কালিমাটি অনলাইন / ১৩৮ / ত্রয়োদশ
বর্ষ : একাদশ সংখ্যা
বইমেলা আমাদের কাছে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মেলা, যা এখন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে উৎসবে রূপান্তরিত হয়েছে। বিশ্বে বইমেলার আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা আয়োজিত হয় প্রতি বছর জানুয়ারী মাসের শেষ বুধবার থেকে, যদিও এবছর বিশেষ কারণে নির্দিষ্ট তারিখের আগেই অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। অন্যদিকে আমাদের প্রতিবেশী বাংলাদেশে যথারীতি ১লা ফেব্রুয়ারী থেকেই সারা মাসব্যাপী অমর একুশে বইমেলার আয়োজনের প্রস্তুতি চলেছে। বইমেলা আমাদের জীবন ও যাপনের সঙ্গে এমন ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে গেছে, আমরা সারাটা বছর তার আসার প্রতীক্ষায় থাকি, দিন গুনি।
বইমেলার ইতিহাস থেকে জানা যায়, বিশ্বে প্রথম বইমেলার আয়োজন হয়েছিল ইউরোপের জার্মানিতে। ১৪৬২ সালে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে। ইয়োহানেস গুটেনবার্গের ছাপাখানার মেশিন আবিষ্কারের পরে বই প্রকাশিত হতে থাকে। গুটেনবার্গ থাকতেন ফ্রাঙ্কফুর্টের কাছাকাছি মেঞ্জ শহরে। মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের ফলে বই পড়ার জন্য পাঠক-পাঠিকারা উৎসাহিত হন। সেই উৎসাহ দেখে গুটেনবার্গ তাঁর আবিষ্কৃত মুদ্রণযন্ত্রের যন্ত্রাংশ এবং মুদ্রিত বই বিক্রির জন্য উপস্থিত হন ফ্রাঙ্কফুর্টে। সেখানে তিনি বইয়ের ব্যবসা শুরু করেন। গুটেনবার্গকে দেখে উৎসাহিত হন অনেকেই। তাঁরাও মুদ্রণযন্ত্রে বইছাপা এবং বিক্রি শুরু করেন। সেইসব বই কেনার জন্য বিভিন্ন জায়গা থেকে পাঠক-পাঠিকারা আসতে শুরু করে। ক্রমশ জমে ওঠে বইবাজার। এবং এভাবেই ফ্রাঙ্কফুর্টের বইবাজার একসময় রূপান্তরিত হয় ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অবসানের পর, ১৯৪৯ সালে ফ্রাঙ্কফুর্টের এই মেলাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয় ‘জার্মান প্রকাশক সমিতি’। এবং ১৯৬৪ সালে এই মেলা অর্জন করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। মূলত অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয় মেলা। মোট পাঁচদিনের মেলা। শুরু হয়। মেলার আয়োজক ‘জার্মান পাবলিশার অ্যান্ড বুক সেলার অ্যাসোসিয়েশন’। উল্লেখ করা বাহুল্য, সারা বিশ্বে যত বইমেলা আয়োজিত হয়, জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা তার মধ্যে সর্ববৃহৎ।
প্রতি বছর নভেম্বর মাস থেকেই শুরু হয়ে যায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং তার পার্শ্ববর্তী কয়েকটি রাজ্যে লিটল ম্যাগাজিন মেলা এবং বইমেলা। এবং এই দুই মেলার আবহেই জানুয়ারি মাসে আয়োজিত হয় কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা। যদিও আমরা বলে থাকি ‘আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা’, কিন্তু সরকারীভাবে স্বীকৃত নাম ‘আন্তর্জাতিক কলকাতা পুস্তকমেলা’ (পূর্বনাম ‘কলিকাতা পুস্তকমেলা’)। পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় এই বইমেলা শুরু হয়েছিল বিগত শতাব্দীর ১৯৭৬ সালে। বেশ কয়েকবছর চলার পর ১৯৮৪ সালে আন্তর্জাতিক বইমেলার স্বীকৃতি অর্জন করে। তবে একথাও প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে, যদিও এই বইমেলা আন্তর্জাতিক বইমেলা রূপে বিশেষিত, কিন্তু মেলায় সিংহভাগ অংশগ্রহণ করে বাংলা প্রকাশনা। সঙ্গে অবশ্যই অংশগ্রহণ করে ইংরেজি, হিন্দি, ঊর্দু প্রকাশনাও। এছাড়াও বিদেশি দূতাবাসগুলিও স্টল বা প্যাভিলিয়ন সাজিয়ে নিজ নিজ দেশে প্রকাশিত বইপত্রের প্রদর্শনী ও বিপণন করে থাকে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও ভারত সরকারের বাংলা প্রকাশনা বিভাগগুলিও এই মেলায় অংশ নিয়ে থাকে। সেইসঙ্গে ফ্রাঙ্কফুট বইমেলার আদলে প্রতি বছর মেলায় অংশগ্রহণকারী একটি বিদেশি রাষ্ট্র ‘ফোকাল থিম’ ও অপর একটি রাষ্ট্র ‘সম্মানিত অতিথি রাষ্ট্র’ নির্বাচিত হয়। সেইসব দেশের প্রকাশনা সংস্থাগুলি অংশগ্রহণ ক’রে কলকাতা বইমেলার আন্তর্জাতিক মানকে গৌরবান্বিত করে। প্রাসঙ্গিক আলোচনায় আরও উল্লেখ করা যেতে পারে, কলকাতা বইমেলা বিশ্বের বৃহত্তম অবাণিজ্যিক বইমেলা, ফ্রাঙ্কফুর্ট বা লন্ডন বইমেলার মতো বাণিজ্যিক বইমেলা নয়। কলকাতা বইমেলায় ফ্রাঙ্কফুর্ট ও লন্ডন বইমেলার মতো গ্রন্থপ্রকাশনা, পরিবেশনা এবং অনুবাদ সংক্রান্ত কোনো চুক্তি বা বাণিজ্য হয় না। বরং বইয়ের প্রকাশকরা ও পরিবেশকরা সাধারণ মানুষের কাছে তাদের বইয়ের প্রদর্শনী, প্রচার ও বিক্রি করে থাকে। সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির পীঠস্থান কলকাতায় তাই এই বইমেলা কলকাতার প্রাচীন ঐতিহ্য ও পরম্পরার অনুসারী।
প্রতি বছরের মতোই, আশাকরি, ‘আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা’ এবং ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ স্মরণীয় হয়ে থাকবে দুই দেশের অগণিত সাহিত্যপ্রেমী পাঠক-পাঠিকা, লেখক-লেখিকা এবং প্রকাশনা তথা পরিবেশনা সংস্থাগুলির কাছে।
ইংরেজি নতুন বছরের শুভেচ্ছা শ্রদ্ধা অভিনন্দন জানাই সবাইকে।
আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের ই-মেল ঠিকানা :
kajalsen1952@gmail.com
/ kalimationline100@gmail.com
দূরভাষ যোগাযোগ :
9835544675

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন