কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / দ্বিতীয় সংখ্যা / ১৪১

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / দ্বিতীয় সংখ্যা / ১৪১

সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬

চঞ্চল বোস

 

শান্তিপুর ডুবুডুবু নদে ভেসে যায়

 



ছোটবেলায় পাড়ার সেন দাদুর বাড়িতে রবিবাসরীয় কীর্তনের ওই সমাপনি সুর কবিরাজের কন্ঠে ধ্বনিত হওয়া মাত্রা উৎসাহের মাত্রা তুঙ্গে চড়ে যেত। কবিরাজ ওই গানের প্রথম কলির একটা শব্দ ‘শান্তিপুর’ বলে মুচকি হেসে থমকে গিয়ে উপস্থিত শ্রোতৃমণ্ডলীর দিকে এমন করে তাকিয়ে থাকত যেন আমরা কেউ জানি না এরপর কি আসছে।  অত্যুৎসাহী আমি আর হাবুল  দরাজ গলায় ‘নদে ভেসে যায়’গেয়ে আনন্দে উর্ধবাহু হলে বাজারের কুমড়ো বিক্রেতা খোলিয়া সুধীরের নির্মম থাপ্পড় মাথায় পড়ত - ‘ভক্তিটা কি উছলাচ্ছে?’

সুধীর কি বুঝবে কত প্রতীক্ষার পর এই শান্তিপুরে ডোবার সময় এসেছে। সন্ধ্যে সাতটা থেকে একের পরে এক ঐ ভক্তিমূলক গান - বৈষ্ণব পদাবলী, রামপ্রসাদী, ভজন, কীর্তন। এছাড়া আউট অফ সিলেবাস কেউ মেয়ে দেখানোর জন্য তাকে বসিয়ে দেয়। সে শুরু করে ‘প্রেম মুদিত মন সে কহ রাম ও রাম ও রাম’। এত অত্যাচার সহ্য করে অদ্য রাত্রির শেষ নিবেদন কবিরাজের শান্তিপুর। এর পরেই তো পুতামাসির কাছ থেকে শালপাতার ঠোঙায় সিন্নি আর প্রসাদ নিয়ে কেটে পড়ার পালা। কবিরাজ গানের চরম শিখরে পৌঁছে ছেড়ে গলা ছেড়ে দিলে শুরু  আমাদের ঐকতান ‘নদে ভেসে যায়’। এটাই নিয়ম ছিল। তখন জানতাম শান্তিপুর বানের জলে ভেসে যাচ্ছে। অনেক পরে বুঝেছি ওটা নদের (নদিয়ার) নিমাইয়ের ভক্তির প্লাবন।

আজ সকালবেলায় এসব কথা মনে উদয় হল কেন? ওই যেই দেখলাম দোমোহনীর সুবর্ণরেখার ধারে আজ এক ভক্ত পুরুষ জলে ভেসে যায়। একজন সাধুজাতীয় মানুষকে কোমর জল থেকে টেনে তোলার চেষ্টায় বছর তিরিশ-একতিরিশের এক ছোকরা চিৎকার করছে, ‘বাঁচান দাদা। টুকু হেল্প করবেন।’ আমি সাঁতার না জানলেও কোমর জলে ডোবার কোনো সম্ভাবনা নেই বুঝে মানবিক কারণে  দুজনে টেনে-হিঁচড়ে বহু পরিশ্রম করে স্বাস্থবান ভাল খাওয়া দাওয়া করা চেহারার গুরুদেবকে জল থেকে টেনে নিয়ে এসে পাড়ের বালিতে পেড়ে ফেলার পার প্রায় মুমূর্ষু বাবার উক্তি - মা-তারা কৃপা করো মা।

তারপর বাবা নিঃসাড় হয়ে চোখ বুঝলেন। মুখশ্রীতে আঘাতের দাগ, ভুরুর কাছে অল্প রক্তপাতের চিহ্ন। দেখে মনে হলো মারধর করা হয়েছে।

দুদিন আগে দোমোহনীর পাড়ে ভক্তকুল পরিবৃত মাখোমাখো পরিতৃপ্ত মায়াময় অভিব্যাক্তিতে এই গুরুদেব কীর্তন শুনছিলেন। কীর্তনীয়ার দল গাইছিলো –

জয় শিব শংকর পরম ঈশ্বর

জয়  জয় প্রভু বরাতেরই নাচ

তুমি আমার প্রভু ভোলা নাচ

মহাত্মা কীর্তন থামিয়ে গুরুগম্ভীর কন্ঠে বলেছিলেন –

‘বসিষ্ঠেন কৃতং স্তোত্রং সর্বরোগনিবারণম্

সর্বসম্পৎকরং শীঘ্রং পুত্রপৌত্রাদিবর্ধনম্

কি আনন্দ কি আনন্দ ‘



খোল করতাল হারমোনিয়াম সহযোগে হাঁটু পর্যন্ত খাটো ধুতি আর স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে ওই কীর্তন দলকে  আগেও দেখছি পাড়ার বস্তি পঞ্চবটি নগরে। ওরা পুরুলিয়া বা বাঁকুড়া জেলার বান্দোয়ান, বড়বাজার, খাতরা বা ঝালদা থেকে আসে। পাড়ার অষ্টপ্রহরের আধ্যাত্মিক অনুষ্ঠানে  ‘সুনো চম্পা সুনো তারা’র সুরে মাইকে গলা  ফাটিয়ে ‘হরে কৃষ্ণ  হরে রাম’ গেয়ে আমার শ্রীমতীর মেজাজ আর আমার চিত্তসুখ হরণ করেছে বহুবার।

তবে সেদিন কীর্তনিয়া আর খোলিয়ার দল অকৃত্রিম লালচাঁদ মাহাতো ছাপের মানভূমি কীর্তন গাইছিল।



সেদিন গুরুদেব সদলবলে নৌকায় চড়ে ডোবোর পথে রওনা হয়েছিলেন। নৌকোর মাঝি হাবু সর্দার নৌকায় নৃত্যরত কীর্তন দলকে সামলাবার নিষ্ফল চেষ্টা করেছে। দাঁড় কীর্তন হলে তেমন বিপদ হয় না। কিন্তু এরাতো নৌকা বিলাসের পালায় শ্রীরাধার অভিমান কৃষ্ণের চপলতায় ছৌয়ের লচক নেচে নৌকা উত্তাল করে দেয়। গুরুদেব নৌকার একপ্রান্তে মসৃন মায়াময় ছবি হয়ে থাকলেন।

সেই গুরুদেব আজ আহত রক্তাক্ত অবস্থায় বালিতে শুয়ে। কি করে এমনটা হল? ওপারে  নির্লিপ্ত হাবু সর্দার বালিতে পা রেখে নৌকোয় হেলান দিয়ে খৈনি দলন করছে। দুচারজন ডোবোবাসী হাতপা ছুঁড়ে মনে হল খিস্তি করছে। সকাল সকাল শান্তিপ্রিয় ডোবোবাসি এরকম একজন ভক্তিমূলক ব্যাক্তিত্বকে ধরে ক্যালালো কেন?



এপারে আমাদের আশেপাশে দু-তিনজন কৌতুহলী মেছুয়াও জুটে গেছে। একজন জিজ্ঞাসা করে –

‘কি হইলোরে দুর্জয়? কেউ মারাপিটা কইরলো নাকি?’

‘আর গাঁয়ের বুরবক গুলার কথা কি বলবি। টুকু জলদি হাতলাগা। রাস্তায় উঁঠায়ে হসপিটাল লিয়ে যেতে হবে।’

গণ্ডগোলের গন্ধ পেলেই চেপে থাকা ব্যোমকেশের সত্যান্বেষী সত্তা আমাদের চেপে ধরে। ঠিক কি হলো ব্যাপারটা জানতে হবে। আমিও মানবিক কারণে ওদের সাথে হাত লাগিয়ে দোমোহনীর উঁচু ঢাল বেয়ে রাস্তায় উঠে এলাম। একটা অটোরিকশা পাওয়া গেলো। দুর্জয় বলল ‘আপনি টুকু সাথে চলুন দাদা। আপনাকে দেখলে থানা পুলিশ হবেনা’।

মেছুয়াদের তুলনায় কিঞ্চিৎ ভদ্রসভ্য আমার সাজ পোশাক ও বাচনভঙ্গি বোধহয় দুর্জয়ের মনে এই ভরসা জুগিয়েছে। ছোটবেলায় দুই বেচারার প্যারোডি গান শুনে জীবনদর্শন আমার, ‘পরকে লেলিয়ে দিয়ে নিজে মজা দেখবি, মারামারি দেখলে সোজা দৌড় দিবি’;   ফলে, আমি কিঞ্চিৎ সন্ত্রস্থ।

‘না বৈলবেন না দাদা। মাইনসের বিপদে একটুকু করতেই হয়। আপনাকে হামি চিনছি। মুড়িওয়ালা গোবিন্দ আপনার গল্প আমায় জানাইছে।’

আমার ইতস্তত ভাবভঙ্গি দেখে দুর্জয় আমার হাত ধরে অটোরিকশার একধারে অর্ধশায়িত গুরুদেবের পাশে বসিয়ে দিলো। দায়ে পড়ে আপাতত সত্যান্বেষী সত্তার কাছে আত্মসমর্পন করলাম।



জামশেদপুর দোমোহনীর পাড়ে সবাই মানভূমি বাংলা বলে। ওদের সাথে কথা বললে আমার বাংলা ভাষার স্বরাঘাতে সহজাত মানভূমি টান চলে আসে।

গুরুদেব একপাশে হেলান দিয়ে নিঃসাড়। দুর্জয় আমার কানে ফিসফিস করে বলে - ‘আমি জানছিলাম এমনটাই হবার আছে।’

আমার জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে প্রশ্ন - কেমনটা হবার ছিল?

দুর্জয় আঙ্গুল নেড়ে কিছু না বলেই বুঝিয়ে দিলো - সবুর কর। পরে বলবো।

অটোরিকশা চলেছে। দুর্জয় জানাল, তামোলিয়ায়  ‘ব্রহ্মানন্দ হাসপাতালে’-এ

নিয়ে যাবে।

‘উহারাও ভগবান পার্টি। সন্ন্যাসী দেখলে ফিরিফান্ড দেখে দিবে।’

বুঝলাম দুর্জয় বিচক্ষণ ম্যান অফ দ ওয়ার্ল্ড। হঠাৎ গুরুদেব গোঁ-গোঁ শব্দ করে আরো নেতিয়ে একপাশে কাৎ হয়ে গেলেন। মনে হচ্ছে মূর্ছা গেছেন। প্রাণ আছে তো? মরে গেলে থানা পুলিশের ঝামেলা হলে? অটোরিকশা থেকে নেমে ‘আমি নেই’ গাইতে গাইতে আমায় কেটে পড়তে হবে।

আমার দক্ষিন হস্তে বাবা হাত রাখলেন। তাকিয়ে দেখলাম মুখে সেই অমায়িক মসৃন হাসি ফিরে এসেছে -- যেন বলছেন, ‘কিছু চিন্তা করিস না। সব ঠিক হয়ে যাবে।’

এত অন্তর্যামী গুরুদেব। ফিল্টার করে ভাবনা চিন্তা করতে হবে। বাবা সব পড়ে ফেলছে।

হাসপাতালে পৌঁছেই একটা স্ট্রেচারে তুলে গুরুদেব কে ভিতরে নিয়ে গেল। আমি সরে পড়ার জন্য উসখুস করছি বুঝে দুর্জয় আমার হাত চেপে ধরে বললো - প্লিজ একটু দাঁড়হাবেন দাদা।

একটা কাউন্টারে কিছু কাগজপত্রের কাজ চটপট সেরে ফেললো। ভেতরে গিয়ে উঁকি মেরে চার-পাঁচমিনিট পরে বেরিয়ে এল।

-      বেডে লিয়ে ডাক্তারে দেখছে। বলছে টুকু পরে জানাবে।

আমার ভিতরের ব্যোমকেশ বেরিয়ে আসে – ‘হইলো টা কি?’

‘এমনটাতো হবারই কথা। ‘

‘তোমাকে কিছু করলনা কেন?’

‘ডোবো হামার সসুর ঘর। সালা গুলা থাইকতে হামার কিছু হবেই নাই। উহার সঙ্গের এসিসটেন আর কীর্তন পাটি মারাপিটার হাল্লা সুনে সব রাতেই পালাইছে। বাবাকে উহারা হামারলে বেশি জাইনছে ন।

বাবার কি বেশি জানছে এখনও পরিষ্কার নয়। আমার চোখে মুখের জিজ্ঞাসা বুঝে দুর্জয় বলে -’দেখ, এই ধান্ধায় টুকু ইহার দোষ থাইকবেকেই।’

ইহার দোষ? লোকজন কে গালমন্দ করে? নাকি বিনা কারণে ঝগড়া করে? আমার চোখে মুখে জিজ্ঞাসার চিহ্ন ফুটে উঠলো। আমার অজ্ঞতার গভিরতা বুঝে দুর্জয় বিরক্তির সাথে চুক করে। হাতের ইশারা করে বলে –

‘বুইঝছ নাই? বিটিছায়ে ইহা।’

বিটিছা মানে তো মহিলা? আমার চোখেমুখে আরো গাঢ় বিস্ময় ও কৌতুহল ফেটে বেরিয়ে আসছে।

-      আইধাত্মিক ধান্ধায় টুকু মেয়েছিলায় দোস থাইকবেকেই। তবে জাইগা বুঝে লিতে হবে।

মেয়েমানুষে দুর্বলতার গন্ধ পেয়ে ভিতরের ব্যোমকেশ এবার দুর্বার - জানতেই হবে ব্যাপারটা।

-      মেয়েছিলায় দোষ?

দুর্জয় আমার কথায় কোনোও পাত্তা না দিয়ে প্রায় স্বাগোতক্তির মত বলে – ‘দু-চারটা বাবার সাথে ঘুরে এই ধান্দাটা হামি জাইনে লিছি। ইহাদের সাথে ঘুরাঘুরি করলে দু-চারটা মন্ত্র-তন্ত্র এমনি জাইনে যাবে। ছোটোর থেকে  রামায়ণ মহাভারতের পালাগান, ঝুমুর আর বাউল-কীর্তন থেকে বহুত জাইনে লিয়েছি। সঙ্গে কীর্তন পার্টি থাইকলে দু-চার ঘন্টা এমনি একাই টাইনে দিব। এদিককার বাজারটা বহুত বড়। ধর, হামদের পটমদারলে  শুরু হচ্ছে  মানবাজার,খাতরা, বলরামপুর, ঝালদা,তুলিন তক। ইদিকে গালুডিহি, চাকুলিয়া, বহরাগোড়া, ঝাড়গ্রাম তক। হামাকে অনেক লোকে চিনছে। ইদিককার ধান্দা হামার ভরসায় চলছে।’

বুঝলাম দুর্জয় আমার সাথে কথা বলছে না। বাবার থেকে আলাদা হয়ে নিজের স্টার্টআপের ভবিষ্যৎ কর্মসূচী কষছে। মার্কেট স্টাডি করে নিয়েছে। ধান্দার নোহাউ ওর আয়ত্তে। স্টার্টআপ ওর ভাষ্যে ‘আইধাত্মিক ধান্দা’ চালু করার অ্যাকশন পয়েন্ট গুলো গুছিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু বাবা ঠিক কি করেছিল যে মার খেয়ে পালাতে হল সেটাতো জানা গেল না। দুর্জয়কে প্রসঙ্গে ফিরিয়ে আনতে আমি বালি – ‘বাবাতো সাধন মন্ত্র মেয়ে-পুরুষ সবাই কে নিয়ে বসেন। সেখানে ওতো মানুষজনের উপস্থিতিতে মহিলাদের সাথে…?’

‘ই বাবা গায়েঁর ভক্তিমূলক পালাগান আর প্রবচনের আসরে আধাঘন্টায় ব্যটাছিলা সব উঠে পালায়। ব্যস, তারপরে চন্ডিদাসের সহজিয়া কাম তত্ত্ব আসে গেলে তো কথাই নাই। হামি হামদের বাবার, আরও অনেক বড়বড় গুরুদেবের প্রবচন পুরা রটে লিয়েছি। তুমাকে বললি ন। গুরুজিদের ইহার দোষ থাইকবেকেই। দেখ নাই, তারিণী ঠাকুর দুটা ডবকা ছুঁড়ি লিয়ে ঘুইরত। পুলিশে ত্রৈলোক্য ব্রহ্মচারীর মরা লাস বার কইরতে সিডি-তিডি আরও কত লন্দফন্দ  বই বেইরাল। আসারাম রামরাহীম টুকু অধিক বাড়াবাড়ি কইরে ফাঁইসে গেল। এই ধান্দাতে তুমাকে কথা বলার কাইদাটা জাইনতে হবে। ভালভাল কথা বইলতে হবে। একটু তরজা গান বলতে হবে। ‘

দুর্জয় আমায় মানভূমি মাটির লোক জ্ঞান করে তুমিতে নেমে এসেছে।

ওই কবিগান আর তরজায় আমার কিছু অভিজ্ঞতা আছে। চুয়াত্তর-পঁচাত্তরে যখন কার্জন পার্কে প্রতি রবিবার প্রতিবাদী সংস্কৃতির আসর বসত, তখন যোগ দিয়ে গেয়েছি কবিগান। দুর্জয়কে জানালাম কবিগান তরজা আমার বড় প্রিয়। একসময় গেয়েওছি।

-      তুমি কবিগান যান?

-      তবে সে গানে ভক্তিরসের আড়ালে দেশের কথাই বেশি থাকে।

-      তুমার অনেক গুণ আছে। একটা গান বল যে রকমটা জান।

-      হাসপাতালের ওয়েটিং রুমে গান ?

-      চল ওই চায়ের দোকানে জাঁইয়ে বসছি। হঁ ইবার বল গানটা। আমার দমে জাইন্তে মন কইরছে।

আমি এদিক ওদিক দেখে নিলাম আশেপাশে কেউ নেই। মৃদু সুরে দুর্জয়কে শোনালাম -

‘প্রথমে বন্দনা করি শ্রীগুরুর চরণ

তারপাছে বন্দনা করি যতেক গুণীজন

তারপাছে বন্দনা করি দেবী জননীরে

যার দয়াতে বেঁচে আছি দুধে ভাতে ক্ষিরে

আরেক প্রেম মহাপ্রেম ডলারধারির সনে

বন্দনা না করলে তারে পাপ থাকে মনে

এই পর্যন্ত বন্দনা গান করি সমাপন

মধুমাখা দেশের কথা করিব গাহন’

গানের মধ্যে একাত্ম হয়ে গিয়ে  গলাটা উচু হয়ে যায়। দুর্জয় আমার প্রতিভায় মুগ্ধ। ওর মাথায় খেলছে এই জিনিশ কে ওর নিজের ভবিষৎ প্রজেক্টে কি ভাবে ব্যবহার করা যায়।

‘তুমাদের গানে কোন ঠাকুরের জয় গান কইরতে? ‘

‘মার্কস, লেনিন আর কমিউনিস্ট পার্টির জয় গান। মানুষকে সচেতন করতে গানের কথা এমন হত –

অহিংস এক জাতি আমরা মেরুদণ্ডহীন

ভাতের হাঁড়ি ঢনঢন স্বপ্ন রঙ্গিন’।

‘কাজটা অনেক ইজি। লেনিন-তেলিনের জাইগায় শিবঠাকুর কৃষ্ণঠাকুরের নামগুলা ডেলে দিতে হবে। হামার কাছে ইদিককার অনেক ঝুমুর পালা গান আছে। তুমি জাইনলে ওই গান আরো সুন্দর বইলতে পারবে।’

দুর্জয়ের ভাবনা চিন্তা নতুন কর্মসূচীকে বাস্তবায়ন করতে মগ্ন।

বাবার আসল এসিস্টেন্টরা খবর নিয়ে পৌঁছে গেছে। সঙ্গে দু-চারটে সভ্যভব্য গাড়িওয়ালা পার্টিও আছে। বোঝা যায় বাবার ভক্তের পরিধি ব্যাপক।

দুর্জয় ওদের কে বাবার কাছে নিয়ে গেল। যাবার আগে সনির্বন্ধ অনুরোধ করে গেল আমি যেন অপেক্ষা করি। মিনিট কুড়ি বসে থেকে বিরক্ত হয়ে উঠে যেতে উদ্দত হলে দুর্জয় এসে যায়।

‘গুরুজীর পাটির লোক আইসে গেছে। আর চিন্তা নাই। হঁ, তো কি বইলতে ছিলি?’

‘বাবাকে মারপিট কেন করলো?’

‘তুমাকে বললি ন। দ্যাখো বিটিছার সঙ্গে উল্টাপাল্টা করার আগে জাইগা, মানুষ ঠিকঠাক বুঝে লিতে হবে।’

আমার কৌতূহলী চোখে আরো প্রশ্ন বুঝে দুর্জয় বলে - ‘আমাদের ভক্তির জগতটা জাইনলে বুঝতে - মহাভারত, কৃষ্ণলীলা, শিবপুরান -  গোটাটাই কামশাস্ত্র।’

আমি ইশারায় একটু নিচুগলায় কথা বলতে বলি। দুর্জয় কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে ফিসফিস করে বলে, ‘তুমি কৃষ্ণলীলার কোনো পালা দেখেছ? বাউল সহজিয়া সাধনায় শুক্রকে মহাভাব নিত্য বস্তু বলা হয়। উনাদের গানে তুমি যাকে সেক্স বলছ উহারা সাধনার অংশ বলছেন। ঢঙ্গের নাম দিছেন 'চারিচন্দ্র ভেদ'। শিবঠাকুরের কুচুনিপাড়ার কিস্সা গুরুজিরদের কাছে শুনলে তুমি হাঁ হয়ে যাবে। হামদের বাবাতো বড়ু চণ্ডীদাস গল্পে  কৃষ্ণের নৌকাবিলাস এমন বইলবে বুঝাবে কি ধর্মাত্মার সাথে সেক্স কইরলে ডাইরেক্ট  স্বর্গযাত্রার টিকিট হাথে পাঁইয়ে জাবে।’

‘বল কি? কিন্তু ওসব কাণ্ড লোকজনের মাঁঝে…গুরুজী কেমন করে..? ‘

‘হাই দেখ, একঘরে গুরুজী ভক্ত নারীকে দীক্ষা দিবেন। শিবরাত্রিতে দীক্ষা। বাবা চারধাম আর কৈলাশে সাধনা করে দিব্য পুরুষ হয়েছেন। দীক্ষা দিতে নিজের বরপ্রাপ্ত ধর্মদণ্ড দেখাই দিলেন। বাবা কি জাইনছেন  বিটিছাটা আদিবাসী? বোকাটা হল্লা কইরে দিল।’

বাবার স্বর্গীয় অভিসারে দুর্জয়ের গলায় প্রচ্ছন প্রশ্রয়। আদিবাসী মহিলার হল্লা করাটাই অত্যন্ত অন্যায়। আর পাঁচটা পুরুষমানুষের মত ভিতরে ভিতরে অল্পবিস্তর দুশ্চরিত্র, লোকলজ্জায় আর বউয়ের ভয়ে নিপাট সজ্জন আমি মহৎ মহাত্মাদের ‘আইধাত্মিক ইহার দোষ’ জেনে আসস্ত হলাম।

‘বাবার দ্রব্যগুনতো আমিয়েই সামলাই।’

‘সেটা কি ?’

‘রোগ বিমারী, মাতাল ছেলে, ব্যাটার বাপের সঙ্গদোষ, বিটির বিহা – সবের মন্ত্রপূত ঐশ্বরিক ইলাজ বইলতে হয়। কিছুনাই, একটা পুঁটলিতে ঝান্ডু কি রামদেবের গুলি, জড়িবুটি শিকড় কপালে ঠ্যাকায়ে মন্ত্রকরে হাতে সমর্পন কইরতে হয় - গুরুজীর রামবান। আর দু-চারটা আচার সিখাই দিবে। মঙ্গলের রাতে বিড়াল দেখলে সিনাতে হবে। শুক্রতে খাট্টা খাওয়া চলবে নাই। সকালে সূর্জ কে পিছু রেখে গুরুমন্ত্র আউড়ে এক লোটা জল ফেলতে হবে। এমন দু-চারটা আরো।’

মনে পড়ে গেল সেই গৃহীসন্ন্যাসীর কথা। কলেজ পাশকরে তখন চাকুরীহীন আমি ব্যাঙ্কের পি.ও. পরীক্ষার ইন্টারভিউ দিতে কলকাতায় তালতলার পিসতুতো দিদির কাছে উঠলাম। দিদি আমায় সঙ্গে নিয়ে সল্টলেকের  এক গুরুজীর কাছে গেছিল। বুঝিনি, আমার জীবনের নানা সমস্যার জোড়াতালি দেওয়ার অভিপ্রায়েই সেখানে যাওয়া। আমরা পৌঁছনোর কিছুক্ষন পরে প্যান্ট শার্ট জুতো পরা গুরুজী অফিস থেকে ফিরলেন। দিদি কানে ফিসফিস করে বলেছিল - ‘এঁদের কে বলে গৃহীসন্ন্যাসি। অফিসে কাজ করেন আর বাড়িতে ঐশ্বরিক শক্তি দিয়ে মানুষের উপকার করেন। টাকাপয়সা কিছু চান না। যে যা দেবে।’

আমি গুরুজীর ‘আইধাত্মিক’ সাইড বিসনেসের অভিনব আঙ্গিক দেখে অভিভূত হয়ে গেলাম। গুরুজী একটা ঘোলাটে জলভরা কিষান স্কোয়াশের বোতলের মুখ কপালে ঠেসে ধরে জপ্ করলেন। বোতলের থেকে বেরিয়ে একফোঁটা জল গুরুজীর নাকের ডগায় ঝুলে থাকল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বোতলটা নামিয়ে নিজের বাঁহাতের বুড়ো আঙ্গুলটা  দেখিয়ে বললেন - ‘এখানে একটা ওঁ দেখতে পাচ্ছ?’

‘না, পাচ্ছি না।’

আমার দিদি - সে দিব্যি ওঁ দেখতে পাচ্ছে। উদ্বিগ্ন দিদি আমার ঘাড়ে হাত রেখে বলে - ‘দেখতে পাচ্ছিস না কি রে? ভাল করে দেখ।’

না দেখতে পেলে বিপদ হতে পারে বুঝে আমি বললাম, ‘হ্যাঁ দেখতে পাচ্ছি। এই তো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।’

দিদির চোখেমুখে পরিতৃপ্তি। গৃহি-গুরুজি নির্দেশ দিলেন - ‘ কাল সকালে বাড়ি থেকে বেরনোর পূর্বে একগ্লাস ওই কেশর-মারা জল খাবে। বেরোনোর সময় বাঁ পা আগে বাড়াবে। মনে করবে এই ওঁ-টা দেখতে পাচ্ছ।’

পরের দিন সকল বেলায় বাড়ি থেকে বেরনোর সময় দিদি একগ্লাস গুরুজীর কেশর-মারা জল হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেটাকে গলাধঃকরণ করে বেরনোর মুহূর্তে দিদির চিৎকার - ‘বাঁ পা আগে, বাঁ পা আগে। ওঁ টা দেখতে পাচ্ছিসতো?’

‘হ্যাঁ- হ্যাঁ, পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি।’

চাকরিটা আমার হয়ে গেল। দিদি সবাইকে জানাল - ‘সে হতভাগার কোত্থাও চাকরি হচ্ছিল  না। ইন্টারভিউ খুব খারাপ করেছিল। কিচ্ছুটি বলতে পারেনি।গুরুজীর কাছে একটিবার গেল, কেশর-মারা জল খেল – ব্যস, যাবে কোথায় বাছাধন? অত বড় অফিসারের চাকরি পাকা হয়ে গেল !’

দুর্জয় ঠিকই বলেছে। ‘আইধাত্মিক ধান্দায়’ দ্রব্যগুন আর আচার -  দুটোরই ব্যাপক গুরুত্ব।

দুর্জয়  বলে – ‘হামদের গুরুজীর আশ্রম ঝাড়গ্রামের কাছে। গুরুজিদের একটা আশ্রম থাকতেই হয়। গালুডিহি থেকে দুআরসিনির রাস্তায় আমার শালার রোডসাইডে জমি আছে। উহার সঙ্গে কথা করে লিয়েছি। আশ্রম থাইকবে আর আজকাল হোটেলের মত হইছে না। কি টা বলে উহাদের?’

‘রিসর্ট?’

‘রিসত নাই, ক্যাম্প। পেলাস্টিকের ছাদ টাংয়ে ক্যাম্প। দু রাত্রি ব্যাপী ভক্তদের অনুরোধে গুরুজীর অখণ্ড ভক্তি ক্যাম্প। দূর দূর থেকে ভক্ত আইসবে। দমে চইলবে। হামাকে লোক চিনছে। গুরুজী বলে মানবে নাই।  তুমাকে গুরুজী বানাতি। কিন্তু পাঁচ লোকের সামনে প্রবচন করতে তুমি পাইরবে নাই।

কর্মজীবনে পাঁচতারা হোটেলে বাঘাবাঘা টেকনোক্রাটদের প্রোডাক্ট ডেমো দিয়ে তাক লাগিয়েছি আমি। এতবড় একটা অপমান জনক কথা মেনে নিতে পারলাম না।

‘সুনো। অনেক বড়বড় নামিদামি কোম্পানির জন্য হামি নামিদামি হোটেলে উহাদের সামান বেচতে দু-তিন ঘন্টার লেকচার মেরেছি। তখন কোম্পানিগুলার থেকে দমে পইসা পিটেছি। লোকে ইউটুবে হামার ভিডিও দেখেছে।’

দুর্জয় মুগ্ধ বিস্ময়ে আমার হাত দুটো চেপে ধরল।

‘তুমি কি বৈলছ? তুমি মোবাইল ভিডিও করা জাইনেছো! কে বইলবে তুমি এত গুনে ছুপারুস্তম!’

এতক্ষন দুর্জয়ের সঙ্গে কথা বলয় আমার ভাষাও অজান্তে কখন মানভূমি হয়ে গেছে। বলি, ‘আরও সুনো। জয়শ্রীরামের চাপে হামাকেও আজকাল একটু বেশি বইলতে হচ্ছে।’

‘ই বাবা! বাঙালি হইঁয়ে তুমিও ওই চালিসা পার্টিতে ভিড়লে?’

‘তুমি উল্টা বুঝছ। হামি চালিসা পার্টিকে সুধাই - একমিনিটে বইলতে পারবে গীতায় বলা একজন সত্যিকারের হিন্দুর চিন্তা-ভবনা, লিখাপড়া, রহন-সহন, কামধাম  কেমন হবেক?’

‘কি বলে উহারা?’

‘উহারা কিছু জানে? দশ মিনিটের ও বেশি উল্টাসিধা বকবে। অমুক গুরুদেবের তাইজ্জব কান্ডকারখানা,  অমুক মাতামন্দিরের চমৎকারী ইচ্ছাপূরণ ও দুর্গতিবিনাশের ভেলকিবাজীর যত্তোসব গালগল্প। হামি জিগাই হিন্দু-জিবনদর্শনটা কই বললে?’

'হাই জীবনদর্শন কথাটা কী বটে?'

‘অই যে বইল্লাম ন -- তুমার ভাবনাচিন্তা, লিখাপড়া, কামধাম বগেরহ্ -- যা সব দেখে আসপাসের লোক ব্যুঝবেক তুমি মানুষটা কি রকম, তুমার অগল-বগলের মানুষগুলাকে কী চোখে দেখ। তুমার ভিতর যে আসল সচ্চা মানুষট আছে ন, তুমার 'জীবনদর্শন' সেই লোকটাকেই উজাগর করে দিবে আম পাবলিকের সামনে।"

বেচারাদের দোষ নেই। ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে ধর্মব্যাবসা বেচছে ঠাকুর দেবতার কর্মসূচী  - ‘ভক্তের ধনবৃদ্ধি আর সঙ্কটমোচন। আমরা মহামানব ঠাকুরের প্রিয়পাত্র। তোর নামটা ও ঠাকুরের লিস্টে টুকে দেব।’ বিক্রি হচ্ছে চমৎকারী ধনবৃদ্ধি যন্ত্র। দাম একশো একান্ন থেকে এক লক্ষ টাকা। সঙ্কটমোচন মন্দিরে সকালসন্ধে ভজন বাজছে ‘ঝোলি ভর দে মা’।

বোধহয় দুর্জয়কেও এই যুদ্ধ লড়তে হচ্ছে ওর ‘আইধাত্মিক ধান্দায়’।

‘তুমি আসল হিন্দু জীবনের ইহাটা কি জানালে?’

‘উহাদের সুধাই – গীতায় কোথাও জয়শ্রীরাম বা হরহর মহাদেব বলা আছে? নাই। হিন্দুধর্মের জীবন দর্শন ষড়রিপু বসে রেখে নিরন্তর সত্যের সন্ধানে গীতা যেমনটা বইলেছে কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ অথবা  ভক্তিযোগ - - একটা রাস্তা বাইছে লাও। সে ভক্তিযোগ ঠাকুরের মূর্তির সামনে ঘন্টা বাজিয়ে অংবং মন্ত্রোচ্চারণ লয়। বিবেকানন্দ বা মুনি-ঋষিদের মত কন্যাকুমারী বা হিমালয়ে জাঁয়ে একাকী ধ্যানস্থ হওয়া। লিজেকে খোঁজা। আপন ভিত্তরটাকে ঠিকঠাক জানা। ’

জানি না, আমার মানভূমি বাঙলা বয়ানে পরিবেশিত হিন্দু-জীবনদর্শনের এহেন অতি সরলকৃত ব্যাখ্যা দুর্জয় বাবাজী কতটা হজম করতে পারল। কিন্ত কিছুক্ষণ চুপ থেকে ও যা মন্তব্য করল তাতে মনে করা যায়, একাডেমিক শিক্ষা পাঠক্রমে ঘাটতি থাকলেও, দুর্জয় বিচক্ষন দুনিয়াদার।

দুর্জয়ের বাঙ্ময় শরীরী ভাষ্যে উল্লসিত প্রতিক্রিয়া, ‘ই বাবা ! তুমিতো ধর্মযোগের রামবানে চালিসার পিছন মাইরে দিলে! গো’

আমি জীব কেটে বলি, ‘ঠাকুরের নামে মুখখারাপ করিস না রে ভাই। গীতা বইলছে, ঈশ্বর কি কেউ জানে না। যে জানে সে বৈলতে পারে না। রামকৃষ্ণ ঠাকুরকে এক ভক্ত একবার শুধায়ে ছিল – বাবা, পরমব্রহ্ম বস্তুটা কি? বাবা বইলেছিলেন এক বিরাট নুনের পুতুল সাগরের গভীরতা মাপতে ডুব দিয়েছিলো। গভীরতা বৈলবে কি, সে তো নিজেই গইলে গেলো! মানেটা কি বুঝলি ? ‘

‘নাই বুঝলি। আপনি টুকু বুঝান।’

আমার প্রতি ভক্তিতে দুর্জয় আমায় আপনি সম্বোধন করছে। চোখেমুখে গুরুদেব সুলভ তুর্যভাবে আমি তুই তোকারি তে নেমে এসেছি। দুর্জয়ের চোখে দেখতে পাচ্ছি আমার ভাবমূর্তিটা প্রায় রামকৃষ্ণ হয়ে গাছে। কপাল ভাল, ‘বিবেকানন্দ স্কুল’-এ ধৰ্ম নামে একটা বিষয় ছিল; যেখানে ঘোর চাপে কর্মযোগ-জ্ঞানযোগ-ভক্তিযোগ ইত্যাদি পড়তে হয়েছে।

– ‘যে মানুষ কর্মযোগ বা জ্ঞানযোগ অথবা  ভক্তিযোগ এর মাধ্যমে ব্রহ্মজ্ঞান প্রাপ্ত করে সে নিজেই, নিজের অজান্তেই, ঈশ্বর হয়ে যায়। কিন্তু, সে নিজে বুঝতে পারে নাই। উহার আসপাশের লোক জানতে পারে ইনি সাক্ষাৎ ব্রহ্ম। মানে, তোর ভগবান। আরে, চালিসা-ওয়ালারা কালীমন্দিরের পাশে পাঁঠার মাংস বিকতে দিছে নাই। আরে তোদের মনুস্মৃতি বৈলছে মাংসয় টুকু মন্ত্র পৈড়ে খাওয়া চৈলবে। হামদের কালীঠাকুরে পাঁঠা বলি দিয়ে দমতক খাছে  লোকে। আর ঋগ্বেদ দেখাচ্ছে, ভগবান ইন্দ্র ছাগল গরু সব মাংস খেতেন – উক্ষণো হি মে পঞ্চদশ সাকং পচন্তি বিংশতিম্ ।

উতা হমদ্মি পীব ইদুদরং মে পৃণন্তি বিশ্বস্মাদিন্দ্র উত্তরঃ।’

গোমূত্র সংস্কৃতির চাপে ঠাকুর দেবতা বিবর্জিত আমি ও  ইদানিং কিছু শ্লোক মুখস্ত করেছি মোক্ষম জায়গায় ছাড়তে। দুর্জয় আমায় ব্রহ্মজ্ঞান-প্রাপ্ত মানুষ ভেবে আমার হাতটা চেপে ধরল।

– ‘স্বয়ং ঠাকুর আজ আপনার দর্সন  করাই দিলেন। গুরুজী মারটা খাইলো তো আপনি উদয় হলেন।’

হাসপাতাল থেকে দু-চারজন গুরুজীর লোক আর ভক্ত গুরুগম্ভীর চিন্তিত মুখ করে বেরিয়ে এল। দুর্জয় আমায় অপেক্ষায় রেখে ছুটে গেল তাদের কাছে।

আমি চিন্তামগ্ন। দুর্জয়ের আশ্রম প্রজেক্টকে একটা নতুন কর্মক্ষেত্রে পরিণত করতে পারলে মন্দ হয় না। জীবনের গোধূলিতে পৌঁছে বেঁচে থাকার সার্থকতা খুঁজতে মানুষের জন্য কিছু করতে চান এমন পরোপকারী মানুষের অভাব নেই। আশ্রমে সাপ্তাহিক নিশুল্ক চিকিৎসার ব্যাবস্থা করা যায়। মানভূমি লোকসংস্কৃতি সময়োচিত সংলাপে ঝুমুর আর পালাগানের মাধ্যমে নতুন দল বানিয়ে মানুষের কাছে নিজের কথা পৌঁছে দেওয়া যায়। কিছু মানুষের অর্থসংস্থান করা যায়। এক লহমায়  দুর্জয়ের কর্মসূচি আমার জীবনে বেশ প্রাসঙ্গিক মনে হল।

দুর্জয় কিছুক্ষণ পরে  ফিরে এসে জানাল - ‘বাবাকে বোধহয় লাকওয়া (প্যারালিসিস) মাইরে দিল। আরও অনেক টেস-তেস করে জানা যাবে। হামদের গাঁয়ে একটা বুড়াকে লাকওয়া মাইরলো তো উহার মুখটাই  ট্যাঁঢ়া হয়ে গেল। ট্যাঁঢ়া লাকওয়া-মারা মুখ লিয়ে গুরুজী কি প্রবচন পাইরবে? ইদিককার ধান্দা তো চৌপট। আপনার নম্বরটা হামি রাইখছি। আপনার সঙ্গে পরে পুরা কথা কৈরব।’

যাবার আগে আমার হাতটা চেপে ধরে বললো - ‘আপনি সামান্য মানুষ নন। আজ থেকে জাইনবেন বাবার জাইগাটা আপনাকে লিতে হবে। ঠিক?’

‘হামাকে অ্যাত্ত বড় মানুষ ভাবার কোন কারণ নাই। হামার ঘরে জাঁইয়ে ধর্মপত্নী সারদামনি কে শুধাবে ন; –  বইলবে হামার মত রাম-খচ্চর দুটা দ্যাখে নাই।’

বাড়ি ফেরার পথে হৃদয় উৎফুল্ল। মনে হচ্ছে জীবনে একটা কাজের কাজ খুঁজে পেলাম। ওই সুমনের কথায় ‘দেখা হবে তোমায় আমায় অন্য গানের ভোরে’। ক্ষুদার্থ পেট - মনে আজ  রবিবাসরীয় কবিরাজের কীর্তন শেষের খাওয়ার আনন্দ। পুতা মাসির সিন্নি প্রসাদ নয়, বাঙালি রবিবাসরীয় প্রাতঃরাশ বৌয়ের হাতের লুচি-তরকারি অপেক্ষা করছে। স্বতস্ফূর্ত গান বেরিয়ে এল –

শান্তিপুর ডুবুডুবু নদে ভেসে যায়। 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন