![]() |
| সমকালীন ছোটগল্প |
ফেল করলেও ফেলনা নয়
(নেপথ্যে গান - তুমি যে আমার ওগো তুমি যে আমার…)
সাবেরী - সুমি, তোর গান তোলা হয়ে গেলে মাসিকে এগিয়ে দিয়ে ফেরার পথে টুকাইকে একবার আসতে বলিস তো! তাড়াতাড়ি ফিরিস আজ, তোর রেজাল্ট আনতে যেতে হবে। আজ তোর বাবা কী একটা সারপ্রাইজ দেবে বলেছে। তাড়াতাড়ি ফিরবি কিন্তু, আমি মন্দিরে যাব। কী যে রেজাল্ট আনবি কে জানে!
সলিল - সাবেরী ও সাবেরী! কোথায়
গেলে গো আমার সাবেরী, কাবেরী, গোদাবরী, মন্দোদরী, লালপরী, স্ট্রবেরী, ব্ল্যাকবেরী,
নকশালবাড়ী, বাড়াবাড়ি আমার - কোথায় তুমি?
-এইয্যে হেতায় - তোমার হারাকিরির ব্যবস্হা করছি।
ব্ল্যাকবেরী না? তাও যদি রংটা তোমার মায়ের মত পেতে! হুঁঃ - মন্দোদরী, নকশালবাড়ী!
তা ব্যাপারটা কী বলো তো? অফিস থেকে ফিরে যে ছন্দমিলের পিচকারী ছোটাচ্ছো একেবারে!
-তা দশঘন্টা পঁয়তিরিশ মিনিট পরে অফিস থেকে ফিরে
পরের সুন্দরী বৌ-এর মুখ না দেখলে ঐসব হাজিবাজি একঘেয়ে স্যান্ডউইচ হজম হয়? মাঝে মধ্যে
মুখবদল করতেও তো ইচ্ছে হয়!
-মুখ বদল করাচ্ছি! পরের বৌ মানে, মানেটা কী?
-তাছাড়া আবার কী! আমাকে তো একেবারে পর করে দিয়েছ।
আধঘন্টা, তিরিশ মিনিট - বাইরের ঘরেই বসে বসে জাবর কাটছি।
-ইস্-স্-স্ কী মিথ্যুক! আধঘন্টা? তা যাও না, যাও
ঐ সুজন মিত্তিরের ঢলানী বৌটার কাছে! চা খেতে! আঁচলের বাতাস খেয়ে এসো! চিনি না দিলেও
তো ওর ছ্যাড়ছ্যাড়ে চা তোমার মিষ্টি লাগে। পাটিসাপ্টা পুড়িয়ে কয়লা করলে তুমি ওর
ভেতরেও হীরে খুঁজে পাো। আসলে তোমার হজমের গোলমাল হলে আবোল তাবোল বুলি বেরোয় কেন জান?
PNPC-র তাল তখন তোমার পেটের মধ্য গোল পাকায়। তাই না? তা এখন কোন ব্যাপারটা তোমায়
সুড়সুড়ি দিচ্ছে? কী এমন জবর খবর আছে তোমার ডাস্টবিনে, বলে তো!
-হেঁঃ হেঁঃ হেঁঃ, ঠিক ধরেছ ম্যাম্, এক্কেবার জব্বর
খবর। শুনলে ঐ গব্বর সিংও কবরের মধ্যে নড়াচড়া শুরু করে দেবে। আরে কাছে এসো না, এসব
সিরিয়াস কথাবার্তা এত দূর থেকে বেতার মারফৎ চলে না কী!
-না না না, এখানেই ঠিক আছি। সুমি যখন তখন ঢুকে পড়তে
পারে।
-আরে ঠিক আছে, ঠিক আছে। এখন কাছে কোথাও কেউ নেই
তো, পি এন পি সি করি এসো না, তোমার হৃদয় যে চায় সবই শুনতে, তবে মুখে করো কেন ছলনা,
তুমি আর বোল না - না না না, আরও কাছে এসো…
-ইস্, তোমার আজেবাজে কথা কাছে গিয়ে শুনতে আমার
বলেই গেছে -
-ওঃ হো, আমি না আমি না, স্বয়ং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়
গেয়ে গেছেন।
-(সাবেরী সুর পাল্টে আদুরে গলায়) এই বলো না, বলো
না কিস্যাটা কার গো? ঐ মিরচন্দানীর বউ?
-আরে দূর দূর, ওটা তো কবে কোল্ড স্টোরেজে ঢুকে ভ্যাদভ্যাদে
হয়ে গেছে। গড়গড়ি গো গড়গড়ি। মনে নেই, আমি যখন নতুন গাড়িটা কিনলাম, জি এমের পার্টিতে
কত নমুনা করল। “সিটি কিনেছেন বাবু, হন্ডা সিটি। বাড়িতে কাঁচকলা সেদ্ধ খেয়ে, তহবিল
নয়ছয় করে গাড়ি কিনলেন!” তা এবারে তোর কী হল রে - এ্যাঁ? অতো মেয়ে মেয়ে করতিস, সে
তো পানওয়ালার সঙ্গে ফুরুৎ ধা!
-(সাবেরী সোৎসাহে) এ্যাঁ - বলো কি গো, সত্যি? পালিয়েছে?
পানওলার সঙ্গে? আমি তখনই বলেছিলাম না - ও খেলুড় মেয়ে, এমনি ফ্যালা যাবে, শকুনের চোখ
পড়বে না? তা কী হয়েছে গো বলো না! দাঁড়াও দাঁড়াও, একটু গুছিয়ে বসি, এই এবার বলো-
-ম্যাডামের যে বড় ইন্টারেস্ট দেখি! এই শোন না একটু
চা হবে না তোমার হাতে? তোমার না, হাতের গুণ দিন দিন দুইগুণ তিনগুণ চারগুণ…
-(সাবেরী ঝামটা মেরে) থামো থামো, তোমাকে আর গুণগুণাতে
হবে না। বলো তো সব গুছিয়ে, ও সব চা-টা পরে হবে। একেবারে গোড়া থেকে বলো। এঃ, শেষে
একটা পানওলা? কেলেঙ্কারীর চূড়ান্ত একেবারে।
-আরে, তাহলে আর বলছি কী - একেবারে রামকেলো। ঐ যে
মোড়ের পানওলা ছোকরাটা ছিল না, রঙচঙে গেঞ্জি পরতো, আর তেমন তেমন মেয়ে দেখলে আবার শীষ
দিত! সেই ছোকরাই তো! আচ্ছা এক মিনিট, এক মিনিট। সুমি কোথায়, ফিরেছে? ওকে রেডি হতে
বল। আজ তো ওর রেজাল্ট বেরোল, তাই না? ‘চাক্ দে ইন্ডিয়ার’ টিকিট এনেছি আয়নক্স-এ। শুনেছি
ফাটাফাটি, লাঠালাঠি…
(সাবেরী) - সুমি এই সুমি! অবেলায়
ঘুম দিচ্ছিস নাকি? তোরা পারিস বাবা! এই সুমি - উরিব্বাবা, সুমি যে একেবারে টিপু টুপু
ঠাকুমা হয়ে গেল! ঘরদোর গোছানো, বিছানা পরিপাটি, ছাড়া জামাকাপড় নেই, আলমারির পাল্লা
বন্ধ, ড্রেসিং টেবল ঝকঝকে, আবার বাথরুমের একজস্ট বন্ধ!
-সে তো বুঝলাম। তা ঠানদিদিটি গেলেন কোথায়? সুমি,
এ্যাই সুমি!
-দাঁড়াও দাঁড়াও, এটা কী? এ তো একটা চিঠি দেখছি,
সুমিরই লেখা যে! আমার না খুব ভয় করছে, আমি পারব না। তুমি দেখো তো কি লিখেছে, কিছু
কেলেঙ্কারী বাধাল না কি ঐ গড়গড়ির মেয়েটার মতো? দেখো, দেখো না, দেখো -
-আঃ, ভাল গেরো তো! প্রথমেই এতো ঘাবড়ে যাও কেন?
আগে দেখি না! হ্যাঁ সুমি-মা’রই তো লেখা দেখছি!
“মা বাবা, আমি চলে যাচ্ছি। তোমাদের
সামনে কোন সিন ক্রিয়েট করতে চাই না আর আত্মীয় বন্ধুদের কাছেও তোমাদের জবাবদিহির কোন
দরকার নেই। আমাকে খোঁজার চেষ্টা কোর না। মা, তুমি ঠিকই ধরেছিল, ঐ যে একদিন আমাকে রাত দশটায় বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গিয়েছিল,
সে-ই আমার পটকা’ - ওটা কিন্তু ওর লাইনের নাম, পদবীটা ও জানে না, ওর মা-ও নাকি বলতে
পারেনি। ও বলছে পদবী নয়, নাম দিয়েই মানুষ নামী দামী হয়। ও পরশু জেল থেকে বেরিয়েছে
মা, বেইল পেয়েছে আর বলেছে কোন ভয় না কি নেই। ওদের ‘ওস্তাদ’ যে ওকে ড্রাগ সার্কিটে
নামিয়েছিলো, তারসঙ্গে সব ওপরওয়ালাদের সাংঘাতিক দহরম মহরম। যখনই ধরা পড়বে, বেইল পাবেই।
দুদিনের বেশী জেলের ভাত খেতেই হবে না। ধানবাদের কাছে একটা বিশাল ফার্মহাউস আছে, সেখানেই
আমার পটু কাজ করবে - অবশ্যই অন্য নাম পরিচয় নিয়ে। ওখানেই তো মারিজুয়ানা আর ললিপপ্
প্যাকিং হয় আর চালানও হয় চারদিকে। এবার আর নিজের জন্যে মারিজুয়ানা জোগাড়ের উদ্দেশ্যে
এদিক সেদিক ছ্যাঁচড়ামো করতে হবে না ম! ওফ্ - যা এক একটা দিন গেছে, দেখেছি তো চোখের
সামনে। ঠিক ডোজটা সময়মত না পেলে একেবারে পাগল হয়ে যেতো। দুএকটা খুনও নাকি করেছে ঐ
অবস্হায়। বাব্বাঃ। তা এখন সারাজীবনের নেশার খোরাক তো হাতের মুঠোয় আর তা ছাড়া এদিক
সেদিক করে বিক্রি সাফাই করে আমাদের দুজনের সংসার ভালভাবেই চলে যাবে।
ওমা, দুজন বলছি কেন? তোমরা নিশ্চয়ই
শুনে খুশী হবে আগামী চার মাসের মধ্যেই তোমরা দাদু-দিদা হতে চলেছ। আমার পটু তো ভীষণ
খুশী। বলছে, আমাকে বিয়ে না করলেও বাচ্চা নস্ট হতে দেবে না, বরং বাড়ি ভর্তি করে অনেক
দেবশিশু আনতে চায় ও, বলে আমার মধ্যে নাকি ‘মা’ হবার অনেক সম্ভাবনা আছে, আমি আর না
বলব না মা। দুএক বছর পরে তোমাদের রাগ দুঃখ কমলে যখন তোমাদের কাছে যাব, দেখো তোমাদের
জন্যে অন্ততঃ দু তিনটে নাতি নাতনী নিয়ে যাব। ওদের জন্যে বেশ কয়েকটা ট্রেন্ডী নাম
নেট থেকে বের করে রেখে তো বাবা।
আর ততদিনে, ভগবান আছেন - নিশ্চয়ই
ওর এইডস্ একটা মোক্ষম ওষুধ বেরিয়ে যাবে, বলো? বিজ্ঞানীরা পারবে না? তোমরা ওর জন্যে
একটু প্রার্থনা কোর মা, ও যেন এই অসুখটা থেকে শিগ্গীরই নিস্তার পায়। হ্যাঁ, অসুখের কথায় বলি, ওর বুকের অসুখটা
এখন ধরা পড়েছে, ওটা টিবি-ই। এবার নিশ্চিন্তে ট্রিটমেন্টটা শুরু করা যাবে, টাকাপয়সার
তো অভাব থাকবে না।
তোমরা কিন্তু আমার জন্যে চিন্তা
কোর না মা, আমি মাঝে মাঝে ফোন করব। ইন ফ্যাক্ট, একটু পরেই করবো। আমার তো ষোল বছর হয়ে
গেছে, কি করে জীবনের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়, আমি ওর কাছ থেকে ভাল করেই শিখে নিয়েছি
মা।
ওহো বাবা, টাটু, পিয়ার্সিং, নাটবল্টু
লাগানো মোটরবাইক মার্কা জ্যাকেট, পনি টেল এসব যে তুমি একেবারেই পছন্দ করো না আমি বলেছি
ওকে। ও কি বলছে জান মা, এত দুষ্টু না! বলছে - ঐ মাস্তান টাস্তানী করতে গেলে এরকম সাজগোজ
খুব দরকার, একটু গুছিয়ে নিতে পারলেই ওগুলো ফেলে দেবে, তোমার সামনে পরবেই না, প্রমিস্! তোমরা ভালো থেকো -
ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং…
(অবসন্ন গলায়) – হ্যালো!
-হ্যালো বাবা, আমি সুমি।
-সুমি, সুমি মা, তুই কোথা থেকে কথা বলছিস? এক্ষুনি
ফিরে আয় মা, ফিরে আয়। কোথায় আছিস বল, আমরা এক্ষুনি…
-বাবা শোন, ঐ চিঠিতে যা লিখেছি…
-জানি রে মা জানি, জানি। তোকে ওসব নিতে আর ভাবতে
হবে না, মা’র দিকটা আমি ঠিক সামলে নেব। কোথায় ইংল্যান্ড-এ এ্যাকাউন্সি পড়তে পাঠাব
আর তুই, তুই এটা কি করতে চলেছিস মা?
-মা, বাবা, চিঠিতে যে কথাগুলো লিখেছি সেগুলো একেবারে
সত্যি।
-ভুলে যা মা, ভুলে যা, ওসব ভুলে যা!
-ভুলব কী করে বাবা? রাত জেগে কত খসড়া করে লিখেছি
ওটা, তোমরা কতটা আঘাত পাবে আন্দাজ করে। কত ঘুম নষ্ট করেছি দু তিন রাত্তির জেগে।
-ছেড়ে দে, যদি খুবই খারাপ কাজ করে থাকিস তাহলেও
কিছু বলব না মা।
-প্রমিস্?
-প্রমিস্!
-বাবা, আমার না, রেজাল্ট খুব খারাপ হয়েছে। তোমরা
যা ভেবেছিলে তার থেকে অনেক খারাপ। আমি পাশ করতে পারিনি মা - ফেল করেছি!
-কিচ্ছু ভাবিস নি মা, চিন্তা করিস না তুই। একবার
ফেল করলে কি ভুল রাস্তায় ছুটতে হবে, সেটা শুধরাবার রাস্তা থাকবে না?
-বাবা বাবা, শোন!
-আরে কি শুনব রে মা! তুই যে রাস্তায় যাচ্ছিস তার
থেকে পাঁচ পাঁচবার ফেল করাও অনেক অনেক ভাল। তুই তো একবার ফেল করেছিস, রবিঠাকুরের স্কুল
কলেজের কোন ডিগ্রী আছে? শরৎচন্দ্র ক্লাস টুয়েলভ্, তোদের বিল গেটস্, স্টিভ জবসদের বেড়া কতদূর বল?
আমরা তো তোর পাশ ফেলের কথা ভাবছি না, তুই কোথায়?
-বাবা আমার কথাটা শোন আগে! আমি চিঠিতে যা লিখেছি
তা ঠিক নয়, একেবারেই সত্যি নয়। আমি শুধু তোমাদের বোঝাতে চেয়েছিলাম, মানুষের জীবনে
এমন সব জঘন্য ব্যাপার ঘটছে, সেগুলো সামান্য পাশ ফেলের চেয়ে অনেক অনেক খারাপ। ঐসব কিছুই
তো হয়চনি আমার জীবনে, হবেও না কোনদিন। সেসবের থেকে আমার ফেল করাটা তো মারাত্মক কিছুই
নয়, তাই তো তুমি বললে বাবা! আমি এখন শিল্পীমাসীর বাড়িতে, আয়নেক্সে যাবার সময় আমাকে
তুলে নিও। মাকে বোলো, মাসির সামনে সামলে থাকতে, উনি জানেন না। আর, রিঙ্কুদি যে লাইট্
ইয়েলো আর খয়েরী লেহেঙ্গা সেটটা দিয়েছিল, ওটা যেন নিয়ে আসে। লাভ ইউ!

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন