কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / দ্বিতীয় সংখ্যা / ১৪১

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / দ্বিতীয় সংখ্যা / ১৪১

সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬

শর্মিষ্ঠা বিশ্বাস

 

ধারাবাহিক উপন্যাস

দ্য ক্লাউড

 


(বিংশ পর্ব)  

সকালের আলো মাঠে নামতে একটু দেরি করছে আজ। পতাকাটা একই জায়গায় ঝুলছে। কাপড়ের রং আরও মলিন। উৎপল তাকিয়ে বুঝতে পারে রাতটা সহজে যায়নি। নিমচাঁদ দাগার সুতো আরও পাতলা হয়ে গেছে। যেন রাতভর কেউ তাকে টানছিল নিচের দিকে।

উৎপল ধীরে বলে দাগা, তুমি আছো? কিছুক্ষণ কোনো উত্তর নেই। তারপর খুব দূরের মতো একটা চাপ ভেসে আসে দাগা-- আছি। কিন্তু আমি আর পুরোটা পতাকায় নেই।

উৎপল থামে। কোথায় গেলে? দাগা যেন একটু ভেবে নেয়। নিচে। উৎপল নিচে তাকায়। মাঠের পাশে যে মজা নদীটা বয়ে চলেছে —ওখানে আজ জল অদ্ভুত স্থির। জলের উপর কিছু একটা ভাসছে। প্রথমে মনে হয় গাছের ডাল। তারপর ধীরে ধীরে বোঝা যায়ওটা একটা শরীর। উৎপল এগিয়ে যায়। তার ডেটা-ডায়েরি ব্যাগের ভিতরেই থাকে। আজ সে আগে তার ডেটা ডায়েরি খুলে দেখে, শরীরটা মেয়ে মানুষের। জলে ভাসছে।

খাকি পোষাক জলে ভিজে গাঢ় হয়ে গেছে। কাঁধের ব্যাজটা অল্প আলোয় ঝলকে ওঠে।

উৎপল থেমে যায়। তার মনে পড়ে এই মুখ সে আগেও দেখেছে। খুব কাছ থেকে। কবরখানার মাঠে নয়। আরেকটা সন্ধ্যায়। সেদিন বাবলু অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিল। আর মনিরত্না ভরদ্বাজ মৃত হয়েও কথা বলছিল। সেই রাতের শেষে এই মানুষটা এসে দাঁড়িয়েছিল। তরুণী IPS অফিসার। তার চোখে তখনও ঘুম ছিল না। সে বলেছিল—“আইন কাগজে থাকে। মানুষ থাকে কবরখানায়।

উৎপল তখন কিছু বলেনি। কিন্তু বাবলু হেসে বলেছিল—“আপনি দেরি করে ফেলেছেন স্যার। মৃতেরা আগে থেকেই সাক্ষ্য দিয়ে দিয়েছে।

সেই রাতের পর এই মানুষটাকে আর কেউ দেখেনি। সংবাদপত্রে কয়েকদিন নাম উঠেছিল। তারপর হঠাৎ চুপ। আজ সেই শরীর জলে ভাসছে। উৎপল মজা নদীর ধারে বসে পড়ে। ডেটা-ডায়েরি খোলা তার সামনে।

উৎপল চিত্রকরের ডেটা-ডায়েরি।

এন্ট্রি: আপডেট

নাম: অনির্দিষ্ট

পরিচয়: তরুণ IPS

পূর্ববর্তী উপস্থিতি:

বাবলুর সাক্ষাৎকার।

মনিরত্না ভরদ্বাজ ঘটনার পরবর্তী তদন্ত।

বর্তমান অবস্থা: জলে ভাসমান।

উৎপল লিখতে গিয়ে থেমে যায়। কারণ একটা অদ্ভুত ব্যাপার সে বুঝতে পারে পতাকাটা আজ আর নড়ছে না। হাওয়া আছে। তবু কাপড় স্থির। নিমচাঁদ দাগার কণ্ঠ আবার ভেসে আসে। খুব ক্ষীণ।

দেখলে?

উৎপল উত্তর দেয় না। সে শুধু জিজ্ঞেস করে তোমার সুতোটা কেন নিচে নামছে?

দাগা একটু চুপ করে থাকে। তারপর বলে কারণ আমার অপরাধ মাটির। ওরটা ছিল আকাশের।

উৎপল বুঝতে পারে না। আকাশের অপরাধ? দাগা বলে যে প্রশ্ন করে, সে ওপরে উঠে যায়। রাষ্ট্র তাকে সহ্য করতে পারে না।

উৎপল খালের জলে তাকিয়ে থাকে। IPS অফিসারের মুখটা ধীরে ধীরে ওপরে ঘুরে যায়। জল একটু নড়ে। হঠাৎ উৎপলের মনে পড়ে মনিরত্না ভরদ্বাজ বলেছিল এক অদ্ভুত কথা।মৃতেরা কখনও হারায় না। ওদের শুধু ফাইল বদলায়।

উৎপল ডায়েরিতে নতুন লাইন লেখে

নোট:

রাষ্ট্র মৃতদের সৎকার করে না। রাষ্ট্র মৃতদের ডেটা বানায়।

এই সময় একটা কাক এসে খালের ধারে বসে। কাকটা একবার শরীরটার দিকে তাকিয়ে উড়ে যায়।

উৎপল বুঝতে পারে প্রকৃতির কাছে এই মৃত্যু খুব সাধারণ। কিন্তু রাষ্ট্রের কাছে এই মৃত্যু থাকবে না।

ডেটা ডায়েরিতে হঠাৎ একটা নতুন ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়। যেন কোনো ফাইল মুছে গেছে। উৎপল ধীরে বলে দাগা, তুমি আছো?

কোনো উত্তর আসে না। সে পতাকার দিকে তাকায়। নিমচাঁদ দাগার সুতো নেই। পতাকা হালকা হয়ে গেছে।

উৎপল প্রথমবার ভয় পায়। কারণ সে বুঝতে পারে যে আত্মা অপরাধ নিয়ে ঝুলে ছিল, সে হয়তো এখন অন্য কোথাও গেছে। খালের জলে আলো এসে পড়ে। IPS অফিসারের শরীরটা ধীরে ধীরে ভেসে সরে যায়।

উৎপল আঁকে না। আজ সে শুধু লিখে ডেটা-ডায়েরি শেষ নোট:

আজ তিনজন নাগরিক উপস্থিত

একজন মৃতা (মনিরত্না)।

একজন অভিযুক্ত (বাবলু)।

একজন রাষ্ট্রের কর্মকর্তা।

তিনজনই এখন একই স্তরে। অর্থাৎ তিনজনই এখানে নাগরিক। শুধু রাষ্ট্র এখানে অনুপস্থিত।

মাঠে তখন সকাল নেমেছে। পতাকা নড়ছে। কিন্তু উৎপল আজ জানে এই নড়াচড়া আর বাতাসের নয়। এটা ইতিহাসের ক্লান্তি।

(ক্রমশ)

 

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন