমি কোনো দিকচক্রবালের প্যাটার্নে পরে হুইস্কিই, আমার কানে ভেসে আসছে সেই বিশ বছর আগের সদ্য শোনা আল দ্য গ্লিটার্স আর নট গোল্ড, নাকে হুইস্কির ঘ্রাণ, মাথা ঝাঁকিয়ে দেখলাম নেশা কত? না পাবে বাজছে অন্য কোনো গান মনে রাখার প্রয়োজন নেই। পূর্বাশাদিকে আমি ট্র্যাক এখনও হাল্কা হাল্কা করি, স্কলারে, তাঁর ইউনিভার্সিটির পেজে, তিনি মেমরি স্টাডিজ, এডগার এলান পো নিয়ে কাজ টাজ করেন বলে এমন না, এসব ক্রিটিক্যাল হ্যাজে আমি নেই, আমি তো চাই উপন্যাস লিখতে, এটলিস্ট নভ্লেট, আমি আমার সব সফল বন্ধুদের ফলো করে দেখি আমার সাথে তাদের দূরত্ব আরো কতটা বাড়লো, কখন আমি একটা উপন্যাস ছাপিয়ে স্যাট করে তাদের ওভারটেক করে যাবো। সাহিত্যকে যারা আপন, যাপন, চৌকি ঠাপন বলে রেখে দিয়েছে আমি একটু আলাদা, স্যাটান আছি নাকি?  সাহিত্য আমার মত ম্যাদামুখোর জনপ্রিয় হয়ে ওঠার বাহন, পূর্বাশাদির সাথে যোগাযোগ করলে হয়তো রিপ্লাই পেতাম, এক্স স্টুডেন্ট তো আমাদের আস্কারা দিতেন, কিন্তু তিনি সেই দীপ্তার্ক বন্দোদের রিসার্চ গ্রুপের মেম্বার, আমার এই প্রফেসারগুলোকে মনে হয় এরা কবিতা, গদ্যে কায়দা করতে না পেরে গবেষণায় ঢুকলো, সেন্ট্রাল গভমেন্টের স্কিম, জীবনভর বুদ্ধিমতী, সুন্দরীদের গুরু হয়ে থাকা, আর কী চাই, বস! অপুকে এই কথাগুলোই রাঙিয়ে টাঙিয়ে বলছিলাম, অপু হাসছে মজা নিচ্ছে, মনে মনে আমার লেখা, চাকরী কেরিয়ারের ব্যর্থতা নিয়ে হাসছে, না হাসাটাই অনুচিত। কিন্তু, বন্ধু, তোমরা সবাই অশ্বমেধের ঘোড়া পড়লে, ওয়া ওয়া করলে পাঁচবার। কেউ তো শেষ লাইনের দূর্বলতাটা নিয়ে কথা বললে না? পুরো গল্পটাই রেখা আর কাঞ্চনের ব্যক্তিগত সুখ, দুঃখ এবং ক্রাইসিসকে লোকেট করে করে প্রায় অর্ধশতাব্দী পরের কলকাতার একটা সুস্থ প্রেম না করার জায়গা দিয়ে যে বহুবচনীয় ইঙ্গিত সেটা দীপেন্দ্রনাথ লাস্ট লাইনে কাঞ্চন আর রেখা থেকে যেমনি ‘তাদের’ মানের রেখা আর কাঞ্চন সবাই প্রথম পুরুষে, তাল কাটেনি? পূর্বাশাদি, নিলয়দা, সিদ্ধার্থ বললেন না যে রেখা আর কাঞ্চনই বহুবচন? নেশার ঘোরে আমি বেশী বলবো এত মদ অপু আমায় খাওয়ায়নি এখনও, এই মৃদু আলো, অজস্র কথাবার্তা, পানীয়ের দিকে ঢলে থাকা মাথার মধ্যে কয়েকটা দূর্দান্ত গদ্যের আইডিয়া মাথায় আসছে, টিসু পেপারে লিখতে শুরু করি এই অসামঞ্জস্য তলে যেন বা হাতে খড়ি দিচ্ছি গদ্যে, অপু ছলছল নয়নে স্থির শূন্য দৃষ্টি, বন্ধু এই যে তুমি দেখলে না কী লিখলাম, তোমায় কতই না ভালবাসি!


অফিসে যখন ঢুকলাম মেঘ কই সূর্য ত্রিগুণ তেজে টাক ফাটিয়ে দিচ্ছে। ঢুকেই আমার সন্দেহ হলো গেটে পাঞ্চ করার সময়। দরজা এঁটে পাঞ্চ করলাম অথচ শব্দ হলো না, আজ কি পাঞ্চ নিচ্ছে না, ভেতরের সব সিকিউরিটি খোলা হাঁ হাঁ! নোটিস বোর্ডে লেখা দেখছি যে আজ সিকিউরিটি ক্লোজড, আংশিক পাওয়ার শাট ডাউন! আজ যে এটেন্ডেন্সের জন্য এলাম তা জলে। এই মাসের পনেরো দিনে আমার অফিস আসা হলো তার মানে তিনদিন! মাসে দশটা করতে তাহলে আমায় পরের দুই হপ্তায় আসতে হবে সাত দিন এরমাঝে শুরু হচ্ছে শ্রাবণী মেলা সোমবার ট্রেনে ওঠা ভাবা যাবে না! অফিসে ঠাপ খাবো, তেল মাখিয়ে রেডি রাখি! ত্রিদিবদা ক্যান্টিনে বসে খাচ্ছে, টিফিন থেকে কিছু ঢালছিল, সেই মুহূর্তেই আমি দেখে এক ঝটকায় থামের এপারে, একে তো এই সাড়ে তিনটের সময় ভাত খাচ্ছে আবার দেখা হলেই আবার হিন্দিতে তাল দিতে হবে তার দেরীতে ভাত খাওয়ার কাহিনী, সে ক্যানো ননভেজ খাওয়া ছাড়লো! আজ শনিবার। মাথার ভেতরের সব ট্রান্সলেটার, ডিফিউশান সফটওয়ারদের আজ সেক্রেড ঘুম চলছে। পূর্ণ শাটডাউন। দুঃখে আমাদের ছয়তলায় সিঁড়ি দিয়ে উঠে হিসু করতে গেলাম। ওডোনিলের গন্ধ নাকে আসতে ভাবছি ওয়াশরুম কি একতলায় ছিল না? আমি সেখানে থামিনি কোনো দিন। আজ অপুকে কথা দিয়েছি না আজ মাল খাবো! আমি যদি কোনো এক বন্ধুর জন্যে নিজের লেখালেখি বাজি রাখি সে অপু! অন্তত সবাই জানে এগুলো বলার কায়দা। সে চাকরি করে মেদনিপুরের কোন এক কোষ্টাল থানা অফিসে, অফিসিয়ালি সে একজন পুলিশ,  তার অফিস থেকে আধঘন্টা হেঁটে দূর্দান্ত কোনো গোপন সমুদ্রসৈকতে চলে যাওয়া যায়, এরপর তাকে আমি না ভালবাসার কোনো কারণ খুঁজতে চাইনি। মাঝে মাঝে তার কাছে যাই সে রাতে দোকান থেকে রুটি- তড়কা কিনে আনে খেয়ে আমার গলা জ্বলে, খেতে খেতে তার অজস্র বকবকানি সে কোন পাশের গ্রামের বৌদিকে ধান দেখিয়ে ঘুঘু বানিয়ে কাছে টেনে এনেছে রাজমিস্ত্রি, পরে ন্যাতা এসে বলে মামলা তুলে নিচ্ছে কাদের পরিবার ইত্যাদি, আমি হাসি মুখে হাত ধুয়ে বলি অপু তোমার কাছে এন্টাসিড আছে? তার দেওয়ালে সারি সারি বইয়ের আগে ময়লা কাচে নিজের ছবি দেখি দেখি সিগারেট জ্বালিয়ে বইয়ের নাম পড়ছি দেবেশ রায়, তিস্তাপুরাণ, কেজি মল্লিক, অরূপরতন, সমরেশ বসু,; আমি অপেক্ষায় কতক্ষণে অপু তার হেঁশেল সামলে সিগারেট চায় আর আমি বলি চলো অপু ঘুরে আসি ওই ধার থেকে, এমন হাসে য্যানো সে আড়াই বছর আগে আমার এই কথা ট্যারট কার্ডে দেখেছিল। অপুর একটা গদ্যের বই বেরিয়েছে আগের বছর। জিনা, সিদ্ধার্থদের পরামর্শ দিই অপুর জন্মদিন আসছে উনিশে নভেম্বার, সেদিন বৃষ্টি হবে, তোমরা কিছু একটা লেখো অপুকে নিয়ে, ভাল কিছু লেখো প্লিজ, সবারটা একজায়গায় জড়ো করে জন্মদিনের রাত্রে তাকে একটা কপি দেবো, নিলয়দা তুমি প্লিজ কিছু লেখো। সিদ্ধার্থর মনটা একটু নয় অনেকটা ছোট। তার কি আগে থেকে কোনো খার আছে, সে মাঝে মাঝেই বাংলাদেশী বলে গাল দ্যায় অপুকে! সিদ্ধার্থই আবার বলে উপন্যাস লিখবে আন্না কারেনিনের মতন, এত ছোট মন নিয়ে বারোশ পাতার উপন্যাস নামাতে পারবে না, সিধু!, অফিসে কাজে ফেঁসে সেবার আমি অপুকে উইশ করলাম তখন জন্মদিনের বারবেলায় কার সাথে শুয়ে রয়েছে অপু কার বিছানায়, আর ফোন ধরেনি, পরে ফোন করেছিল কিনা আমি জানি না, তবে তার সাথে আমার সম্পর্ক মদের গ্লাসে, সৈকতে, অজস্রবার তাকে লটারি নিয়ে সতর্ক করার পরেও অটুট। আমি জানি ওই সমুদ্রের ধার, টং ঘরের যাবার আগের তিন কিলোমিটার লম্বা ঘাস জমি, খরিশ সাপের গর্জন পেরিয়ে তর্জনীতে সিগারেটের ছ্যাঁকা খাওয়ার আগে অব্দি একভাবে হাত নাড়িয়ে যাবার প্রত্যয় আমার একার নেই, আমি বিশ্বাস করি অপুরও নেই, সমুদ্রের ধার থেকে দেখা যায় হাজার জোনাকি আমরা দ্বিধান্বিত হই কোনটা জোনাকি কোনটা দূরের মাছধরা জাহাজ, অপু হাত উঠিয়ে বলে ওই দ্যাখো ধ্রুবতারা, সে কলম্বাসের সমসাময়িক কোনো নাবিক, সে সুপিরিওর, সে ইস্টইন্ডিয়া কম্পানি, সে স্প্যানিশ আর্মাডা, আমি স্লেভ, আমি ছদ্ম গোনবার চেষ্টা করা গনৎকার, এ বাবা আরেকটু আগে আসলে সমুদ্রের সবার আড়ালে ওপরে উঠে আসা দেখে ফেলতাম এখন খালি ভাটা আর ভাটা! আমাদের পায়ে বাসি ফ্যানা লেগে আছে। অপু তার স্বভাবজনিত আশাবাদ হোক, কিম্বা দূর্দান্ত অভিনয়, যাইহোক, আমার প্রস্তাবের জন্যে  অপেক্ষা করে হাসার আগে অব্দি। অপুকে নিয়ে একটা লেখা আমি তৈরী করছি, আমরা লেখকরাই যদি লেখকদের সমর্থন না করি, জিনা অন্তত একবার আসতে পারতো অপুদের এখানে। আসেনি ভালই হয়েছে, আমিই আবেগে ভেসে যাই, মদ খেলে কে জিনা আর কে অন্য, অপু নির্ব্বিবাদে জিনা হারাম করে দেবে। আমি এসবের সাথে পরিচিত, যতবার সে মদ খেয়ে চোখের জল ফেলতে আরম্ভ করেছে ততবার আমি তাকে অন্তর্জলী যাত্রার প্রথম প্যারাগ্রাফ উচ্চস্বরে পড়ে শুনিয়েছি তাকে, আমারও কি গলা কেঁপে যাচ্ছে মাঝে মাঝে! আহা গো, বাংলা ভাষা অমর হলো! প্রত্যেকবারই অপু প্রথম বাক্য শেষ করে দ্বিতীয় বাক্য খুব জোর তৃতীয় যাবার আগেই ঘুমিয়ে পড়ে, আমি প্রত্যেক বাক্য দুই, তিন, চারবার রিপিট করতে শুরু করি উপন্যাস পড়বার এই ডাইভারজেন্সি শেষ করে ফেলবে আমার গলা, আমার কত দায়িত্ব আমি অপুকে শোনাবার ছলে নিজেকে বার বার শুনিয়ে যাচ্ছি বাবু কমলকুমারের অশ্রুতপূর্ব সব বাক্যের বিন্যাস! আমি বসে ভাবি, এই মফস্বল, এই আধা গ্রাম, এখানে কোনো রহস্য নেই, যতক্ষণ এখানে আমি না থাকি অপুর খোঁজ নিয়ে যাই কতক্ষণে সে বলে ওঠে এদিকে কবে আসছো বলো?

‘দ্রষ্টা’র পুজো সংখ্যা এলো। সুচিপত্রটা দেখলাম, সম্পাদকীয় পড়লাম এক লাইন। যথেষ্ট। আমার লেখা মানোনিত হয়নি। এখানে ‘মৃত্যু’ নামে একটা গল্প দিয়েছিলাম। গল্পটায় ডায়লগ ছিল তিন কিম্বা চার, পাঁচ পেরোবে না। সারা গল্পটায় আঁধার থেকে একটা স্বর সব ঘটনার মুখোমুখি হয়, আরো অন্য ঘটনা বলে, তার আশেপাশে মানুষের সমাবেশ, কখনও লোনলি, বেডরুমে উলঙ্গ বাইরে চকচকে রৌদ্র। আমি বাসে বসে লেখাটা আরেকবার পড়লাম। দেখলাম একটা ঘটনা ঘটছে, তারপরের ঘটনাও, এই দুই ঘটনায় কোন সিমিলারিটি নেই, আমি কী বলতে চাইছি যে, প্রথম ঘটনার সাথে দ্বিতীয়র সিমিলারিটি প্রথমটাই কিম্বা দ্বিতীয়টা কিম্বা দুই’ই। যেটাকে আমরা কন্সিকুয়েন্স বলি। কন্সিসিকুয়েন্সের বাংলা আমি পরিণতি করতে পারি না, ঘটনাক্রম একটা আধো আধো হতে পারে। কলকাতার বাসে আমি কিছু পড়তে পারি না। আজ রাগে রাগে পড়ে ফেললাম আমার লেখাটা, পাশাপাশি দ্রষ্টার গল্পগুলো পড়ছি। আমার লেখার ধারে কাছেও একটা নয়। সিদ্ধার্থর গুচ্ছকবিতা আছে। এই লেখা সে লেখাবার পরপরই পড়িয়েছিল। এখন দেখলাম খারাপ লাগছে, মনে হচ্ছে রাবিশ। আমার গল্পটার থেকে ভাল গল্প কি আছে এই মুহূর্তে পৃথিবীতে? নিজেকে সৎ হবার জন্য সতর্ক করলাম। রবীন্দ্রনাথের ‘পোস্টমাস্টার’ ভাল এর থেকে। ওই ওম্যান উইথ ডগ? ওই গল্পের শেষের দিকে মহিলা আর পুরুষটি সেক্স করবার পরে তরমুজ খাচ্ছিলেন, সেই সময়েরর যে নির্লিপ্ততা চেকভ নির্মাণ করছেন। টলন, উকবার? আমি বাছতে বসলে অন্তত দশটা ইমিডীয়েটলি হাজির করেই ফেলবো। কিন্তু পৃথিবীতে দশহাজার ভাল গল্প আছে, তাদের মধ্যে একটা গল্পও খুবই ভাল বাকি নয় হাজার নয়শো নিরানব্বইটা সাথে, আমারটার র‍্যাঙ্কিং মনে হয় দশ হাজার এক। এই গল্পের পাঠক একশো চার-পাঁচজন হবে তারমধ্যে আমি একশোবার পড়েছি। জিনা পড়ে রিপ্লাই করেছিলঃ ভাল। নিলয়দাকে পাঠাইনি, এই গল্পটা সত্যই একটু বেশীই কপি তার। সে খুশি হয়ে যেতো। সিদ্ধার্থর প্রতিক্রিয়া মনে নেই। পড়েনি মনে হয়। আমি আমার প্রতি পুনঃপাঠে বিবেচনা করতে চেয়েছি খারাপ দিকগুলো কোথায় কোথায়, দুয়েকটা বানান ভুল ঠিক করেছি। ছাপলে হয়তো প্রুফ রিডিং এর দরকার পড়তো না। আমার পুরানো গুরু ঋত্বিকদা বলে তুই লিখতে শুরু করলি সেই দুইহাজার দশে, এখনও না ছাপলি কোনো লেখা না বার করলি বই! বই বার করা যায়, টাকা নিয়ে কেউ চাপ নেয় নাকি, কিন্তু কে কিনবে? আমার চেনাশোনা দশজন হলে চারজন কিনবে, এর মধ্যে হয়তো দুজনকে আমিই গিফট করেছি, বাকি বই আমায় ফেরিওলার মতন করে বইমেলায় বিক্রি করতে হবে! মানুষ ওরকম করে থালা, বাসন, নাইটি অব্দি কিনতে পারে, কিন্তু বই! হয়তো দুইপাতা ব্রাউসই করবে না! আমি আমার বন্ধুদের কথা ভাবি, তোরা কি বর্হেস একবারই পড়িস? নোটস ফ্রম দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড? ইউলিসিস? সত্যি বলতে ইউলিসিস আমি পড়িনি এখনও। পড়ার মহড়া অবশ্যই শুরু করেছি। কিন্তু আমার লেখা প্রথমবার ভাল নাই লাগতে পারে, আরেকবার কেউ পড়লে পারতো! একবার পড়েই কোনো লেখককে বড় লেখক ঘোষণা করা যায়? একবার পড়ে কাউকে রিজেক্ট করে দেওয়া যায় নিশ্চয়। এদিক থেকে আমি দায়হীন থাকি, বডি থাকে পেঁজাতুলোর মতন হালকা, কার দখল করা আকাশে উড়ি কখন ঠিক নেই। ওই গল্পটা নিয়ে আমি আর মনখারাপ করছি না, বাস থেকে নামবার সময় হয়ে এলো। দেখি অপু কাছেপিঠে ক’ই আছে!

আমার আবার খিদে পেয়েছে। পিজ্জা হাটের দুটো কুপন আছে, ডিএলএফ সি তে যেতে আমার গায়ে জ্বর। ওখানে নিউজ২৪ বাংলার অফিস, সিঁড়ি দিয়ে ওঠবার সময় সবুজ ঘোষকে দেখতে পেয়ে ধরা গ্যালো জুতোতে শুরু করলাম! সরকার আমায় কি দেশদ্রোহিতার কেস দেবে?পাশের নজরুল তীর্থের বিল্ডিংটায় কে এফ সি আছে। ঢোকবার সময় দেখলাম গুচ্ছ বাল বাল হিন্দি সিনেমা চলছে তীর্থে। কে এফ সিতে যা খেতে চাই তার আদ্দেক জিনিসের দাম আমার আদ্দেক পেট ভরার সমান না। তবে, অনেকদিন বাদ কটা ফ্রাই আর কোল্ড ড্রিংক নিলাম, খেয়ে আগের মতন মজা নেই। কলেজ স্ট্রীটে নামতে বিকাল পৌনে পাঁচ একদম অমায়িক সময় আজ স্কুল, কলেজের হাফ ডে তারপরেও প্রচুর মেয়ে তো থাকবে! একেক জনের বুক এতো বড় পুরো খেতে কয়েক বছর সময় লেগে যাবে এরপরেও বলবো এত বড় বুক অশ্লীল লাগে এ কথা অদিতিকে বলেছিলাম তোমার ছোটবুকে দাঁড়িয়ে যায় বুঝলে, সে তো মুখ চেপে ছি: করে আলা তবে তার পছন্দ হয়েছিল একটু পরে বুঝেছিলাম! তার বুক ছোট হলেও থাই ছিল প্রকান্ড তার দুই থাই সরিয়ে ভ্যাজাইনার কাছে যেতে দমবন্ধ হয়ে যেতো, তবে সে লিকিং নিতে পারতো না, তার মেহগনির গাছের গুঁড়ির মতন পাছা আমায় অভুক্ত রেখে গ্যাছে দীর্ঘদিন তাকে বলেছিলাম কতবার একবার দাও একবার দাও এখনও যদি মনে পড়ে তাকে মনে পড়ে একবার দাও দাও আর তার ছি: করে খিলখিল হাসি মনে পড়তেই বিরক্ত লাগে সে একবার দিতেই পারতো না!

বুকস্টপে সুব্রতদা ছিল সটান মুদ্দায় গেলাম কমলকুমারের নতুন বইটা আছে, সুব্রতদা সিজনড কলেজ স্ট্রীটার এক কথায় ধরে নিয়েই নিরাশ করলো তার নিরাসক্ত গলায়- বুঝলে বেরিয়ে গ্যাছে। আমি নিরাশা টিরাশা না অশনী সংকেত দেখি! পাঠকে দ্রুত যাই, আজ সোমনাথদা না নেই, একজন মহিলা ছিলেন, তাকে দোকানদার, বুঝতেই পারিনি, তাঁকে বললাম, একটু বোঝাতে হলো কবার, বললেন লাস্ট কপিটা তো বেরিয়ে গ্যালো! সোজা সিতারায়, দোকানের রাস্তায়, বাস থেকে নেমে ওদিকেই এলাম, একটা খোঁজ নিলেই, লাস্ট কপিটা যদি আমি আসার এক মিনিট আগে বেরিয়ে যায় তো খুনখারাপি হবে না! সিতারাতেও নেই, দোকানের কম্পিউটারে একজন মহিলা বসে, তাঁ্র থুতনিতে একটা বড় আঁচিল, আমার মন ভেঙে গ্যালো! প্রতীমদের অফিসে যাই একবার, আজ জীবন থেকে পাওয়ার কিছু নেই, একটু পাখার তলায় বসাই সব। যাক, প্রতীম ছিল দপ্তরে এটাই অনেক, আগের মেয়েটা কী একটা নাম, হেনা না কি, আগের বার যেদিন গেলাম ও মেঝেতে বসে কিছু হিসাব মেলাচ্ছিল, থ্রি কোয়াটার কোমর থেকে নেমে পাছার খাঁজ দেখা যাচ্ছিল, আজ থাকলে, যাক প্রতীম আছে একাই একটু বসা যাবে। নিত্য মালাকারের কবিতার বইটাও আসেনি, প্রতীমকে বললাম তোমরা কী করছো বল তো, বই কেনবার তরে ব্যাগ কিনলাম একটা! প্রতীম কহিলা বিষাদে শ্যামল দাশ নাও,  পার্থপ্রতীমের কাব্য সংগ্রহ দ্বিতীয় ভাগ এসে গ্যাছে। আমি নিলাম শ্যামলের একটা কবিতা সংকলন। সদ্য প্রকাশিত  বাংলা উপন্যাস পড়ি না। প্রতীম বললো চা খাবে? লিকার চা, খাও? বললাম চিনি খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি, গো। ও বিড়ি ছাড়তে পারেনি। বললো অক্টোবরে দারমা দন্তু ভ্যালি যাচ্ছে। আমার এবার হবে না, মে বি পরের বছর। বা, তার পরের। চা খেয়ে আর বসিনি।

সেন্ট্রাল যাওয়ার সবচে শর্টকার্ট মেডিকেলের ট্রমা সেন্টারের পাশ দিয়ে ট্রপিক্যাল মেডিসিনের সামনে ওঠা কিন্তু ওদিক মাড়ালে প্রেসিডেন্সির পেছনের পুরানো বইয়ের দোকানগুলো মিস যাবে। সারি সারি পুরানো বইয়ের মেলা, এখন একটু কমে গ্যাছে। হকাররা কলকাতার সৌন্দর্য। পুরানো বই কেনার ছল হচ্ছে একসারি বই দেখতে দেখতেই ইনটুইশান চলে আসবে এই তো আমার প্রিয় বই ওতদিন ধরে খুঁজি, ওমনি দেখিবেন তা ঘুরে তাকানোর মতই না, একটা নয় একের পর এক বই। সৈয়দ হক দেখতে পাচ্ছি, হকের সেরা উপন্যাসটা, দূরত্ব, পড়া। সেরা জিনিস পেলাম কবি রামকৃষ্ণ, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত প্রণীত। দুপাতা পড়লাম দিল খুশ হয়ে গ্যালো। বিনিময়ে জলের দরে ফলের রস, সত্তর টংকা অনলি! চাচাকে বইটা বিক্রি না করার ওয়াদা করিয়ে টাকা তুলতে গেলাম। এই চত্ত্বরে এটিএম পাওয়া এই ঝামেলা, ইউনিভার্সিটির নীচেরটা আউট অব সার্ভিস! মেডিক্যাল কলেজের শেষ প্রান্তে, বউবাজারের দিকে একটায় পেলাম! মেট্রোর খোদাই চলছে জীবনভর, জুতোর তলায় কাদা! দিনটা ওতটা খারাপ না, চাচা তার ইমান ধরে রেখেছে। তবে, হঠাৎ পাঁচশো টাকার ভাঙানি দিতে দিতে সে নাখোশ! এবার মনটা একটু ভাল লাগছে। সামনে অনেক মেয়েও। ফুল ছোঁড়ার মতন করে খিলখিল করছেন তাঁরা, তাঁরা বই কেনেন না। আমি হেনরি মিলার। এবার পার্ক স্ট্রীট যাবো।

সেন্ট্রাল স্টেশানে টিকিট কাটতে এক কিলোমিটার করে দুটো লাইন লেগেছে, আমার পেছনে এক চাচা বলছে এই খানকির ছেলে যেদিন কাউন্টারে বসবে সেদিনই লাইন পড়বে। আমরা লাইন পাল্টে অন্য লাইনে আবার সেই পেছন থেকে দাঁড়ালাম, চাচার পেছনে তার ভাতিজা আর ভাইয়ের বয়সের মাঝামাঝি এক লোক তাঁর কাঁধে হাত দিয়ে বোঝাচ্ছেন, চাচা, কাল রবিবার ছুটির দিন, রাগ করে না, শান্ত হন, আস্তাগাফিরুল্লাহ বলেন। এই লাইনটা তাড়াতাড়ি টিকিট দিলো। ট্রেনে সেইরকম ভীড়, এক কোণায় এই দানবীয় চেহারা নিয়ে সেঁদিয়ে আছি কোনো রকমে, পেছনে একটা সুদর্শনা বলছেন এক্সিউস মি! ভাবছি আজ যা দিন দেখবো বাহরিসন্স বন্ধ, নয় খুব ভীড়, নয় বিচ্ছিরি বইয়ে ভরা। না, দোকান খোলাই। ক্লাসিক সেকশানে গিয়ে মাথা নষ্ট, এরেঞ্জমেন্টটাই পাল্টে ফেলেছে! সারি সারি চা খাবার টেবিল কোনে কোনে সাইডে বইয়ের র‍্যাকগুলো। ক্লাসিকের র‍্যাকটার সামনের টেবিলেই দুজন ছেলে
  এক নেকিচুদি, বদ্দা মতন ছেলেটা গপ্প দিচ্ছে গল্পটা এমন মাছটা নিয়ে যখন জেলে পারের কাছে তখন মাছের কঙ্কাল বাকি খালি। চোখ বন্ধ করে বললাম হেমিংওয়ের ওল্ড ম্যান, তুমি শালা মবিডিক পড়োনি। ততক্ষণে তাদের কফি শেষ তাদের হাতের ধরা বই পড়া শেষ, তারা পশ্চিমের আলো নিয়ে টেবিল ছাড়লো, ডুবে মর গে যা তোরা। বই খোঁজার সময়েও দেখলাম আমার ধৈর্য্য কমে গ্যাছে ওদের এক স্টাফকে ডেকে জিগাই মিনিবুকের পঞ্চাশটা সিরিজের কোনোটা খুচরো বেচছে কিনা। সে আমতা আমতা করে কটা বই খুঁজে দিল। কেরুয়াকের বিগ সার আমার প্রিয়। এটা লোনসাম ট্রাভেলার। সল বেলোর অগি মার্চ নেবো নেবো কিনা করছি, ওটাই বাকি খালি, থাক। এই বছর তেজু কোল আমার প্রিয় রাইটার। তার আগের বছর ছিলেন স্যালিঞ্জার। তার আগের বছর সল বেলো। নীলিমেশ বই বার করার জন্যে তাড়া দিচ্ছে, আমি কমপ্লিট, আধা কমপ্লিট গল্পগুলোয় তা দিয়ে যাচ্ছি আরো ক’লাইন লিখে দেবার চক্করে। আমি দস্তয়েভস্কিয়ান, ক’লাইন বেশী লিখলে কে আমায় বায়না দিয়েছে পার এক্সট্রা শব্দ দুটাকা বেশী!  জিনার জন্য একটা টেক্সটাইল ক্রাফটসের বই নিলাম, সে তো পড়ে উল্টে দেবে, যদি মন চেঞ্জ হয়। এখানে আমার কিছু কেনার নেই। বিল করার সময় পাশের একটা ফর্সা ছেলে দেখি বেকেটের ফার্স্ট লাভ নিয়েছে, আমার তো রাগে মাথা ঠুকতে ইচ্ছে করছে, আমার যদিও প্রিন্ট আউট আছে। সময় যখন আছে একবার অক্সফোর্ডেও ঢুঁ মেরে যাই নাকি।

প্রতি তিন ঘন্টায় আমার খিদে পায়। ঘড়ি না দেখে কলকাতার রাস্তা নিয়ে বদনাম শুরু করলাম। কনফেশান নিজের মুখে নিজের কথা শোনার একটা ভনিতা। সব লেখাই কনফেশনাল। মজা হচ্ছে কনফেশানে মিথ্যে কথা বলা। আমরা তো শুদ্র, কেজিএফে রকিভাই বলছেন আমাদের হারানোর কিছু নেই। দখল করবার জন্য আছে গোটা দুনিয়া। আমরা করাপ্ট হতে বাকি থাকি ক্যানো, বন্ধু। রিসেনটলি অনেক বন্ধু এড করলাম। মেয়ে সবাই। মেয়েদের লেখা আমি পড়তে চাই। তবে উদ্দেশ্য লেখা পড়ার থেকেও নিজের লেখার প্রচার বেশী। কেউই আমার লেখা পড়েন না। আমি কথা বলতে ইচ্ছুক নই কারোর সাথেই। দু:খের কথাই সব। অফিস করতে রাত্রি নেমে যায়। কাল অফিস থেকে ফেরবার পথে এরিক জনসন। জামাইকান ফেয়ারওয়েল কত ফেমাস গান প্রায় সব ভাষাতেই অনুবাদ হয়েছে। জীবনে টিকে থাকার লড়াই থামবার নয়। কী কী পড়বো লিস্ট দেখলে ভড়কে যাবেন- মার্সেল প্রুস্ত, জগদীশ গুপ্ত, জেমস জয়েস। অন্তত দশখানা গল্পের সিনোপসিস লিখে রেখেছি। একটা উপন্যাসের আদ্ধেক। যেখান থেকে যা পাচ্ছি টুকে রাখছি। আমি চোর ও অলস। কিন্তু চোরের অলসতার সময় নেই। নিজের পেটে লাথ মারার সমান। আমি পেটে লাথ মারিনি, মোট কথা সে রিস্ক নেওয়ায় অনর্থ হবে। লেখালেখি করা স্বপ্নের চেয়েও অলীক ঘটনা আপনার হাতে কম কম নিয়ন্ত্রণ। পড়াশোনা ধৈর্য্যের ব্যাপার! আমি তো অলস, বললামই- তবে রণাঙ্গন ছেড়ে পালাবার বান্দা নই। এখানে আমি একটু পলিটিক্যাল কারেক্ট থাকতে চাই, দাঁড়ান। স্ট্রাগল আলাদা জিনিস। আমি তো কম্পিউটার সায়েন্সের ছাত্র। ম্যাথের গ্রুপ থিয়োরি টিয়োরি পড়তে হয়েছিল। সেখানে একেকটা থিয়োরেম মাথায় এন্ট্রি মারতে দুতিন দিন সময় লাগতো। এবসট্রানশান বোঝার জিনিস না। সেন্স করবার। ইনটুইশান বুঝে কাউন্টার ইন্টুইটিভ পদ্ধতিতে ডিরাইভেশান। সেম ঘটনা ঘটলো দুহাজার আঠারোয়। সময়টা ভালো যাচ্ছিল না। বিরহ, ফুটবল বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হার সব মিলিয়ে বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার। ফিয়ার এন্ড ট্রেম্বলিং কিনেছিলাম। কামালাহাল্লির ওই দোকানটায় মোমো খাচ্ছিলাম। রাস্তার উল্টোদিকে একটা লস্যি সপ আছে। সামনের মসজিদের ডানদিকে একটা পাঞ্জাবী রেস্টুরেন্ট খুলেছিল। কোভিডের পর বন্ধ। মোমো অর্ডার করে দাঁড়িয়ে পায়ে ব্যথা হয়ে গ্যালো। পিছনে মাংসের দোকান আর পাশে বইয়ের দোকান। এখানে বসে ‘সিদ্ধার্থ’ পড়েছিলাম। বইটা আজাদকে গিফট করি ওর জন্মদিনে। সিদ্ধার্থ নিয়ে আমার চেয়ে ওর উচ্ছ্বাস বেশী ছিল। এখন মুভ অন করে গ্যাছে। ক্লাসিক সেকশানটায় মার্গারেট এটউড, সুসান সন্ট্যাগ। সনট্যাগের ফটোগ্রাফির ওপর বইটা মাণিককে দিয়েছি। পড়বো না। তবে কিয়ের্কেগার্দ ছিল ক্লাসিকে সেকশানে, কয়েকটা জিজেক, দোকানের মালিক যে আন্টি, তাকে আমি দুপাতার একটা লিস্ট দিয়েছিলাম, আন্টি দোকানে থাকলে ঢুকতাম না। এত কথা বলতে ইচ্ছে করে না। কথা বলার থাকলে আজাদের সাথেই বলতাম। কাল আমাদের একটা ক্যারালাইট ক্যাফেতে যাওয়ার কথা ছিল। শনিবারের বারবেলায় বিরিয়ানী খেয়ে ঘুমিয়ে গেছি। কিয়ের্কেগার্দের ওই বইটা অন্তত দুবছর পড়ার কম চেষ্টা করিনি। নীলিমেশ ইদার/অরের কথা অনেক বলেছে। আমি বইটা কিনিনি। বরং সিকনেস আনটু ডেথ অনেক ফ্যাসিনেটিং লাগছিল শুনতে। এই আত্মা তো ছেড়ে চলে গ্যাছে এই ঘটনা না দেখে থাকলেও সিনেমা, সিরিয়াল, বাস্তবে ব্যবহার কম দেখেননি। এবার ধরেন আপনি আত্মাকে ছেড়ে চলে গ্যাছেন। আপনার হাত, পা, বাহারি চুল, চোদনা আত্মা ছেড়ে আপনি কখন বনের দিকে রওনা দিয়েছেন! তবে সিকনেস আনটুতে ডিসপেয়ারকে আমি প্রথমে ডিসএপিয়ার পড়ছিলাম। আমি বইটা ট্রান্সলেট করতে পারি- কাফকা বলেছেন কিয়ের্কেগার্দ একজন নক্ষত্র তাঁকে স্পর্শ করা যাবে না। কিয়ের্কেগার্দ সারাজীবন সক্রাতেস হতে চেয়েছেন। তবে এখানে মিমেটিক ডিজায়ার এনে গুরুর প্রতি শিষ্যের অসন্তোষ আমি ব্যাখ্যা করতে পারবো না। অনুপ সেদিন বলছে ওর গুরুর সাথে ওর ঝামেলা হয়ে গ্যাছে। গুরু একভাবে ছক বিচার করছে ওর মত অন্য। অর্থাৎ মিমেটিক ডিজায়ার খালি শিষ্যের সাথে গুরুর না শিষ্যের ভিন্ন মতের প্রতি গুরুর ক্ষোভও ব্যাখ্যা করে। রেনে জিরার্দ বলেন মানুষের নিজের কোনো ডিজায়ার নেই, সবই অন্যের থেকে টোকা। বাইরে বেরিয়ে দেখি চিকেন মোমো শেষ। ভেজ মোমোই খাই, মেয়োনিজ খাই না অনলি টমেটো, লংকা, ধনেপাতার চাটনি। বিচ্ছিরি গরম মোমো। দোকানকে বললাম আপনার বাড়ী কোথায়। তাঁর দেশ কালিম্পঙের দিকে। তাকে বললাম আমি সুকনায় থাকতাম চারবছর। সে কোনো উত্তর দেয়না। সবাই পাহাড় ভালোবাসে না মনে হয়।

 

অক্সফোর্ডের ওপরের স্পেসটায় কাদের সভা হচ্ছে, এক মহিলা বাংলা, ইংরেজি মিশিয়ে বক্তব্য দিচ্ছিলেন, গলার স্বর শুনে মনে হচ্ছিল তাঁর নিতম্ব গুরু। তিনি বাঘেদের নিয়ে কিছু বলছিলেন।  তাঁরা সভা শেষ করলেন এক বাচ্চার বিরক্তিকর আবৃত্তি দিয়ে। আজ আমার পাঠক জীবনের একটা অধ্যায় শেষ হলো। ইন দ্য পাতাগনিয়া কিনলাম। কাল থেকে জীবন আজকের মত থাকবে না। ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট এর দুটো আলাদা এডিশান, একটা আমারটার সাথে এক আরেকটা আলাদা। অরুণ সোম অনুবাদে প্রথম বাক্যটারই গান্ডি মেরে রেখেছেন! দুটো ইংরেজি অনুবাদই দীর্ঘ বাক্যে, মাঝে কমা কটা, একটা দারুণ অপরাধের সিনের প্রিলিউড ও মেঘ ঘনাচ্ছেন। সেখানে সোম করেছেন তিনটে না চারটে আলাদা বাক্যে! যাইহোক তিনি মারা গেলে টেনে সমালোচনা করবো। ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট এর দ্বিতীয় অনুবাদটা নিলাম। এই বই আমার আত্মার উইসডম, চলমান প্রজেক্ট। ট্রেনটা ফাঁকা পেলে একটু আরাম করে লেখা যায়। আমি এত বড় হুব্বা অক্সফোর্ডের ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি সেকশানটাই ফিলসোসফি সে খবর কেউ নেয়নি! আমার প্রিয় একটা বই জ্বলজ্বল করছেন সেখানে, মার্শেল মশের দ্য গিফট! এই বইয়ের প্রশংসা করেছেন দেরিদা। নীলিমেশ আবার দেরিদা কে বলে হাফ ফিলোসফার! সে বলুক, আমি দেরিদা পড়িনি এখনও। দুইহাজার তেরো চৌদ্দ নাগাদ আমি প্রায় ফিলোসফার হয়ে যাচ্ছিলাম কান্ট- হেগেল- ব্রেনতানো- হুসার্ল- হাইডেগার লাইনে। তার তিনচার বছর পর একটা এফোরিজম দিই নীলিমেশকে যে দর্শন পড়বার সময় ভাববি ফিকশান পড়ছিস, উপন্যাস পড়বার সময় ভাববি দর্শন পড়ছি। এই একহপ্তা আগেই আবার সেম কথা ওকে রিপিট করলাম। ও খুব সায় দিলো। আলতুসারের আত্মজীবনীটা, কী একট নাম বেশ, সেটা তো আমি থ্রিলার ভেবে অনেকটা পড়ে ফেলেছি! আজ একটা এগ চিকেন রোল খেলাম। এখন এসব খেয়ে আর মজা পাই না। সেই স্বাদ সময়ের কোথায় হারিয়ে গ্যাছে। এখন খেলে রিগ্রেট হয়। জেমস জয়েস প্রণীত ইউলিসিসের দিকে তাকাচ্ছিলাম খালি একদিনের ঘটনার ঘোর থেকে পৃথিবী একশো বৎসরর না বেরোতে পেরে ব্লুমস ডে চালু করেছে। আমি অন্তত একশো বার শুনেছি মলি ব্লুমের সলিলকি। ট্রেন একটু ফাঁকা থাকলে লেখা শুরু করবো। এই লেওড়া লেউড়ি পাশে বসে উঁকি মারলে, তোদের বাবার বিয়ের নিমন্ত্রণ পত্র লিখছি বে। কাল রবিবার, বাজারে যাবো। মা মনে হয় মাছ, মাংস কিনতে দেবে। কাল জিনা আসবে বিকেলে। রাতে আবার আমাদের নিমন্ত্রণ আছে অলোকেশদার মেয়ের জন্মদিনে। কী গিফট দেবো ভাবতে ভাবতে এক হপ্তা চলে গ্যালো। আজকেই ভেবে শেষ করতে হবে আর কোনো উপায় নাই। এই অলসতাই আমার উপহার। অলসতাই আমার উপহারের মূল্য।


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন