![]() |
| সমকালীন ছোটগল্প |
পঁচিশ-ছাব্বিশ
২০২৫ এল, চলেও গেল। কিন্তু আমি বোকার মত আটকে গেলাম একটা বৈঠকী ধাঁধাঁয়। ধাঁধাঁটা পাঠক পাঠিকা প্রায় সবাই জানেন, কারণ এই হার্ডলটা ছোটবেলায় সবাইকেই পার করতে হয়েছে, এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভুল করার জন্য পিঠে বেতের বাড়িও খেতে হয়েছে।
সংখ্যার অদল বদলে মূল ধাঁধাঁটা
হল, ২৫টা বেড়াল যদি ২৫ মিনিটে ২৫টা ইঁদুর ধরতে পারে, তাহলে ২৬টা বেড়াল ২৬ মিনিটে
কতগুলো ইঁদুর ধরতে পারবে। আপাত নিরীহ, এখন হয়ত কাগজ কলম নিয়ে বসলে কয়েক মিনিটে সমাধান
করে ফেলা যেত, কিন্তু গোল বাধাল কিছুদিন আগে খেলার ময়দানে ঐ ছাগল সংক্রান্ত অনুষ্ঠান।
যেখানে একটা ছাগল, প্রায় লাখখানেক ইঁদুর আর দশ পনেরো হাজার বেড়াল ছিল। ওরাই সব হিসেব
গুলিয়ে দিল। সেদিন থেকে আজও আমি এই ধাঁধাঁয় আটকে।
ভাবুন, ছাগল দেখতে না পেয়ে তার
আশেপাশের উল্লুক আর বেল্লিকদের বত্রিশ পাটির চমক দেখে বিরক্ত হয়ে লাখখানেক ইঁদুর পাগল
হয়ে সমস্ত আসবাবপত্র দাঁতে কাটতে শুরু করল, ওদের সঙ্গে স্ট্রাগল করতে না পেরে বেড়ালগুলো
মার্কেট থেকে হাওয়া হয়ে গেল। খানিক পরে শোনা গেল, সমস্ত বেড়াল মিলে একজন ইঁদুরকে
দোষী সাব্যস্ত করে তাকে ধাঁই কিরি কিরি জেলে ঢুকিয়েছে, এবার তার বিচার হবে। দোষ? সে
নাকি খতরনাক - ছাগল পাচারে সিদ্ধহস্ত। একুশ দিন জেল আর সাত দিনের ফাঁসি।
কিন্তু এখানেই গল্পের শেষ নয়।
কয়েকদিন পর জানা গেল, ছাগল আসলে একজন নয়, বেশ কয়েকজন। এবং জেলে পুরে দেওয়া ইঁদুরের
বিরুদ্ধে প্রধান রাগ, সে একজন ছাগল বাদে বাকি ছাগলদের ছাগল হিসেবে কদর করেনি, তাদের
উল্লুক বলেছে। ফলে অন্য ছাগলরূপীদের ছাগলত্বে আঘাত লেগেছে, তারা সবাই মিলে বেড়ালগুলোকে
ফুসলিয়ে ওই ইঁদুরটাকে জেলে পুরেছে। বাকি ছা-গুলোর আশা ছিল, বিদেশী ছাগলের গায়ে গা
ঘষে এবার বইমেলায় ‘আমার ছাগলজীবন’ নামক বই প্রকাশ করবে এবং সেগুলো কালক্রমে বেস্ট
সেলার হয়ে উঠবে। কিন্তু সেটা না হওয়ায় বেল্লিকদের
সব রাগ গিয়ে পড়েছে ওই নেংটি ইঁদুরটার ওপর। সেদিন মাথা ঝাঁকিয়ে বুঝলাম, এই বৈঠকী
ধাঁধাঁটা আসলে থ্রি ডাইমেনশনাল নয়, এখানে শুধু ইঁদুর, বেড়াল আর মিনিট লুকিয়ে নেই,
লুকিয়ে আছে ছাগলেরাও। ফোর ডাইমেনশনাল। অর্থাৎ এটা আসলে এরকম হবে - ২৫টা ছাগলের কথায়
২৫টা বেড়াল যদি ২৫ মিনিটে ২৫টা ইঁদুর ধরতে পারে, তাহলে ২৬টা ছাগলের কথায় ২৬টা বেড়াল
২৬ মিনিটে কতগুলো ইঁদুর ধরতে পারবে? এবার বুঝলেন, কোথায় আমাদের ভুল হচ্ছিল! যাক বাবা,
বছরের শেষে গিয়ে খানিক শান্তি পেলাম।
কিন্তু না, এখানেও গল্প শেষ হল
না। হুমাদা শেষ করতে দিল না। ফস করে কিছু ইঁদুরের গায়ে রং করে দিল। ইঁদুর হয়ে গেল
দু'রকম, আলা ইঁদুর আর ভোলা ইঁদুর। আলা ইঁদুর - যে হুমাদার সঙ্গী, যে রোজ সকাল বিকেল
চিৎকার করে সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে পড়ে "বাবার হল আবার জ্বর সারিল ঔষধে",
আর ভোলা ইঁদুর - যে চাকরি চাই শিক্ষা চাই খাবার চাই এইসব স্লোগান তুলে কোর্টে কেস করে।
তো, ছাগলেরা বেড়ালদের কানে ফিসফিস করে গুরুমন্ত্র দিয়েছে যে আলা ইঁদুরেরা পাশ দিয়ে
গেলেও ওদের ধরা যাবে না, বেড়ালদের তখন তপস্বী হয়ে আকাশের তারা গুনতে হবে। আর ভোলা
ইঁদুর গেলেই, খপাৎ। চাইকি তাদের দু-এক পিস লাথিও মারা যেতে পারে।
২৫ পেরিয়ে ২৬ পড়ে যাবার পর ধোঁয়াশা
ঠান্ডায় আমি বুঝলাম, এই বৈঠকী ধাঁধাঁয় হুমাদা যে বাঁশ আর তেল মিশিয়েছে, তাকে আলাদা
করা খুব দুরূহ। দেখুন, সেই ছোট্ট ধাঁধাঁ এখন কি রকম হয়ে গেল। ২৫টা ছাগলের কথায় ২৫টা
বেড়াল যদি ২৫ মিনিটে ২৫টা আলা আর ভোলা ইঁদুর ধরতে পারে, তাহলে ২৬টা ছাগলের কথায় ২৬টা
বেড়াল ২৬ মিনিটে কতগুলো আলা আর ভোলা ইঁদুর ধরতে পারবে? ব্যস, হয়ে গেল! এবার আলাদা
করো আলা আর ভোলাদের। তারপর ধরো। দেখি বেড়ালের কত ক্ষমতা।
কিন্তু পৌষের পিঠেপুলির মত এই গল্প
যেন শেষ আর হচ্ছে না। আবার এক বেয়াড়া প্রশ্ন উঠে এল। ঐ যে ২৫-২৬ ছাগল, তারা কি নিজেই
চরে নাকি অন্য কেউ চরায়? মনে পড়ে গেল ছোটবেলার এক ছড়া। "পাঁচু পাঁচ ছাগলের
মা, পাঁচু ..." (বাকিটা বলায় সেন্সর বোর্ডের আপত্তি আছে)। তাহলে এখানেও পাঁচুই
কি আসল মাথা? তাহলে ধাঁধাঁটা আরো জটিল হল। সিক্স ডাইমেনশনাল। সাধে কি এটা কষতে গিয়ে
এত চুলকোচ্ছিলাম? আজ, এই ২৬এর দোরগোড়ায় বসে, বুঝলাম কত দুঃখ আর কষ্ট নিয়ে জীবনানন্দ
"আট বছর আগের একদিন" কাব্যগ্রন্থে লিখেছিলেন, "চমৎকার, ধরা যাক দু-একটি
ইঁদুর এবার!" ইঁদুর ধরা কি অত সহজ ভাই!

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন