কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / দ্বিতীয় সংখ্যা / ১৪১

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / দ্বিতীয় সংখ্যা / ১৪১

সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬

রামতনু দত্ত

 

বই কি পড়তেই হবে?

 


এর সহজ ঋজু উত্তর হল, হ্যাঁ, বই পড়তে হবে। গ্রন্থ পাঠ না করলে বিপদ আছে সামনে। একমাত্র পুস্তকপাঠই পশ্চিমী ঔপনিবেশিক যন্ত্র সভ্যতাকে থমকে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে। কেতাবী ঢঙে শাস্ত্রপাঠ করলে, বই পড়লে, পুথি পাঠ করলে এক নতুন দিগদিগন্ত এক অন্য পৃথিবীকে সম্ভব করে তোলা  যায়। গ্রন্থ বা টেক্সট-এর সঙ্গে গ্রন্থন বা টেক্সচারের সম্পর্ক। টেক্সচার হল গ্রন্থি বুনুনি বা গ্রন্থনা। বই কেবল পাঠ বা পড়া হয় না, পুস্তক বা গ্রন্থ লেখাও হয়। যাঁরা গ্রন্থ বা টেক্সটকে পাঠ্য জ্ঞান করেন তাঁরা, বইয়ের পোকা, গ্রন্থকীট পাঠক ও আমরা নিজেদের অজ্ঞাতসারে লেখাকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখতে শুরু করে দিই। এবং ঔপনিবেশিক কর্পোরেট ভোগবাদী সভ্যতার দিকে একটু বেশি ঝুঁকে পড়ি।

ইতিমধ্যেই আমাদের চারপাশের সারস্বত সমাজের দিকে তাকালে দেখবেন যে সরস্বতীর সাধনা ছাড়া সবই আছে। সমস্তকিছুই চারপাশের পরিচিত পৃথিবীতে আনুষ্ঠানিকতা ও উৎসব। এখানে কোনো কর্মযজ্ঞ নেই। কারণ কর্মরহস্য বুঝি না। মানুষ কাজ  করে অন্যের জন্য এবং কর্মের ভিতর দিয়ে নিজের চেতনার উত্তরণ ঘটে। তখন কর্মী নিজের অজান্তেই জ্ঞানী হতে থাকেন। লেখক বন্ধুদের দেখবেন খাতায় লিখেছেন না, মোবাইল ফোন থেকে পাঠ করছেন। ইতিমধ্যেই বইপত্র বা বইয়ের বিশাল বহুমাত্রিক বহুবাচনিক বহুস্বরীয় জগৎ থেকে বেশ তফাতে চলে গেছেন বা চলে যাচ্ছেন ক্রমশ। এ হল যন্ত্র ও যন্ত্র বিভূতির সামনে নতজানু হয়ে বসে পড়া বা ঐকান্তিক আত্মসমর্পণ। এখানে কোনো গ্রাম সংগ্রাম বা লড়াই নেই। প্রশ্নহীন আনুগত্য ও মুগ্ধতা পুঁজিবাদী পণ্যসভ্যতার প্রতি। যন্ত্র যন্ত্রবিভূতি দূরশব্দ দূরভাষ আন্তর্জাল (না অন্তর্নাথ!) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এক মহা পণ্যকুহক রচনা করেছে, করে চলেছে সেখানে  নিঃশর্ত আত্মনিবেদন, কোনো জিজ্ঞাসা নেই সংশয় নেই। এই মায়া মরীচিকা, ভ্রম উৎপাদনকারী ভেষজ অলীক কিছুর অস্তিত্বে বিশ্বাস স্থাপন করতে বলে। এ যেন মহামারী 'চৈতন্যে (মহা) মড়ক '!

বই পড়ার সঙ্গে বর্ণপরিচয়ের ও আত্মপরিচয়ের এবং বিশ্বপরিচয়ের সম্পর্ক। বই থেকে সরে যাওয়া মানে জ্ঞান ও বিদ্যা থেকে সরে যাওয়া। বইহীন জগৎ মানে অজ্ঞান অবিদ্যা ও তমসাবৃত পণ্যকুহকিনীর অদৃশ্যলোক। অদৃশ্য কিন্তু ভীষণভাবে সক্রিয়। নিরন্তর ক্ষত সৃষ্টি ও ক্ষতি করে যাচ্ছে। শিশুর হাতেখড়ি প্রয়োজন যেমন তেমনই দরকার হাতে হাতে বই তুলে দেওয়া। শিশুর শ্রেষ্ঠ পানীয় জ্ঞান এবং তার উৎস উৎসমুখ বই। বই সেই উৎস বহন করে, পরম্পরা ঐতিহ্য পুরাণ ইতিহাস আর তাই বইমেলা হল বইয়ের উৎস(ব)। মেলা বই এই অর্থেও যেমন বইমেলা আবার বই আমাদের মিলিত সম্মিলিত করে। এই মহামিলন-ক্ষেত্রে "নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধান, বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান"। অর্থাৎ বই আধুনিক উত্তরাধুনিক - উত্তর মহাসময়ে ইহজাগতিক ব্যাপার। পৃথিবীতে পশ্চিমবঙ্গেই সবচেয়ে বেশি বইমেলা লিটল ম্যাগাজিন মেলা হয়। লিটল ম্যাগাজিন মেলা হল অপ্রাতিষ্ঠানিক বইমেলা। এবং পৃথিবীর বৃহত্তম বইমেলাও কলকাতায় হয়। কিন্তু আমাদের ঘরের শিশুদের বই পড়তে দিন। বই পড়ার অভিযান শুরু করুন। লাইব্রেরি গ্রন্থাগার ও গ্রন্থাগার মন্ত্রীকে নিয়ে ভাবুন। সরকারের বাইরেও নতুন উদ্যোগ গ্রহণ ও নব উদ্যোমে কাজ আরম্ভ হতে পারে।

বইয়ের লক্ষ্য সমাজ, বৃহত্তর গণসমাজ। সমকালীন রাজনীতি ও রাষ্ট্র বইবিমুখ। গড়পড়তা মানুষকে নিয়ে মাতামাতি করে। দ্বিতীয়ত, বইকে ভয় পায়, পুস্তকপ্রেমী মানুষদের, লেখক শিল্পী সাহিত্যিকদের ভয় পায়। সাহিত্য কথার অর্থ মিলন। সুসাহিত্য  জনসাধারণের সঙ্গে সুহাবস্হান করে। বইয়ের জগৎ গণতন্ত্র ও অফুরন্ত স্বাধীনতা সাম্য মৈত্রীর অবকাশ রচনা করে। পণ্যাকাশ বা কামোদিতি (কমোডিটি) স্রোতের  বাইরে এক মহাপ্রাণ বর্ণবিচ্ছুরণ। তাই শিশুশিক্ষার উপর জোর দিন। শিশুদের হাতে হাতে বই ধরিয়ে দিন। গোটা সমাজকে শতকরা একশো ভাগ সাক্ষর করার দাবি করুন। রাজনীতি রাষ্ট্র ও সরকারের মুখাপেক্ষী থাকবেন না। বৃহত্তর সামাজিক গণমানুষ আপনাদের পাশে থাকবে যাঁরা হবেন নতুন উদ্যোগপতি। আমরা ধনপতি কোটিপতি লাখপতি অধিপতি ক্ষেত্রপতি কুলপতি গৃহপতি দেখতে দেখতে তিতিবিরক্ত। এবার সমাজ ও সভ্যতার কথা ভেবে এগিয়ে আসুক মানুষের মতো মানুষ নূতন উদ্যোগ -'পতি'। "বেদ- মত বিভা করে যে জন সে পতি "(রায়গুণাকর) পশ্চিমবঙ্গের অসহায় লক্ষ কোটি জনসাধারণ অর্থ সাহায্য করবে যদি বৃহত্তর সমাজের জন্য কাজ করেন।

আগেই বলেছি বইয়ের সঙ্গে পঠনপাঠন ও লেখালেখির সম্পর্ক। লিখনে কী ঘটে তা আমরা আন্দাজ করতে পারি না। পৃথিবীতে সমস্ত সভ্যতা আড্ডা থেকে সৃষ্টি হয়েছে। জ্ঞানও বিজ্ঞান সবেরই উৎস আড্ডা বা আড্ডাসংস্কৃতি। কত সভ্যতার উদয়  ও বিলয় ঘটেছে। নতুন নবজন্ম ঘটেছে মানবসভ্যতার। বই কথার অর্থ বহন করা। বই জ্ঞানের কথা বহন করে, চিন্তন মননের হাতিয়ার বই। গ্রন্থ কিন্তু অস্ত্র বা আয়ুধ। অর্থাৎ যুদ্ধের হাতিয়ার। অসির চেয়ে মসী বা কলমের জোর বেশি, এ প্রবাদ বাক্য মিথ্যা নয়। মুক্তআলো মুক্তবুদ্ধি মুক্তচিন্তা ও মুক্তিযুদ্ধের হাতিয়ার বই। তাই বই এবং বইপত্রের এত গুণগান। আপনার ভাষাকে, ভাষার কৃৎকৌশলকে ধারণ করে আছে বই। বই বই (=ছাড়া) আপন স্বদেশ ও স্বদেশ আত্মা আপনার কাছে অধরা থাকবে। এবং হেরে যাবেন একুশ শতকের কর্পোরেট ঔপনিবেশিকতার কাছে। তাই আর দেরি নয়। বই কিনুন বই পড়ুন, শিশু বন্ধুসহ সকলকে ডাঁটের সঙ্গে বই উপহার দিন গাঁটের কড়ি খরচ করে। অনেক কামিয়েছেন, এবারে কিছু কিছু ছাড়াও মশাই। আত্মস্বার্থচরিতার্থভিড়ে মিশে যাওয়া ভালো নয়। আরও বই পড়ো আন্দোলনের জন্ম দিন। শ্লোগান তুলুন: ব  ই দী  র্ঘ  জী  বী   হো  ক । ফরাসি দার্শনিক জাক দেরিদার মতে, লেখালেখির উপস্থিতি ঈশ্বরের অনুপস্থিতিকে সুনিশ্চিত করে। নচেৎ রাষ্ট্র ও ঈশ্বরের ককটেল আরও ঘন হবে এবং মৌলবাদ ফ্যাসিবাদ অবলীলায় বেঁচে থাকবে। লেখক শিল্পী সমাজকর্মী দেশপ্রেমিক মানুষরা অনেক অনেক বেশি কোণঠাসা হতে থাকবে। ফৌজিমনস্ক মানুষেরা বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তামনস্ক সৃষ্টিশীল পরিবর্তনশীল মানুষদের দিকে তেড়ে আসবে। সাধু সাবধান! সময় অল্প। কলম ও বই হাতে তুলে নিন, শিশুসন্তানের হাতে তুলে দিন উত্তরাধুনিক-উত্তর যুগের ব্রহ্মাস্ত্র বই পুস্তক গ্রন্থ কিতাব শাস্ত্র বুক ও নোটবই ও কলম। পণ্যকুহকিনী মায়াজাল বিস্তারকারী ভোগবাদী কর্পোরেট ঔপনিবেশিকতার সামনে বড় চ্যালঞ্জ (< challenge) বই ও বইপ্রেমী কোটি কোটি মানুষ।

Every great book is an action, and every great action is a book. (মার্টিন লুথার)


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন