![]() |
| কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৪৬ |
স্বাধীনতা অনন্ত
সাতকাহন করে কিছু বলার প্রয়োজনীয়তা কোনদিনই অনুভব করেনি জয়িতা। সে নিজের নীরবতার মাঝে নিজেকেই খোঁজে। কারণ সেখানে কেউ হাত দিতে পারবে না। সে বেশ ভালোভাবেই জানে তার চারপাশের মানুষজনরা যতই পোশাকের উজ্জ্বলতা, প্রসাধনের চাকচিক্য আর সুখী কথার ফুলঝুরি ঝড়াক না কেন-- তারা কেউই সেই জীবনটা কোনদিনই পায়নি --- যেটা তারা পেতে চেয়েছিল। এটাই চরম সত্য। জীবনের সবকিছুই গোলমেলে। কোনো অঙ্কই মেলে না। মেলা উচিতও না।
এই কারণেই জয়িতা কখনোই কোনদিনই নিজেকে কোন তথাকথিত দুর্ভাগ্যের শিকার মনে করে না। তার চলন এবং যাপন এলোমেলো বাতাসের মতো অথবা ঝড়ের সমুদ্রে উত্তাল ঢেউয়ের মতো। সে ভেসে যায়। আবার সাঁতার কেটে পাড়ে উঠে এসে বালির বিছানায় শরীর ডুবিয়ে দিয়ে মনের আগল খুলে দেয়। যবে থেকে সে নিজের শরীরকে চিনেছে সেদিন থেকেই সে যেন আকাশের অনন্ত নীলের সঙ্গে পৃথিবীর জল, মাটি, অরণ্য, পর্বতের মধ্যে কোন ফারাক খুঁজে পায়নি। এক মহাসঙ্গমের গীতধ্বনির সুর সর্বত্র বিরাজমান। তার স্বপ্ন ও যাপনকে তার নিজের কোনদিনই মূল্যহীন মনে হয়নি। সব সময় মনে হয় সে শুধু বর্তমানে নয়, অতীত এবং ভবিষ্যতেও বাস করছে একই সঙ্গে। শরীরকে ভালোবেসে সে এক স্বেচ্ছা দাসত্বের ঘেরাটোপে যে আটকে পড়েছে -- এ কথা তার কখনোই মনে হয়নি।
প্রতিটি মুহূর্তকে সে উপভোগ করে। সে সুখী হয়ে উঠতে চায় নিজের মতো করে। এখানেই সে যেকোনো রকমের দাসত্ব থেকে মুক্ত। এমনকি জীবনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে, ভেংচি কেটে চলে যাওয়াটাও একটা স্বাধীনতা। স্বাধীনতার কি কোন সংজ্ঞা হয়? জয়িতার মনের মধ্যে প্রশ্নটা এঁদো পুকুরের জলের নিচ থেকে বুদবুদের মতো উঠে আসে। উত্তর পায় না। না পাক। ওতে জয়িতার কিছু যায় আসে না। তবু জীবনে বেঁচে থাকার মধ্যে একটা গতি আছে, গতি আছে জমাট বেঁধে থাকা সময়ের মধ্যেও। সময়টাকে শুধু বুঝতে হয়। তার প্রৌঢ় বাবা সুবোধ কুমার তলাপাত্র তো অফিসের রুটিন মাফিক একটা জমাটবদ্ধ কাজের মধ্যেও গতি খুঁজে পায়। যেমন তার মা রান্নাঘরের মধ্যে আটকে থেকেও এখনো মাঝে মাঝে রাতের অন্ধকারে বাবার জন্য পা ফাঁক করে জীবনের গতি খুজে নেয়। গতির তারতম্য আছে।
ধুস্, এটা জীবনের
কোনো গতির চরিত্র হলো! জয়িতা মনে মনে হাসে এবং ভাবে কী বোকা
বোকা জীবন! সেও তো কতবার যে তার শরীরের উৎসবে মেতে
উঠেছে তার হিসাব নেই। তাই বলে সেই ক্ষণিকের উৎসব তাকে আটকে রাখতে
পারেনি। তার গতির কাছে কত সময় যে নিজের শরীরও
হেরে গেছে তার হিসেব নেই।
জয়িতার দরজাটা ভেজানো আছে। এতো বেলা হয়ে গেল এখনো ব্রেকফাস্ট করেনি। সকালের চা-ও খায়নি। সুবোধকুমারকে
তার স্ত্রী বলল, একটু দেখো তো!
সুবোধকুমার জয়িতার ঘরের ভেজানো দরজায়
টোকা মেরে কোনো শব্দ না পেয়ে দরজাটা ঠেলে খুলে দেখলো মেঝেতে রক্তের সমুদ্রে জয়িতা
ঘুমোচ্ছে।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন