কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১৩৮

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১৩৮

রবিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬

সুপর্ণা বোস

 

কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৪৩


শাড়ি

পুজোর মধ্যে এত বৃষ্টি যে ঢাকাই শাড়িটা আর ভাঙ্গাই হলো না টুকুর। দশমীর বিকেলে মায়ের বরণের পর, বাড়ি ফিরে লালপাড় সাদা গরদের শাড়িটা ছেড়ে কাঁচাহলুদ রঙের ঢাকাইটা আলমারি থেকে বার করে বিছানার ওপর রাখল। সঙ্গে একছড়া মুক্তোরমালা। কানের সোনার ঢেড়ি ঝুমকোদুটো থাক। ওদুটো আর বদলাবে না। শাড়িটা পাটভেঙে পরতে গিয়ে কিঞ্চিৎ নাজেহাল হল। মাথার ওপর ফ‍্যান ঘুরছে বনবন করে তবুও দরদর করে ঘাম ঝরছে। টুকু শাড়িটা পরতে শুরু করল। হাতের আঙুলে কুঁচির ফেরতাগুলো ধরতে ধরতে ডাক দিল,

-পিকলু!

পিকলু নিজের ঘরে আয়েশ করে শুয়ে ব্র‍্যাম স্টকারের ড্রাকুলা পড়ছিল। সে শুয়ে শুয়েই গলা তুলে বললো,

-কী হয়েছে?

-একবার আয় এঘরে। আমার শাড়ির কুঁচিটা একটু ধরে দিয়ে যা তো বাবা!

পিকলু অগত‍্যা উঠে এসে দরজার সামনে দাঁড়ালো। পেল্লায় বেলজিয়ান কাঁচের ওপর মা ছেলের ছায়া পড়ল। ছেলে মাকে ছাড়িয়ে দেড়হাত লম্বা হয়ে গেছে।

পিকলু ব‍্যাজার মুখে বললো, ওই জন‍্যেই তোমাকে শাড়ি-টাড়ি ছেড়ে জিন্স-টপ পরতে বলি মা! তাহলে আর অন‍্যলোকের সাহায‍্য লাগবে না তোমার!

টুকু হেসে ফেলে বলে, অন‍্যলোকটা কে? তুই?

-না তা নয়, কিন্তু আমিও তো একটা বই পড়তে পড়তে রেখে উঠে এলাম মা!

-ধন‍্য করেছ বাবা! এবার বক্তিমে ছেড়ে শাড়ির কুঁচিগুলো ধরো!

পাশের ঘর থেকে পিকলুর ঠাকুমা বেরিয়ে এসে বললেন, আমার দাদুভাইকে দিয়ে এসব কাজ কেন বৌমা? ও বড়ো হচ্ছে। এসব কি পুরুষমানুষের কাজ?

ঊষারানির মুখে রীতিমত বিরক্তি ফুটে উঠল।

টুকু তাতে তেমন আমল না দিয়ে হেসে বললো, ছেলেকে মানুষ করছি মা। যাতে পরের বাড়ির মেয়েকে এসে আবার নতুন করে মানুষ করতে না হয়!

ঊষারানি কোনো উত্তর দিলেন না। কিন্তু দরজার কাছে দাঁড়িয়েই রইলেন।

পিকলু মায়ের পায়ের কাছে উবু হয়ে বসে আঙুলের চাপে কুঁচিগুলোকে ধাতস্থ করতে লাগলো। টুকু খুশি হয়ে ছেলের থুতনি নেড়ে নিজের ঠোঁটে ঠেকিয়ে বললো, এই তো আমার সোনাছেলে! এবার ঝটফট তৈরি হয়ে নাও তো বাবা! আমরা রাঙাদিদাকে বিজয়ার প্রণামটা সেরে আসি।

পিকলু চোখ কপালে তুলে বলল, এখন? না না প্লিজ মা, বইটা একটা দারুণ জায়গায় ছেড়ে এসেছি। তুমি আর বাবা যাও। আমি পরে গিয়ে দিদাকে প্রণাম করে আসব।

অবিন নতুন পাঞ্জাবি পরে ঘরে ঢুকেই বললো, আমার রুমাল কোথায় রেখেছ টুকু? আর চিরুনিটাই বা কোথায়?

টুকু সেফটিপিনটা দাঁতে চাপা অবস্থাতেই বলল, তোমার ওয়ারড্রোবেই রেখেছি তো!

-পেলাম না। তুমি খুঁজে দাও!

অবিন টুকুর ঘাড়ের ওপর দিয়ে আয়নায় একবার নিজেকে দেখে বলল, ইশশ, দাঁড়িটা বিশ্রীভাবে খোঁচা-খোঁচা হয়ে আছে!

টুকু সেফটিপিনটা আঁচলে পিনাপ করে বললো, সেটাও কি আমাকে করে দিতে হবে?

-থাক তোমাকে আর কিছু করে দিতে হবে না। চিরুনিটা দাও, তাহলেই হবে।

টুকু কিছু বলার আগেই ঊষারানি গম্ভীর গলায় বললেন, ওই তো সামনেই আয়নার সামনে পড়ে আছে। নিজে তুলে নিতে পারছ না?


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন