কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১৩৮

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১৩৮

রবিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬

মৌসুমী মুখোপাধ্যায়

 

সমকালীন ছোটগল্প


নীলঝর্ণা

নীলঝর্ণার পাহাড়গুলো নীরব। কেউ বলে, পাহাড় কখনো কথা বলে না। কিন্তু যারা কিছুদিন থাকে, তারা বোঝে, নীরবতাও বার্তা দেয়।

একটু গভীরভাবে তাকালে মনে হয়, পাহাড়ের প্রতিটি ছায়া, প্রতিটি ঢেউ, প্রতিটি পাথরের ফাটল, এক ধরনের কথা বলে। শুধু শুনতে হয়।

ইলিয়াস এসেছে দূরের শহর থেকে। ব্যাকপ্যাকে ক্যামেরা, নোটবুক, চোখে ক্লান্তি। শহরের শব্দ, গরম, ধুলোর চাপ - সব ভুলে সে এসেছে শুধু নিঃশব্দের কাছে। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিল, আলো ঠিক আছে কি না দেখছিল।

পাহাড় তখন শুধু পাহাড় - সবুজ, নির্দোষ, শান্ত। দ্বিতীয় দিন সকালে তার অনুভব হল অদ্ভুত কিছু।

চায়ের দোকানদার, নাম বশির, অস্বাভাবিক চুপচাপ। লোকেরা হাঁটে, তবে হাঁটা যেন ভয়ে ভরা। হাসি নেই, চোখে সাবধানতার আভা।

“আজ নদীর ধারে যাবেন না!” বশির হঠাৎ বলল। কণ্ঠটা শিথিল না, কিন্তু কিছু বোঝায়, এক ধরনের সতর্কতা। ইলিয়াস প্রশ্ন করতে গিয়েও করল না। পাহাড়ের মাঝে মানুষ প্রশ্ন কম করে, অনুভবে শেখে।

সেতুতে দাঁড়ালে নদী নীরবভাবে বয়ে যায়। পাথরে পড়ে ভাঙা জল - কিছু ক্ষোভ নেই, কিছু বোঝা যায় না।

সেখানে বসে ছিল একটি মেয়ে। চোখে স্থিরতা, যেন অনেক কিছু দেখেছে, আবার কিছুই নয়।

“আপনি কি এখানকার?” ইলিয়াস জিজ্ঞেস করল।

মেয়েটি মাথা নাড়ল।

“আমি এখানেই থাকি। পাহাড়ের মতো।”

ইলিয়াস হেসেছিল। মেয়েটি হাসেনি।

কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর বলল, “আপনি শহর থেকে এসেছেন। শহরের মানুষ শান্ত হতে চায়। আমরা শান্ত হতে শিখিনি।”

ইলিয়াস বুঝতে পারল, শান্তি কোনো শব্দ নয়। শান্তি অনুভূতি, যা কখনো প্রকাশ পায় না, কিন্তু ছুঁয়ে যায়।

মেয়েটি হঠাৎ চোখ মেলল নদীর দিকে।

“এখানকার বাতাসও ভয় শিখেছে!” সে বলল।

পরের দিন সকালে খবরটা আসে। শব্দ নয়, একটা হাওয়া। দোকান, হোটেল, গাছ, মানুষের চোখ - সব ছুঁয়ে যায়। কেউ জোরে কিছু বলে না। কেউ কাঁদে না প্রকাশ্যে। কেবল পাহাড়ের ভেতর ভারী নীরবতা।

ইলিয়াস বশিরের কাছে যায়।

“মানুষ মারা গেছে!” বশির বলে, কোনো সংখ্যা বা নাম উল্লেখ না করে।

ইলিয়াস জানে। ‘কারা’ জিজ্ঞেস করলে ক্ষতি হবে। এখানে মৃতের সঙ্গে কিছু বিশ্বাসও মরে।

কিছু ভরসা হারায়। সেটা বোঝার জন্য তাকে অনেকক্ষণ নদীর ধারে বসে থাকতে হয়। নদী বয়ে যায়।

পাহাড় চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। শান্তি নেই, ক্ষোভ নেই, শুধুই এক ধরনের স্থিরতা - যার মধ্যে আছে প্রশ্ন।

সেতুর কাছে ফেরার পর মেয়েটি নেই। কেবল নদী, আগের মতোই। হঠাৎ কণ্ঠ শোনা যায় – “পাহাড় জানে। কিন্তু কিছু বলে না।”

মেয়েটি ফিরে এসেছে। চোখে ক্লান্তি, মুখে প্রশ্ন।

“আপনি কাঁদছেন না?” ইলিয়াস জিজ্ঞেস করে।

“কাঁদলে কি পাহাড় হালকা হয়?”

পাহাড় নীরব। নদী বয়ে যায়। কিন্তু নদীর তীরে, সেতুর ওপর, বায়ুর ভেতর একটি প্রশ্ন ভেসে আসে:

“মানুষ কেন মানুষকে আঘাত করে?”

কেউ উত্তর দেয় না।

ইলিয়াস ঘুমোতে পারে না। জানালার বাইরে পাহাড়, অন্ধকারে দাঁড়ানো বিশাল ছায়া। হঠাৎ বোঝা যায়, পাহাড় পাহারা দেয় না মানুষের, প্রশ্নের। যে প্রশ্ন শোনে না, তাকেও পাহাড় নীরবভাবে ধরে রাখে।

চেকআউটের সময় বশির একটি ছোট কাগজ ধরিয়ে দেয়। একটা নাম - যে বাঁচবে, যে ক্ষত ভরাবে।

ইলিয়াস বোঝে - এটি ঠিকানা নয়, প্রতিজ্ঞা।

শহরে ফিরে, সংবাদে এটি হবে সংখ্যা। কিন্তু তার ভেতরে থাকবে, একটা ক্ষুদ্র পাহাড়ের মতো নীরবতা।

রাতের অন্ধকারে, ইলিয়াস জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে। নদী অচেনা কণ্ঠে গান গায়। পাহাড়ে ছায়া নাচে। এবং ভেতর থেকে আভাস আসে, যতদিন মানুষ প্রশ্ন করবে, যতদিন মানবতা প্রশ্নের ভেতর বাঁচে, ততদিন এই নীরবতা পরাজয় মানবে না।

মেয়েটিকে শেষবার দেখা যায় সেতুর ওপর। চোখে দাগ নেই, মুখে অচেনা কোনো সমাধান নেই। শুধু নীরবতার গভীরতা। ইলিয়াস বোঝে, জীবন মানে হলো এই নীরবতার সঙ্গে হাঁটা। সন্ধ্যা, নদী, পাহাড়, এবং ভেতরের প্রশ্ন, সব মিলিয়ে একটি আভাস দেয়, যা কখনো পূর্ণ হয় না।

পরবর্তী দিনগুলো ইলিয়াস ছবি তুলে, নোটবুক লিখে, অনুভব করল, কিছু লেখা যায় না। সব শব্দ, সব ছবি, সব আলো পাহাড়ের নীরবতার কাছে অসহায়। শুধু অনুভব থাকে, যেটি প্রশ্নের মতো ভেসে থাকে।

শহরে ফিরে সে গল্প বলতে পারে না। সংবাদে এটি হবে সংখ্যা। কিন্তু তার ভেতরে থেকে যাবে নীলঝর্ণার নীরবতা, নদীর ধীর গান, মেয়েটির চোখে থাকা প্রশ্ন। এটি একটি প্রতিজ্ঞা, যা চুপচাপ দখল করে নেয় মানুষকে, ভাবতে শেখায়, অনুভব করতে শেখায়। নীরবতার মধ্যে থাকে আভাস - সহিংসতা ক্ষণস্থায়ী, মানবতা প্রশ্ন রেখে যায়। যতদিন মানুষ প্রশ্ন করবে, যতদিন নিজের ভেতরের নীরবতাকে শোনার চেষ্টা করবে, ততদিন ক্ষতি হলেও মানবতা বাঁচবে।

নীলঝর্ণার পাহাড় নীরব। তবু সেই নীরবতার ভেতর আভাস আছে - প্রশ্ন, দায়িত্ব, এবং প্রতিজ্ঞা। যে মানুষ তা শুনতে শিখবে, সে বুঝবে - শান্তি কেবল অস্ত্রের বাইরে। শান্তি আসে ভ্রাতৃত্বে, বিশ্বাসে, প্রশ্ন করার সাহসে। এবং সেই নীরবতা কখনো হারায় না।

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন