কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১৩৮

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১৩৮

রবিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬

সমরেন্দ্র বিশ্বাস

 

সমকালীন ছোটগল্প


হৌসাবাই-এর কাহিনী

(১) 

থানার গেটের সামনে। রাস্তার পাশে চওড়া চাতালটা। লোকটা তার অল্প বয়েসী বৌটাকে বেদম পেটাচ্ছে। আর বৌটা জোরে জোরে চিৎকার করছে; তার স্বামীকে গালি দিয়ে শাপ-শাপান্ত করছে। লাঠির আঘাতে বৌটার হাত কেটে রক্ত বেরোচ্ছে!

ভর দুপুরবেলা। মহারাষ্ট্র-র সাংলি অঞ্চলের ভবানীনগর থানা। খোলা রাস্তায়, থানার সামনে বর-বৌএর এই  মারপিট পুলিশের নজর এড়ালো না। পুলিশের বড় বাবুর অর্ডার দিলো, ‘মরার আর জায়গা পেলো না! যা লাঠির বাড়ি দিয়ে ওদের সমঝে দিয়ে আয় এটা হল্লা করার জায়গা না! আর ওদের দুজনকে গাড়িতে তুলে স্টেশনে ফেলে আয়!’

থানা থেকে কয়েকজন পুলিশ বেরিয়ে এলো। হল্লাগোল্লা করা স্বামী-স্ত্রীকে গোটা কয়েক ডান্ডার বাড়ি লাগিয়ে দ্রুত গাড়িতে তুলে নিলো। পুলিশের গাড়ি ছুটলো, স্টেশনের দিকে। দুজনকে ফেলে রেখে আসতে।

এই সুযোগেরই অপেক্ষা করছিল বিপ্লবীদের দল। তারা আসপাশের ঝোপঝাড়ে থেকে সশস্ত্র আক্রমণ চালালো থানার উপরে। তখন ভর দুপুরের থানাতে মাত্র গোটা কয়েক পুলিশকর্মী। তুফান সেনাদের দল মুহূর্তের মধ্যে থানার পুলিশকর্মীদের ঘিরে ফেললো।

‘জয়হিন্দ! ইংগ্রেজ তোরা ভারত ছাড়! জয়হিন্দ! ইংগ্রেজ তোরা ভারত ছাড়! জয়হিন্দ!’ কয়েক জন বিপ্লবী শ্লোগান দিতে দিতে থানার ছাদে ভারতীয় ঝান্ডা লাগিয়ে দিলো। আর একজন থানার কোনে রাখা কিছু কাগজ পত্রে দেশলাই দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিলো। মাত্র মিনিট পাঁচেকের অপারেশন! ব্রিটিশ-পুলিশদের একটা কামরায় বন্ধ রেখে বাইরে থেকে কপাটে খিল লাগিয়ে দেয়া হলো। তুফান সেনার অ্যাকশন দলটা ওখান থেকে চম্পট দিলো!

অন্যদিকে থানার সামনে হল্লাগোল্লা পাকানো দম্পতিকে স্টেশনে ছেড়ে বাকী পুলিশেরা যখন সেখানে ফিরে এলো, তারা দেখলো ভবাণীনগর থানা লন্ডভন্ড, ধোঁয়ায় ধোঁয়াক্কার!

এতোক্ষণ তুমুল ঝগড়া করছিল যে দম্পতি, তারা তখন স্টেশনের রেললাইন ধরে পাশাপাশি হাঁটছে! তাদের মধ্যে আর একটুও কোন্দল নেই! বউটা তার সহযোগী কমরেডকে বললো, - ‘কি বলো! আমরা স্বামী স্ত্রীর নাটকটা ভালোই করেছি। মনে হচ্ছে, এতোক্ষণে থানা দখল হয়ে গেছে! তবে পুলিশের ডান্ডায় হাতে পায়ে লেগেছে। যাক, এসব কয়েকদিনেই ঠিক হয়ে যাবে!’

ওরা নিরাপদ জায়গাতে পৌঁছে গেল। থানা দখলের জন্যে যে মেয়েটি অভিনয় করেছিল, তার নাম হৌসাবাই পাটিল, বয়েস মাত্র সতেরো, ব্রিটিশ বিরোধী সংগঠন ‘তুফান সেনা’র সদস্য। আর সাথের বর লোকটা আদৌ তার স্বামী নয়, সেও ‘তুফান সেনা’র একজন সদস্য। স্বাধীনতা আন্দোলনের এক সক্রিয় কর্মী, থানা দখলের জন্যে এটা ছিল তাদের কষ্টসাধ্য, অথচ রোমাঞ্চকর একটা দুর্দান্ত অভিনয়!

(২)

হৌসাক্কা নামেই তাকে অনেকে ডাকে। হৌসাবাই পাটিল। তার জন্ম ১৯২৬এ। মাত্র তিন বছর বয়সে সে তার মা’কে হারায়। তার বাবা ক্রন্তিসিনহ নানা পাটিল। স্ত্রী বিয়োগের পরে সে আর বিয়ে থা করে নি। নিজে সক্রিয় ভাবে জড়িয়ে ছিল ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে। বিস্তৃত তার রাজনৈতিক কর্মকান্ড। হৌসাবাই পাটিল তারই যোগ্য কিশোরী কন্যা।

সময়টা ১৯৪২-৪৩। মহারাষ্ট্রের সাতারা জেলায় প্রায় ৬০০ টা গ্রাম নিয়ে সংগঠিত হয়েছিল ‘প্রাতি সরকার’। ব্রিটিশ সরকারের বাইরে তাদের ছিল নিজস্ব গভার্ণমেন্ট, নিজস্ব আইন কানুন। প্রাতি সরকার-এর ছিল ‘তুফান সেনা’ নামে নিজস্ব সেনা বাহিনী। হৌসাবাইএর বাবা নানা পাটিল ছিল এই ‘প্রাতি সরকার’এর অন্যতম প্রধান সংগঠক।

মা-মরা হৌসাবাই ভাবতো, তার পিতা নানা পাটিল একই সঙ্গে তার মা ও বাবা। বাবাই তাকে শিখিয়েছিল, সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে। স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয় ভাবে সামিল হতে। বাচ্চা কাল থেকেই সে দেখেছে দারিদ্র্য আর জীবন যাপনের জন্যে কষ্টকর লড়াই। মহারাষ্ট্রে তাদের ছিল যৌথ পরিবার, বিশাল জায়গা জমি, ঘরবাড়ি - ঠাকুমা, কাকা জ্যাঠাদের সাথে একান্নবর্তী পরিবার।

ব্রিটিশ সরকার স্বাধীনতা সংগ্রামী নানা পাটিলকে জব্দ করার বিভিন্ন উপায় খুঁজছিল। সে সুযোগ এসেও গেলো। নানা পাটিলদের ঘরবাড়ি, জায়গা জমি ব্রিটিশ সরকার জব্দ করে দখল নিয়ে নিলো। তাই হৌসাবাইদের উঠে আসতে হলো এক কামরার ছোট্ট একটা বাড়িতে। তাদের আয়ের উৎস হলো, দুটো ষাড় আর একটা গোরুর গাড়ী। সেই গরুর গাড়িতে করে বাড়ির মেয়েরা দশ-বিশ কিলোমিটার দূরের শহর থেকে খাদ্যশস্য, নানা জিনিষপত্র পরিবহন করতো। এই পরিবহনের কাজই ছিল নানা পাটিল পরিবারের মূল আয়ের উৎস। বাড়ির কম বয়েসীরা মাঠ ঘাট থেকে তুলে আনতো ঘাস, গরুর খাবার। এম্নি ভাবেই খুব কষ্টেসৃষ্টে তাদের দিন চলতো। তবুও ব্রিটিশ সরকারের নিদারুণ অত্যাচার তাদের মনোবলকে দমাতে পারে নি!

এরই মধ্যে হৌসাবাই-এর বিয়ে হয়েছে। তার কোলে তিন বছরের শিশু সন্তান। সেই বাচ্চাকে যৌথ পরিবারে তার আত্মীয়ার কাছে রেখে হৌসাবাই বেরিয়ে পড়লো তুফান সেনাদের সক্রিয় কাজে। দেশের স্বাধীনতার জন্যে একের পর এক ব্রিটিশ বিরোধী নানা কর্ম কান্ড। রোমাঞ্চকর সে সব অধ্যায়!

(৩)

পর্তুগীজ শাসিত গোয়াতে তখন স্বাধীনতা আন্দোলনের ঢেউ। এটা ১৯৪৪ সালের কথা। সেখানেও চলছে তুফান সেনাদের নানা আন্ডার গ্রাউন্ড কাজকর্ম।

গোয়ার পানাজি জেলে আটকে আছে তুফান সেনার নেতা বাল যোশী। তাকে সেখান থেকে মুক্ত করতে হবে। তুফান সেনার বড়ো নেতা জি ডি বাপু অনেক কিছু ছক কষেছে। কিভাবে জেল ব্রেক করতে হবে? কিন্তু তাদের পরিকল্পনার খবরটা তো জেলবন্দী বাল যোশীর কাছে পৌঁছাতে হবে? কাকে দেয়া যায় এই বিপদজনক কাজটার দায়িত্ব? জেল ব্রেকআপের পরিকল্পনাটিকে আগে বাড়ানোর জন্যে মিডলম্যানের কাজটা কে করবে? এগিয়ে এলো সেই মহিলাটি!

কমরেড হৌসাবাই পাটিল নিজের মাথায় দায়িত্বটা নিয়ে নিলো। যথেষ্ট রিস্কের কাজ! ছদ্মবেশে পৌঁছে গেল পানাজি জেলে। হৌসাবাই দেখা করলো জেল সুপারিন্টেন্ডের সাথে। নিজের পরিচয় দিলো, সে জেলবন্দী বাল যোশীর কাজিন। জেলে সে যোশীর সাথে একবার দেখা করতে চায়।

‘কী প্রমাণ, তুমিই বাল যোশীর কাজিন?’

ব্যাপারটা আগে থেকেই সেট করা ছিল। সেখানে হাজির কয়েকজন সাক্ষ্য দিল। তারা এই মহিলাকে চেনে - সেই নাকি সত্যি সত্যি বাল যোশীর কাজিন!

জেলের নিয়ম অনুযায়ী পুলিশ প্রহরায় সংক্ষিপ্ত সেই ভিজিট। বাল যোশীর কাজিন সেজে কমরেড হৌসাবাই জেলবন্দীর সাথে পারিবারিক টুকি টাকি নানা কথা বললো।

তার চুলের খোপায় গোঁজা ছিল এক টুকরো কাগজ। তাতে লেখা, জেল ব্রেকের বিস্তারিত প্লান, পরিকল্পনা! কথা বলার ফাঁকে হৌসাবাই সেই কাগজের টুকরোটা যোশীজির পায়ের কাছে ফেলে দিলো। ব্যাস, তার কাজ সারা। বাল যোশীর হাতে পৌঁছে গেলো পরিকল্পিত জেলব্রেক পরিকল্পনার খুঁটিনাটি!

জেলের সুপারেন্টেন্ডেটকে ধন্যবাদ দিয়ে পানাজি কারাগারের সীমানা থেকে বেরিয়ে এলো এই মহিলা কমরেড।

(৪) 

এবার হৌসাবাইকে পানাজি থেকে নিজের গায়ে ফিরে আসতে হবে। সে আর তার সাথে ছিল তুফান সেনার আরেকজন কমরেড। তারা ফিরতি পথে সেখান থেকে সংগ্রহ করলো কয়েকটা আগ্নেয়াস্ত্র, রিভালবার। সামনেই লড়াই। এগুলো তুফান সেনাদের কাজে লাগবে।

কিন্তু সিধা পথে গেলে আগ্নেয়াস্ত্র সহ ধরা পরে যেতে পারে। তাই তারা ঘুর পথে, গ্রাম জংগলের রাস্তায় পা বাড়ালো। বড়ো লম্বা সে সফর, বিপদজনকও বটে!

সামনেই বিশাল একটা নদী – নাম মান্ডবী! নদীটা বেশ চওড়া, তখন ভরা জলে টইটম্বুর! কাছা কাছি কোনো নৌকা নেই।

হৌসাবাই আর তার পুরুষ কমরেড সঙ্গীটি রাতের অন্ধকারে মালপত্র কোমরে বেঁধে নেমে পড়লো নদীতে। প্রচন্ড জলের স্রোত। নিজেকে সামলে রাখা মুস্কিল!

ওদের নজরে এলো নদীর কিনারে একটা কাঠের বাক্স বেঁধে রাখা। ওরা বাক্সটার কাছে গেলো। কোনো জেলে তাদের জাল ও কয়েকটা সরঞ্জাম বাক্সটার মধ্যে রেখে গেছে। দুজনে মিলে সেই ঢাউস কাঠের খালিও বাক্সটাকে ঠেলে জলের কিনারে নিয়ে এলো। বাক্সর সাথে একটা দড়ি বাঁধা হোলো।

তখন মাঝরাত। মান্ডবী নদীতে কাঠের বাক্সে ভর দিয়ে ভেসে চলেছে হৌসাবাই। সামনেই দড়িটাকে কোমরে বেঁধে, সাঁতরে সাঁতরে টেনে টেনে, কখনো বাক্সটাকে ঠেলেঠুলে ওটার সাথে সাথে এগিয়ে চলেছে তুফান সেনার পুরুষ কমরেডটি। নদীর ঠান্ডা জল, ক্লান্তিতে ঘুম পাচ্ছে। নাঃ, একথা ভাবলে চলবে না! চোখ দুটো বন্ধ করে হাত পা ছেড়ে দিলে তারা তক্ষুনিই তলিয়ে যাবে জলের নীচে। হয়তো কয়েকদিন বাদে ভেসে উঠবে ওদের পচাগলা দুটো দেহ! না! তেমনটা হয় নি। কয়েকঘন্টার চেষ্টায় ওরা দুজন পেরিয়ে এলো নদী। না, পরিচিত রাস্তায় গেলে ধরা পড়বার ভয়। নদী পেরিয়ে আবার জঙ্গলের রাস্তা ধরে ওরা বেশ কয়েকদিন হাঁটলো। দিন পনেরো বাদে ওরা ফিরে এলো নিজেদের গ্রামে, সঙ্গে সংগ্রহ করা আগ্নেয়াস্ত্র, রিভালবার।

ওরা গ্রামে পৌঁছবার পরে পরেই খবর পেল, পানাজি জেল-মিশন সাকসেসফুল! ছককাটা পারিকল্পনা অনুযায়ী তুফান সেনার নেতা বাল যোশী পানাজি-র জেল ভেঙ্গে বেরিয়ে এসেছে!

(৫)

বৃটিশদের ডাকবাংলোগুলো অত্যাচারী প্রতিষ্ঠানের প্রতীক! সেগুলো প্রচন্ড আক্রোশে পরাধীন নাগরিক জীবনকে খোঁচা দেয়। সেগুলোকে আক্রমন করাও তুফান সেনাদের কাজ।

হৌসাবাইর কাজ আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকে গোপনে বিভিন্ন খবর সংগ্রহ করা। তার খবরের ভিত্তিতেই ঠিক হল ভনগি-তে যে ব্রিটিশদের ডাকবাংলোটা আছে সেটাকে অ্যাটাক করতে হবে। সেখান থেকে ইংরেজদের কিছু শাসকীয় কাজকর্ম পরিচালিত হতো। সেটা ১৯৪২ এর কথা। তুফান সেনার একটা দল অতর্কিতে ভনগি-র ডাকবাংলোটায় হানা দিলো, ইংরেজদের একটা প্রতিষ্ঠান আগুনে পুড়িয়ে ছাড়খার করে দেয়া হলো।

হৌসাবাইদের কাছে খবর এই সময়ে যে রেলগাড়িটা যায়, তাতে নানা সরকারী কাগজপত্র যায়, ইংরেজ সরকারের সংগৃহীত খাজনা, টাকা-পয়সা ব্যাগ ভরে ভরে যায়।

হৌসাবাই আর তার দল একদিন সকালে রেললাইনের উপর বড়ো বড় পাথরের স্তুপ জড়ো করলো। ট্রেনটা আসতেই ঝান্ডা দেখিয়ে সেটাকে থামানো হলো। ট্রেনটার সামনে লাইনের উপরে স্তুপীকৃত পাথর। ট্রেনটা যাতে পিছনে ফিরে না যেতে পারে, সে জন্যে নিমেষেই ট্রেনের পেছন দিকটাতে লাইনের উপর বড়ো বড়ো পাথর রাখা হলো। তাদের কাছে খবর ছিল, টাকা কোন বগিতে থাকে, কিভাবে সেসব রাখা থাকে!

হৌসাবাই আর তার দলের তৎপরতায় সেদিন লুট হলো ট্রেন, নষ্ট করে ফেলা হলো মূল্যবান সরকারী চিঠি- কাগজ পত্র। জনগনের থেকে জোর করে আদায় করা সরকারী খাজনা, তার কিছুটা চলে এলো তুফান সেনাদের হাতে!

ইংরেজ সরকারদের বিরুদ্ধে নানা অবরোধ করো! চোরা গোপ্তা আক্রমন করো! জেলখানাকে ভাঙ্গো, সরকারী টাকা লুট করো! জনগণের মধ্যে যাও, জনতাদের সঙ্গে থেকে আন্দোলন তৈরি করো! সরকারকে নানা ভাবে ব্যতিব্যস্ত করে তোলো। এমনি ভাবেই ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আসবে।

হৌসাবাই পাটিল বা তার মতো অসংখ্য স্বাধীনতা সংগ্রামীদের লড়াই আর আত্মত্যাগের বিনিময়ে একসময়ে ইংরেজরা এদেশ ছেড়ে পালিয়েছিল। ভারতবর্ষ স্বাধীন হয়েছিল!

হৌসাবাই, নানা পাটিল বা ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের আত্মত্যাগী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কোনো অহংকার বা নাম-যশ-অর্থের দাবী ছিল না, তাদের সংগ্রামগুলো ছিল নিঃস্বার্থ। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের অনেক ইতিহাস এখনো লোকচক্ষুর আড়ালে রয়ে গেছে। যতটা প্রচার পাবার কথা ছিল, সে প্রচার ইতিহাসের পাতায় বা জনমানসে ততটা উঠে আসেনি।

(৬)

দিল্লী আর হরিয়ানার রাস্তায় রাস্তায় তখন কৃষক আন্দোলন। বিরাট মিছিল পদযাত্রা করে পার্লামেন্টের দিকে যাচ্ছে।

কৃষকদের এই আন্দোলনকে উৎসাহিত করতে হৌসাবাই পাটিল বার্তা পাঠালো তাদের কাছে। জানালো - কৃষকেরা তাদের শস্যের ন্যায্য মূল্য পাবার জন্যে যে আন্দোলন চালাচ্ছে, তাকে সে সমর্থন করে। সরকারের কাছে তার অনুরোধ, এ সময় গভর্মেন্ট যেন না-ঘুমিয়ে দরিদ্র মানুষদের পাশে এসে দাঁড়ায়।

সে চেয়েছিল, এই দেশ যেন জাতি আর ধর্মের সংকীর্ণ বেড়াজালে আটকে না থাকে।

হৌসাবাই পাটিল আরো চেয়েছিল, সে নিজে এই কৃষক আন্দোলনের পদযাত্রায় অংশ গ্রহন করবে। কিন্তু তখন তার শরীর তেমন ভালো যাচ্ছিলো না।

তবুও হৌসাক্কার তীব্র ইচ্ছে ছিল, সেই কৃষক আন্দোলনের পদযাত্রায় সে সামিল হবে। না - তা আর হয় নি! ২০২১ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর হৌসাবাই মৃত্যু শয্যায় ঢলে পড়ে! তার চির পরিচিত জায়গা - সাংলিতে, তখন তার বয়স পঁচানব্বই বছর।

দেশকে নিয়ে হৌসাক্কার চিন্তা ভাবনা ও আত্মত্যাগ অনেকটাই ছিল! স্বাধীন ও স্বতন্ত্র ইন্ডিয়া কি হৌসাবাই পাটিলকে নিয়ে কি ততটা ভেবেছে, যতটা সত্যি সত্যিই ভাবা উচিত ছিল? সব চাইতে বড়া কথা, স্বাধীনতা সংগ্রামের এই তুখড় মহিলা সৈনিক হৌসাবাই পাটিলকে ভারতবর্ষের কতজন লোকই বা জানে?

[এই কাহিনী পি সাইনাথ রচিত গ্রন্থ ‘আননোন হিরোস অফ ইন্ডিয়া’স ফ্রিডম স্ট্রাগেল’-এর দ্বারা অনুপ্রণিত।]

 

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন