ধারাবাহিক
উপন্যাস
স্বর্গ এসেছে নেমে
(১৫)
ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই ফেটে পড়ল কুন্তলা, ‘এই জন্যেই তোমরা বাপ মেয়ে মিলে গাঁয়ে নিয়ে গিয়েছিলে আমায়? ঐ নচ্ছার ছেলেটার গুণকিত্তন শোনানোর জন্য? শ্বশুরের ভিটে দেখাতে নিয়ে গেছ আমায়! ওটা কি আর শ্বশুর ভিটে আছে নাকি? ওটা তো এখন ঐ মেয়েছেলেটার আস্তানা। মা বেটার নামেই ঘরবাড়ি জমি লিকে দেওয়া হয়েছে কিনা তাই বা কে জানে’। অনঙ্গবাবু প্রতিবারের মত এবারও কেবল শুনেই গেলেন, জবাব দিলেন না কিছু। তিনি তো জানেন, কুন্তলার কাছে কোন যুক্তি খাটে না। একটা গাছ বা পাথরকে বোঝানো যা কুন্তলাকে বোঝানোও তাই। সে রাতের শেষ কথা কুন্তলার, ‘রক্তবীজ একটা, মারতে চাইলেও মরে না’। মনস্বিনী ভবিষ্যতে উকিল হবে। মায়ের এ কথাটি শোনার পর সে ষোলআনা নিশ্চিত হল বৈশ্বানরের খাদ্যে বিষক্রিয়ার পেছনে কারা ছিল সে বিষয়ে তার ধারণা একশ ভাগ সত্য। সত্য জানার পরও কোন বিবেকবান মানুষ চুপ করে থাকতে পারে? পারে ন, কিন্তু এখানে যে আসামীর কাঠগড়ায় স্বয়ং তার মা। কি করবে মনস্বিনী? একটা ওজর তো আছেই হাতের কাছে। আর ক’টা দিন মাত্র, তারপর তো বৈশ্বানর সেই সুদূর প্রান্তে সকলের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। তাকে নিয়ে মায়ের উৎকন্ঠারও অবসান হবে। সত্যি কি তাই? মা কি নিশ্চিন্ত হতে পারবে? এখন তো আর সে যুগ নেই যে প্রিয়জনের একটা চিঠি পাবার জন্য হাপিত্যেশ করে বসে থাকতে হবে! এখন যে ফোনে ফোনে কানে কানে কথা, মা যেমন বলে।
থাক, মা থাক তার ভাবনা নিয়ে, মনস্বিনীর এখন মনোযোগী হতে হবে
পড়াশোনার প্রতি। পরীক্ষা যে খুব কাছেই। সেও তো যেমন তেমন ছাত্রী নয়। বৈশ্বানরের মত
তার উপরও ভরসা করে আছে কলেজ কর্তৃপক্ষ, ইউনিভারসিটি হোক বা ডিস্ট্রিক্ট লেভেল, মনস্বিনী
কোন একটা র্যাঙ্ক করবেই। অনেক রাত পর্যন্ত
পড়া চলে মনস্বিনীর। নানা ব্যাপারে সময় নষ্ট হয়েছে অনেক। আর নয়। লক্ষ্য স্থির রেখে এগোতে
হবে তাকে। কখনো কখনও বইয়ের উপরে মাথা রেখেই ঘুমিয়ে পড়ে নিসাড়ে। কুন্তলা চুপিসারে এসে
দেখে দাঁড়িয়ে, কখনো বা মাথায় হাত বুলিয়ে জাগিয়ে দিয়ে বলে , ‘অনেক হয়েছে, এখন ঘুমো,
কাল সকাল সকাল উঠে পড়লেই হবে’। বেশ লাগে মনস্বিনীর মায়ের এই স্নেহের প্রকাশ, কথায় স্পর্শে।
অনঙ্গবাবুর কিন্তু কোন ভাবনা নেই মেয়েকে নিয়ে। তিনি জানেন, তার
মেয়ে এমন কোন কাজ করতে পারে না যাতে তার মা বাবার সম্মানহানি হতে পারে। কুন্তলার যে
এত চিন্তা বৈশ্বানরের সঙ্গে মনস্বিনীর সম্পর্ক নিয়ে, কোথায়, তিনি তো কখনও কোন অশালীন
আচরণ দেখেননি দু’জনের মধ্যে, বরঞ্চ একের অপরের প্রতি শ্রদ্ধাই লক্ষ্য করেছেন তিনি।
প্রায় সমবয়সের দু’জন নারী পুরুষ এত কাছাকাছি থেকেও কি করে যে এতখানি দূরত্ব বজায় রাখতে
পারে! অনঙ্গবাবু বিস্মিত হয়ে ভাবেন কখনো কখনো, এরা দুজন তবে কি ভাব জগতে বিচরণ করে?
যেন ব্যক্তি নয় আদর্শই এদের কাছে মুখ্য বিবেচ্য বিষয়, কিন্তু এটাও তো লক্ষ্য করেছেন
তিনি, বাস্তব বুদ্ধিতে কেউ কম যায় না কারো থেকে। যে লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে ওরা, সে তো
অতি কঠিন বাস্তবের উপর প্রতিষ্ঠিত! একজন পালন করবে শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব অন্যজন দোষীদের
দণ্ডবিধানের। আবার একটি প্রশ্নও মনের কোণে উঁকি দিয়ে যায়, কুন্তলার আশঙ্কার কারণ কি
সত্যিই অমূলক? কথায় আছে মেয়েরা বিশেষ করে মায়েরা মেয়েদের মন সব চাইতে ভাল বোঝে। তবে
কি বৈশ্বানর মনস্বিনীর মধ্যে অন্যরকম বোঝাপড়া আছে কিছু! আর থাকলেই বা, এ নিয়ে অনঙ্গবাবুর
কোন মাথাব্যথা নেই। পরিণত বুদ্ধির দুটি ছেলেমেয়ে যদি নিজেদের সম্পর্ক নিজেরাই তৈরী
করে নেয় তাতে ক্ষতি কি, যেখানে বৈশ্বানর আর মনস্বিনীর মত দুটি ব্যক্তিত্বের জীবনের
প্রশ্ন জড়িত। ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে আমরা কোন ধারণা তৈরী করতে পারি কিন্তু বাস্তবে কি ঘটতে
চলেছে বা ঘটবে সে কথা তো নিশ্চিত করে বলতে পারি না কেউ, তাই অযথা সে নিয়ে মাথা ঘামানো
মূর্খতা ছাড়া আর কিছু নয়, এমনই ভেবে প্রসঙ্গে ইতি টানলেন অনঙ্গবাবু।
(১৬)
সম্বর্ধনা সভার দু’দিন পর ফিরে এল বৈশ্বানর। মা মাত্র একদিন নয়, অন্তত দু’টি দিন কাছে পেতে চেয়েছিল ছেলেকে। অনঙ্গবাবুকে অবশ্য সে খবর আগেই জানিয়ে দিয়েছিল বৈশ্বানর। ফিরেই হাসিমুখে হাজির অনঙ্গবাবুর কাছে। হাতে একখানা স্থানীয় প্রকাশনার সংবাদপত্র যাতে বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে সম্বর্ধনা সভার। কেবল কি বিবরণ? যে সাংবাদিক কভার করেছেন অনুষ্ঠানটি তিনি অকৃপণ হাতে অনঙ্গবাবু আর তার কন্যার সুখ্যাতিতে ভরিয়ে দিয়েছেন পত্রিকার প্রায় দু’টি কলম। বৈশ্বানরের মেধা, তার অমায়িক আচরণ ও বক্তা রূপে তার সাবলীলতা ইত্যাদি আর একটি কলম অধিকার করে নিয়েছে পুরোটাই। এছাড়াও আর একটি খবর, কলেজ কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বৈশ্বানরকে সম্বর্ধনা দেবে বলে। কলেজ অডিটরিয়ামে সম্বর্ধনার আয়োজন। তারিখও নির্ধারিত হয়ে গেছে। এসব ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা থাকে কলেজ ছাত্র সংসদের কিন্তু যেহেতু উদ্দিষ্ট ব্যক্তিটি বৈশ্বানর, তাই ছাত্র সংসদের তৎপরতা দেখা গেল কলেজ কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের প্রবল বিরোধিতায়। অনঙ্গবাবু দেখতে চাইছিলেন এ অবস্থায় স্থানীয় দলের বা দলনেতার কার্যপ্রণালী কি হতে পারে। দলনেতা আর যা-ই হন রুদ্রাক্ষের মত কাণ্ডজ্ঞানহীন তো নন। ইলেকশনের কথা মাথায় রেখে তিনি সংসদকর্তা রুদ্রাক্ষকে নির্দেশ দিলেন কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করতে।
অনুষ্ঠানের দিন দেখা গেল রুদ্রাক্ষ তার সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে কিছু
একটা করার মতলবে আছে। উপরে উপরে এমন একটা ভাব যেন বৈশ্বানর কত কাছের, কত আপন। সাপ খোলস
মুক্ত হবার পর কিছু দিন নিস্তেজ থাকে কিন্তু তার ছোবল মারার স্বভাবটা তো যেখানে থাকার
সেখানেই থেকে যায়। সুযোগ পেলেই আবার ফনা তুলবে, ছোবল মারবে। রুদ্রাক্ষ দলনেতার নির্দেশে
খোলস ত্যাগ করে ভাল ছেলের অভিনয় করে যাচ্ছে সত্য কিন্তু ভুলতে পেরেছে কি সেদিনের হারের
যন্ত্রণা? প্রতিশোধের বিষ জমা হচ্ছে দিনে দিনে, সুযোগের অপেক্ষা মাত্র।
অনুষ্ঠান শুরুর কয়েক মিনিট বাকী। প্রিন্সিপ্যাল স্যর অধীরভাবে
অপেক্ষা করছেন কখন এসে পৌঁছবেন অনঙ্গবাবু বৈশ্বানর আর মনস্বিনীকে নিয়ে। রণজয় স্যর,
যার আগ্রহ বাঁধ মানছে না এই অনুষ্ঠান ঘিরে তিনিও অস্থির ভাবে পদচারণা করছিলেন, কখন
এসে পৌঁছবে তার প্রিয় ছাত্রটি। রণজয়ের নজরে পড়ল, কলেজ গেটের দিকে অগ্রসরমান দুটি গাড়ির
দিকে। আগে আগে রয়েছে অনঙ্গ সান্যালের গাড়ি, তার পেছনে একটি জিপ, দেখে মনে হচ্ছে পুলিশের
গাড়ি। হ্যাঁ, তাই। থানার বড়বাবুকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে, তিনি এসেছেন। আন্দাজ করা যায়,
এর পেছনে দুটি কারণ বর্তমান। এক, থানার বড় কর্তার উপস্থিতিতে রুদ্রাক্ষ কোন ঝামেলা
পাকাবার সাহস পাবে না; দুই,বড়বাবু নিশ্চিত অবগত আছেন বৈশ্বানরের আই পি এস এ যোগদানের
ব্যাপারে।
অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবেই সম্পন্ন হল। বৈশ্বানরের প্রতি প্রশংসা
বর্ষণে মুখর হয়ে উঠল বক্তা এবং দর্শকাসনের প্রায় সকলেই। সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান যখন প্রায় শেষের
মুখে তখনই এগিয়ে এলো রুদ্রাক্ষ তার দলবল নিয়ে। রুদ্রাক্ষ’র হাতে একটি সুদৃশ্য প্যাকেট।
সকলের চোখে সন্দেহ। কিছুক্ষণ আগেই বেরিয়ে গেছেন বড়বাবু। তবে কি রুদ্রাক্ষ এই সুযোগটির
জন্যই অপেক্ষা করছিল? রণজয় স্যর এগিয়ে এলেন দ্রুতপদে। রুদ্রাক্ষ তাকাল তাঁর দিকে, একটু
বাঁকা হাসি হেসে বলল হিসহিস করে, ‘আপনার প্রিয় ছাত্র আর ক’দিন স্যর! এরপর তো আমরা ছাড়া
গতি নেই আপনার। ভয় নেই, আমি এখন খুব ভাল ছেলে। বাধা দেবেন না, উপহারটি আপনার ছাত্রের
হাতে দিয়েই নেমে আসবো’। রণজয় স্যর সরে দাঁড়ালেন। মঞ্চে উঠে গিয়ে বৈশ্বানরের সাথে হাত
মেলালো রুদ্রাক্ষ, তারপর উপহারটি তার হাতে তুলে দিয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল কিছু।
ওর চ্যালারা অশালীন ভাবে মিনিটখানেক ধরে তালি বাজিয়ে গেল। নেমে এল রুদ্রাক্ষ মঞ্চ থেকে।
প্রিন্সিপ্যাল স্যর ধন্যবাদ দিয়ে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করলেন।
বিদায়কালীন সৌজন্য বিনিময় শেষে অনঙ্গবাবু হল থেকে বেরিয়ে এলেন
মনস্বিনী ও বৈশ্বানরকে নিয়ে। মঞ্চে বৈশ্বানরকে রুদ্রাক্ষ’র কানে কানে কিছু বলার ব্যাপারটা
এড়াতে পারেনি মনস্বিনী’র সতর্ক দৃষ্টি। কৌতূহল ধরে রাখতে পারল না মনস্বিনী। ড্রাইভারের
পাশে বসা বৈশ্বানরকে জিজ্ঞেস করে বসল, ‘কি বলল রুদ্রাক্ষ আপনার কানে কানে’? কি জবাব
দেবে ভাবল বৈশ্বানর। কথাটা যদিও অতি সাধারণ, এক বন্ধু আর এক বন্ধুকে মজা করে বলতেই
পারে, ‘উপহারটা এখানে খুলবে না কিন্তু, ঘরে গিয়ে খুলবে’, কিন্তু কথাটি যে বলেছে সে
তো কোন অর্থেই বন্ধু নয় বৈশ্বানরের, বলা যায় পরম শত্রু। অযথা চিন্তা বাড়িয়ে লাভ নেই,
একটু অন্যরকম করে বলল বৈশ্বানর, ‘বলল, উপহারটা পছন্দ হল কিনা জানাতে’। বিশ্বাস করল
মনস্বিনী, তার মুখ থেকে শ্লেষসূচক একটি শব্দ বেরিয়ে এলো, ‘অওঁ’!
(ক্রমশ)

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন