কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / দ্বিতীয় সংখ্যা / ১৪১

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / দ্বিতীয় সংখ্যা / ১৪১

সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬

প্রদোষ ভট্টাচার্য

 

বড় পর্দায় হিন্দী ছবি (১৭শ পর্ব): শাহরুখ খানঃ ১৯৯৫-২০১৮

 


গতানুগতিক প্রেমের সিনেমায় হয় মেয়ের নয় ছেলের নয় দুই পক্ষেরই পরিবারের দিক থেকে প্রবল আপত্তি আসে। সাধারণত আগের প্রজন্মের মতামতের বিপক্ষেই যায় নায়ক-নায়িকা। শেষ হয় বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে মিলনান্তক, বয়োজ্যেষ্ঠরা কনিষ্ঠদের ইচ্ছে মেনে নেন; তা না হলে কাহিনী বিয়োগান্তক পরিণতি পায়। এখন অবধি আলোচিত হিন্দী ছবির মধ্য থেকে এই ‘ফর্মুলার’ মিলনান্তক উদাহরণ, ষাটের দশকে মেরে সনম, জানোয়ার, সত্তরের দশকে হাথী মেরে সাথী, পাকীজা, হাম কিসী সে কম নেহী, ত্রিশূল। বিয়োগান্ত প্রেমকাহিনী, আমার দেখা হিন্দী ছবির ক্ষেত্রে অন্তত, এসেছে সেই সব ছবিতে যাতে আছে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটঃ বৈজু বাওরা (১৯৫২) আনারকলি (১৯৫৩), বা জাহানারা (১৯৬৪)। অবশ্য বিয়োগান্ত সামাজিক ছবিও আছে, যেমন অছুত কন্যা (১৯৩৬)।

১৯৯৫-তে মুক্তিপ্রাপ্ত, এবং অভূতপূর্ব সাফল্য পাওয়া দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে আশির দশকের শেষে মুক্তিপ্রাপ্ত, এবং বাণিজ্যিকভাবে চূড়ান্ত সফল, বিয়োগান্ত কেয়ামত সে কেয়ামত তক (১৯৮৮) এবং তার পরের দশকের গোড়ায় মুক্তিপ্রাপ্ত মিলনান্তক দিল (১৯৯০)-এর ধারার – দুটি ছবিরই নায়ক ছিলেন আমির খান – সজ্ঞান বিরোধিতা করে, যে দুটি ছবিতে প্রেমিকযুগল তাদের পরিবারের বৈরিতার বিরুদ্ধে গিয়ে, প্রথম ক্ষেত্রে মৃত্যু ও দ্বিতীয় ক্ষেত্রে মিলন লাভ করেছিল।

দিলওয়ালে দুলহানিয়া­-র নায়ক রাজ (শাহরুখ খান) নায়িকা সিমরনকে (কাজল) দেব আনন্দ-শাম্মী কাপুরের মতো তাড়া করে অবশেষে নিজের প্রেমে পড়াবে। মেয়ের বাবা (অমরীশ পুরী) এই সম্পর্কের প্রবল বিরোধিতা করে মেয়েকে বিলেত থেকে তাঁর দেশের মাটি পাঞ্জাবে এনে ফেলে এক ধনী পরিবারের চরিত্রহীন ছেলের (প্রমীত শেঠী) সঙ্গে বিয়ের ঠিক করেন। কিন্তু রাজ তো সিমরনকে সারা ইউরোপে ধাওয়া করে ফিরেছে। সে কি এত সহজে হার মানবে? বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় ডাহা ফেল করা এবং খেলাধুলোয় মোটামুটি পারদর্শী এই সৎ পাত্রটি নিজের বাবার (অনুপম খের) সমর্থনে – এবং উপস্থিতিতে – পাঞ্জাবে এসে হাজির হয় আর প্রেমিকাকে আশ্বাস দেয় এই বলে, “দেখো আমি কী কী করি!” গঙ্গারাম – থুড়ি রাজের – কোন প্রচেষ্টাই কিন্তু সফল হয় না, মধ্যে থেকে স্থানীয় একটি মেয়ে (মন্দিরা বেদী) রাজের প্রেমে পড়ে যায়! তা নিয়ে অবশ্য রাজের কোনও হেলদোল নেই। সিমরনের মা (ফরীদা জালাল) স্বয়ং রাজকে বলেন মেয়েকে নিয়ে পালাতে, নইলে তাঁর নিজের ক্ষেত্রে যা হয়েছিল – বিয়ের পর পড়াশুনো বন্ধ করে দেওয়া, শুধু সংসার সামলাতে বাধ্য করা – ঠিক তাই সিমরনের ব্যাপারে হবে। এখানেই ‘কাহানী মে টুইস্ট’ – গঙ্গারাম আসলে বড় ভালো ছেলে, সে শ্বশুরের সম্মতি ছাড়া সিমরনকে গ্রহণ করবে না! এবার স্রেফ হাওয়ায় উড়ে রাজ-সিমরনের একত্রের একটা ছবি বাবার পায়ের কাছে এসে পড়ে। বাবার ঠিক করা জামাই হবু-শ্বশুরের পূর্ণ সমর্থনে রাজকে পিটিয়ে পোস্ত করতে শুরু করে, আর রাজ চরম গান্ধীগিরি দেখিয়ে পড়ে পড়ে মার খেয়ে ট্রেনে ওঠে। ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে, এমন সময় হঠাৎই মেয়ের আকুতি আর রাজের গান্ধীগিরিতে আপ্লুত হয়ে সিমরনের বাবা মেয়েকে বলেন, “যা, সিমরন, যা! ও তোকে সত্যিই ভালোবাসে!”

এই রাজনৈতিক সঠিকতা এবং অতি-সংবেদনশীল নারীবাদের সময়ে রাজ ছবির প্রথমার্ধে যে ভাবে সিমরনকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে stalk করে বেড়িয়েছে, সেটা সমর্থনযোগ্য তো? এমনকি সিমরন মদ খেয়ে বেহুঁশ হয়ে পড়ার পর সিমরনের লিপস্টিক ব্যবহার করে নিজের সারা গায়ে চুম্বনচিহ্ন এঁকে রাজ ইঙ্গিত করে যে তাদের মধ্যে যৌন সম্পর্ক ঘটে গেছে! অর্থাৎ সে সিমরনকে ধর্ষণ করেছে। মানসিকভাবে সিমরন যখন ভেঙে পড়ছে, তখনই উচ্চারিত হয় ছবির সংলাপের সেই অনৃতভাষণঃ “না, না, আমি কখনও অমন করতে পারি? আমি কি ‘হিন্দুস্থানী’ নারীর ইজ্জত সম্বন্ধে সচেতন নই!” বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্ক তো অ-হিন্দুস্থানী মেয়েদের সঙ্গেই করতে হয়। তাছাড়া, প্রসঙ্গত, দ্বিতীয়ার্ধে সিমরনের বাবার ঠিক করা উচ্ছৃঙ্খল ছেলের বন্ধু সেজে তাকে রাজ বলবে, “আরে, তুমি এরকম [ম্যাড়ম্যাড়ে] দিশী মেয়ে বিয়ে করে কী করবে? আমি বিলেতে থাকি, সেখানে এসো, অনেক বিদেশী মেয়ের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক করিয়ে দেব!” আক্ষরিক অর্থে রাজ একটি দালালের ভাষায় কথা বলছে। ২০১৭ সালের ওয়েন হ্যারি মেট সেজল (স্থানীয় মাল্টিপ্লেক্সে দেখা) ছবিতেও এই মনোভাব বজায় রাখা হয়েছে। অনুষ্কা শর্মা অভিনীত সেজল যখন শাহরুখ অভিনীত হ্যারিকে বলছে যে হ্যারি যেভাবে অতীতে একাধিক বিদেশী মেয়ের সঙ্গে ‘ক্যাজুয়াল’ শারীরিক সম্পর্ক করেছে, সেজলের সঙ্গেও সে তাই করবে, হ্যারি প্রতিবাদ করে বলছে যে সেজল ভারতীয় মেয়ে – তার কথা আলাদা! বিদেশী হলেই মেয়েরা ভোগ্য পণ্য। আর ছবিটির অন্যতম বক্তব্য এই যে একটি লেবেল – ‘হিন্দুস্থানী’ – গায়ে মারলে এবং একটি গর্হিত কর্ম থেকে বিরত থাকলেই একজন পুরুষের অন্য যাবতীয় অশিষ্টাচার, এবং স্রেফ বেলেল্লেপনা, মাপ!

আর দিলওয়ালে দুলহানিয়া-র দ্বিতীয়ার্ধে প্রেমের যা অপমান চাক্ষুষ করা গেল, তাতেই আপামর দর্শককুল, বিশেষ করে তার মধ্যে একটি বিশেষ লিঙ্গের যাঁরা, তাঁরা আপ্লুত! এক স্বেচ্ছাচারী বাবা মেয়ের পছন্দ করা অপদার্থের পরিবর্তে মেয়েকে আরেক অপদার্থের গলায় ঝোলাতে বদ্ধপরিকর, কারণ দ্বিতীয়জন বাবার ‘আপন দেশের’ মানুষ এবং সেই দেশের মাটি, পাঞ্জাবে, তার বাস! এমন এক অপদার্থ পিতার সম্মতির কোনও মূল্য থাকা উচিৎ? আর যে তথাকথিত প্রেমিক মেয়ের মায়ের আশীর্বাদ প্রত্যাখ্যান করে এইরকম বাবার মতের অপেক্ষায় থাকে, আর যে মত সেই বাবা দিয়ে দেন কোনও বুদ্ধি-বিবেচনা না করে, শুধু তাৎক্ষণিক ঝোঁকের বশে, এই সব কিছুই নাকি এক চিরকালীন প্রেমোপাখ্যানের অন্তর্গত! মন্দিরা বেদী অভিনীত দুর্ভাগা নারী-চরিত্রটি যেভাবে উপেক্ষিতা হলো, সে প্রসঙ্গে আর কী বলব?

মূলধারার হিন্দী ছবি, অমিতাভ বচ্চনের রাজত্বকালে, কাহিনীর দিক দিয়ে শক্তিশালী, কিন্তু গানের কথা ভাবলে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। আলোচ্য ছবিটি সেই বাজে গল্প-ভালো গানের পরম্পরায় ফিরে গেছে। ছবিটি দেখেছিলাম অধুনালুপ্ত লেক টাউনের জয়া প্রেক্ষাগৃহে। ১৯৯৫-এ এটি সফলতম হিন্দী ছবি।



তুলনায় প্রথম দর্শনে ১৯৯৭ সালের দিল তো পাগল হ্যায় কিন্তু আমার এবং আমার স্ত্রীর খুব ভালো লেগেছিল। La Café (ফরাসী ব্যাকরণমতে হওয়া উচিৎ Le Café, কারণ Café পুংলিঙ্গ)-তে খেয়ে যখন দেশপ্রিয় পার্ক-লাগোয়া প্রিয়াতে ঢুকলাম, ততক্ষণে ছবি শুরু হয়ে গেছে। এক নাচের দলকে নিয়ে গল্প, যার প্রধান কুশীলবের ভূমিকায় শাহরুখ খান (রাহুল) আর করিশ্মা কাপুর (নিশা)। নিশা রাহুলের প্রেমে পড়েছে, যা অন্তত প্রথম দিকে রাহুলের অজ্ঞাত। দলের নতুন নৃত্যনাট্যের মূল নারীচরিত্র ‘মায়া’-র জন্য রাহুল পছন্দ করে অজয়ের (অক্ষয় কুমার) পরিবারে পালিত অনাথ পূজাকে (মাধুরী দীক্ষিত)। এবার শুরু হয় নাচের দলে ত্রিকোণ প্রেম – নিশা-রাহুল-পূজা – যা আবার পূজার বাড়ীর পরিপ্রেক্ষিতে হয়ে যায় চতুষ্কোণ, কারণ অজয়ও পূজার প্রতি আকৃষ্ট! নাটকের ঘটনা ও দৃশ্য এবং বাস্তবের ঘটনা একাধিকবার একে অপরের সঙ্গে মিলে যায়। অবশেষে নিশা আর অজয়ের আত্মত্যাগের ফলে রাহুল ও পূজার মিলন ঘটে এবং দর্শক এই ইঙ্গিতও পান যে হয়তো এই দুজন দিলদরিয়া মানুষ ভবিষ্যতে এক হবে। এটি ১৯৯৭-এর দ্বিতীয় সফলতম ছবি।

আপাতদৃষ্টিতে দিলওয়ালে দুলহানিয়া-র অনিষ্টকর এবং চূড়ান্তভাবে ভণ্ডামিপূর্ণ বক্তব্য দিল তো-তে নেই। তবে যেহেতু নব্বই দশক এবং এই শতাব্দীর গোড়ার দিকে অনেক যুবতীই শাহরুখের মধ্যে তাদের স্বপ্নের পুরুষকে খুঁজে পেয়েছিলেন, তাঁদের প্রশ্ন করতে হয়, তাঁরা এই ছবিদুটির কোন নারী চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম বোধ করেন? দিলওয়ালে-র সিমরন? তাহলে তাঁদের নারীবাদী মূল্যবোধের সঙ্গে প্রথমার্ধে সিমরনের consent-এর বিরুদ্ধে গিয়ে রাজের চরম অশালীনতা ঠিক কিভাবে খাপ খায়? আর দ্বিতীয়ার্ধে একজন নারী – সিমরনের মা – যখন তাঁর নিজের প্রতি হওয়া নির্যাতনের কথা বলে রাজকে বলেন সিমরনকে তাঁর পরিবারের পিতৃতান্ত্রিক আবহাওয়া থেকে মুক্ত করতে তখন সেই রাজ যে বলে যে ঐ উগ্র পৌরুষের প্রতীক পিতারই সম্মতির অপেক্ষায় থাকবে, তখন এই ‘নায়ক’-কে কতটা নায়কোচিত মনে করা যায়? আর যুবতীদের মন্দিরা বেদী-অভিনীত চরিত্রের প্রতি মনোভাব কী, যাকে রাজ স্রেফ ব্যবহার করছে সিমরনের পাঞ্জাবের বাড়ীতে ঢুকে চলাফেরার সুবিধের জন্য?

দিল তো পাগল হ্যায়-তে দীর্ঘকাল ধরে রাহুল নিশার মনোভাবের সম্বন্ধে (হয়তো ইচ্ছাকৃত ভাবেই) অজ্ঞ এবং/অথবা উদাসীন থেকেছে। নিজের পছন্দের নারীকে খুঁজে পেয়ে সে পুরোপুরি তাকে পাবার চেষ্টায় ব্যাপ্ত থাকছে, নিশা অবশেষে নিজের প্রেম স্পষ্ট করে জানাবার পরেও। অবশ্য, নারীবাদীদের যুক্তি এখানে প্রয়োগ করা যেতে পারেঃ তাঁরা বলে থাকেন যে কোন পুরুষ কোন নারীর প্রতি আকৃষ্ট হলেই সেই নারীর কোন দায়বদ্ধতা থাকে না সেই আকর্ষণের প্রতিদান দেবার। সেই ভাবেই, কোন নারী কোন পুরুষের প্রেমে পড়লেই সেই পুরুষের দায়বদ্ধতা জন্মায় না সেই প্রেমের প্রতিদান দেবার।

এছাড়া নিশা আর পূজার অস্তিত্বই আবর্তিত হচ্ছে সম্পূর্ণভাবে আত্মমগ্ন এবং আত্মকেন্দ্রিক রাহুলকে ঘিরে। নিশা একটি দলের দক্ষ নৃত্যশিল্পী হলেও ছবির আখ্যান অনুযায়ী তার প্রধান পরিচয় সে রাহুলের ব্যর্থ প্রেমিকা। আর পূজা অজয়ের পরিবারে আশ্রিতা, কিন্তু সে ‘শপিং’ আর পরে রাহুলের স্বপ্ননায়িকা ‘মায়া’-র প্রতিভূ হওয়া ছাড়া আর কী করে সময় কাটায়? আর রাহুল কি সত্যিই কোন রক্তমাংসের নারীকে ভালোবাসতে সক্ষম? সে তো সর্বক্ষণ ‘মায়া’-কে (নামটি খুব অর্থবহ) খুঁজে বেড়াচ্ছে! এই হলো মেয়েদের – বিশেষ করে নারীবাদী মেয়েদের – আদর্শ প্রেমিক!



১৯৯৮-এর সফলতম ছবি কুছ কুছ হোতা হ্যায়। এক বিচিত্র কলেজ, যেখানে ছাত্রীরা স্বল্পবেশে ঘুরে বেড়ান, এবং যেখানে ইংরেজী সাহিত্যের অধ্যাপিকা (অর্চনা পূরণ সিং) রোমিও-জুলিয়েট­-এর নান্দনিক বিশ্লেষণের বদলে কলেজের অধ্যক্ষের (সেই অনুপম খের) প্রতি নিজের আকর্ষণ ব্যক্ত করতে বেশী ব্যস্ত। কলেজে কলির কেষ্ট রাহুল (শাহরুখ) একাধিক মেয়েকে নাচিয়ে বেড়ায়। তার সবচেয়ে ঘনিষ্ট বন্ধু পুরুষালী অঞ্জলি (কাজল)। অধ্যক্ষের আত্মীয়া টিনা (রাণী মুখার্জী) ভর্তি হতেই রাহুল তাকে তাক করে, এবং অঞ্জলি তখন বুঝতে পারে যে সে নিজে রাহুলের প্রেমে পড়েছে। হতাশ প্রেমিকা রাহুলের প্রবল আপত্তি (কেন? একাধিক মেয়ের আনুগত্য সে উপভোগ করে বলে?) উপেক্ষা করে কলেজ ছাড়ে, রাহুল আর টিনার বিয়ে হয়। কন্যাসন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে টিনা মারা যায়, স্বামী রাহুলকে বলে যায় মেয়ের নাম ‘অঞ্জলি’ রাখতে, আর মেয়ের উদ্দেশে রেখে যায় (সম্ভবত) আটটি চিঠি যাতে অঞ্জলি-রাহুল-টিনার ত্রিকোণ প্রেমের বর্ণনা আছে, এবং যা পড়ে অকালপক্ক বালিকা-অঞ্জলি তার বিপত্নীক বাবা আর সেই অঞ্জলিকে এক করবে। টিনা ধরে নিয়েছে যে এত বছর ধরে অঞ্জলি অনূঢ়াই থাকবে! আদতে অঞ্জলির বিয়ে ঠিক হয়েছে অমন নামে একটি সুপাত্রের সঙ্গে (সলমন খান) যে স্পষ্ট বুঝেছে যে অঞ্জলি তাকে ভালোবেসে বিয়ে করছে না। নানারকম বিচিত্র ঘটনা ঘটিয়ে ছোট অঞ্জলি তার প্রয়াতা মায়ের আদেশ পালন করার চেষ্টা করে, আক্ষরিক অর্থেই ‘বাপের বিয়ে’ দিতে উদ্যত হয়, বাবাকে হাজির করে অঞ্জলি-অমনের বিয়ের আসরে! শেষরক্ষা (?) করে উদার-হৃদয় অমন, বরের আসন ছেড়ে উঠে এসে নিজের বাগদত্তা আর রাহুলকে মিলিয়ে দিয়ে! নেপথ্যে মাঝে মাঝেই দেখা দেয় টিনার আশীর্বাদকারিণী আত্মা!

একাধিক সুখশ্রাব্য গান আছে, আছে কিছু দৃশ্য যেগুলির মানসিক অভিঘাত অনস্বীকার্য। কিন্তু সব মিলে ছবির কাহিনী দাঁড়ায় কি? এর ওপর এসেছে, দিলওয়ালে-র মতো কিছু অনৃতভাষণ – “জীবনে প্রেম একবারই হয়” এবং সেই প্রেমজনিত “বিয়েও একবারই হয়” – যা কাহিনীর পরিণতিই ভুল প্রতিপন্ন করে। সেটাই কি করণ জোহরের উদ্দেশ্য? আবার, রাহুলের বহুগামিতাকে – কলেজের একাধিক মেয়ে, টিনা, এবং সবশেষে যে অঞ্জলিকে রাহুল মানসিকভাবে শোষণ করে এসেছে (‘টিনাকেই আমি বিয়ে করব, তাই বলে তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে কেন?’) – যেভাবে বৈধতা দিয়ে দু’দু’বার পুরস্কৃত করা হয়েছে (টিনা-লাভ, তারপর একেবারে বিয়ে ভেঙে অঞ্জলি-লাভ) তা নিয়ে শাহরুখের অসংখ্য মহিলা ভক্তরা – যাদের মধ্যে অনেকেই অন্য ক্ষেত্রে আগুনখোর নারীবাদী – তলিয়ে ভেবেছেন কি? আর দিলওয়ালে-র মন্দিরা বেদী অভিনীত নারী চরিত্রের মতো সলমন খানের অমনও অবিচারের শিকার, আর দিল তো পাগল হ্যায়-এর অজয়ের কপালে নিশা জোটার সম্ভাবনা থাকলেও, এই ছবিতে অমনের জন্য কোন সান্ত্বনা-পুরষ্কার ছিল বলে মনে পড়ছে না। তবে সৎ পুরুষের প্রতি অন্যায় অবিচার তো আমাদের দেশের আইনেই কতটা স্বীকৃত তা ভেবে দেখার বিষয়; পুরুষের নিছক আত্মত্যাগ তো পিতৃতন্ত্রের যুগ যুগ ধরে চলে আসা নারীদের প্রতি অবিচারের প্রতিকার হিসেবে অবশ্য-করণীয় কর্তব্য মাত্র!

কুছ কুছ হোতা হ্যায় মধ্য-কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ‘মেট্রো’-তে আমার শেষ দেখা ছবি। এই মেট্রোতেই আবার বাল্যকাল ও কৈশোরের সিংহভাগ ইংরেজী ছবি দেখেছি। জীবনে প্রথম আমার সিনেমায় যাওয়াও নাকি এই মেট্রোতে – অবশ্যই ইংরেজী ছবি দেখতে, যে কথা ইংরাজী ছবি দেখার প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছি।



এরপর ২০০৭ সালে দেখি সেই বছরের সফলতম হিন্দী ছবি, শাহরুখ খান এবং নবাগতা দীপিকা পাড়ুকোন অভিনীত ওম শান্তি ওম। এটিই একবিংশ শতাব্দীতে একমাত্র হিন্দী ছবি যা আমি বড় পর্দায় দু’বার দেখেছি। উপভোগ্য ছবি, গানও ভাল, তবে চিত্রনাট্য রচয়িতা প্রথমে ষাট-সত্তরের দশকের হিন্দী ছবিকে সস্নেহ ব্যঙ্গ করার পর দ্বিতীয়ার্ধে সত্তরের কর্জ, এবং তার চেয়েও বেশী, ১৯৫৮ সালের মধুমতী-র অনুকরণই করেছেন। দুটো ভাগ ঠিক মেলে কি?

এর পরবর্তী আলোচনা বন্ধুপ্রতীম ছাত্র অভিরূপ মাশ্চরকের লেখনীপ্রসূত।


এই বিশেষ নায়কটির পরবর্তীকালের ছবিগুলোতেও ভালোবাসা ও মহিলাদের সমস্যাজনক চিত্রায়ণ অব্যাহত রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে চারটি ছবি নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা যাক। প্রথম, রব নে বানা দি জোড়ি (২০০৮-এর দ্বিতীয় সফলতম ছবি, স্থানীয় মাল্টিপ্লেক্সে দেখা)। তানি বলে একটি মেয়ের (অনুষ্কা শর্মা) হবু বরের  অকালমৃত্যুর ফলে তার বিয়ে হয় আপাতদৃষ্টিতে খুবই ভালোমানুষ, গোবেচারা সুরিন্দর সাহানির সাথে। শাহরুখ-অভিনীত এই সুরিন্দর চরিত্রটি এরপর তানির প্রতি তার 'ভালোবাসা' দেখাতে একটি অদ্ভুত পন্থা বেছে নেয়। গোঁফ কামিয়ে, চুলের স্টাইল পাল্টে, উগ্র রকমের রঙচঙে পোশাক পরে, নিজেকে রাজ বলে পরিচয় দিয়ে সে তানির সাথে একটি নাচের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে, ও তানিকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করতে সচেষ্ট হয়। তানি যেহেতু স্বভাবতই প্রাণোচ্ছ্বল, হাসিখুশি, নৃত্যগীত-প্রিয় মেয়ে, তাই মুখচোরা, মিতবাক সুরিন্দরের চেয়ে আমোদপ্রিয়, উচ্ছ্বাসপ্রবণ রাজকেই তার বেশী ভালো লাগে, আর এর ফলে তার মনে তৈরী হয় অপরাধবোধ। পরকীয়া করার, স্বামীকে ঠকাবার অপরাধবোধ। অথচ সুরিন্দর আর রাজ তো একই ব্যক্তি। তানির কাছে সেটা গোপন করে, তাকে অনর্থক এই মানসিক নিপীড়ন কেন? শাহরুখের ভক্তরা বলবে, সুরিন্দর লাজুক কিনা, তাই তানির মন পেতে সে এই রাস্তা বেছেছে। কিন্তু তানির প্রিয়পাত্র হওয়ার জন্যে রাজ-রূপে যে অতিরিক্তরকম 'ফ্ল্যাম্বয়েন্ট' ব্যক্তিত্ব সে দেখাচ্ছে, তাতেই বোঝা যায় যে সুরিন্দর প্রয়োজনে নিজের লাজুকপনা দিব্যি কাটিয়ে উঠতে পারে। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠবেই যে এই স্মার্ট, চটপটে, ফ্লার্ট করায় ওস্তাদ সত্তাটি সে সুরিন্দর হিসেবেই তানির সামনে তুলে ধরছে না কেন? ছবিতে বিনয় পাঠক-অভিনীত চরিত্রটি (সুরিন্দরের বন্ধু) এই প্রশ্ন করেও। কিন্তু সুরিন্দর বা ছবিটি, কারুর কাছ থেকেই তার সদুত্তর পাওয়া যায় না। ফলে সন্দেহ জাগে যে আপাতভাবে সাত চড়ে রা না কাড়া সুরিন্দর কি আসলে একজন সাইকোপ্যাথ, যে অপরের কষ্টে খুশি হয়? তানিকে দিয়ে 'পরকীয়া' করিয়ে, তার মানসিক টানাপোড়েনের যন্ত্রণা উপভোগ করাই কি সুরিন্দরের উদ্দেশ্য? যদি তাই হয়, তবে সেটা স্পষ্ট করে বললে ছবিটি একটি চিত্তাকর্ষক সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার তথা ডার্ক রোমান্স হতে পারতো নিঃসন্দেহে। কিন্তু তার বদলে ছবিটি সুরিন্দরের প্রতারণাকে দেখাতে চেয়েছে সত্যিকারের প্রেমিকসুলভ আচরণ হিসেবে। ছবির শেষে যখন তানি জানতে পারে যে তার স্বামীই রাজ, তখন সে আনন্দে আপ্লুত হয়; একবারও সুরিন্দরকে জিজ্ঞেস করে না যে কোন অধিকারে সে তানিকে এতদিন বোকা বানিয়েছে, তাকে অনর্থক অপরাধবোধ ও মানসিক দ্বন্দ্বে ভুগিয়েছে। 'কিং খান'-এর ছবিতে নায়িকাদের এসব প্রশ্ন তোলার অধিকার নেই। নায়কের প্রতি তাদের মুগ্ধতাই ছবির শেষে প্রতিষ্ঠা করতে হবে, নায়ক তাদের সাথে যেমন আচরণই করে থাকুক না কেন।

 

আবার নিজের কথায় ফিরি।

আমার পরিবারের বাকি দু’জন সদস্য যেহেতু এককালে শাহরুখ খানের ভক্ত ছিলেন – নানা কারণে উক্ত অভিনেতা অনেকদিন হলো সিংহাসনচ্যূত – ২০১১ থেকে ২০১৮ অবধি ভদ্রলোকের ছবি পরপর দেখা হয়ঃ ২০১১-তে উপভোগ্য কল্পবিজ্ঞানভিত্তিক রা ওয়ান (যার ওপর, অন্যান্য বিদেশী ছবির মধ্যে প্রথম কয়েকটি Terminator ছবির প্রভাব সুস্পষ্ট), এবং ‘থ্রি ডি’ প্রযুক্তিতে নির্মিত ডন ২, যাতে ত্রিমাত্রিক প্রযুক্তির কোনও বিশেষ লাভজনকতা চোখে পড়েনি (প্রসঙ্গত, ব্যবসায়িক হিসেবে ছবিদুটি বছরের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সফলতম); ২০১২-য় বিদেশী কাহিনী অনুপ্রাণিত যশ চোপড়ার শেষ পরিচালিত, বছরের তৃতীয় সফলতম, ছবি  জব তক হ্যায় জান, যেখানে আমার কাছে প্রধান আকর্ষণ ছিলেন, নায়কের চেয়ে অনেক বেশী, দুই নায়িকা – সেই ক্যাট্রিনা কাইফ ও অনুষ্কা শর্মা। পরিচালকের দিল তো পাগল হ্যায় (১৯৯৭-এর সফলতম ছবি – এই ছবি নিয়ে কথা হয়ে গেছে)-এর কাহিনীর  সঙ্গে এক গঠনগত সাদৃশ্য জব তক-এ লক্ষ্যণীয়। প্রথমত, দুই ছবিতেই নায়কের ভূমিকায় একই অভিনেতা, যার প্রেমে পাগল মুখ্য (মাধুরী দীক্ষিত – ক্যাট্রিনা কাইফ) এবং পার্শ্বনায়িকাদ্বয় (করিশ্মা কাপুর – অনুষ্কা শর্মা)। অবশেষে মুখ্য নায়িকাই নায়ককে লাভ করবেন, কিন্তু কাহিনীর গতিপ্রকৃতি এবং অভিনয়ের গুণে দর্শকের দৃষ্টি এবং সহানুভূতি যাবে পার্শ্বনায়িকারই দিকে। ২০১৩-য় দেখা, বছরের দ্বিতীয় সফলতম ছবি চেন্নাই এক্সপ্রেস সেই দিলওয়ালে দুলহানিয়া-র অসংখ্য ‘ক্লোন’-এর একটি। সব ছবিগুলিই বিভিন্ন মাল্টিপ্লেক্সে দেখা।

আবার অভিরূপের বক্তব্যঃ

হ্যাপি নিউ ইয়ার (২০১৪-র দ্বিতীয় সফলতম, স্থানীয় মাল্টিপ্লেক্সে দেখা) ছবিতেও রব নে বনা দী জোড়ী­-র ভালোবাসা ও মহিলাদের সমস্যাজনক চিত্রায়ণ চোখে পড়ে, আরো দৃষ্টিকটুভাবে। এখানে নায়ক চার্লি (শাহরুখ) নায়িকা মোহিনীকে (দীপিকা পাড়ুকোন) সমানে 'বাজারু ঔরত' - অর্থাৎ সোজা কথায় বেশ্যা - বলে অপমান করে, কারণ মোহিনী একটি ক্লাবে স্বল্পবাস দশায় নাচ-গান করে জীবিকা নির্বাহ করে। কিন্তু তারপরেও চার্লির প্রতি মোহিনীর মোহ কাটে না, কারণ চার্লি ইংরেজী বলায় সড়গড়। হ্যাঁ, অবিশ্বাস্য শোনালেও এটাই সত্যি - এই ছবির নায়িকা নায়কের কাছে কদর্যভাবে অপমানিত হতেও রাজি, কারণ ইংরেজী বলায় নায়কের সাবলীলতা তাকে মুগ্ধ করে। একইভাবে, চার্লি যখন নিজের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে ফাঁসিয়ে তাকে জেলে পাঠাতেও পিছপা হয় না, বা নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এক সমকামী যুগলকে ব্ল্যাকমেল করে, তখনো মোহিনীর চোখে সে খারাপ প্রতিপন্ন হয় না, ছবিটিও চার্লির আচরণের সমালোচনার কোনো পরিধি দর্শকদের দেয় না। কারণ, ওই যে, 'কিং খান' যাই-ই করুন না কেন, তার সমালোচনা করা বারণ। বিশেষত, তাঁর 'রোম্যান্টিক হিরো' পারসোনা নিয়ে তো প্রশ্ন তোলাই যাবে না।

 

ফিরি নিজের কথায়।

২০১৫-র তৃতীয় সফলতম ছবি দিলওয়ালে-তে এককালীন সফল জুটি শাহরুখ-কাজলকে পুনর্বার উপস্থাপিত করা হয়েছে, দ্বিতীয়জনকে দেখতে ভালো লেগেছে, কিছু গানও শ্রুতিমধুর, কিন্তু গল্পে যুক্তির অভাব হাস্যকর; ২০১৬-র অষ্টম সফলতম ফ্যান ছবিতে, অভিনেতা পর্দায় যে ব্যক্তিত্ব বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে উপস্থাপনা করেন, সেটির প্রতি খানিকটা দোষগ্রাহী দৃষ্টি দেওয়া হয়েছে, যা এককথায় refreshing; ঐ একই বছরে মুক্তিপ্রাপ্ত ডিয়ার জিন্দেগী­-তে শাহরুখ-অভিনীত মনোবিজ্ঞানী-চরিত্রটি যথাযথ। যা বিরক্তির উদ্রেক করে যে এই ব্যক্তি আলিয়া ভট্ট-অভিনীত আত্মমগ্ন, স্বার্থপর, দুঃখবিলাসিনী কন্যাটিকে কেন স্পষ্ট বললেন না, “দেখো বাপু, অনেক যত্নে বড় হয়েছ বটে, কিন্তু মানুষ হওনি, একাধিক পুরুষের আবেগ নিয়ে স্বেচ্ছা-অনুযায়ী অসংবেদনশীল খেলা খেলেছো, এবার নিজের কীর্তিকলাপের যা পরিণাম তা মেনে নিতে শেখো, your actions will always have consequences”? ২০১৭-র ষষ্ঠ সফলতম ছবি রঈস জনৈক সমাজবিরোধী আবদুল লতিফের জীবন-আধারিত, যদিও নির্মাতারা এ কথা অস্বীকার করেছেন। সে যাই হোক, একজন মাফিয়া ডন, যে তার অপরাধ-সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে কাঙালিভোজন থেকে শুরু করে গরীব শিশুদের মধ্যে পাঠ্যপুস্তকবিতরণ প্রভৃতি সমাজসেবামূলক কাজ করে, তা দেখিয়ে জনপ্রিয় অভিনেতার প্রতি সহানুভূতি টানার চেষ্টা একেবারেই প্রশংসনীয় মনে হয় না।একই বছরে মুক্তিপ্রাপ্ত জব হ্যারি মেট সেজল হলিউডের When Harry Met Sally-র নাম সজ্ঞানে ব্যবহার করেছে। অনুষ্কা শর্মার উপস্থিতি সত্বেও ছবিটি মনে তেমন দাগ কাটেনি। সব ছবিই মাল্টিপ্লেক্সে দেখা।

২০১৮ সালের সার্থকনামা জিরো (এটিও স্থানীয় মাল্টিপ্লেক্সে দেখা) ছবিতে শাহরুখ-রূপায়িত বউয়া সিং খর্বকায় হওয়াতে বিয়ের জন্য মেয়ে পায় না। অবশেষে সে প্রেমে পড়ে আফিয়া-নাম্নী এক মহাকাশ-বিজ্ঞানীর (অনুষ্কা শর্মা)  যে ‘সেরিব্রাল পলসি’-তে আক্রান্ত বলে হুইলচেয়ার-আবদ্ধা! অর্থাৎ শাহরুখের প্রেমিকা এক পরমা সুন্দরী স্টিভেন হকিং, যার সামনে বউয়া হঠাৎ একটা পেন্সিল ফেলে দিয়ে এই প্রতিবন্ধী মহিলাকে ‘চ্যালেঞ্জ’ জানায় সেটা মাটি থেকে তুলে নিতে। পরে বিয়ের আসর থেকে আফিয়াকে বউয়া ফেলে পালায় এক নাচের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে কারণ সেখানে সে ক্যাটরিনা কাইফ অভিনীত ববিতা কুমারীর দেখা পাবে। পরে আমরা জানব যে আফিয়া অন্তঃসত্ত্বা ছিল! আর বেশী কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করছি না।

 

সুদূর অস্ট্রেলিয়ায় ৩২ বছর-বয়সী এক নিরাপত্তা রক্ষীর বিরুদ্ধে মহিলাদের অবাঞ্ছিত টেক্সট-মেসেজ এবং সশরীরে উত্যক্ত করার অভিযোগ আনা হয়। অভিযুক্তের উকিল বিচারককে বোঝান যে তাঁর মক্কেল এই আচরণ শিখেছে বলিউডের ছবি দেখে, যেখানে মহিলাদের প্রতি এই আচরণ ‘স্বাভাবিক’ এবং প্রত্যাশিত হিসেবে দেখানো হয়। তৎকালীন আনন্দবাজারে নাকি লেখা হয় যে উদাহরণ স্বরূপ উকিল-মহাশয় দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে ছবিটির এক বিশদ বিবরণ দেন এবং বলেন যে মেয়েদের চরমভাবে উত্যক্ত করলেই যে তাঁদের ‘মন পাওয়া যায়’ তা এই ছবির অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা – পুরুষ এবং মেয়েদের মধ্যে – প্রতিষ্ঠিত করে। বিচারক অভিযুক্তকে জেল-খাটা থেকে অব্যাহতি দেন! কলকাতার এক ইংরেজী সংবাদপত্রে শাহরুখ খানকে ‘রোম্যান্স”-এর পরাকাষ্ঠা বলা হয়, সে উক্ত অভিনেতা সর্ষেক্ষেতের মাঝখানে নায়িকাকে প্রেম নিবেদন করুন (দিলওয়ালে দুলহানিয়া) বা তাকে ছাত থেকে ঠেলে ফেলে হত্যা করুন (বাজীগর ছবিতে শিল্পা শেঠী অভিনীত চরিত্রটি)!

 

আবার অভিরূপের বিশ্লেষণঃ

 

তবে যে কতিপয় ছবিতে শাহরুখ রোম্যান্টিক চরিত্রে নেই, সেখানেও কি তাঁকে সমস্যাজনক আচরণ করতে দেখি না আমরা? চক দে ইন্ডিয়া-র (২০০৭-এর তৃতীয় সফলতম ছবি) কথাই ধরা যাক। একদল লোফার-মার্কা ছেলের সাথে মহিলা হকি খেলোয়াড়দের মারামারির দৃশ্যটা স্মরণ করুন। একটি মেয়েকে পেছন থেকে ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে আঘাত করতে যাচ্ছিলো যে ছেলেটি, তাকে বাধা দিয়ে শাহরুখ-অভিনীত হকি কোচ কবীর খান বলে, "সত্যিকারের পুরুষমানুষ যদি হও, সামনাসামনি লড়ো। পেছন থেকে নয়। আসলে কি জানো, আমাদের হকিতে ছক্কা থাকে না।" এতই ম্যাটার-অফ-ফ্যাক্টলি উচ্চারিত এই সংলাপটি, যে এর সমস্যাজনক দিকটি ৯৯% মানুষ খেয়ালই করবেন না। কিন্তু ঘটনা হচ্ছে যে ছেলেটি ব্যাট হাতে কাপুরুষের মতো পেছন থেকে মেয়েটিকে মারতে গিয়েছিলো, তাই কবীর তাকে ছক্কা, অর্থাৎ রূপান্তরকামী নারী বলে অভিহিত করে। কাপুরুষতা বোঝাতে 'হিজড়ে' বা 'ছক্কা' শব্দগুলো ব্যবহারের যে দুর্ভাগ্যজনক অভ্যাস আমাদের সমাজে রয়েছে, ক্রিকেটের ছয় মারা বা ছক্কার সাথে punning করে বলা এই সংলাপটির মাধ্যমে সেটাকে, ও তার মধ্যে নিহিত ট্রান্সফোবিয়াকেই মান্যতা দিয়েছে কবীর খান ও 'চক দে ইন্ডিয়া।' মজার কথা হলো, এই ছবিটির অন্যতম থিম নাকি নারী-অধিকার। মহিলা হকি খেলোয়াড়রা কতরকম বাধা-বিপত্তি-বৈষম্য অতিক্রম করে দেশকে চ্যাম্পিয়ন করে, সেটাই ছবির গল্প। অথচ কি অনায়াসে সেই ছবিতেই রূপান্তরকামী নারীদের উপহাসের বস্তু, কাপুরুষতার সমার্থক বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। যদিও এতে হয়তো অবাক হওয়ার কিছু নেই। রূপান্তরকামীদের মানবাধিকারের বিরুদ্ধাচরণ করাটা তো অনেকদিন যাবতই আধুনিক নারীবাদের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সেই হিসেবে 'কিং খান'-এর এই ট্রান্সফোবিয়ার ভিত্তিতে তাঁকেও এই আধুনিক নারীবাদের এক বিশিষ্ট মুখপাত্র বলা যায় বৈকি।

 

পরিশেষে অন্তর্জাল থেকে কিছু ইংরেজী মন্তব্য উদ্ধৃত করলামঃ

 

In Australia, a 32-year-old Indian security guard has escaped a jail term after his attorney argued his harassment of women with unwanted texts, messages and personal advances was a by-product of his film fanaticism. What for some might be seen as stalking was, for Bollywood aficionados it was argued, “quite normal behaviour” as the movies encourage the idea that a woman will eventually fall in love with a man if he pursues her hard enough.

In Yash Chopra’s Darr: A Violent Love Story (1993), Rahul (Shah Rukh Khan) is obsessed with Kiran (Juhi Chawla), who is engaged to Sunil, a navy officer. Rahul carves her name on his chest with a knife, decorates his room with her photos and discusses her with his dead mother. He eventually kidnaps her to force her into marriage but is killed by Sunil.

It was a film made before Khan mutated into the megastar that he is today, a time when he was better known for playing villainous roles. Yet his audiences championed his character’s cause. They shouted their support for him in the fight scenes, and fast-tracked the actor into the A-list.

https://www.theguardian.com/film/filmblog/2015/jan/29/does-bollywood-normalise-stalking


 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন