পুলিশের কবলে
গল্পটা তারাদাসবাবুর মুখে শোনা,
ঈশ্বর তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। এখানে তা বলবার লোভ সামলাতে পারছি না। বোধহয় আমি পুলিশে
চাকরি করতাম বলেই গল্পটা আমায় শুনিয়েছিলেন। তারাদাসবাবুর বয়েস তখন অল্প, বছর বাইশ তেইশ
হবে। পাড়ার একজন দাদা স্থানীয় লোক পুলিশ অফিসার পঞ্চানন ঘোষালের সাথে দেখা করতে যাচ্ছেন
শুনে তারাদাস বাবুও চললেন তার সাথে। পুলিশ হলেও লেখক হিসেবে পঞ্চাননবাবুর তখন খুব নাম,
বেশ কয়েকটি পপুলার উপন্যাস এবং থ্রিলার লেখার জন্য। তারাদাসবাবু ছিলেন তাঁর মুগ্ধ পাঠক।
সুতরাং সুযোগ তিনি ছাড়তে পারলেন না। গেলেন তাঁর কাছে। সঙ্গের ভদ্রলোক পরিচয় করিয়ে দিলেন।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ছেলে শুনে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকলেন পঞ্চাননবাবু। তারপর বললেন,
"তোমার বাবাকে একবার পুলিশ অ্যারেস্ট করেছিল, জানো?" তারাদাসবাবু বলে উঠলেন,
"অসম্ভব। কখনো হতে পারে না। আমি সকলের মুখ থেকে শুনে বা পড়ে যা জেনেছি তাতে কখনো
তা হতে পারে না। আমার বাবা কোনোদিন সেরকম ছিলেন না"।
-- সেসব তোমার জানতে পারার কথা
নয়, তাই জানতে পারনি। অমুক থানায় (থানার নাম এখন ঠিক মনে নেই, সম্ভবত এন্টালি বা ধর্মতলার কাছাকাছি কোনো থানা) গিয়ে খোঁজ
করলে পেতে পারো। অবশ্য অত পুরনো রেকর্ড আছে
কিনা কে জানে! আসল কথাটা আগে শোনো, সন্ধ্যার মুখে বাইরের কাজ-টাজ সব সেরে থানায় ফিরেছেন
বড়বাবু। থানার কাজকর্মের খোঁজ নেওয়া চলছে তখন। হাজতে যারা ছিল তাদের বের করে এনে
বড়বাবুর সামনে হাজির করল হাজত-বাবু। বড়বাবু সব শুনে সিদ্ধান্ত নেবেন কাকে রাখা হবে,
কাকে ছাড়া হবে। যাদের বের করা হল তাদের মধ্যে ধুতি শার্ট পরা একজন ভদ্রলোককে দেখে বড়বাবু
জিজ্ঞেস করলেন, আরে এ তো ভদ্রলোক দেখছি, এ আবার কী করল? হাজত-বাবু বলল, "স্যার,
উনি ঐখানে থানার দেওয়ালের খাঁজের মধ্যে পেচ্ছাব করছিলেন"। “অ্যাঁ! থানার দেওয়ালে
পেচ্ছাপ? দেখে তো মনে হচ্ছে শিক্ষিত, বেশ ভদ্দরলোক ভদ্দরলোক লাগছে, খোলা জায়গায় এসব
করতে নেই, জানেন না?”
--- আর কোনোদিন হবে না। বিশ্বাস
করুন, না পেরে বাধ্য হয়ে করে ফেলেছি। খুব জোর চেপেছিল, কোথাও কোনো টয়লেট খুঁজে পাইনি।
আর পারছিলাম না, কাপড়ে চোপড়ে হয়ে যেত। তাই একটু আড়াল দেখতে পেয়ে এখানে করে ফেলেছি।
এটা যে থানা বুঝতে পারিনি।
--- কাপড়ে চোপড়ে হয়ে যেত বলে অন্যের
বাড়ির দেওয়ালে পেচ্ছাব করবেন? থানার কথা না হয় বাদই দিলাম। কী করেন?
--- আজ্ঞে আর হবে না। আমি শিক্ষকতা
করি।
--- শিক্ষকতা করেন? কোন স্কুল?
--- অমুক স্কুল (ধর্মতলাস্থিত সেই
স্কুলটার নাম এখন মনে নেই। সম্ভবত স্কুলটি এখন নেই। স্কুলটির তখন বেশ নামডাক ছিল)।
--- ওরে বাবা, অমুক স্কুল? স্কুলটা
কোথায় জানেন?
--- বিশ্বাস না হলে ফোন করে দেখতে
পারেন। আমার কাছে ফোন নাম্বার আছে, দিতে পারি।
ফোন নাম্বার নিয়ে ফোন করে দেখলেন
বড়বাবু। কথা সত্যি। এবার আরো ঝেঁঝেঁ উঠলেন। "তাহলে তো সোনায় সোহাগা, মাস্টারমশাই
হয়ে এসব করছেন, ছাত্ররা কী শিখবে?"
--- বলছি তো ভুল হয়ে গেছে। আগে
কখনও হয়নি। অবস্থার ফেরে হয়ে গেছে, আর কখনো হবে না।
বড়বাবুর চোখ মুখ দেখে কোনো আশা
পাচ্ছিলেন না হয়ত ভদ্রলোক। ভাবছিলেন হয়ত আবার কোন কেস লাগিয়ে কোর্টে পাঠিয়ে দেবে। লোক
জানাজানি হবে, হয়রানির শেষ থাকবে না। তাই বড়বাবুর সহানুভূতি আদায় করার জন্য বললেন,
"এ ছাড়া আমি একটু লেখালিখি ও করি।"
-- আচ্ছা! এমনি হয় না, তায় আবার,
তা কী লেখেন শুনি!
-- গল্প, উপন্যাস এইসব।
-- কী উপন্যাস?
-- আপনি নাম শুনেছেন কিনা জানি
না, আমার একটা লেখা একটু নাম করেছে, পথের পাঁচালী।
--- এবার ঠাটিয়ে একটা চড় কষাব।
অনেক সহ্য করেছি। পথের পাঁচালী কার লেখা জানেন?
--- আজ্ঞে, আমার লেখা বিভূতিভূষণ
বন্দ্যোপাধ্যায়, তখন আপনাকে নাম বললাম তো যখন স্কুলে ফোন করলেন!
বড়বাবু অবাক দৃষ্টিতে মুখের দিকে
চেয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। কী যেন পড়বার চেষ্টা করলেন। তারপর বিস্ময় তার কণ্ঠস্বরে--
--- আপনি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়?
বলতে বলতে বড়বাবু চেয়ার ছেড়ে উঠে
টেবিলের পাশ দিয়ে ঘুরে এসে তথাকথিত আসামীর পায়ের উপর গড় হয়ে পড়লেন। মাথা ঠুকে ঠুকে
প্রণাম সেরে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, "যান, মুতুন, মুতুন এই থানার যেখানে খুশি মুতুন,
যত খুশি মুতুন, পুণ্যভূমি হয়ে উঠুক এ থানা!”
এইপর্যন্ত বলে পঞ্চাননবাবু বললেন
তারাদাসবাবুকে, "বুঝলে, সত্যি সত্যিই তোমার বাবাকে পুলিশে ধরেছিল"। তারাদাসবাবু
বললেন, "এ আপনার বানানো গল্প। আপনি লেখক-মানুষ, সামান্য একটু কিছু কারো কাছে শুনেছেন
হয়তো, তাই দিয়ে এত সুন্দর একটা গল্প বানিয়ে ফেলেছেন!”
--- গল্প হবে কেন? আর অন্যের মুখ
থেকেই বা শুনতে হবে কেন? সেদিনের সেই বড়বাবুটা যে আমিই। আমিই সেই পুণ্য অর্জন করেছিলাম।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন