কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / দ্বিতীয় সংখ্যা / ১৪১

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / দ্বিতীয় সংখ্যা / ১৪১

সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬

শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী

 

ধারাবাহিক উপন্যাস

ইন্দ্রপুরী রহস্য

 


(সাত)

তিষ্টন্তি

কলকাতায় ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে 'অনুশীলন সমিতি' নিয়ে তখন একটা ওয়েবসিরিজ করছিলেন বিখ্যাত চিত্রপরিচালক অর্ঘ্যকমল রায়। সদ্য ফিরেছেন বার্লিন ফিল্মফেস্টিভাল থেকে। সেখানে উদ্বাস্তুদের নিয়ে তৈরি তার তথ্যচিত্র বিশেষভাবে সমাদৃত হয়েছে। পেয়েছেন সম্ভাননাও। অর্ঘ্যকমল পছন্দ করেন পুরনো দিনের মেথড ঢঙে অভিনয়। তার ছবিতে অভিনেতাকে নিজেকেও ভেঙেচুরে পরিবর্তন করতে হবে। এই ডেডিকেশনটা তিনি আসা করেন তাঁর অভিনেতাদের ভিতর। কিন্তু এইটুকু দায়বদ্ধতা তরুণ সমসাময়িক অভিনেতাদের ভিতর তিনি কিছুতেই পাচ্ছেন না। এদিকে কাজের জায়গায় একচিলতে কম্প্রোমাইজ করেন না তিনি। প্রোজেক্টটা আর করবেন না ভাবছেন। প্রোডিউসারকে জানিয়ে দেবেন ভাবছেন, এহেন পরিস্থিতিতে বারীণ ঘোষ চরিত্র অডিশন দিতে তার সামনে এসে দাঁড়াল সদ্য রায়গঞ্জ থেকে আসা এক তরতাজা তরুণ অভিনেতা। হাঁটা সামান্য ত্রুটিযুক্ত, কথাবার্তাতেও সামান্য উত্তরে ছোঁয়া। তবু অল্প দিনেই তরুণটি তার অভিনয়ের মেধা আর অধ্যাবসায় দিয়ে মন জয় করে ফেললেন অর্ঘ্যকমলের।

-টু উইক্স। এর ভিতর পারলে তো পারলে। না হলে বাতিল...

তরুণটি এটা চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিল। অর্ঘ্যকমল মনে মনে ভাবলেন,"দেখাই যাক না!" ঠিক দুই সপ্তাহের মাথায় সেই যুবকটি আবার তার সামনে এসে দাঁড়াল। হাঁটার ত্রুটিটা প্রায় ধরাই যাচ্ছে না। উচ্চারণ স্পষ্ট। একশো বছর আগেকার কলকাতার কথনপদ্ধতি মাত্র দুই সপ্তাহে রপ্ত করে ফেলেছে ছেলেটি। অর্ঘ্যকমল যেন এই সঞ্জীবনীটুকুই চাইছিলেন। তৈরি হল ওয়েব সিরিজ, 'অনুশীলন'। বারীন্দ্রকুমার ঘোষের চরিত্রে দর্শকের নজর কাড়লেন সেই রায়গঞ্জ থেকে আসা তরুণ অভিনেতা শুভায়ু দে। এরপর শুভায়ুকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। টিভির পর্দায় ব্যস্ত মেগাসিরিয়ালের শিড্যিউলে অব্যশ্যম্ভাবী নাম হয়ে উঠল শুভায়ু।

খ্যাতির সঙ্গে আসে আলো। দায়িত্ব। আর আসে মাদকতা। ধুঁকতে থাকা বাংলা সিনেমার একদিকে বলিউড-হলিউড, অন্যদিকে কন্নড় তেলেগু মেশানো কলিউড নিশ্বাস ফেলছে। শুভায়ু পরিশ্রমী, অসামান্য প্রতিভাধর।  একবার কোনও স্ক্রিপ্ট পড়লেই তার সেটা মুখস্থ হয়ে যায়। এর ভিতর আবার আর এক ঘটনা ঘটে গেল। হোম মিনিস্টার শরদিন্দু পাটিলের ছেলে প্রীতম সেদিন সেটে শ্যুটিং দেখতে এসেছে। দাদাভাই নওরোজির  বায়োপিক হচ্ছে। এরই ভিতর সেটে ঘটে গেল দুর্ঘটনা। প্রীতম পাটিলের একটা ছোট্ট ফেলিসিটেশন ছিল।  বক্তৃতা দেবার সময় হঠাৎ সেই স্টেজটা ভেঙে মাটির ভিতর ঢুকে গেল। সমস্যা গভীর হতে পারত। বাঁচিয়ে দিল শুভায়ুর প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব। শুভায়ু মোক্ষম সময় প্রীতমকে হাত ধরে টেনে সরিয়ে না দিলে তার মাথায় চোট পাওয়া  থেকে কেউ বাঁচাতে পারত না। কৃতজ্ঞ প্রীতম আর তার বাবা তাদের রাজনৈতিক সাহায্যর হাত বাড়িয়ে দিল শুভায়ুর দিকে। শুভায়ুর জীবন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছিল। ধীরে ধীরে তার রাতগুলো দখল করে নিল নাইটপার্টি। অবাধ নারীসঙ্গে ঘটে গেল ভুল। খ্যাতির হাত ধরেই আসে বিড়ম্বনা। নেশার ঘোরে একটি  বারে সেখানকার ডান্সারকে ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত হয়ে গেল শুভায়ু। শোনা যায়, সেই মেয়েটি নাকি অভিযোগ দায়ের করবার সময় গর্ভবর্তী ছিল। ব্যাপারটা শুভায়ুর রূপোলি ডানায় একচিলতে কলঙ্কর দাগ ফেলেছিল বটে, কিন্তু ঠিক সেই সময় পাটিল পরিবারের রাজনৈতিক প্রভাব শুভায়ুর ঋণশোধ করে দেওয়ায় শুভায়ু বেঁচে গেল। কী হয়েছিল সেই মেয়েটির? কী তার নাম? এসবই এখন অজানা। তবে এই ঘটনার পর শুভায়ুর জীবনেও পরিবর্তন এল অনেক। সামাজিক জীবনে সে অনেক সংযত হয়ে উঠল। মদ্যপান ছেড়ে দিল। নবনীতাকে বিয়ে করল। টুকরোটাকরা স্ক্যাণ্ডাল ছাড়া তেমন নারীসঙ্গেও লিপ্ত হতে দেখা গেল না তাকে। সোহরাব বিস্তৃতভাবে যেভাবে শুভায়ুর উত্থানপতনের ইতিহাস তুলে ধরল আমাদের সামনে তাতে বিস্মিত হতে হয়। এ যেন কোনও এক রোমান সেনানায়কের 'এলাম-দেখলাম-জয় করলাম' গাথা।

সোহরাব ভোর ভোর ফিরে গেলে আশুদা সম্বরণদাকে ফোন করতে বসল। আর আমি বসলাম কলেজের কিছু বাকি থাকা কাজের হিসেব সারতে। একবার যেতেও হতো কলেজে। তাই বেরিয়ে পড়লাম দুপুর দুপুর। শহরের রাস্তাঘাট ছেয়ে গেছে তন্দ্রা আর রোহিতের 'পৃথ্বীরাজ' ছবির পোস্টারে। দেখতে দেখতে ভাবছিলাম,  মিথ্যে ভরা এই রূপোলি পর্দা দেখতেই কেমন আমরা ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিই। বিকেলের দিকে অলোকেশ ফোন করল একবার। আশুদাকে ফোনে না পেয়ে আমাকে ফোন। কথা শুনে মনে হল সুনন্দর মৃত্যুর খফরটা এখনও সে জানতে পারেনি। বাড়ি আসতে চায়। আমি বললাম জানাব। কলেজ সেরে সবে পার্কিংএ এসেছি, আমার ফোন আবার বেজে উঠল। স্ক্রিনে অচেনা নম্বর। সাড়া দিতেই বিস্মিত হতে হল।

-আমি বিনতা বলছি। চিনতে পারছেন?

-হ্যাঁ। কেন চিনতে পারব না! বলুন না। কী খবর? এটা নতুন নম্বর?

-না। লুকিয়ে অন্য নম্বর থেকে করছি। ও জানতে পেরে গেছে বোধহয়। আপনাদেরকে আমি এইসব বলছি বললে ও আমাকে মেরে ফেলবে।

-কে ও?

-কেউ না। পরে বলব। আগে বলুন তো, ট্যাটু করালেন?

-না। তবে আসিফের সঙ্গে দেখা করেছি। কথা হয়েছে।

-কেন করালেন না? ভয় পেলেন? আপনি তো ভীতু!

-আমি ভীতু, এটা কে বলল আপনাকে?

-বলেছে একজন। অনেকদিন আগে। যাক সে কথা। আমি একটা ট্যাটু করিয়েছি। দেখবেন?

-কৈ দেখি?

পরক্ষণেই আমার ফোনে ভেসে এল বিনতার কন্ঠনালি আর বক্ষবিভাজিকার উপরে আঁকা একটি ট্যাটু। একটা প্যাঁচানো সাপ।

-কে করল? আসিফ?

-না। অন্য আরেকজন। আপনাদের সেদিন অনেক কথা বলিনি। কিন্তু শুনলাম সুনন্দ মারা গেছে। তখন মনে হল, জানানো উচিত।

-বলুন।

-আপনাকে নয়। আশুদাকে বলব।

-আমাকে নয় কেন?

-আপনাকে বলে কী লাভ? আপনি তো ভীতু। জানেন এই ট্যাটুটা করতে খুব ব্যথা লেগেছে।

-তাহলে করালেন কেন?

-ব্যথা পাবো বলে। একটা কথা। আশুদাকে আমার ট্যাটু দেখাবেন না। আমাদের এই কথাবার্তার কথাও বলবেন না।

-কেন?

-কারণ আছে। শীঘ্রই যাব আপনাদের কাছে। আচ্ছা আপনি প্রমিতি সেনকে চিনতেন?

এতোটুকু দমকা বৈশাখী বাতাস আমার কান ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল যেন। প্রমিতিকে কীভাবে চিনল এই মেয়েটি! সেই কুসুমকুমারী দাসীর রোমহর্ষক কুহুকিনীকে আজও চোখ বন্ধ করলেই তো দেখতে পাই। কিন্তু সেকথা বিনতা জানল কী করে?

-বলব সব। তবে তার আগে বলুন কবে দেখা করবেন? কথা আছে।

রহস্যজাল বুনছে বিনতা! কিন্তু কেন? তবে কি সেও এই রহস্যচক্রর সদস্যা!

-আপনি বলুন।

-ভীতু কোথাকার!

ফোনটা কেটে গেল। আর একগাদা প্রশ্ন নিয়ে আমি ঘরে ফিরে দেখলাম সোফার উপর আশুদা ধ্যানমগ্ন হয়ে বসে আছে। আমি আর বিরক্ত করলাম না তাকে। বিনতার কথাও কিছু বললাম না। বারান্দায় বসে ভাবতে লাগলাম, বিনতা কী বলতে চায়! সে প্রমিতির কথা জানল কী করে! ভাবতে ভাবতেই কখন আশুদা আমার পাশে এসে বসেছে জানতেই পারিনি।

-তোর সম্বরণদা ছেলেটি খুব সিনসিয়ার। আমাকে ওর ফাইণ্ডিংগুলো বলছিল। খুব আশ্চর্যের বিষয় জিনিস! সুনন্দর শরীরে যে উনালোম, তার শেষ তিনটি বিন্দুতে পারদ রয়েছে। আর ভিসেরা রিপোর্ট বলছে ওর পাকস্থলিতে কড়ামাত্রায় ঘুমের ওষুধ আছে।

-তার মিনে বাজোরিয়াই সব করাচ্ছে!

-সেইরকমই তো মনে হচ্ছে।

-তাহলে তথাগতকে বলেছ?

-না। এখনও সময় আসেনি। তাছাড়া সম্বরণকে আমি অন্য একটা পরীক্ষাও করাতে বলেছি। দেখি, কী রেজাল্ট আসে। যদিও ও বলছিল রিপোর্ট আসতে সাতদিন সময় লাগবে।

-কী টেস্ট?

-শুভায়ুর শরীরের স্যাম্পেল আর সুনন্দর দেহের টিস্যুর জিন ম্যাপিং।

-হঠাৎ! কেন?

-কী জানি। এমনিই মনে হল। শোন। তিনদিন ছুটি নে। আমাদের বাঙ্গালোর যেতে হবে।

-আরতি ইনস্টিটিউটে?

-ঠিক তাই। শুভায়ুর শরীরে কী রোগ ছিল জানাটা দরকার। অন্তত ওরা কী ভাবছিল। সেটা। আর...

-আর?

-সর্বানন্দ শুভায়ুর ফোনের কললিস্ট ধরে ট্র্যাকিং করেছে জানিস। শুভায়ু শেষবার বাঙ্গালোর নেমেছিল ঠিকই, কিন্তু সর্বানন্দর অনুসন্ধান বলছে, ও সেখানে মহেন্দ্র নাইডু বলে একজনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল বাঙ্গালোর থেকে প্রায় দুশো কিলোমিটার দূরে অনন্তপুরে!

-আমরা কি তবে অনন্তপুরেও যাচ্ছি?

-অবশ্যই যেতে হবে। ব্যবচ্ছেদে লুকানো ম্যালফরমেশনের তথ্য উড়িয়ে দেওয়া যাবে না অর্ক। দুই ফ্লাইট বুক কর। বাকি কাজ সর্বানন্দ করবে।

আমি ঘরছাড়বার উন্মাদনায় এক মুহূর্তে ভুলে গেলাম বিনতার কথা, প্রমিতির কথা। আমি কি সত্যিই কাপুরুষ! বিনতা কী ঠিকই বলেছে? তাই হবে হয়তো! তবে অনন্তকে ছুঁয়ে দেখার সোমরসের উন্মাদনায় আমি হাজারবার 'ভীতু' হতে রাজি আছি।

(ক্রমশ)


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন