![]() |
| সমকালীন ছোটগল্প |
ভজহরির ভজকট
স্ত্রী মারা যাওয়ার পর ভজহরিবাবু তাদের পৈত্রিক বাড়িতে একা একাই থাকেন। তাঁর কোনো পুত্রসন্তান নেই। দুই মেয়ে। তারা বিয়ের পর দূরদেশে থাকে। বড়জন পুনে আর ছোটোজন আমেরিকায়। ভজহরিবাবু নিজে রাঁধতে জানেন। রাঁধতে ভালোও বাসেন। এবং ভালোবাসেন বাজার করতেও। তার সমস্যা একটাই। তাঁর রান্নার পরিমাণ একজন মানুষের পক্ষে অনেকটাই বেশি হয়ে যায়। ডাক্তারের বারণ আছে বাসি খাবার খাওয়া চলবে না। নিজে যত্ন করে রেঁধে ফেলে দিতেও মন চায় না। তাই তাঁকে যারা তাঁর রান্না খাবার খাবে সে ধরনের লোক খুঁজতে হয়। ব্যাপারটা শুনতে সহজ। মনে হবে টিফিন ক্যারিয়ার ভরে, ও দিদিভাই, ও বৌদি বলে আশপাশের বাড়িতে দিয়ে দিলেই হয়। কিন্তু না। তিনি যে ধরনের রান্না করেন সেসব খাবার এখন চলে না। চলে না বলাটা ভুল। কারণ তাহলে সেসব বাজারে বিকোচ্ছে কেন? কেউ না কেউ তো সেসব কিনছে! রাঁধছে। রেঁধে খাচ্ছে। আসলে তার আশপাশের জগতে সেসব চলে না। তাদের এসব বিলকুল না পসন্দ।
উনি যে বাজারে গিয়ে এই সব মোচা, লতি, কচুর ডাঁটা, কল্মিশাক, চালতা ইত্যাদি কেনেন, সেই বাজারটা তাঁর বাসা থেকে বেশ দূরে। একেবারে সেই রেল লাইনের ধারে। অনেকটা হাঁটতে হয়। ভজহরি হাঁটতে পারেন। বয়স তাঁর অনেককিছুই কেড়ে নিয়েছে। আবার অনেককিছু কাড়তে পারেনি। হাঁটার শক্তিটা সেই না কাড়ার লিস্টে আছে। আরো যা যা আছে আর যা যা নেই, সেসব ক্রমশ প্রকাশ্য।
তাঁদের বাড়ির কাছের বাজারটা অনেকদিন
হলো উঠে গেছে। ডিজিটাল জগতে ওরকম নগদ টাকার লেনদেনের বাজার চলে না। তারা অনলাইনে টাকা
নিতে ইচ্ছুক ছিল না। কারণটা আর্থ-সামাজিক। এক নম্বর, সেজন্য ব্যাঙ্কে একাউন্ট খুলতে
হয়। ব্যাঙ্ক একাউন্ট খোলার দশটা হ্যাপা আছে। আবার যে চাষীদের থেকে ওরা মাল আনে তারা
ক্যাশ ছাড়া কারবার করে না। জটিল সমস্যা। তাই তারা এখান থেকে উঠে গেছে। তবে সেখানকার
একজন সব্জিওলাই ভজহরিবাবুকে এই লাইন ধারের বাজারটার খবর দিয়ে ছিল।
- ওরা আজকাল ওখানে বসে। দূর আছে
কিন্তু!
- দুর! ও কোনো ব্যাপারই নয়। আমি
ঠিক চলে যাবো।
শুনতে মামুলি মনে হলেও ভজহরিবাবুর
কাছে তার এই সমস্যাটা গুরুতর সমস্যা। যার সমাধান হওয়াটা তিনি মনে করেন খুবই জরুরি।
ভজহরিবাবু তার বর্তমান সমস্যার
সমাধান খুঁজতে একদিন সেই বাজারে গিয়েই খোঁজ করতে শুরু করলেন।
- এই তোদের থেকে এইসব সব্জি পাতি
কারা কেনে রে?
- অনেকেই। এই তো আপনিই কেনেন।
- আরে আমার কথা বাদ দে। আর কারা
কেনে? ঐ বাবু পাড়ার কেউ কি কেনে?
এর জবাবে সকলেই মাথা নেড়ে জানালো।
- না। কখনোই না।
- তবে? এতো মাল?
- কেন খালপার বস্তির ওরা কেনে।
কিন্তু সে খবরে আপনের কী দরকার?
- না মানে, এই কৌতূহল।
- অ। কৌতুক! তা নিজে গিয়ে খোঁজ
নিলেই পারেন। আপনার তো পায়ের জোর আছে।
একদিন তাই গেলেন ভজহরিবাবু। এটাও রেল লাইনের ধারে। ছোটো ছোটো ঘর। সব গা ঘেঁষাঘেঁষি করে। অনেক ঘরের দেওয়াল পাকা। ইঁটের গাঁথুনি। তবে ঢালাই ছাদ একটাও নেই। কোনোটা খাপরার, কোনোটা টালির, কোনটা ঢেউ খেলানো এসবেসটস সিটের। সব ঘরের দরজাই বন্ধ। মনে হয় লোকজন নেই। কিম্বা দরজা বন্ধ করে সবাই ঘরের ভেতরে সেঁধিয়ে আছে।
দরজায় কড়া নেড়ে - আপনারা কি
লতির তরকারি খান? বা মোচার ঘন্ট খান? জিজ্ঞেস করাটা ভারি বেমানান হবে। লোকে পাগল ভেবে
তেড়ে আসতে পারে। তাহলে কি উপায়? এমন সময় পথে একজন সাইকেল চালককে দেখা গেল। তাকে
সাইকেল চালক বলাটা অবশ্যি ভুল। সাইকেল ঠেলক বলা উচিত। কারণ সে একটা সাইকেলকে ঠেলে ঠেলে
নিয়ে চলছিল। সে ছাড়া উপায়ও নেই। কারণ গোটা সাইকেল বোঝাই অনেক বাক্স। বাক্সের গায়ে
মুরগির ছবি। ভজহরিবাবু এরকম বাক্সগুলোকে চেনেন। ওতে মুরগির ডিম থাকে। লোকটা তবে এ পাড়ায়
ডিম বিক্রি করতে ঘুরছে!
- ও দাদা।
- বলুন।
- আপনি তো ডিম বিক্রি করেন।
- হ্যাঁ। তাতে কী?
- কী করে করেন? মানে সব ঘরই তো
বন্ধ।
- বন্ধ হবে না! সারারাত জেগে তারপর
দিনে না ঘুমালে শরীর টিকবে? শরীর নিয়েই যখন কারবার, শরীরকে টিকিয়ে রাখতে হবে তো!
ভজহরিবাবু থতমত খেয়ে গেলেন। ডিমওয়ালা
আরো জানালো --
- এ পাড়ায় ডিমই প্রধান খাদ্য।
বাবুরাও খান বিবিরাও খায়। ওতে তাকদ বাড়ে। ইচ্ছে শক্তিও বাড়ে।
- ও।
- তাই যাদের ডিম দরকার তারা আমার
সাইকেলের ঘন্টি শুনেই দরজা খুলে ডিম নিয়ে নেয়। বেশ ভালো বিক্রি বাট্টাই হয়।
ভজহরিবাবু বুঝলেন। এ পাড়ায় তার
মোচার ঘন্টের বা কচুর শাকের কদরদান নেই। তাঁকে অন্যত্র খোঁজ করতে হবে। তিনি হাতের পাঁচ
সেই ডিমওলাকেই জিজ্ঞেস করলেন--
- আচ্ছা এখানে ধারে কাছে এমন লোকজন
আছেন যারা লতি, মোচা, কচুর শাক খায়?
- আপনি কি ঠ্যালায় করে ওসব বেচতে
চান? কিন্তু তোমাকে তো দেখে ভদ্দর লোক মনে হচ্ছিল!
এক ধাক্কাতেই সে আপনি থেকে তুমিতে
নেমে এলো।
- না না। বেচবো না। আমি এমনি এমনিই
দিতে চাই। রান্না-খাবার।
শুনে ডিমওলা এমন চমকে উঠলো যে ডিমের
বাক্স সহ তার সাইকেল পড়ো পড়ো হয়ে গেল। ভজহরিবাবুকে হাত লাগিয়ে সে ভয়ঙ্কর পতন আটকাতে
হোলো।
বাক্স বাক্স ডিম আছড়ে পড়ে ভেঙ্গে
চুরমার হলে। যে কেলেঙ্কারিটা ঘটতো। তাতে ভজহরিবাবুও আস্ত থাকতেন না। উনি কালবিলম্ব
না করে কেটে পড়লেন। যেতে যেতে শুনলেন ডিমওলা বলছে - আপনিও খেতে পারেন রোজ দুটো তিনটে
করে ডিমসেদ্ধ। আপনার শরীরেও নবযৌবন এসে যাবে। তারপর নয় এ পাড়ায় আসবেন। আমার চেনা
কাউকে বলে দেবো।
- না না। বলতে হবে না। আমার ওই
দুর্বলতা নেই।
ভজহরিবাবুর রান্না করা ছাড়া ফেসবুকের নেশাও আছে। তিনি মোবাইল ঘেঁটেও সময় কাটান। সেখানে ইউ টিউবে গিয়ে তিনি এসব মোচা, লতি কচুর শাকের নতুন নতুন রান্নার রেসিপি শিখেছেন। যদিও তাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি রান্না। তারা যে কেবল জলের বদলে পানি দিয়ে রান্না করেন তা না, সেখানে উল্লেখিত অনেক ইনগ্রেডিয়েন্টই এদেশে মেলে না। সেইসব রান্নার ব্লগে অনেকেই মন্তব্য করেন। তারা নিশ্চয়ই সেসব রান্না রাঁধে এবং খায়। অনেক খুঁজেও সেখানে ভজহরিবাবুর পরিচিত কাউকে পেলেন না। ভেবেছিলেন তেমন কাউকে পেলে ফেসবুক ফ্রেন্ড করে নেবেন। নেমন্তন্ন করে তাদের তাঁর নিজের রান্না খাওয়াবেন। কিন্তু এখনো পর্যন্ত তিনি তেমন কাউকে পাননি। যদিও চেষ্টা জারি রেখেছেন।
হঠাৎ একদিন, না না দিন নয় এক রাতে একটা ফোন এলো।
- এই যে ভুতো আমি সরলা।
ভজহরিবাবুর মনে পড়ে গেল তাঁর ছোটোবেলার
ডাকনাম ছিল ভুতো। তাঁর ধারণা ছিল তাঁকে ঐ নামে ডাকার মতো এখন এ সংসারে আর কেউই জীবিত
নেই। কিন্তু ধারণাটা ভুল ছিল। কিন্তু সরলাটা আবার কে? তাকে তিনি চিনতে পারলেন না।
আমতা আমতা করে সেটাই বলে ফেললেন।
- আমি তো ঠিক চিনতে...
- তা চিনবে কেন? যখন রোজ রোজ সকাল
বিকেল চিঠি দিতে তখন তো খুব চিনতে।
- চিঠি?
- হ্যাঁ লাভলেটার। দাওনি শত শত?
অনেকদিন সেসব যত্ন করে নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলুম। তারপর যখন বিয়ের ঠিক হলো তখন শম্পা
মুখপুড়ির পরামর্শে মাটির কলসিতে চিঠিগুলোর সাথে কটা পাথর ভরে মাঝপুকুরে ডুবিয়ে দিয়েছিলুম।
এরসাথে সরলার দীর্ঘশ্বাসটা এতোই
জোরে ছিল যে সেটা হাওয়ার ঝাপটা হয়ে ভজহরিবাবুর মুখে এসে লাগলো।
- তারপর যখন খবর পেলুম তোমার বউ
গত হয়েছেন তখন বুকে বল পেলুম। যাক এবার যোগাযোগ করা যাবে।
ভদ্রতার খাতিরে ভজহরিবাবু জিজ্ঞেস
করলেন--
- আর আপনার স্বামী।
- মরণ! আপনি আজ্ঞেঁ করছে দেখো!
তুমি কি ভোটের ক্যান্ডিডেট? অতো বিনয় কেন?
- না না।
- তিনি গত হয়েছেন আরো আগে। আমার
থেকে পনেরো বছর বড় ছিলেন তো।
ভজহরিবাবু সাহস করে বলেই ফেললেন--
- তুমি কি কচুর লতি খাও? মোচার
ঘন্ট?
- খুব খুব। সে জন্যেই তো এলুম।
আছে নাকি?
- হ্যাঁ হ্যাঁ। এখন খাবে?
- সাথে চাড্ডি ভাত হবে?
- হবে বোধহয়। তবে ঠান্ডা।
- জল ঢেলে তাদের পান্তা করে দিতে
পারবে?
- খুব পারবো।
ভজহরিবাবু ধড়মড় করে উঠে বেডসুইচ
টিপে আলো জ্বেলে দিলেন। LED lightএর আলোয় গোটা ঘর আলো হয়ে গেল। কিন্তু সরলা কই? ঘর
তো ফাঁকা! ও হরি! এটা তবে স্বপ্ন ছিল?
ভজহরিবাবু হতাশ হয়ে ঘটঘট করে হাফ
বোতল জল খেয়ে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লেন। যদিও ঘুম আর এলো না।
শুয়ে শুয়ে তিনি মোবাইল ঘাঁটতে
বসলেন। হঠাৎ নজরে পড়লো U tubeএ fusion cooking. ব্যাপারটা অভিনব। দেশি রান্নার সঙ্গে
বিদেশি রান্নার মিশ্রণ। যেমন চাউমিনের পায়েস। ম্যাকারোনির পোলাও। অমনি ভজহরিবাবুর মাথায় একঝাঁক আইডিয়া উঁকি দিলো। এরকম
fusion তো তিনিও করতে পারেন! অনলাইনে পিৎজার বেস পাওয়া যায়। সেটা আনিয়ে তাতে মোচার
ঘন্টের প্রলেপ দিয়ে ফিউশন পিৎজা বানানোই যায়। সেরকম কচুর শাক দিয়েও করা যায়। সেরকম
ফিউশন পিৎজা নিশ্চয় এ পাড়ার ছেলে ছোকরারা খেতে আপত্তি করবে না। কালই লেগে পড়তে হবে
কাজে।
পরদিন সকালে উঠে তিনি বাইরে এসে দেখলেন একঝাঁক ছেলেমেয়ে রাস্তা দিয়ে চলেছে। কাঁধে ব্যাগ। আজ তো রবিবার। স্কুল ছুটি। তবে ওরা যাচ্ছে কোথায়? ও টিউশনি! এখন যাচ্ছে যাক। ফেরার পথে ধরতে হবে।
ভজহরিবাবু ঘরবার করে করে তক্কে
তক্কে থাকলেন ছেলেমেয়েদের পাকড়াও করার জন্য।
ফেরার সময় দল বেঁধে নয়। ওর ফিরছিল
একা একা। ভজহরিবাবু ডাক দিলেন--
- এই কী নাম তোর? এদিকে আয়!
- না দাদু। খিদে পেয়েছে। ঘরে যাবো।
- আচ্ছা যা।
ভজহরিবাবু তো এটাই চান। ক্ষুধার্ত
বালক বালিকা। পরের রবিবারে উনি ওদের ফিউশন পিৎজা রেঁধে খাওয়াবেন।
পরের রবিবার তাঁর ছেলেমেয়ে ধরার
প্রচেষ্টায় সব ফস্কে গিয়ে ধরা পড়লো মাত্র একজন।
- কী নাম তোর?
- ঝিঁঝিঁ।
- এ আবার কী নাম?
- দাদুর দেওয়া ডাকনাম। দাদুরও
তোমার মতো মাথায় ছিট ছিল। সরি সরি! মুখ ফস্কে বের হয়ে গেল।
তা যাক্। তাঁর রান্না ফিউশন পিৎজা
মুখ না ফস্কালেই হলো।
তিনি গরম গরম মোচার ঘন্টের লেয়ার
দেওয়া পিৎজাটা পরিবেশন করলেন। এক কামড় দিয়েই ঝিঁঝিঁর মুখের চেহারা পাল্টে গেল।
- খেতে অসুবিধে হচ্ছে?
- সেউ ভাজা আছে?
- না মা।
- তা হলে ভাত?
ভজহরিবাবু চমকে উঠলেন। তিনি কি
ঠিক শুনলেন? ঝিঁঝিঁ ভাত বললো!
- হ্যাঁ হ্যাঁ আছে তো।
- তাই দাও।
পিৎজা সরিয়ে দিয়ে ঝিঁঝিঁ তৃপ্তির
সঙ্গে মোচার ঘন্ট দিয়ে ভাত খেলো।
- একদম ঠাম্মার মতো রান্না তোমার।
- ওমা তাই নাকি?
- এখন আর বাড়িতে এমন রান্না হয়
না।
- কেন?
- ঠাম্মা তো নেই।
- মারা গেছেন?
- না না। Old age homeএ আছেন। দূর্গা
পূজার আগে আমরা তো যাই দেখা করতে।
- আচ্ছা তোমার ঠাম্মার নাম কি সরলা?
- হ্যাঁ তো! তুমি জানলে কী করে?
চিনতে নাকি?
- না না। এমনি আন্দাজে বললাম। আর
মিলে গেল।
কিম্বা সত্যি সত্যিই ঝিঁঝিঁর ঠাম্মাই
ভজহরিবাবুর সরলা। হাতের নাগালেই ছিল অচেনা অজানা হয়ে।
এখনো কি তাকে ফিরে পাওয়া যায়
না? Old age home তো অগম্য কিছু নয়।
ইতিমধ্যে আনন্দে ভজহরিবাবুর চোখে
জল এসে গেছে। ঝিঁঝিঁ যেতে যেতে বলে গেলো--
- আর তোমাকে ছিটেল বুড়ো বলবো না।
বাকি সব্বাই কেও বারণ করে দেবো।
- ভালো। তবে কী বলে ডাকবি আমায়?
- ভজহরি মান্না।
ঝিঁঝিঁ চলে গেল। ভজহরিবাবুর মনে
তখন মান্না দের গাওয়া গানটা বাজছিল।
- আমি শ্রীশ্রী ভজহরি মান্না।
... শিখেছি আজব এই রান্না।
চমৎকারভাবে তাঁর সমস্যাটা মিটে
গেছে।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন