গল্পগাথার ভিন্ন সমীকরণ: ‘হনন’
বাংলা ও বাঙালির রোজনামচার জীবনে
‘গল্প’- এর স্থান অত্যধিক। নিত্য নৈমিত্তিক জীবনযাপন থেকে পুরনো দিনের ফেলে আসা সমাজ
জীবন কিংবা পারিপার্শ্বিক নানান পরিবেশ পরিস্থিতি রাজনৈতিক মতাদর্শ সবই গল্পের ছলে
পরিবেশিত হয়। মানুষের মুখে মুখে রচিত অন্যতম সাহিত্যধারা লোকসাহিত্যের ক্ষেত্রে এমন
গল্পগাঁথার নানান প্রতিরূপ লক্ষ্য করা যায়। আবার সাহিত্যের অন্যতম প্রধানধারা কথাসাহিত্যের
মধ্যেও ছোটোগল্পের একটি অনন্য স্থান রয়েছে। আধুনিক জীবন থেকে শুরু করে বর্তমান সমাজের
নানান ঘটনা, ছোটগল্পের স্বল্পাধিক আঙ্গিকে একটি অনন্য প্রতীতি সৃষ্টি করে। কখনো বা
মন-মনন থেকে চেতনার অভ্যন্তরে আরো গল্পের নব্য প্রতিরূপকে প্রতিবিম্বিত করে। যাকে সহজ
করে বলা যেতে পারে গল্পের ছলে অপর এক আখ্যানের রূপরেখা অঙ্কন। যা প্রচ্ছন্নতায় নিবিষ্ট
হলেও অনুভূতিতে প্রকটিত হয়। সাহিত্যিক কাজল সেন প্রণীত ‘হনন’ শীর্ষক গল্পসংকলনটি সেই
ভাবনারই প্রতিলিপি।
আধুনিক গতিময় প্রযুক্তি তথা সমাজমাধ্যম নির্ভর জীবনযাপন এক প্রতিরোধ্য গতিশীলতার মধ্য দিয়ে সাজানো। সেখানে আবেগের ত্বরান্বিত ধারার সুক্ষ্ম ধারাপাত থেকে যায়। দেশ - কাল - সমাজে কঙ্কালসার রূপের অন্তরালেও মানুষের চেতন-অবচেতনের দ্বন্দ্ব বিরাজমান। সেখানে প্রতিটি দিনের যাপন এক-একটি মুহূর্তের হিসাব নিকেশ করতে চায়, খুঁজে পেতে চায় নিজস্ব সমীকরণ। সেখানে যুক্তির পরিবর্তে আবেগীয় ধারার ভার বেশি থাকে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে ‘একটি কুকুরেরও গল্প’। সাধারণ শিরোনাম দেখেই অনুমান করা যায় কোনো এক সারমেয় কেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা প্রসারিত হয়েছে। কিয়দংশক অনুমান সঠিক। গল্পকার জার্মান শেফার্ড ডেভিডের কথা তুলে ধরেছেন। প্রায়শই প্রতিটি বাড়ির সামনে দেখা যায় একটি বিদ্ধিবদ্ধ বিজ্ঞপ্তি ‘কুকুর হইতে সাবধান’। স্বভাবতই বাড়ির সদস্যরা প্রিয় পোষ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও বাইরের অন্যান্য মানুষদের ক্ষেত্রটি আলাদা হয়। সেখানে কাজ করে এক অজানা আতঙ্ক তথা ভয়। জলাতঙ্ক বা র্যাবিস ভাইরাসের কথা সর্বজনবিদিত, ফলে ভয়টি যেন আরো উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। উক্ত গল্পের কথকও সেই ভাবনার অধিকারী। ফলে যে কোন রকম কুকুরের সংসর্গ এড়িয়ে চলতেই পছন্দ করেন এবং তার পরিবারের সদস্যদের সেই পরামর্শই দেন। কিন্তু দেখা যায়, কথকের ভাইজি কথাকলিকে ভাদ্র মাসে একটি কুকুর কামড়ে দেয়। তবে কোনো রোগব্যাধি নয় বরং এক প্রাচীন অজ্ঞাত সম্পর্কের দুর্দমনীয় বীজ কথাকলির শরীরে প্রবেশ করে। পৌরাণিক গাথা অনুযায়ী সম্রাট যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে স্বর্গযাত্রায় অংশ নিয়েছিলেন একটি কুকুর। অতএব মানুষের সঙ্গে কুকুরের সম্পর্ক বহুকাল বহু যুগের। কিন্তু সেই অজ্ঞাত বীজের অঙ্কুরোদগমের সমাধানটি অজানা। কারণ প্রতিবেশী বোসবাবুদের পোষ্য ‘ডেভিড’ এবং কথাকলির ‘ভাব-ভালবাসা’; “ডেভিড কথাকলিকে দেখলেই তার কাছে নাকি দৌড়ে চলে আসে। কথাকলি ডেভিডকে আদর করে, খুব আদর করে, ডেভিডের সারা শরীরে হাত বুলিয়ে দেয়, সুড়সুড়ি দেয়, গায়ের লোম চিরুনি দিয়ে আঁচড়ে দেয়, চুমু খায়। আর ডেবিট নাকি সেই যত্ন ও আদর তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে।” আপাতভাবে দেখলে একজন পশুপ্রেমীর অগাধ ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ বলে ঘটনাটিকে ধরা যেতেই পারে। তবে ‘প্রেম’ কেবলই সমজাতীয় প্রাণীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার সংজ্ঞা কথাকলির কাছে ভিন্ন। ভাদ্রমাস কুকুরের যৌন সম্পর্ককালীন সময়। ফলে কামড়ের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে কথাকলির শরীরে ‘কুকুর’ কেন্দ্রিক একটি বিধর্মীয় যৌন চাহিদা প্রবিষ্ট হয়। সমকামিতা সম্পর্ক আইনগতভাবে স্বীকৃত হলেও পশু ও মানুষের এরূপ সম্পর্কের জটিলতা স্বীকৃতি প্রশ্নাধীন। কিন্তু সেই অজ্ঞাত বীজের ক্রমশ প্রসারণ অপ্রতিরোধ্য হয়ে যায়। সমাজ শৃঙ্খলার বাইরে গিয়েও এক অনবদ্য প্রণয় মূলক আখ্যানের রূপরেখা প্রতিফলিত হয়। কথাকলির প্রশ্নবাণ যেন সমাজের প্রতি এক অন্য ভালোবাসার সংজ্ঞা তুলে ধরে; “পুষল তো কী হল? পুষলেই ভালোবাসা যায়? প্রেম করা যায়? চিত্রাঙ্গদাকে কি কখনও কুকুর কামড়েছে? কামড়ায়নি। কোনো কুকুরই কামড়ায়নি। তাহলে চিত্রাঙ্গদা দাবি করে কোন যুক্তিতে যে, ডেভিডকে ও বিয়ে করবে? বরং আমি বিয়ে করতে পারি, আমাকে কুকুর কামড়েছিল। কুকুরের শরীরের বীজ আছে আমার শরীরে। এবং এই গোপন কথাটি টের পেয়ে গেছে ডেভিডও। তাই ও আমাকে এত ভালোবাসে।”
আবার, ‘মৃত্তিকা’ শীর্ষক গল্পটি ভিন্নরূপে নিবদ্ধ। সেখানে মানুষের আদিম প্রবৃত্তি কিংবা কোনো শৃঙ্খলা পরিবর্তনের ইতিকথা নেই। গল্পটির শিরোনামের সঙ্গে সম্পর্কিত আক্ষরিক অর্থগত মিলও নেই, কোনো ভৌগোলিক ভূমিরূপের বর্ণনার পরিবর্তে কিশোরী মৃত্তিকার প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরেছেন গল্পকার। আজন্মকালীন ভাবে মৃত্তিকার দুটি পা’য়ই বাঁকা। ফলে সে হেঁটে বা দৌড়ে যে দিকেই যেতে চায় তার বিপরীত দিকে চলে যায়। যদিও বৈজ্ঞানিকভাবে মানুষের হাঁটাচলা সহজে কোনো জৈবিক প্রক্রিয়া মস্তিষ্কের মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত হয়। অথচ সেই বাঁকা পায়ের দ্বারা মস্তিষ্কে নিয়ন্ত্রণকে দূরে সরিয়ে রেখে মৃত্তিকা বেছে নেয় বিপরীত ধর্মী বিভিন্ন বিষয়। রবীন্দ্রসংগীত নজরুলগীতি কিংবা আধুনিক গানের পরিবর্তে তার আগ্রহ জন্ম নেয় প্রাচীন টপ্পা গানের প্রতি। মৃত্তিকার কল্পলোকে প্রকৃতির এক ভিন্ন রূপ প্রতিফলিত হয়, যা প্রতিযোগিতামূলক সমাজের সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত হয় না। মৃত্তিকার ভাবনাগুলি যেন তার প্রতিবন্ধকতার মতোই বিপরীত দিকের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে যায়; ‘আঁকার জন্য যে বিষয়ই নির্দিষ্ট করা থাক না কেন, মৃত্তিকা শুধু প্রকৃতির ছবি আঁকে। সেই প্রকৃতি আবার এখনও পর্যন্ত কেউ দেখেনি। সেই পৃথিবীর মাটির রং ও গঠন, গাছের রং ও আকার, পাহাড়ের খর্বতা, অরণ্যের বক্রতা একেবারেই আলাদা, একেবারেই অন্য মাত্রার।” ফলে প্রতিযোগিতার দৌড়ে মৃত্তিকার ভাড়ারে কেবল সান্তনা পুরস্কারই যুক্ত হয়। শুধুমাত্র পড়াশুনা কিংবা অন্যান্য প্রতিযোগিতার দৌড়েই নয় স্বাভাবিক জীবনযাপনেও মৃত্তিকা অন্য ধরনের চিন্তায় মগ্ন হয়ে থাকে। স্কুলের রুটিনমাফিক ক্লাসের বদলে বাড়ির অদূরে থাকা শীর্ণকায় বর্ষার জলধারা পুষ্ট নদীর শুষ্ক রূপ তার কাছে আগ্রহের বিষয় হয়ে ওঠে। আবার কখনোবা উৎসবমুখর আয়োজনের পরিবর্তে সে পৌঁছে যায় বস্তিতে। সমাজের চোখে তার পা দুটি বাঁকা এবং তার ফলেই সে নির্দিষ্ট জায়গার পরিবর্তে অন্য জায়গায় পৌঁছে যায়। অথচ মৃত্তিকার ধারণা অনুযায়ী মস্তিষ্ক নয়, ‘পায়ের মস্তিষ্কের’ নির্দেশনায় পরিচালিত হয় তার জীবন যা সাধারণ জীবনের থেকে ভিন্ন প্রকৃতির।
বাংলা ও বাঙালি জীবন যেমন উৎসবের প্রাবল্যতায় প্রবাহমান, ঠিক তেমনভাবেই চলতেই প্রবাদ প্রবচনও জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। কথায় আছে ‘জন্ম - মৃত্যু - বিয়ে তিন বিধাতা নিয়ে’। যেন সৃষ্টি-সংহার থেকে কৃষ্টি সকল কিছুই বিধাতার নিয়মের নিয়ন্ত্রণাধীন। যাবতীয় সমস্ত কিছু পূর্ব পরিকল্পিত ঘটনার সমকালীন বহিঃপ্রকাশ মাত্র। অথচ পূর্বপরিকল্পিত ‘বিয়ে’র মত একটি জীবনের দিক দরদামের হিসেবে আবদ্ধ থাকে। বিধাতার নিয়মের বেড়াজাল দেনা-পাওনার ক্ষেত্রটিতে অনুপ্রবেশ করতে পারে না। পাত্রপক্ষের মতামত গুরুভার স্বরূপ পাত্রীপক্ষ গ্রহণ করলেও পাত্রীর আবেদন নাকচই হয়ে যায়। হয়তো বা ওই নিয়মের দোহাই আসে সেক্ষেত্রে। তবে রক্ষণশীল পরিবারের ক্ষেত্রটি আলাদা। তারা শুধুমাত্র আলাপপরিচারিতায় কিংবা দরদামে নয় একেবারে নতুন জন্মের আলোয় আলোকিত করে বিয়ের কনেকে। ‘জন্মান্তর’ গল্পে তিতিরের নতুন জন্মের পূর্বক্ষণের কথা গল্পকার শ্রী সেনের কলমে লিপিবদ্ধ হয়েছে। কলেজপড়ুয়া তিতিরের বিয়ে সম্বন্ধের মাধ্যমে স্থির হয়, তবে পাত্র-পাত্রীর পরিচয় এক্ষেত্রে নৈব নৈব চ। কারণ রক্ষণশীল পরিবারে সাজিয়ে গুছিয়ে যথাযথ দরদামের দাড়ি-পাল্লায় কন্যাকে সম্প্রদান করাটাই গুরুত্বপূর্ণ। পরিচয় থেকে পরিণয় সেখানে একটি গৌণ কাজ। মুখ্য ভূমিকায় সেখানে থাকে পরিবারে সামিল নববিবাহিতার প্রতি একাধিক বিধিবদ্ধ নিয়ম। সেখানে তিতিরের ইচ্ছে-অনুভূতি-শখ নেই। নতুন জীবনের সঙ্গে বিবাহিতা তিতিরের নতুন জন্মেরও নিয়মাবলী আরোপিত হয়। অথচ চিরকালীন পারিবারিক নিয়মমাফিক জীবনে বেড়ে ওঠা মেয়েটির জন্মান্তর ঘটে যায় বিয়ের পূর্বেই। সমস্ত আরোপিত নিষেধাজ্ঞার সম্মুখে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করে তিতির, ‘...বৃহস্পতিবার ফুলশয্যা। ফুলশয্যার ঘরে সেদিন আপনাদের সবাইকে উপস্থিত থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানাতে এসেছি। কেননা, সেদিন আপনাদেরই মনোনীত ছেলে আপনাদের মেয়েকে প্রথমবার ধর্ষণ করবে। বিনীত অনুরোধ, আপনারা সেই দৃশ্যের সাক্ষী থাকবেন প্লিজ!’
আধুনিক জীবন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মাধ্যমে অগ্রসর হয়েছে। হাতের মুঠোয় চলে এসেছে দুনিয়া ইন্টারনেটের মাধ্যমে। পরিবর্তিত হয়েছে মানুষের জীবনধারার ইতিবৃত্ত। অথচ পাশবিকতার নির্মমতা সমাজজীবন থেকে বিলুপ্ত হয়নি। প্রায় প্রতিটি দিন রাজ্য-দেশ-বিশ্বের নানান প্রান্তে নারী নির্যাতনের ঘটনা সংবাদের শিরোনামে প্রকাশিত হয়। তার মধ্যে সর্বাধিক ভাবে এগিয়ে থেকে ‘ধর্ষণ’ কেন্দ্রিক মর্মান্তিক ঘটনা। যদিও বহুপূর্বেই পান্ডব-কৌরবদের লড়াই এর ফলে দ্রৌপদীর সন্মানহানির ঘটনা ‘মহাভারতে’ বিধৃত হয়েছে। তবুও সেখানে কৃষ্ণের সহায়ক ভূমিকা দেখা যায়। সমকালীন জীবনে সহানুভূতি সহায়তা বিচারের নিভৃত বাণীতেই আবদ্ধ। ফলে ‘ভানুপ্রিয়া’র মত মেয়েরা নির্যাতিত নিপীড়িত হয়ে কেবল মৃত্যুর কোলেই ঢলে পড়ে। কিন্তু গল্পকার কাজল সেন তার প্রণয়কারী ‘রামপ্রসাদ’কে ভিন্ন রূপে অঙ্কন করেছেন। ইংরেজির অধ্যাপক রামপ্রসাদ স্বভাব চরিত্রে শান্ত হলেও তার অবচেতন মন ‘হননে’র ভাবনাকে তাড়িত করে। তাই সে অভিযুক্ত ওমপ্রকাশকে হত্যা করে। পাঞ্চালির পঞ্চস্বামী যে ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে অপারগ ছিল রামপ্রসাদ সেখানে সক্ষম। আসলে আমাদের জীবনের নানান সমস্যা দেশ কাল সময়ের আখ্যান সংবাদপত্র থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিধ্বনিত হয়। অনেক সময় সমকালীন নানান চিন্তা চেতনা আবেগের প্রতিফলন সাহিত্যের অন্তরেও অনুরণিত হতে দেখা যায়। অথচ প্রতিটি ব্যক্তি ভেদে মানুষের রুচিবোধ পরিবর্তিত হয় তাদের আবেগের জারণ বিজারণ ও ভিন্ন রূপ নেয়। সেই ভিন্ন রূপের আখ্যানের কথা গল্পকার কাজল সেনের কলমে বিধৃত হয়েছে আলোচ্য সংকলনে। সম্পূর্ণ বৈপরীত্য মূলক চিন্তনের প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায় ‘হনন’-এ। রোজনামচার জীবনে নিভৃত স্বরে আলোচিত কথামালার অভাবনীয় পরিবেশন এক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায়। সেই পরিবেশনার মাধ্যমে পাঠকের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে যায় গল্পকারের কলম।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন