কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / দ্বিতীয় সংখ্যা / ১৪১

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / দ্বিতীয় সংখ্যা / ১৪১

সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬

রাজেশ গঙ্গোপাধ্যায়

 

কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৪৬


টুপটাপ

জীবনে কোন কাজই ঠিকঠাক করে উঠতে পারেনি অভ্রকান্তি। এজন্য ওর খুব বদনাম। সবচেয়ে বড় কথা ও নিজেও ওর এই স্বভাবটা জানে। তবু চেষ্টা করেও নিজেকে বদলাতে পারে না।

এই যেমন এখন ও ঘুরে বেড়াচ্ছে পাহাড়ের ঢাল বরাবর। বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে এসেছে নর্থ বেঙ্গলের একটি অপেক্ষাকৃত কম জনপ্রিয় পাহাড়ি গ্রামে। একটা হোমস্টেতে আছে ওরা।

বন্ধুরা আগে থেকেই সাবধান করে দিয়েছিল, “দ্যাখ আগে থেকেই বলে দিলাম, এবার কিন্তু এমন কোন ঝামেলায় ফেলিস না, যে ট্যুরটাই মাটি হয়ে যায়। এর আগে সব জায়গায় কিন্তু তোকে নিয়ে কোন না কোন ঝামেলায় পড়েছি আমরা।” অভ্রকান্তি মাথা নেড়ে বাধ্য ছেলের মত স্বীকার করে নিয়েছল, এবার তেমন কিছু ঘটবে না।

দুপুরের খাওয়াদাওয়ার পর ও যখন সামনে থেকে একটু ঘুরে আসার জন্য অনুমতি চাইল, তখন সবেমাত্র জমিয়ে তাসে বসা বন্ধুরা ভাবল, যাক আপদটা কিছুক্ষণের জন্য বিদেয় হোক! ফরম্যালি যদিও সতর্ক করে দিল, “বেশী দূরে যাস না কিন্তু।”

হোমস্টে থেকে বেরিয়ে ওর বেশ খুশী খুশী ভাব। দারুণ ওয়েদার! হোমস্টের উঠোনটা সোজা গিয়ে ঝপ করে শেষ হয়েছে, যেখান থেকে একটা গভীর খাদের শুরু। রেলিং আছে যদিও। তার পাশ দিয়েই একটা সিঁড়ি নেমে গেছে একটা চওড়া চাতালের দিকে। সেখানে গিয়ে মোবাইলে কয়েকটা ছবিও নিল। চোখজুড়ানো দৃশ্য! তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে একমুখ ধোঁওয়া ছাড়ল। বেশ কিছুক্ষণ ধরে আনমনে সিগারেট খেতে খেতে ওর মনে হল, প্রকৃতি এত সুন্দর। এই সৌন্দর্যকে সিগারেটের ধোঁওয়ায় দূষিত করে দেওয়াটা কি ঠিক হচ্ছে!

ভাবনাটা আসা মাত্রই ও সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিল। কিন্তু পা দিয়ে পিষে নেভাতে যাবে এমন সময় দমকা হাওয়ায় সিগারেটের আধখাওয়া জ্বলন্ত টুকরোটা ঢাল বেয়ে গড়িয়ে গেল। ও দৌড়ে গিয়েও নাগাল পেল না। যাঃ! ঢালের বেশ কিছুটা নীচে একটা শুকনো গাছে গিয়ে আটকে গেল ওটা। আর দেখতে দেখতে আগুন ধরে গেল গাছটায়। সর্বনাশ!

গাছটার দুটো ডালের কোণে বিরাট একটা মৌচাক হয়েছিল, অভ্রকান্তি আগে খেয়ালই করেনি। দেখা গেল আগুনের তাপে মৌচাক ফাঁকা রেখেই উড়ে চলে যাচ্ছে মৌমাছিরা। আর টইটম্বুর মৌচাক থেকে মধু টুপটাপ করে ঝরে পড়ছে নীচে। কোত্থেকে এসে জড়ো হয়েছে কয়েকটি স্থানীয় বাচ্চাছেলে। অত উঁচু গাছে উঠতে পারবে না জেনে ওরা জিভ বের করে রেখেছে, আর ওদের ছোট্ট গোলাপী জিভগুলোয় মধুর প্রত্যেকটি বিন্দু পড়ার সাথে সাথে দুচোখ বুজে আসছে তাদের। মুখটা ভরে উঠছে স্বর্গীয় হাসিতে। মুখ বন্ধ করে জিভ কুঁকড়ে শুষে নিতে গিয়ে চকাস করে এক আলতো সুরেলা আওয়াজ সৃষ্টি হচ্ছে।

ওরা অভ্রকান্তিকে নীচে ডাকল – মধু খাবে, এসো। অভ্রকান্তি হেসে হাত নাড়ালো, তারপর পা বাড়ালো হোমস্টের দিকে।

ফিরতে ফিরতে অভ্রকান্তি বুঝে উঠতে পারল না এই ঘটনাটার জের কতদূর গড়াতে পারে! জ্বলন্ত গাছটার  কোনো ডাল যদি আচমকা ভেঙে পড়ে বিভোর বাচ্চাগুলোর ওপর…


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন