কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১৩৮

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১৩৮

রবিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬

দীপক সেনগুপ্ত

 

সমকালীন ছোটগল্প


একটি গুঁতোর গল্প

লাল রং দেখলে ষাঁড় খেপে যায় এটা সুলোচনা জানতো। কিন্তু ও এখন তো সুলোচনা নেই। সুলোচনা থেকে সুলু হয়েছে। সুলু চৌধুরী পরিচয়ে অফিসে চাকরি করে। মানে অনেকটাই পরিবর্তন হয়ে গেছে ওর। তাই ওর ধারণা হয়েছিল। ইতিমধ্যে নিশ্চয় ষাঁড়েদেরও যথেষ্ট পরিবর্তন হয়েছে। তারা আর আগের মতো লাল রং  দেখে খেপে ওঠে না। মানুষের মতোই তাচ্ছিল্য ভরে লালের পাশ কাটিয়ে যায়।

কিন্তু সুলুর কপাল দোষে এই ষাঁড়টা প্রাচীনপন্থী। সে লাল পোশাকের সুলুকে গুঁতিয়ে রাস্তার ওপর ফেলে দিল। এবং সুলু যখন রাস্তায় পড়ে আছে তখন আর একবার শিং বাগিয়ে পরবর্তী গুঁতো দেবার জন্য এগিয়ে এলো। রিফ্লেক্স এ্যকসনে, নিজেকে বাঁচাতে সুলু তার ভ্যানিটি ব্যাগটি এগিয়ে ধরলো। তখন দুটি কান্ড ঘটলো একসাথে। এক ব্যাগটা ষাঁড়ের একটা শিং এ ঢুকে সেখানেই লটকে গেল। দুই ব্যাগের ভেতরে থাকা মোবাইল ফোনটা সেই মুহূর্তেই সজোরে বেজে উঠলো। রিংটোনে জনপ্রিয় হিন্দি গান - "তুমনে পুকারা ঔর হম চলে আয়ে"।

এই মুহূর্তে গানটা অপ্রাসঙ্গিক এবং সম্পূর্ণ বাজে কথা। সুলু ষাঁড়কে ডাকেনি। ষাঁড়টাও ডাক শুনে আসেনি। এসেছে রং দেখে।

"আপনি এলো ষাঁড় বাবাজী তাকে ডাকা হয় নাই।"

এদিকে লাল রং ষাঁড়টাকে যতোটা না খেপিয়ে দিয়েছিল তারচেয়ে অনূক বেশি বিচলিত করে দিয়েছিল কানের কাছে হঠাৎ এরকম একটা গান বেজে ওঠায়। সে ব্যাগসমেত শিং উঁচিয়ে দৌড় লাগালো। ততক্ষণে আসেপাশের লোকজন ঘটনাটা সম্যক উপলব্ধি করেছে। এবং ছুটে এসেছে। তবে তারাও বেশ বিভ্রান্ত। কোনটা বেশি উচিত কাজ? ভুপতিতাকে টেনে তোলা? নাকি ষাঁড়ের শিং থেকে ব্যাগটা উদ্ধার?

একটুক্ষণের ভ্যাবাচ্যাকা ভাব। তারপর উপস্থিত জনগণ তিনটে দলে ভাগ হয়ে গেল। একদল এগিয়ে এলো ভুপতিতাকে টেনে তোলার জন্য। আর একদল যেমন ছিল তেমন নিরাপদ দূরত্বে থেকে দৃশ্যটা উপভোগ করতে থাকলো। খুব ছোটো একটা দল ষাঁড়ের পেছনে ছুটলো।

ঘড়িতে তখন সকাল সাড়ে নটা। সুলুর অফিস শুরু দশটায়। তবে আজ সে জন্য ওর কোনো তাড়া নেই। আজ অফিসে বিশেষ অনুষ্ঠান আছে। পোঙ্গল উৎসবের অনুষ্ঠান। এবং সেজন্যেই সুলুর পরনে লাল টুকটুকে কামিজ। বড্ড কটকটে ছেলেমানুষী রং বলে এটা পরা ও বেশ কিছুদিন হলো ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু আজ অনুষ্ঠানের দিনে পরে ফেলেছে। গায়ে চাপিয়ে খুশিও হয়েছে। জামাটা ঢিলে। মানে তার জিমে যাওয়াটা সফল  হচ্ছে। ওজন কমেছে, তার চেয়েও বড়ো কথা ভুঁড়িও কমেছে। যদিও মেয়েদের মধ্যাঞ্চলকে ভুঁড়ি বলা অনুচিত।

গোটা পাঁচেক বাড়ানো হাতের মধ্যে যে যুবকের হাতটা সুলু আঁকড়ে ধরলো, সে প্রবল আত্মবিশ্বাসে হ্যাঁচকা টানে সুলুকে তোলার চেষ্টা করলো। কিন্তু সফল হলো না। সেটার কারণ মনে হয় শরীরের ওজন নয়, বরং ঘাবড়ে যাওয়া সুলুর অসহযোগিতা।

সেসময় অনেকেই অনেক কথা বলছিল। পথের ওপর থেবড়ে বসা সুলুর কানে সব কথা ঢুকছিল না। কিন্তু একটা কথা সব কথাকে ছাপিয়ে ঢুকে পড়েছিলো।

-ম্যাম আপকা ব্যাগ, জিসে ষাঁড় লেকে ভাগ গিয়া!

-উসকা ক্যা?

-ফিকির নট। দো-লোগ গিয়া না ষাঁড়কা পিছে, জরুর ষাঁড়সে ছিনকে ও ব্যাগ লেকে আয়গা।

আর একজন এই সংবাদে আরো একটু আশার কথা জুড়ে দিল।

-এক বাইক মে। এক দৌড়কে। দোনো মে সে কোই না কোই ষাঁড় কো পকড় হি লেগা।

কিন্তু ষাঁড় ধরে কী হবে? সুলুর তো ষাঁড় চাই না! ওর চাই ব্যাগটা। ওর ভেতরে শুধু মোবাইল নয়, আরো অনেক কিছুই আছে। সে সবকিছুই দরকারি জিনিসপত্র। ব্যাগ হারালে চলবে না।

সুলু একটু ধাতস্থ হয়ে মাটি ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে পারলো। সাহায্যের হাতগুলোকে এড়িয়ে একটা চায়ের দোকানের চেয়ারে গিয়ে বসলো। ঝটপট তার সামনের টেবিলে এককাপ গরম চা এসে গেল।

- পি লিজিয়ে ম্যাম! আচ্ছা লগেগা।

- ও সামনে কা দুকান সে ব্রান্ডি লা দুঁ?

ডামসেল ইন ডিসট্রেসকে হেল্প করার জন্য অনেকেই আগ্রহী থাকে। সুলু মাথা নেড়ে জানিয়ে দিল, সে সবের প্রয়োজন নেই। তবে সেইসঙ্গে হাত বাড়িয়ে বললো, ওয়ান মোবাইল ফোন প্লিজ!

তিনটে বাড়ানো মোবাইলের মধ্য থেকে একটা বেছে নিল।

-ওপেন কর দুঁ?

-হ্যাঁ।

সুলু ফোনটা নিয়ে সংকল্পকে ডায়াল করলো। অল্প কথায় পরিস্থিতি বুঝিয়ে দিয়ে বললো, আজ শাম কা প্রোগ্রাম ক্যানসেল। অফিস নহি যা রহি হুঁ।

ফোনের ওপাশ থেকে যে কথা হলো সেটা শুনে সুলু বললো, আনা চাহতে হো তো আ যাও। পর মৈ ঠিক হুঁ। আচ্ছা তব তুমহি ফোন কর রহে থে? তুম্হারা ফোন নে বচা লিয়া মুঝে। থ্যাঙ্কস। বাট আই লস্ট দা ফোন। ব্যাগ কা অন্দর মে হি থা। ঔর ভি বহত কুছ থা। অল আর ইম্পর্ট্যান্ট।

কিন্তু রাখে হরি মারে কে? একটু পরেই একজন বাইক-বাহাদুর সুলুর ব্যাগটা নিয়ে অকুস্থলে এসে হাজির হলো।

-এ লিজিয়ে ম্যাম, আপকা ব্যাগ।

অবাক সুলু বলেছিল, থ্যাংকস।

কিন্তু ব্যাগ খুলেই চমকে উঠেছিল। বাকি সব কিছু ঠিকঠাক থাকলেও মোবাইল ফোনটা সেখানে নেই।

-মেরা মোবাইল?

একরাশ সন্দেহ নিয়ে তাকাতেই সেই বাইক-বাহাদুর আমতা আমতা করে বলল, মৈ নহি। এক দুসরা আদমি ব্যাগ মুঝে দিয়া। ফোনকা হাম কুছ নেহি জান্তা।

তাই বললে হবে? এরকম আধাখ্যাঁচড়া উপকার তো নট হোল হার্টেডলি এক্সসেপ্টেড! ততক্ষণে আর একটা বাইকে করে সংকল্প এসে হাজির। সবকিছু শুনে তার মন্তব্য, তুম বচ গই। চোট উট নহি লগা। ব্যাগভি মিল গয়া। উসমে বাকি কাগজ সব মিলা। এ হি বহত হ্যায়। অব এক নয়া ফোন লেনে সে অল প্রবলেম সলভ। চলো শিউজীকো নমন করে আতে হ্যায়।

সংকল্পের বাইকের পেছনে সাবধানে উঠে বসলো সুলু।

-হামকো কসকে পকড়কে বৈঠো।

সুলু তাই করলো।

শিব মন্দিরটা খুব একটা দূরে নয়। এ সময়ে মাত্র কয়েকজনই আছে সেখানে। কয়েকটা ষাঁড়ও। ওরা ওখানে থাকে কারণ অনেকেই তাদের প্রসাদ খেতে দেয়। লোকে ভক্তিতে আসে। ওরা আসে খাওয়ার লোভে।

সুলু আর সংকল্প হাত তুলে মন্দিরের ঘন্টা বাজালো। তারপর হাত জোড় করে শিউজীকে ধন্যবাদ জানাতে থাকলো।

এমন সময় বেজে উঠলো - "তুমনে পুকারা ঔর হম চলে আয়ে"।

সুলু চমকে উঠে দেখলো, ঐ গানের উৎস পাশে দাঁড়ানো আর এক শিব ভক্তের পকেট।

সুলুর সাথে সাথে চমকে উঠলো আরও একজন। সে মানুষ নয়। একটা কেঁদো ষাঁড়। গানটা সেও শুনেছে।  এবং চিনেছে। এবং পরবর্তী কর্তব্য হিসেবে শিং বাগিয়ে সেই ব্যক্তিকে গুঁতিয়ে মাটিতে ফেলে দিয়েছে। সুলুর মোবাইলটা তার পকেট থেকেই উদ্ধার হলো। বুঝতে অসুবিধা হলো না, ব্যাগ থেকে মোবাইলটা এই মহানুভবই হাতিয়ে নিয়েছিল। এখন ষাঁড়ের দয়াতেই উদ্ধার হলো। শুধু ষাঁড়ের দয়া নয়, সুলুর অফিসের যে কলিগ সে সময় সুলূকে ফোনটা করেছিল, এই মোবাইল উদ্ধারে তারও অবদান আছে।

ভ্যাবাচ্যাকা সংকল্পকে কনুয়ের গুঁতো দিয়ে সুলু বললো, চলো। উসে তো সজা মিল হি গয়া। এঁহা হমলোগকা ঔর কোই কাম নহি হ্যায়।

রাখে হরি মারে কে? গুঁতো দিয়ে কেড়ে নেওয়া মাল গুঁতো দিয়েই ফিরিয়ে দিলেন হরি। নাকি হরি নন, শিউজী স্বয়ং। ষাঁড় তো ওনারই বাহন!


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন