প্রতিবেশী সাহিত্য
অ্যামেরিকার কবি গলওয়ে কিনেলের কবিতা
(ভূমিকা ও ভাষান্তর: গৌরাঙ্গ মোহান্ত)
কবি পরিচিতিঃ গলওয়ে কিনেল (১৯২৭–২০১৪)
আধুনিক অ্যামেরিকান কবিতার অন্যতম মৌলিক কণ্ঠস্বর। কবির সংবেদ্য অভিজ্ঞতার সাথে মানবজীবনের
গভীর সত্যের মেলবন্ধনে নির্মিত হয়েছে তাঁর কাব্যভাষা। কিনেলের কবিতায় রয়েছে সততার
অনিন্দ্য স্ফুরণ—তিনি লিখেছেন জন্ম-মৃত্যু, প্রেম, যন্ত্রণা ও পারিবারিক সম্পর্ক নিয়ে;
শরীরকে ভাষার কেন্দ্রে উপস্থাপন করে সৃষ্টিকে প্রদান করেছেন পেলবতা ও দেহাত্মক সুষমা।
ব্যক্তিগত মুহূর্তকে সার্বজনিক সংবেদনায় রূপান্তরণের ক্ষেত্রে তিনি অসামান্য নৈপুণ্য
প্রদর্শন করেছেন। তিনি রাজনৈতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ ছিলেন বলে নাগরিক অধিকার আন্দোলনে
অংশগ্রহণ করেন এবং যুদ্ধবিরোধী কর্মপরিকল্পনায় যুক্ত থাকেন। তাঁর এ সকল কর্মকাণ্ড কাব্যদৃষ্টিকে
আরও শাণিত করে। তাঁর ভাষা গভীর অথচ সুবোধ্য। চিত্রকল্প নির্মাণের ক্ষেত্রে তিনি বিমূর্ততার
আশ্রয় গ্রহণ করেন না। তিনি ১৯৮২ সালে প্রকাশিত তাঁর কাব্যগ্রন্থ Selected Poems-এর
জন্য কবিতায় পুলিৎজার পুরস্কার অর্জন করেন।
কারণ স্বরবর্ধক শিঙার মতো আমার নাক ডাকতে পারে,
অথবা আমি জোরে গান বাজাতে পারি,
অথবা মোটামুটি সংযত কোনো আইরিশ
মানুষের সঙ্গে
রাত জেগে আলাপ করতে পারি
এবং ফার্গাস কেবল আরও গভীরে নিমজ্জিত
হবে
তার স্বপ্নহীন ঘুমে, যা এক পলকে
চলে যায় বলে অনুভূত হয়,
কিন্তু বাড়ির কোথাও যদি শোনা যায়
সেই ভারী নিশ্বাস,
অথবা বাড়ির ভেতর কোথাও কোনো চাপা
ক্রন্দন
এবং সে মোচড় দিয়ে ঘুম থেকে জেগে
উঠবে
এবং দৌড়ে যাবে তার গন্তব্যের দিকে—যেমন
এখন, আমরা পাশাপাশি শুয়ে আছি,
নিবিড় হওয়ার পর, আমাদের
শরীরের দৈর্ঘ্য বরাবর আলতো স্পর্শে
শান্ত,
দীর্ঘ বিবাহিত জীবনের পরিচিত স্পর্শ,
আর তখন সে উপস্থিত—
তার বেসবল-পাজামা পরে,
এরকমই ঘটে,
গলার ফাঁক এত ছোটো যে তাকে ঘুরিয়ে
নিয়ে পরতে হয়—
সে এসে আমাদের মাঝখানে ধপাস করে
শুয়ে পড়ে, আমাদের জড়িয়ে ধরে, গা ঘেঁষে নিজেই ঘুমিয়ে পড়ে,
এই এমন শিশু হয়ে থাকার
তৃপ্তিতে তার মুখ দীপ্ত।
আধো-অন্ধকারে আমরা একে অন্যের দিকে
তাকাই
এবং হাসি
এই ছোটো, বিস্ময়করভাবে পেশল দেহটির
ওপর দিয়ে হাত বাড়িয়ে একে অন্যের বাহু ছুঁই—
এই সেই জন, যাকে স্মৃতির অভ্যাস
ঠেলে নিয়ে যায় তার সৃজন ভূমিতে,
যে ঘুমন্ত প্রাণীকে কেবল নশ্বর
শব্দই জাগিয়ে তুলতে পারে,
প্রেম আবারো এ আশীর্বাদ আমাদের
বাহুর ভেতর তুলে দেয়।
জলপাই কাঠের আগুন
রাতে ফার্গাস কেঁদে জেগে উঠলে
আমি তাকে শিশুশয্যা থেকে তুলে নিতাম,
হাজার বছরের পুরোনো জলপাই কাঠের
আগুনের সামনে
দোলনা চেয়ারে বসে তাকে বুকে জড়িয়ে
রাখতাম।
কখনো—কেন, তা আমি জানতাম না,
আর এখন সে-ও ভুলে গেছে—এমনকি দুধ
খাওয়ানোর পরেও
তার বড়ো বড়ো চোখের জল গড়িয়ে পড়ত
তার বড়ো গাল বেয়ে—
বাম গালটি সব সময় ডানের চেয়ে বেশি
উজ্জ্বল—এবং আমরা বসে থাকতাম, কোনো কোনো রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা,
সেই প্রাচীন কাঠের আগুনের টিমটিমে
আলোয় দুলতে দুলতে,
অন্ধকারের বিরুদ্ধে একে অপরকে জড়িয়ে,
তার সময়—আমার কাছে ঘনিষ্ঠ, অথচ
দূরের ভবিষ্যতে,
আমার সময়—আমি কল্পনা করতাম, চারদিক
জুড়ে ছড়িয়ে আছে।
এমন এক সময়ে, নিজেই আধো ঘুমে ঢলে
পড়ে,
মনে হলো যেন একটি চিৎকার শুনলাম—
কোনো উড়ন্ত মানুষ আতঙ্কে চেঁচিয়ে
উঠছে,
যখন সে আগুন ফেলছে—জানে না কী বা
কাকে লক্ষ করে,
অথবা এভাবে এক শিশু অগ্নিশিখায়
দগ্ধ হচ্ছে—
আমি চমকে সোজা হয়ে বসলাম। জলপাই
কাঠের আগুন জ্বলছিল ধিকিধিকি । আমার বাহুতে শুয়ে ফার্গাস,
গভীর ঘুমে—তার বাম গাল জ্বলজ্বলে,
হে ঈশ্বর।
অপেক্ষা
এখন অপেক্ষা করো।
প্রয়োজনে সবকিছুকেই অবিশ্বাস করো।
কিন্তু সময়কে বিশ্বাস করো।
এখন অবধি সে কি তোমাকে সর্বত্র
বয়ে নিয়ে যায়নি?
ব্যক্তিগত ঘটনাগুলো আবার চিত্তাকর্ষক
হয়ে উঠবে।
চুল আবার চিত্তাকর্ষক হবে।
ব্যথাও চিত্তাকর্ষক হয়ে উঠবে।
অসময়ে ফোটা কুঁড়িগুলোও চিত্তাকর্ষক
হয়ে উঠবে।
ব্যবহৃত দস্তানাগুলো আবার মনোহর
হয়ে উঠবে;
তাদের স্মৃতিই তাদেরকে দেয়
অন্য হাতের প্রয়োজন।
প্রেমিকদের একাকীত্বও তেমনই:
এত ক্ষুদ্র সত্তা হয়েও আমাদের ভেতর
যে বিপুল শূন্যতা উৎকীর্ণ রয়েছে,
তা পূর্ণ হতে চায়;
নতুন প্রেমের প্রয়োজন মানে
পুরোনো প্রেমের প্রতি বিশ্বস্ততা।
অপেক্ষা করো।
খুব তাড়াতাড়ি চলে যেও না।
তুমি ক্লান্ত। কিন্তু সবাই ক্লান্ত।
তবে কেউই যথেষ্ট ক্লান্ত নয়।
কেবল একটু অপেক্ষা করো, শোনো:
চুলের সংগীত,
ব্যথার সংগীত,
তাঁতের সংগীত—যে তাঁতে আমাদের প্রেম
আবার বোনা হয়।
তা শোনার জন্য সেখানে থেকো, এটাই
হবে একমাত্র সময়,
সর্বোপরি শোনার জন্য তোমার সমগ্র
অস্তিত্ব,
দুঃখের অনুশীলনে প্রস্তুত,
নিজেকে বাজাতে বাজাতে
সম্পূর্ণ অবসাদে চলে যাওয়া পর্যন্ত।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন