কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১৩৮

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১৩৮

রবিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬

পি. শাশ্বতী

 

গঙ্গরিডিই কি দেগঙ্গার চন্দ্রকেতুগড়

 




পৃথিবীর ইতিহাসে এই সত্য চিরায়ত যে, নগরসভ্যতা গড়ে ওঠে মূলত নদীকেন্দ্রিক অবস্থানে। আর তাই  নদীমাতৃক দেশ আমাদের ভারতবর্ষেও সমস্ত নগরসভ্যতা গড়ে উঠেছে নদীকে কেন্দ্র করেই। আবার নদী তার গতিপথ পরিবর্তন করলে, কালের করাল গর্ভে হারিয়ে যায় কত না শক্তিশালী ঐতিহ্য মণ্ডিত জনপদ। এমনকি আস্ত একটা জাতির ইতিহাসও। এই সেই করাল গ্রাসের শিকার হয়েছিল উত্তর চব্বিশ পরগণার অধুনা দেগঙ্গার চন্দ্রকেতুগড় রাজ্যের প্রাচীন ইতিহাস।

ইতিহাসের পাতায় চন্দ্রকেতুগড়ের কথা খুব বেশি দেখা যায় না। অথচ মহেঞ্জোদাড়ো-হরপ্পার বিবৃতি বহুল প্রচলিত। মহেঞ্জোদাড়ো-হরপ্পায় প্রাপ্ত প্রত্নতত্ত্বগুলির অনুরূপ নিদর্শন পাওয়া গেছে চন্দ্রকেতুগড়েও। এগুলি প্রমাণ করে চন্দ্রকেতুগড়ের প্রাচীনত্ব। এখানে আজপর্যন্ত যেটুকু খননকার্য করা হয়েছে, তার থেকে প্রাপ্ত নানা ঐতিহাসিক প্রত্ন নিদর্শনে এটা প্রমাণিত যে, এই অঞ্চল ছিল এক সময়ের গৌরবোজ্জ্বল একটি বন্দরনগরী। একই সঙ্গে চন্দ্রকেতুগড়, অতীতের এক ব্যস্ততম বাণিজ্যবন্দর। বঙ্গ ও বাঙালির দুর্ভাগ্য, এই সমৃদ্ধ নগরী চন্দ্রকেতুগড়ের কোনো লিখিত ইতিহাস নেই। তার প্রাচীনতা ও গৌরবত্বের সাক্ষী নানা চারণ কবিদের গান ও তৎকালীন সাহিত্যাবলির মধ্যেই বেঁচে আছে। এছাড়া আর কিছু ক্ষেত্রে বিদেশি পর্যটক ও ঐতিহাসিকদের গবেষণামূলক প্রবন্ধেই যা উল্লেখ পাওয়া যায়। বাকিটা সবই ছড়িয়ে আছে এখানে প্রাপ্ত  প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে; যারা নির্বাক, তবুও সাক্ষ্য দেয় হাজার হাজার বছরের পুরনো জনজীবনের এক অবিশ্বাস্য প্রবহমানতার। হ্যাঁ, কালের নিরিখে তা আজ অবিশ্বাস্যই বটে।

প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে এই অধিবসতির উত্থান ছিল প্রকৃত অর্থে তাৎপর্যময়। গবেষকদের অনুপ্রাণিত করে এর ভৌগোলিক অবস্থান। এর মূলে কতখানি সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেরণা বিদ্যমান তা পুরাতাত্ত্বিকদের গবেষণার বিষয়। মাতলা, পিয়ালী, বিদ্যাধরী, হৃদয়ভাঙা ইত্যাদি নদীর প্রাচীন গতিপথ একদা নৌবাণিজ্যকে কতটা প্রভাবিত করেছে তার পূর্ণ চিত্র আজও রচিত হয়নি।

চন্দ্রকেতুগড়ের মূল সমৃদ্ধি বিকশিত হয়েছে মৌর্য, শুঙ্গ এবং কুষাণযুগের শিল্পশৈলী চিহ্নিত পর্ব সমূহে। যে কালে সাম্রাজ্য বিস্তার, সংঘর্ষ, সাংস্কৃতিক উত্থান ও আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য সৃষ্টি করেছিল জীবনের বর্ণছটা। কুশাণযুগের পরবর্তী শতাব্দীসমূহে চন্দ্রকেতুগড়ের সমৃদ্ধি নবরূপ ধারণ করলেও এই নগরী অথবা অধিবসতির প্রকৃত গৌরবময় দিনগুলি আরও অনেক আগে বিভিন্ন সাম্রাজ্যের পতন ও অভ্যুদয়ের মধ্যে দিয়েই অতিবাহিত হয়েছে। বাণগড় (পশ্চিমদিনাজপুর), মহাস্থানগড় (বাংলাদেশ), তাম্রলিপ্ত (মেদিনীপুর জেলায় অবস্থিত তমলুক), ও হরিনারায়নপুর (২৪ পরগনা জেলা)-এর সমৃদ্ধির যুগে চন্দ্রকেতুগড়ে যে এক সুবিস্তৃত বন্দরনগরী ছিল এতে কোনো সংশয় নেই। সে বিষয়ে তথ্যের অভাব নেই; তাই এটি কোনো কল্পনা নয়, প্রমাণিত সত্য। আর তাই আমরা গর্বিত, সেইযুগের এক প্রাণবন্ত আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির উত্তরসূরি হিসেবে। প্রায় দু-হাজার বছর আগে বঙ্গোপসাগরকে নিয়মিতভাবে অতিক্রম করেছে ভারতীয় এবং বিদেশি নাবিকরা। ভৌগলিক অবস্থান, অধিবসতি স্তর, অফুরন্ত প্রত্ন নিদর্শন, নামের সঙ্গে সাদৃশ্য ও নগরীর জীবনেতিহাস নিয়ে গবেষকদের নিরন্তর গবেষণা স্পষ্ট করে তুলেছে  এখানকার বৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্যময় সমৃদ্ধ বিলুপ্ত শহর ও সভ্যতার বিস্তৃত প্রেক্ষাপট চন্দ্রকেতুগড়ের গৌরবময় অতীতকে। রহস্যের আবরণ ছেড়ে উজ্জ্বল স্পষ্টতর হয়ে উঠেছে হারিয়ে যাওয়া দ্বিগঙ্গা - যার থেকে প্রচলিত নাম হয়েছে দেগঙ্গা। আর সেখানেই ছিল বেড়াচাঁপা, চন্দ্রকেতুগড়।

তাম্রলিপ্তের ইতিহাস থেকে আমরা জানি, এই বন্দরের হাত ধরেই এক সময় বহির্বিশ্বে বৌদ্ধধর্ম প্রচার থেকে শুরু করে স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ, লবণ তৈরি এবং সর্বোপরি এক সমৃদ্ধ বাণিজ্য বন্দর হিসেবে সুপ্রাচীন তাম্রলিপ্ত বা তমলুক বন্দর সর্বজনবিদিত।

সেই জায়গায় কিন্তু খুব বেশি পরিচিত নয় গঙ্গারিডাই বা গঙ্গারিডি জাতি ও ঐতিহ্যে ঐশ্বর্যে সুসমৃদ্ধ রাজধানী শহর গঙ্গে বা গঙ্গার সঙ্গে। এখানে কিছুটা লজ্জা বোধ হয় যে, স্বদেশের কোনো ইতিহাসিক নথিতে  পাওয়া যায়নি এই প্রাচীন মহানগরীর কথা। রোম, গ্রিস, লাতিনের লেখক-ঐতিহাসিকদের লেখা থেকে উদ্ধার করতে হয়েছে হারিয়ে যাওয়া এই মহানগরীকে। মূলত তাঁরাই ব্যাপারে আলোকপাত করেছে 'পেরিপ্লাস অফ দি ইরিথ্রিয়ান সি' গ্রন্থে। একজন নাবিক এই নগরী সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। তাঁর বাড়ি গ্রিসে। গ্রিক ভাষাতে লেখা পুস্তকটির ইংরেজি অনুবাদ করেন ম্যাক্রিন্ডল ১৮৭৯ সালে এবং ডবলু. এইচ সফ ১৯১২ সালে। ১৯২২ সালে ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেন এক বাঙালি, যার নাম যোগীন্দ্রনাথ সমাদ্দার।

আজকের প্রজন্মের কাছে ‘গঙ্গারিডি' এক অজ্ঞাত বিষয়। বলতে গেলে আজকের প্রজন্মের কাছেও এই নামটি বিস্মৃত কোনো এক অধ্যায়। গঙ্গারিডি কোন জাতি, এই রাষ্ট্রের রাজধানীই বা কোথায়? কে-ই বা তার প্রতিষ্ঠাতা? এসব জিজ্ঞাসার উত্তর জানা যায় ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদারের 'বাংলার ইতিহাস' (প্রাচীন) গ্রন্থ থেকে। সেখানে তিনি লিখেছেন– "গ্রিকগণ গঙ্গারিডাই গঙ্গারিডি নামে যে পরাক্রান্ত জাতির কথা উল্লেখ করেছেন তাহারা যে বঙ্গদেশের অধিবাসী তাহাতে কোন সন্দেহ নাই।” অনেক ঐতিহাসিকদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র ‘বাংলার ইতিহাস’ ও ‘বাংলার কলঙ্ক’ প্রবন্ধে বলেছেন, গঙ্গারিডির অধিবা সীরা নিঃসন্দেহে বাঙালি। তাদের তেজস্বীতা পরাক্রমশীলতা বাঙালি চরিত্রের সমুজ্জ্বল দিক। শুধু তাই নয়, স্যার জন কাম্বেলও বলেছিলেন, ভারতবর্ষে তো বটেই সমগ্র এশিয়ার মধ্যে বাঙালি একসময় বীরত্ব ও  পৌরুষত্বে এথেন্সের অধিবাসীদের সমকক্ষ ছিল।

শ্রীনাথ সেন সম্রাট শাহজাহানের সময় রাজা উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। কায়স্থ বংশ গরিমায় 'দ্বিগঙ্গার সেন' কুলীন রূপে গণ্য হত। জানা যায়, শ্রদ্ধেয় সাহিত্যিক ও সম্পাদক জলধর সেন এবং বাংলা সাহিত্যের দিকপাল পণ্ডিত সুকুমার সেন দ্বিগঙ্গার সেন পরিবারের সন্তান। দ্বিগঙ্গার সেনেদের আদি রাজ্যপাটও ছিল দ্বিগঙ্গাতেই। শুধু তাই নয় দ্বিগঙ্গার আরও অতীত গৌরবস্মৃতি ধরা রয়েছে ইতিহাসের পৃষ্ঠায়। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় 'বাংলার ইতিহাস' গ্রন্থে লিখেছেন,   বালবল্লভীর অবস্থান আজও অজ্ঞাত, তবুও পণ্ডিতদের কেউ কেউ মনে করেন বালবল্লভী রাজ্যের একসময় খ্যাতি ছিল বিপুল। পণ্ডিত ভবদেব ভট্ট শুধুমাত্র রাজ্যের মহামাত্য ছিলেন না, তিনি ইতিহাসে অমর হয়ে রয়েছেন ব্রাহ্মণদের দশকর্মা পদ্ধতির প্রণয়ন করে। সে সময় এ রাজ্যের প্রাণকেন্দ্র ছিল দেগঙ্গা বা দ্বিগঙ্গা ছিল কর্মমুখর এক জনপদ।  এ সে ছিল দ্বাদশ শতকের কথা। দ্বিগঙ্গা চন্দ্রকেতুগড় পরিমণ্ডলে রয়েছে প্রাচীন মধ্যযুগের অনেক রোমাঞ্চকর ঘটনা। 

দিগ্বিজয়ী আলেকজান্ডারও প্রাথমিক স্তরে গঙ্গারিডি তথা বাঙালি জাতির বৈভব, বিত্ত, সাহস ও শক্তির কথা শুনে বঙ্গের দিকে এগিয়ে আসতে সাহস করেননি। গর্বের কথা, বীরত্বপূর্ণ অধ্যায়েরও জাতীয় ঐক্যের শুভ সূচনায় ছিলেন রাজা নন্দ। অবশ্য মৌর্যরাজ প্রতিষ্ঠাতা প্রথম চন্দ্রগুপ্তের সময়ই আলোকিত ও আলোড়িত হয় বন্দরনগরী গঙ্গে বা গঙ্গা। সমসময়ের বহুখ্যাত রাষ্ট্র প্রাচ্য ও তার রাজধানী পালিবোথরা বা পাটলিপুত্রের উজ্জ্বল পরিচয় থাকলেও অন্ধকারে রয়ে গেছে কর্ম চঞ্চল নগরী 'গঙ্গে' - যার প্রশংসা উচ্চারিত হয়েছিল ভূগোলবিদ টলেমি ও পিল্লির কণ্ঠে।

বন্দরনগরী গঙ্গের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন জাগে। জানার আগ্রহ হয় হাজার হাজার বছর আগে চন্দ্রকেতুগড়ের কী নাম ছিল, যোগাযোগের প্রয়োজনের যে স্রোতপথ তার উৎসগুলি কোথায়? নানা সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন উত্তর আসে এসব প্রশ্নের।

প্রাচীন কাব্যে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার গবেষক গোপেন্দ্রকৃষ্ণ বসুর লেখনী থেকে জানা যায় - “ভারতবর্ষের প্রাচীনতম মানচিত্র গ্রিক ভূগোলতত্ত্ববিদ টলেমির দ্বারা প্রস্তুত হয়েছিল। বর্তমানে দক্ষিণ ২৪ পরগনা যে  ভূভাগে অবস্থিত তাহা উক্ত মানচিত্রে গঙ্গারিডি রাজ্যের পশ্চিমাংশ রূপে প্রকাশিত হয়েছে।” ('Dr.D.C.Sarkar, The City  of Ganga')। জানা যায়, মহান তীর্থক্ষেত্র গঙ্গাসাগরের কাছাকাছি অবস্থিত ছিল এই গঙ্গেনগরী।





মতান্তরে  বাংলাদেশের যশোর নগর ছিল সুন্দর নগরী 'গঙ্গে'। এর মধ্যে দিয়েই উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে আর-এক নাম দ্বিগঙ্গা তথা চন্দ্রকেতুগড়। ভৌগলিক তথ্যে এ কথা সত্য প্রমাণিত হয়েছে যে, একদা দেগঙ্গা ও চন্দ্রকেতুগড়ের মধ্যে একটি নদী ধারা প্রবাহিত ছিল। একথার সমর্থন রয়েছে ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম প্রকাশিত পত্রিকায়: “Chandraketugarh has a chain of marshes intervented by dried up lands running better the above two places along the north side of the Calcutta- Basirhat Road.This proves that a river was flowing by Deganga and Chandraketugarh  and the latter was an important or a port of maritime activities.”

মনসামঙ্গলের চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙা পাল তুলে শুধুমাত্র সিংহল কিংবা সুমাত্রার পথে নয়, বাণিজ্য করতে আসত চন্দ্রকেতুর দেশেও। পতিপ্রাণা বেহুলার ভেলা-যাত্রায় ভেসে ওঠে নদীর গর্জনমুখর ফেনোচ্ছ্বাস। দ্বিগঙ্গার গঙ্গার খাতেই সে যাত্রা অব্যাহত ছিল। এ অনুমান করার মতো গবেষকের অভাব নেই। দিগঙ্গার ভৌগোলিক অবস্থানের বর্ণনা লিপিবদ্ধ রয়েছে কমলাকান্ত সার্বভৌম চরিত দেব ভাষায় লেখা 'দ্বিগঙ্গা রাজবংশমে'। পণ্ডিত মহেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় লিখিত 'বাসুকী কুলগাঁথা’য় সেকথার সমর্থন মেলে:

“ভাগীরথী নদীতীরে দীর্ঘ গঙ্গা গ্রাম

সর্বস্থানে দ্বিগঙ্গা বলিয়া ঘুষে নাম।

সুন্দর সে গ্রামখানি কি শোভা তাহাতে

সেই গ্রামে আদিশূর ছিল রমানাথে।"

দ্বিগঙ্গা বা দেগঙ্গার ইতিহাস ঘাঁটলে যেটুকু জানা যায়, সেটি হল মহারাজ আদিশূরের কাছ থেকে রুদ্র নারায়ণের পূর্বপুরুষ রমানাথ দ্বিগঙ্গা গ্রামটি বসবাসের জন্য উপহার পেয়েছিলেন। পরবর্তী উত্তরসূরি নন্দরাম সেন ইংরেজের চাকরিতে বড় রকমের পদে প্রথম বাঙালি ব্যক্তি। নন্দরাম সেন আদিতে যতদূর মনে হয় দ্বিগঙ্গার সেন কুলোদ্ভব বংশেই মানুষ ছিলেন।

আবার আর-একটি সূত্রে দ্বিগঙ্গাকে দীর্ঘ গঙ্গা বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। মঙ্গলকাব্যের ছন্দে লেখা ১০০ বছর আগেকার পুঁথি দেখে পূর্ণেন্দু পত্রীর 'পুরনো কলকাতার কথাচিত্র'-এ তুলে ধরা কাব্য দেখে তাই মনে হয়:

“দীর্ঘ গঙ্গা নামে স্থান সেন কুলোদ্ভব

তদপূর্বের বার্তা জানা নাহিক সম্ভব।

এলেন পুরুষ মহা দীর্ঘ গঙ্গা হইতে

জঙ্গল কাটিয়া বাস এখানে করিতে।”

অন্য এক ঐতিহাসিক লিখেছেন, “গঙ্গা নদীর যে দুটি স্রোত এখন ভাগীরথী ও গঙ্গা বলিয়া পরিচিত এই উভয়ের মধ্যবর্তী প্রদেশে গঙ্গারিডি জাতির বাসস্থান ছিল।” বৃহত্তর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ঐতিহাসিকদের এ উক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল দেগঙ্গা চন্দ্রকেতুগড়ের শহর সীমা।

ইতিহাসের উত্থান-পতনে এক আসনে বসে সমভাগী হয়েছে দিগঙ্গা ও চন্দ্রকেতুগড়। 'প্রাগৈতিহাসিক চব্বিশ পরগনা' প্রবন্ধে প্রয়াত প্রত্নগবেষক পি.সি. দাশগুপ্ত আলোকপাত করেছেন, চন্দ্রকেতুগড়, গোপালপুর, হরিনারায়ণপুর, আটঘরা ইত্যাদি স্থান বিস্ময়কর ভাবে প্রমাণিত করে যে আজ থেকে ২০০০ বছরের অনেক আগে ২৪ পরগণায় ছিল নানা সুরম্য নগরী ও নৌবন্দর যেখানে নিয়মিত আসত দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বাণিজ্যতরণী। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বন্দর শহর চন্দ্রকেতুগড়ের সৃষ্টি তাম্রলিপ্ত বন্দরের থেকে কোনো অংশে কম ছিল না -  একথা বলেছেন প্রত্নবিদ ডি.পি. ঘোষ। তাই স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন ওঠে, চন্দ্রকেতুগড় দ্বিগঙ্গাই কি সেই হারিয়ে যাওয়া রাজধানী 'গঙ্গা'? আজকের বিলুপ্ত 'পূর্ববঙ্গ রেলপথ' থেকে ১৯৪০ সালে প্রকাশিত বাংলায় ভ্রমণ (প্রথম খণ্ড)এ অনুমিত হয়েছে ইতিহাসে পেরিপ্লাস বর্ণিত গঙ্গে বা গঙ্গেরেডিয়া দেগঙ্গাতেই অবস্থিত। গবেষকদের চিন্তায় আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয়, চতুর্থ শতাব্দী থেকে শুরু করে গুপ্ত পরবর্তী সময় পর্যন্ত চন্দ্রকেতুগড় ছিল জাঁকজমকপূর্ণ শহর।

বহুগ্রন্থের লেখক বিনয় ঘোষ ‘পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি’ (তৃতীয় খণ্ড) গ্রন্থে বলেছেন: 'দেবগঙ্গা' দেগঙ্গা, দেবালয় ও অন্যান্য স্থানীয় স্মৃতি থেকে' কারও কারও মনে হয় গ্রিকদের বর্ণিত প্রাচীন গঙ্গারিডি জাতি ও রাজ্যের সাথে চন্দ্রকেতুগড়ের সম্পর্ক আছে।

অনুসন্ধানী, ঐতিহাসিক, গবেষক সতীশচন্দ্র মিত্র 'যশোহর খুলনার ইতিহাস' (প্রথম খণ্ড) গ্রন্থে সুন্দরবন তথা চব্বিশ পরগনার ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে বলেছেন: “গঙ্গারিডি রাজ্যের একটি প্রধান নগর ছিল গঙ্গে বা গঙ্গাবেজিয়া।... দ্বিগঙ্গাই ছিল গঙ্গাবেজিয়া বা গঙ্গা বন্দর।”

বর্তমানের দেগঙ্গার অতীত ইতিহাস দাঁড়িয়ে রয়েছে নানান নামে - গঙ্গার দুটি ধারা নিয়ে দ্বিগঙ্গা, দীর্ঘতার জন্য দীর্ঘগঙ্গা, দ্বীপরূপে অবস্থানের জন্য দ্বীপগঙ্গা, দেবরূপে কল্পিত হতায় দেবগঙ্গা নামগুলির মধ্যে লুকিয়ে  রয়েছে বিস্মৃত নাম 'গঙ্গে' বা 'গঙ্গা'। এমনিভাবেই একদিন আজকের তমলুক প্রাচীন বন্দর তাম্রলিপ্ত আত্মগোপন করেছিল দামলিপ্ত, টামালিটেন তামলিটি প্রভৃতি ইতিহাস সম্মত নামগুলির মধ্যে। আপাতদৃষ্টিতে প্রকাশিত চন্দ্রকেতুগড়ই খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীর পেরিপ্লাস বর্ণিত প্রাচীন বাণিজ্যনগরী গঙ্গে এবং খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে টলেমির বলা গঙ্গারিদাই - এই অভিমত জানিয়েছেন বানগড়, চন্দ্রকেতুগড় উৎখননাধিকারী ও মহেঞ্জোদড়োতে সশরীরে কাজ করার সৌভাগ্যের অধিকারী অধ্যাপক কুঞ্জগোবিন্দ  গোস্বামী। তাঁরই ভাষায়: "...the site of Chandraketugarh seemingly represents the ancient market town of Ganga of the  Periplus (1st cent A.D.) and Gangaridae of Ptolemy (2nd cent. A.D).”

পুরাতত্ত্ব বিশারদ ও গবেষক ধনঞ্জয় দাস মজুমদার পৌরাণিক কাব্য বিশ্লেষণ করে 'বাংলা ও বাঙালির ইতিহাস' (দ্বিতীয়  খণ্ড) গ্রন্থে লিখেছেন: “মহাভারতীয় যুগে প্রবঙ্গের রাজধানী ছিল তখনকার পূর্ব সাগরের মধ্যে ও পরবর্তী পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত সমবঙ্গ দ্বীপ। মহারাজবলির উত্তরাধিকার সূত্রে তাঁহার রাজলক্ষ্মীর অংশভাগী হয়ে এই পূর্ব সাগরে সমুত্থিত দ্বীপ-পুঞ্জের রাজা হন সমুদ্র সেন। সমুদ্র সেনেরই অন্যতম রাজধানী ছিল বর্তমান চব্বিশ পরগনার বেড়াচাঁপার নিকট চন্দ্রকেতুগড় দ্বীপে।”


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন