লুংচুর ললিত লাস্য
আম্বিওক চা-বাগান আর জঙ্গল রেঞ্জ
পেরিয়ে একটু গেলেই নেওরা উপত্যকার জাতীয় অরণ্যমালা। উত্তরদিকে যে রাস্তাটি এঁকে বেঁকে
চলে গেছে তার নাম 'লাভা রোড', কখনও বা 'রিশি রোড'। হয়তো একই রাস্তা লাভা আর রিশপ দুই
পাহাড়েই যায়। তাই নামও ভাগাভাগি করা। নেওরা অরণ্যপথের বর্ণনা শব্দ সাজিয়ে করতে পারা
বেশ চ্যালেঞ্জিং। চোখ থেকে অক্ষরে তার অনুবাদ করতে গেলে দৈবী কলম লাগে। অধমের সে রকম
এলেম নেই। রাস্তাটা যেখান থেকে দুভাগ হয়ে যায় তার বাঁদিকে লাভা বাজার। ডানদিকে কোলাখামের
পথ। এই পথটি টানা চড়াই, পাহাড় ঘুরে ঘুরে। লাভা বাজার পর্যন্ত পথ পাহাড়ি হলেও তেমন ভাবে
শরীরের খাঁচা নাড়িয়ে দেয় না। রাস্তাটি জখমি হলেও বোঝা যায় কখনও পলেস্তারা করা হয়েছিলো।
কিন্তু লাভা বাজার থেকে ডাইনে মোচড় মারা পথটি গাড়ি যাওয়ার অনুপযুক্ত। মানুষ যায়, তাই
তার নাম পথ। নয়তো আমাদের মতো শহুরে জনতার পক্ষে এক কথায় নরক যন্ত্রণা।
এই পথের উপরে আছে কোলাখাম নামের একটি গ্রাম। চাঙ্গে জলপ্রপাত। একদম শেষে একটি নির্জন পাহাড়ি গ্রাম 'লুংচু'। লাভা বাজার থেকে পঁচিশ কিমি। তবে 'পঁচিশ' দেখে আশ্বস্ত হবার নয়। আমাদের মতো পাহাড়ে পাহাড়ে পায়ের তলায় সর্ষে নিয়ে চলা পাবলিকেরও মনে হয় এবার ক্ষ্যামা দে রে বাপ। যদিও আমরা সর্বদা উঁচু এসইউভি গাড়ি নিয়েই ঘোরাঘুরি করি। কিন্তু মনে পড়ে যায় 'সাজাহান' নাটকের সংলাপ। 'অন্ধ জাগে, কী বা রাত্রি, কী বা দিন।' ধম্মোপুত্র সম্ভবত এমন একটি রাস্তা বেয়েই মহাপ্রস্থানে বিলীন হয়ে গিয়েছিলেন।
একেবারে শেষ পর্যায়ে পৌঁছে সামনে দেখি একটা ফুট চল্লিশ সংকীর্ণ খাড়া চড়াই। ষাট-সত্তর ডিগ্রি হবে। ঝুরো মাটি আর আলগা নুড়ি পাথরের জমি। ইংরেজি 'এস' অক্ষরের মতো। বোলেরো গাড়ির চারটে চাকা আঁটবে বড়ো জোর। সারথিকে বলি, পারবে? না আমরা নেমে যাই? সে বলে, মনে হয় পেরে যাবো। না পারলে গাড়ি পিছন দিকে গড়াবে। স্টিয়ারিং শক্ত হাতে ধরতে হবে। তা সে ফার্স্ট গিয়ারে টেনে দিলো। উপরে ছোট্টো একটা কাঁচা পার্কিং-এর জায়গা। গোটা তিনেক এসইউভি ঠাসাঠাসি করে ধরতে পারে। তার পর কাঁচা রাস্তায় অনেকটা চড়াই । কতোটা, সেটা নিচের থেকে বোঝা যাচ্ছে না। খালি হাতে চড়ে যাবো। কিন্তু মালপত্র নিয়ে সম্ভব নয়। দেখি, গাড়ির হর্ন শুনে তিনটে মেয়ে তরতর করে নেমে আসছে। ফুটফুটে পাহাড়ি মেয়ে। আমাদের চোখে বালিকাই মনে হয়। আমাদের স্বাগত জানিয়ে মালপত্রগুলো অবলীলায় টেনে নিয়ে চড়তে থাকে। আমরা তাদের পিছন পিছন যেতে থাকি। পৌঁছে যাবার পর মনে হলো প্রায় ছ-সাত ঘন্টার পাঁজরভাঙা পরীক্ষা দিয়ে এসে কোনও অমরাবতী অপেক্ষা করছিলো আমাদের জন্য।
ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে, সব থেকে সুন্দর জায়গাটায় পৌঁছোবার পথটি সব সময়েই অতি নিকৃষ্ট হয়। বার বার এই উক্তির প্রমাণ পেয়েছি। কিন্তু এইবার যেন কিঞ্চিৎ অধিকই হয়ে গেলো। ধাপে ধাপে সাজানো বাগান। ভরা বসন্তে তার উচ্ছ্বাস ফুরোয় না। 'ফাগুন হাওয়ায়, রঙে রঙে পাগলঝোরা লুকিয়ে ঝরে।' হাজার রকম রডোডেনড্রন, অর্কিড, মরশুমি ফুলকুমারীর দল ঠাণ্ডা হাওয়ায় দোল খেয়ে যাচ্ছে। তিন ধাপ জোড়া বাগান। সব চেয়ে উঁচু ধাপে দোতলা কাঠের বাংলোবাড়ি। ঢালু ছাদ, পাইন কাঠের দেওয়াল। সামনের দিকে তাকালে একের পর এক পাহাড়ের সারি ঘিরে রেখেছে চারদিক। মনে হয় হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। তাদের পিছনেই নাকি তাঁকে দেখা যায়। কিন্তু আমাদের দেখা দেননি তিনি। তবে আপশোস নেই। মেঘের খেলা আকাশ পারে আমাকে সতত মুগ্ধ করে। সবুজের সাম্রাজ্যে মেঘ, আকাশ, আলো আর অন্ধকার সমানে খেলা করে গেলো।
ব্রাহ্মণীর কলকাতায় গরম লাগে। তাঁর জন্ম রউরকেলায়। বেড়ে ওঠা টাটাবাবার শহরে। জীবন কাটলো সিংভূম, পাটনা, ভুবনেশ্বরে। এদেশের সব চেয়ে আগুনে ঠেকগুলো পেরিয়ে এসেছেন। তবু লাগে। তাপের তপের ঋতুগুলি পাহাড়ে পাহাড়ে কাটিয়ে আসি। যেদিন লুংচু পৌঁছোলুম, ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত এক অপরাহ্নে। এদেশে পাহাড়ি ঠেক যতো আছে, কাশ্মীর থেকে কুনুর, শিলং থেকে সোলাং, ঘরবাসী সব সরাইখানার ভোজন আয়োজন একই থাকে। মেনু বাঁধা। আমাদের মতো পাতি জনতার জন্য বেশ স্বস্তিজনক। সৌন্দর্য্য শুধু চোখেই বাঁধা থাকে না। ভিতরটাও ভরে যায়। অতি মাত্রায় উদর-মনস্কতা অস্বস্তিতে ফেলে। মাছের টুকরো মাপা বঙ্গো বা ত্রস্ত নিরামিষাশী গুজু ভাইদের দুঃখের গল্প উপেক্ষা করাই বিবেচনার কাজ। লুংচু হোমস্টে-তে শাক সব্জির জোগাড় নিজের বাগান থেকেই আসে। তার অন্য স্বাদ। আমরা যখন পথে ছিলুম, আমার কাছে ফোন আসে। সরাইয়ের কর্ত্রী আমাদের চালককে অনুরোধ করেন ওদলাবাড়ির একটি বিশেষ দোকান থেকে যেন কুক্কুটমাংস সংগ্রহ করে নেন। বুঝলুম তারা আমাদের সেবনের জন্যই বলিপ্রদত্ত হয়েছে। দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর একটু চোখ লেগে গিয়েছিলো। শীত শীত লাগতে ঘুম ভেঙে গেলো। বারান্দায় বেরিয়ে আসতেই গায়ের উপর দিয়ে ঘরে মেঘ আনাগোনা করতে লাগলো। দূরে তাকালে ঘন শীতল বাষ্পের অভিরাম মায়াবী স্পর্শ।
দেশে অনেক পয়সা-উসুল পাবলিক আছেন। যাঁদের দাবি, সুন্দরবন গেলেই সারি সারি বাংলার বাঘ যেন গার্ড অফ অনার দিতে দাঁড়িয়ে থাকে। অথবা খরচা করে পাহাড় গেলেই ম্যাডাম কাঞ্চনজঙ্ঘা যেন ঘোমটা সরিয়ে ড্যান্স ভিডিওর সুন্দরীদের মতো নিজেকে প্রকট করে যান। আরও ভয়ানক আরেক দল আছেন। যাঁদের উত্তরে গেলেই 'বরফ, বরফ' বিপন্ন আকুলতা। আবার সাগরে গেলে ঘন্টার পর ঘন্টা নোনা জলে লম্ফ দিয়ে রোদ সেঁকে যাওয়া। ট্রফিসুন্দরী বউয়ের মতো ফুল প্যয়সাবসুল ভেকেশনিং না হলে কী করে চলবে? খুব মায়া হয় তাঁদের জন্য। লুংচুতে যেখানে ছিলুম সেখানে 'শুয়ে শুয়ে' জানালা দিয়ে নাকি তাঁকে দেখা যায়। আমরা দেখিনি। কিন্তু যা দেখেছি, এক কথায় 'মাটির ওই কলস আমার ছাপিয়ে গেলো কোন ক্ষণে। .'
এতো দূর পর্যন্ত এসে মনে হয় অক্ষরকে বিদায় দিই। এবার চোখের পালা। দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তর। আমরাও খেলা খেলেছিলেম।
এবার আপনাদের পালা!
0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন