কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১৩৮

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১৩৮

রবিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬

শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী

 

ধারাবাহিক উপন্যাস

ইন্দ্রপুরী রহস্য

 


(৪)  

বিচিত্রবর্ণ

অপরাহ্নর রোদের আভায় আমাদের বসবার ঘরে বসে আছে বিনতা। গতকাল সেটে দেখা বেহুলার তুলনায় এই বিনতার ভিতর বেশ কিছুটা পার্থক্য আছে। গতকাল বেহুলার সেটে বেহুলা চরিত্রে বিনতার মুখে চোখে একটা আত্মবিশ্বাস আর সাহসের স্পর্শ ছিল। যেন সেই বিনতা মন থেকে জানে উত্তরণের পথ। আর আজকের এই বিনতার ভিতরেও সাহস আছে। শুধু তার দুটি চোখ দেখলেই অনুমান করা যায়, এই বিনতা তার দিশা হারিয়েছে। তাই সে আজ আমাদির বাড়ি আসবার আগে কালো বোরখা পরে এসেছে। সাহসিকতার পাশাপাশিই তার চোখেমুখে এক অজানা সংশয়। কেউ তাকে দেখে ফেলেনি তো! আশুদা মুখোমুখি বসে বলল, "বলুন। কাল কী বলবেন বলছিলেন?" বিনতা মাথা নিচু করে মনে হল নিজের চিন্তাগুলোকে খানিকটা গুছিয়ে নিল। তারপর বলতে শুরু করল।

-শুভায়ুদা এভাবে হঠাৎ চলে যাবে ভাবতেই পারিনি। আসলে এই ইণ্ডাস্ট্রিতে একমাত্র শুভায়ুদাই আমাকে বুঝত।

-কতোদিন আপনাদের পরিচয় ছিল?

-সাত আট বছর তো বটেই। শুভায়ুদা দাদার মতো আগলে রাখত আমাকে। নাহলে তো জানেনই, এই লাইনে যা সব চলে!

-শুভায়ুর কোনও শত্রু ছিল?

-ছিল তো। শুভায়ুদার সাফল্যকে ভিতরে ভিতরে সবাই হিংসে করত। বিশেষ করে রোহিত সিনহা। যদিও শুভায়ুদাই রোহিতকে ইন্ডাস্ট্রিতে এনেছিল। রোহিতের উচ্চারণে হিন্দিটান শুভায়ুদাই যত্ন নিয়ে ঠিক করে দিয়েছিল। সেই রোহিতই হয়ে উঠল শুভায়ুদার এক নম্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী। প্রোডাকশন হাউজগুলো সেটা টের পেয়ে এই শত্রুতায় ইন্ধন জোগালো। শেষে ব্যাপারটা এমন জায়গায় গড়ালো যে রোহিত একদিন শুভায়ুকে ঝগড়ার সময় প্রকাশ্যে জানে মেরে দেবার হুমকি দিয়েছিল।

আমি আর আশুদা চমকে উঠি। শিল্পীমহলে এই লড়ালড়ির গল্পের শেষ নেই। কিন্তু জানে মেরে দেওয়ার হুমকি আর তারপরেই শুভায়ুর এই অস্বাভাবিক মৃত্যু! এতো অভাবনীয়। বিনতা বলে চলে।

-অবশ্য এই ঘটনার নেপথ্যে ছিল তন্দ্রাদি।

তন্দ্রাদি, মানে কি তন্দ্রা বর্মন? জনপ্রিয় সিরিয়াল 'রাণী শিরোমণি'র নায়িকা! বিনতা মাথা নেড়ে এসির দিকে তাকিয়ে বলল, "একটা কথা বলি, ভীষণ গরম লাগছে। এটি খুলতে পারি?" বিনতা বোরখার কথা বলছিল। আশুদা সম্মতি দিতেই বিনতা বোরখাটা খুলে ফেলল। একটা হলদে ফুলকাটা হাতকাটা সালোয়ার পরেছে সে। হঠাৎ আমার ওর ডান হাতে গিয়ে নজর স্থির হয়ে গেল। বিনতার ডান হাতে উনালোমের ট্যাটু! যদিও ওপরের তিনটি বিন্দু নেই। বিনতা বলে চলল এক ত্রিকোণ প্রেমের গল্প।

রোহিত আর তন্দ্রা ছিল ইন্ডাস্ট্রিতে 'ঘোষিত যুগল'। ওই ড্রিম কাপল যেমন হয়। এদিকে এর ভিতরেই শুভায়ুর সঙ্গে তন্দ্রার একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল শিরোমণির সেটে। এই সম্পর্কর কথা প্রথমে কানাঘুষো ছিল। কিন্তু মন্দারমণির একটা রিসোর্টে এক জনৈক ইউটিউবার দুজনকে হাতেনাতে ধরে ফেলায় খবরটা রাষ্ট্র হয়ে যায়। শুভায়ুর স্ত্রী নবনীতা জানতে পারে। আর জানতে পারে রোহিত সিনহা। রোহিত এই ঘটনাটাকে মেনে নিতে পারেনি। রাগের বশে চড়াও হল একদিন শুভায়ুর উপর। তবে তন্দ্রা নিজেই মধ্যস্থতা করে ঘটনাটা চুকিয়ে দেয়। এরপর রোহিতের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে তন্দ্রা বলিউড পাড়ি দেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাটা ধামাচাপা পড়ে যায়। আশুদা শুনে বলল, "আচ্ছা, ইদানিং শুভায়ুর ভিতর কি কোনও চেঞ্জ লক্ষ্য, করেছিলে? "বিনতা ভেবে বলল, "চেঞ্জ ছিল তো। ভুলে যেত সব। তবে শুভায়ুদা  ইদানিং সবাইকে সন্দেহ করত। আমাকে একটা আশ্চর্য কথা বলত বারবার জানেন?"

-কী কথা?

-এটাই যে সবাই ওর শত্রু। সবাই নাকি ছদ্মবেশ ধরে ওর ক্ষতি করে দিতে চাইছে। ষড়যন্ত্র করছে ওর বিরুদ্ধে। অবশ্য মাঝেমাঝে আমার মনে হত, শুভায়ুদা ঠিকই বলছে। সত্যিই তো। এই যে আমি বোরখা পরে আপনিদের সামনে এসেছি। কেন? কারণ সত্যিই আশেপাশে অনেকগুলো শত্রু ঘাপটি মেরে রয়েছে।

-শুভায়ুর কোনও নেশা ছিল? কোনও পাউডারের নেশা?

বিনতা অবিশ্বাসের চোখ দিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, "ইমপম্বসিব্ল। শুভায়ুদার একটাই নেশা ছিল। সিনেমা। কিছুদিন রোজের সঙ্গে ছিল যখন, মদ খেত একটুআধটু। কিন্তু তারপর সেটাও না।

-রোজ কে?

-ক্যাবারে ড্যান্সার। আসল নাম দোলনচাঁপা। বাইপাসের ধারে একটা বারে গান করত।  অভাবী ঘরের মেয়ে। গুরুর উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিখতে শিখতে পেটের দায়ে একদিন ক্যাবারেতে নেমে আসতে বাধ্য হয়। নাম হয়ে গেল 'রোজ'। শুভায়ুদার সঙ্গে ওই গানের সূত্রেই আলাপ। ভালো গান গাইত শুভায়ু। গান শুনতে বারে যেত মাঝেমাঝে । একদিন রোজকে নিয়ে এল সেটে। প্লেব্যাক করাবে। বাজোরিয়া রাজি হবে না কিছুতেই। তারপর শেষমেশ রফা হল একটা গানে। তাই সই। কিন্তু ফাইনাল রেকর্ডিংএর দিন রোজকে আর পাওয়া গেল না।

-পাওয়া গেল না মানে?

-মানে মিসিং। আমরা কেউ জানি না রোজের কী হয়েছিল। ওই তো বললাম, এই স্টুডিওপাড়ার লোকগুলো  খুব সাঙ্ঘাতিক। কেউকেউ বলে ব্রজলাল বাজোরিয়া এই শুভায়ুদার জোর করে রোজকে দিয়ে প্লে ব্যাক করানোটা ভালো চোখে নেয়নি। সোজাসুজি আপত্তিতে কাজ না হওয়ায় টাকা দিয়ে গুম করে দিয়েছে।

-আচ্ছা, এই বাজোরিয়া লোকটা ঠিক কেমন?

অপরাহ্ন গোধুলি হয়ে ক্রমশ সন্ধ্যায় হেলে পড়েছে। অথচ আশুদা আর বিনতার কথোপকথনের চৌম্বকীয় আকর্ষণ ছেড়ে আমার ঘরে লাইট জ্বালিয়ে দেবার শক্তিটুকুও যেন নেই। আলোআঁধারিতে যেন সেই আকর্ষণ আরও রোমাঞ্চকর হয়ে উঠছে।

-বাজোরিয়া লোকটা এক কথায় একটা সেয়ানা ক্রিমিনাল।

-কেন এইরকম বলছেন?

-কোনও গুণ বাদ রাখেনি লোকটা। পয়সার জন্য সব পারে। ওর অনেক দুনম্বরি ব্যবসা আছে। আমি সবটুকু জানি না। সব জানলে ও আমাকে খুন করে দেবে। একটা ওষুধের কারখানা আছে শুনেছি, হীরে চোরাচালান করে, আর...

-আর?

-মাপ করবেন। এটা বলতে পারব না আমি। ওবে এটুকু বলতে পারি, লোকটার চরিত্র একদম ভালো নয়। ওর সেটে কোনও ভদ্রমেয়ে কাজ করতে চায় না। শুভায়ুদার সংসারটা তো ওইই ছাড়খাড় করে দিল।

-কীভাবে?

-আপনারা বাজোরিয়ার সঙ্গে নবনীতা ম্যাডামের স্ক্যান্ডালটা জানেন না?

আমরা দুজন ঘাড় নাড়ি। রাস্তার আলো ধাক্কা খেয়ে ঘরে ঢুকে আমাদের তিনজনের ছায়াবয়বগুলো আমাদের তিনগুণ করে তোলে। বিনতা বলে চলে।

-বাজোরিয়ার সঙ্গে নবনীতা ম্যাডামের সম্পর্ক আছে। শুভায়ুদা সেটা জেনেও কিছু বলেনি। নবনীতা ম্যাডিমকে মডেলিংএর টোপ দেখিয়ে ফরেন ট্রিপে নিয়ে যেত বাজোরিয়া। যাক গে। আজ রাত হয়ে গেল। আমি এবার চলি।

তড়িঘড়ি উঠে পড়ল বিনতা। গায়ে আবার সেই বোরখাটা পরে নিল। আমি ঘরে আলো জ্বালাতেই লক্ষ্য করলাম নদিতে ভাসমান মান্দাসের মতো বিনতার চোখের দুটি মণি যেন ভাসছে। আর সেই দুই চোখ অশ্রুটলমল। আশুদার হাত ধরে বিনতা প্রস্থানোদ্যত হয়ে বলল, "শুভায়ুদা আমার কাছে দেবতার মতো ছিল। শুভায়ুদা আত্মহত্যা করেনি। ওকে মারা হয়েছে। আমি নিশ্চিত। কিন্তু আজ সব কথা আমি বলতে পারব না এইটুকু সময়। ফ্ল্যাটে আমার ওপর নজর রাখা হয়েছে। দেরী করে ঢুকলে চোখে পড়ে যাব। আমার কার্ডটা আপনারা রাখুন আশুদা। আপনার আর অর্কবাবুর নম্বরটাও আমি রাখলাম। পরে সুযোগ বুঝে আরও অনেক কিছু বলব। আমি চাই আপনারা আসল অপরাধীকে শাস্তি দিন।"

বিনতাকে গাড়ি করে এগিয়ে দিতে চাইলাম। কিন্তু ও রাজি হল না। আশুদা বলল নীচে অবধি এগিয়ে দিতে। লিফ্টে নামতে নামতে ভাবলাম একটা ছোট্ট ডিসেকশান আমিও করে ফেলি। ওই উনালোম ট্যাটুর পিছনে লুকিয়ে থাকা রহস্যটা জানা দরকার। তাই কৌশল করেই বললাম,"আপনার হাতের ওই ট্যাটুটা কিন্তু শুভায়ুবাবুর হাতেও দেখেছি। বেশ লাগে দেখতে। কোথা থেকে করিয়েছেন যদি একটু বলতেন, আমি করাতাম..."

লিফ্টের দরজা খুলতে গিয়ে বিনতার দুটি চোখ আশ্চর্য বিস্ময়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল এক মুহূর্ত।

-সত্যিই করবেন?

খানিকটা সামলে নিয়ে বিনতা বলল, "ওটা আমাদের টলিপাড়ায় অনেকের হাতেই পাবেন। ট্যাটুটা একজন এসে করে যেত। ওর নম্বর আছে। আমি পাঠিয়ে দেব। তবে এটা বলবেন না যে আমি আপনাকে নম্বরটা দিয়েছি। ছেলেটার নাম সম্ভবত আসিফ। লিণ্ডসে স্ট্রিটে ওর একটা দোকান আছে শুনেছি। যাইনি কখনও। আমি পাঠিয়ে দেব।" বলতে বলতে উবেরে চড়ে বসল বিনতা। আমার দিকে এক ঝলক তাকিয়েই অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। লিফ্টে ফিরতে ফিরতে দেখলাম বিনতা সত্যিই আমাকে আসিফের নামটা হোয়ট্সআপ করেছে। সোৎসাহে ফ্ল্যাটে ফিরে দেখি আশুদা গভীর মনোযোগ দিয়ে ফোনে কারো সঙ্গে কথা বলছে।তারপর ফোন সেরে আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হেসে বলল, "ট্যাটুওয়ালার নম্বরটা দিল মেয়েটা?"আমি অবাক হয়ে বললাম, "তুমি জানলে কী করে?"

আশুদা হেসে বলল, "ওই রিসার্চ গ্যাপটা আমি ইচ্ছে করেই রেখেছিলাম তোর জন্য। ওই নম্বরটা ট্রেস করতে হবে। একবার আমাদের যেতেও হবে লোকেশনে। তোর সিনিয়র সম্বরণদা আমাকে ফোন করেছিল। টক্সিকোলজি রিপোর্ট এসে গেছে। দুটো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। এক। শুভায়ুর রক্তে ফেনসাইক্লিডিন পাওয়া গেছে। যা স্ট্রিটড্রাগবাজারে 'অ্যাঞ্জেল ডাস্ট' নামে পরিচিত।

-অ্যাঞ্জেল ডাস্ট! মানে ঈশ্বরের ধুলো!

-ঠিক। এর থেকে বোঝা গেল বিনতা আমাদের আজ যা যা বলল, সব তথ্যই সঠিক নাও হতে পারে। হয় ও জানত না শুভায়ু নেশা করে, নয়তো ইচ্ছে করেই আমাদের ভুলপথে চালিত করার জন্য তথ্যটি চেপে গেছে।

-আর সম্বরণদার দেওয়া দ্বিতীয় তথ্য?

-আমার অনুমান সঠিক। শুভায়ুর দেহে উনিলোমের যে উল্কিটি ছিল, তার উপরের তিনটি বিন্দুতে কড়া মাত্রায় পারদ রয়েছে।

-এর মানে, পারদ নিজেই মস্তিষ্কবিকৃতি ঘটাতে পারে। আর অ্যাঞ্জেল ডাস্ট তো একটা এমন মাদক যা নিজেই হ্যিলুজিনেশন ঘটাতে পারে। এর জন্যই কি শুভায়ুর মনোবিকার?

-নিঁখুত অর্ক। তোর বুদ্ধির ধার এবার ডিপ ডিসেখশনির যোগ্য হয়ে উঠেছে। এখন আমাদের দেখতে হবে, এই মাদকগুলো শুভায়ু জেনে না না-জেনে নিত। আশীষ হালদারের কথা ঠিক হলে ফেনসাইক্লিডিন শুভায়ু  জেনেই নিত। কিন্তু আমার মন বলছে, এই পারদগ্রস্থ উল্কিকালির কথা শুভায়ু জানত না।

-তাহলে কে ছিল এর পিছনে?

-এখন সেটাই বের করতে হবে অর্ক। তুই ট্যাটুর উৎস সন্ধান কর, আর আমি একটু লোক লাগাই। বিনতার কথায় যা বুঝলাম, এই শুভায়ু দে মানুষটার চরিত্রে অনেকগুলো রঙ ছিল। আমাদের আরেকটু গভীরে গিয়ে ব্যবচ্ছেদ করে সেই সংযোগগুলোর অরিজিন ইনসার্শন বের করতে হবে।

আলো জোরালো হলে ছায়ারা অদৃশ্য হয়ে যায়। আবার অন্ধকার ফিরে এলে ছায়ারা ফিরে আসে। রাতের আঁধারে আমি দেখলাম বিনতার দুই চোখের ছলছল জলতরঙ্গর প্রকৃত কারণ আমাদের ব্যবচ্ছেদের চোখ

এড়িয়ে গেছে।

(ক্রমশ)


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন