অবনীন্দ্রনাথ
ঠাকুরের ‘ক্ষীরের পুতুল’ (দুয়োরানীর গল্প)
প্রিয় দর্শক,
সেবার আমি সেজেছিলাম দুয়োরানী। জানেন না কেউই
আমি কিরকম বিপদে পড়ি নাটকের জন্যে। সবাই যে যার পার্ট নিয়ে নিয়েছে আগেই। এটাই হয়।
আমি যে বানর হয়ে যাইনি সেটাই বেশি। হ্যাঁ, এটাও নাটকের স্ক্রিপ্ট। আমাদের সকলেরই
পড়া ছিল ‘ক্ষীরের পুতুল’। তাই সহজেই … পার্ট-এর সমাধান হয়েছে। আমাদের সবচেয়ে ছোটভাই,
ওই বানর সেজেছে। ওকে আমরা সবাই মিলে একটা কাপড়ের লেজ বানিয়ে দিয়েছি। মাথায় কাগজের
মুকুট। গালে রুপোর তবকওলা রাংতা। নাটকের নির্দেশক আমাদের কাকু। কাকুর সুবাদে
আমাদের কাজ ছিল পার্ট মুখস্থ করা। যেটায় আমাদের জুড়ি ছিল না।
আমার দুয়োরানীর মেকআপ ছিল সাদা ঠাকুরমার কাপড়ের দু-ভাঁজ,
তারপর ঘুরে ঘুরে পেঁচিয়ে যাওয়া। দুয়ো বলে সোনার কানের দুল পরিনি তা নয়। এরসঙ্গে
হাতে বালা ছিল ঝুমঝুম করা, যেটা কমানো-বাড়ানো যেতই। এই সঙ্গে চুল বাঁধা। একটা টিপ
পরা। হাতে থাকত ফুলের গোছা। কিন্তু গল্পে কোথাও এরকম ছিল না। কিন্তু আমাদের
নির্দেশক বলেছিলেন, না ক্যারেক্টারের হাতে ফুল থাকবেই। কারণ … মানসিকতা বোঝাতে
ফুলের চেয়ে আর কিছুই নেই। এখানে ফুল একটা সাইলেন্ট ক্যারেক্টার। যে চুপ থেকেও নাটকের
প্রকৃতিতে একাত্ম হয়ে থাকে। অথচ আড়ম্বর নেই, নেই বাড়াবাড়ি। তাই ফুল। আমি ফুলের
মালাও গেঁথেছি এরকম হয়েছে। নিজেই পরেছি। টগর ফুলের মালা। সাদা ফুল দুঃখ শান্তির
প্রতীক। তাই আমার ক্যারেক্টারের সঙ্গে যেত ভালই।
আমার জীবনের সবচেয়ে ভাল অভিনয় ছিল ওই নাটকেই। দুয়োরানীর
গল্প বলে পরে আমি একটা লিখেছিলাম, কোন কাগজে আজ আর মনে নেই। তবে আমার অভিনয় নিয়ে
দুটো কথা বলতেই হয়। আমাদের নির্দেশক ও গল্পের প্লট নিয়ে আমাদের তাড়নার অবধি ছিল
না। আমরা গল্পটা বেশ করে মনে রেখেছিলাম। হ্যাঁ, এখনও মনে করতে পারি… গল্পটা হল …
এক রাজার দুই রানী। সুয়োরানী আর দুয়োরানী। একদিন তাদের রেখে রাজামশাই গেলেন বাণিজ্যে। জিজ্ঞেস করলেন কোন
রানী কী উপহার চান? যদিও রাজা সুয়োরানীকেই বেশি ভালবাসতেন। তবুও দুয়োরানীর জন্যেও
উপহার আনতে চাইলেন। সুয়োরানীর কথা মত নিয়ে এলেন দামী দামী গয়না
আর শাড়ি। দুয়োরানীর চেয়েছিলেন বানর-ছানা, এল তাই বানর। বানর হলে হবে কি, আসলে সে এক জাদুকরের দেশের মায়া-বানর। সেটাই গল্প। এই বানর এমনই যে, সে মানুষের মত
কথা বলে। আর বানরকে ছেলের মত
ভালবাসে বড় রানী দুয়োরানী। বানর সন্তান দুঃখিনী
মায়ের চোখের জল মুছিয়ে দিতে চায়। তাই, সেই বানর দারুণ বুদ্ধি খাটিয়ে কী করে রাজার মন ফেরাল বড়
রানীর দিকে। আর কী করে দুয়োরানীর কোলে এনে দিল সত্যিকারের রাজপুত্র। কী করেই বা
হিংসুটে সুয়োরানীকে ভোগ করাল যাবতীয় অন্যায় ও পাপের শাস্তি। এটা নিয়েই ‘ক্ষীরের পুতুল’। এই অবাক-করা গল্প আমরা নাটক করেছিলাম। আমাদের নাটকের রূপ দিয়েছিলেন
আমাদের নাট্যকার কাকু।
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘ক্ষীরের পুতুল’ লেখেন ১৮৯৬ সালে। এটা প্রায় ১৩০ বছর
পেরিয়েও একইরকম জনপ্রিয়। এর মূল বিষয়বস্তু
থেকে এক রাজা, দুই মন্ত্রী, এক সেনাপতি, এক রক্ষক,
ইয়া গোঁফওলা জন্ম নেয় কাকুর স্ক্রিপ্টে।
নাটকের সুয়োরানী আমার দিদি। আর দুয়োরানী তো আমিই। এই কাহিনির
মূল হল বুদ্ধি। বুদ্ধি দিয়ে সৎ উপায়ে দুয়োরানীর
ভাগ্য পরিবর্তন।
মঞ্চে আমরা রানীদের মধ্যে দুয়োরানীর অবহেলার
দিকটা সাজাতাম সবুজ পাতা দিয়ে। টগর আর জবার ডাল ছিল বাগানে। সেসবই কেটে আনতাম। ঈর্ষা সাজানোর জন্য নির্দেশক দিতেন লাল একটা লাঠি, আমাদের ছোট
ভাইয়ের ব্যাট ছিল যেটা। হ্যাঁ, তার গায়ে লাল কাগজের পরত। আহা স্টেজ সাজানোর জন্য
সেট, প্রপস আমাদের ছিল ঘরে হাতে বানানো। আমাদের একটা জাদুর
ছড়ি ছিল। রুপোর রাংতা মোড়া। সেটাই থাকত সুয়োরানীর হাতে। তারপর একসময় সেটায় পড়ত লাল
আলো। আমাদের দুটো আলো ছিল। সাদা আর লাল। ছাদের একটা কোণে ত্রিভুজ আকারের মঞ্চ হত।
দুদিন ধরে ওটাকে সাজাতাম। কাগজ, কাপড়, পাতা দিয়ে। কাকু শিখিয়ে ছিলেন রবি ঠাকুরদের
বাড়িতেও এরকম মঞ্চ সাজানো হত। যেখানে সবাই মিলে থিয়েটার করতেন। আসলে নাটক করতেন।
বা অভিনয় করতেন। এসব শব্দগুলো সবই একটু একটু করে আলাদা। দুঃখী দুয়োরানীর
দুটো পাখি ছিল। একটা টিয়ে, একটা কাকাতুয়া। এই দুটো বাজারের থেকে আনা নয়। এই দুটো
আমাদের পোষা। তারা একবার নাটকের মধ্যে টুকাই টুকাই করে ডেকেও উঠেছিল। সেসব অবশ্য
ভুলেই যাওয়া ভাল। কারণ, কোন নাটকে না এরকম কাণ্ড হয়? এমন কতজনের হয়েছে। আমাদের
‘পেটে ও পিঠে’ নাটকেও তো এরকম হয়েছিল। আমাদের নির্দেশক বলতেন,
পরিশেষে সত্যের জয়ের বার্তা রয়েছে। তাই এটা নাটক হিসেবে উত্তম শিক্ষার।
নাটকের দ্বারা শিক্ষা এভাবেই হয়ে থাকে। আমরা নাটক ব্যাপারটা বুঝতাম না। কিন্তু এটা
বুঝতাম যে… আমাদের আনন্দ হত। আর নাটকের রিহার্সাল মানে পড়া থেকে ছুটি। আর মজা লাগত
যখন, ক্ষীরের পুতুলকে খেতে দিলে সে জীবন্ত হয়ে উঠত, এই দৃশ্য।
বা, বানর যখন দুয়োরানীর চোখ মুছিয়ে দিত। আর ভাল লাগত সুয়োরানীর শাস্তি পেল যখন। কষ্ট লাগত সুয়োরানীর
ছলনা, দুয়োরানীর সন্তানদের গায়ে আগুন লাগানো,
বানর-সন্তানকে মারার চেষ্টা। কিন্তু আলোর কাজটা হত অন্যরকম।
একটা কাপড়ের ভেতর থেকে হাওয়া দিয়ে যেত অবিরাম। আর হাওয়ার মধ্যে দিয়ে গলগল করত
আগুনের শিখা। হ্যাঁ, ব্যাপারটা জমত শুধু ওই একটা কাপড়ের প্রিন্টের জন্য। ওই কাপড়টা
ছিল একটা র্যাপার, তাও দিদির পুরনো, বহু ব্যবহৃত।
আমাদের এই নাটকের থেকে শেখার জন্যে কাকু যে এই গপ্প-টা
করেছিলেন, তা এখন বুঝি। আসলে বানর হলে কি হবে, বুদ্ধিতে সে
যে সুয়োরানীর আসল রূপ প্রকাশ করে দেয়। আর শেষে, রাজা দোষীকে দিলেন কঠোর শাস্তি। নীতিগল্পের আদলে লেখা এই গল্প আজও আমার স্মৃতিতে। ভেসে উঠল তাই এই
লেখা। দুঃখের বিষয়, আমাদের নাটকের কোনও ছবি নেই। তাই ক্ষীরের পুতুলের আমার
দুয়োরানী সাজা দেখানো গেল না। এরকমই হয়, যে দুয়ো সে যেন চিরকালই দুয়ো। তবে,
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর -এর এমন লেখার জুড়ি নেই। আমাদের নাটক জমেছিল তো তাঁর প্লটের
জন্যেই।
একুশ শতকের ফ্ল্যাশব্যাক স্বত্বাধিকারী ...

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন