কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / দ্বিতীয় সংখ্যা / ১৪১

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / দ্বিতীয় সংখ্যা / ১৪১

সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬

তপনকর ভট্টাচার্য

 

সমকালীন ছোটগল্প


অপমান

অপমান করার মধ্যে সুখ আছে। অন্যকে অপমান করে যে তৃপ্তি, তার সঙ্গে অথচ টুবাইকে অপমান না  করলেহ্যাঁ, অবশ্যই ওকে অপমান না করে কিন্তু সেই মুহূর্তে কিছু করার ছিল না, শুধু টুবাই ছিল, আর  গনেশের জিভ নিশপিশ এরকম হলে তার অবস্থা যা হয় কিছু তেরা বাঁকা কথা, চোটপাট এক ঝটকায়  কেসটা নিজের দিকে তার জন্য যেটুকু অপমান, — তাকে অপমান না বলে ডায়লগ বলা ভালো, হ্যাঁ কথাবার্তা একটু উঁচু স্বরে আর তাতে মানহানিকর একাধিক কথা থাকে না তা নয়, কিন্তু এর অর্থ কেউ যদি অপমান ভাবে, তাহলে সত্যি সত্যি যখন অপমান সে তো অনেক বড়ো ব্যাপার! ন্যক্কারজনক, বেইজ্জতি, প্রেস্টিজ পাংচার তার সঙ্গে অপমানিতের জন্য পড়ে থাকা লাঞ্ছনা, ব্যঙ্গউপহাস তার  সঙ্গে গণেশের আহ্লাদ, ভালোলাগা, হুল্লোড় ও কর্তব্যবোধের হুংকার।

অথচ টুবাইকে অপমান না করলে

হ্যাঁ, অল্প হলেও ভালো তো হতই গণেশ তো জানত, টুবাই প্রভাবশালী বাড়ির ছেলে। তার বাবা এম এল , কাকা কাউন্সিলর, জ্যাঠা উকিল, মামা লোকাল থানার ওসি তাদের পরিবার,  জন-প্রতিনিধি আর স্থানীয় প্রশাসনের বেশভূষায় সজ্জিত তার সঙ্গে মাজাকি!

কিন্তু দ্যাখো, কি না করেছে গণেশ! যখন মনে হয়েছে অন্যায়, যেখানে অসংগতি,  ফুঁসে উঠেছেএমন ভাবে ফুঁসেছে, ট্যা ফোঁ করতে দেয়নি।

সে কারণে, — ও একটা ছাগল বলে, সাইড কাটিয়ে যাবার উপায় নেই। উপায় নেই, কারণ গণেশ

এলেবেলে কেউ নয়। সে সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত একটা স্কুলের অশিক্ষক কর্মচারী কাজে দক্ষ এবং নিষ্ঠাবান এবং তার আয়ত্তাধীন স্কুলের হিসাব পত্তরে এক পয়সার এদিক ওদিক হবার উপায় নেই।

তার উপর সে শাসক দলের ঘনিষ্ঠ। এর আগের শাসকদেরও ঘনিষ্ঠ ছিল সে। সবসময় ক্ষমতার বৃত্তের  কাছাকাছি তার ঘোরাফেরা। এর মধ্যে একধরনের নিরাপত্তা ছিল, এবং সে সেরকমই চাইত যার জোরে, সে  যতই অন্যকে গালমন্দ করুক না কেন,  প্রতিবাদ তো দূরের কথা, কেউ চোখ তুলে কথা বলার সাহস দেখাতে পারত না।

এরকম সুবিধাজনক অবস্থানে, বিশেষ কোন সুবিধা নেওয়া অথবা পাওয়া উচিত নয় এই জ্ঞানে, এমন সুযোগ নেওয়ার অভিলাষ থেকে সে সব সময় দূরত্ব রক্ষা করেছে। দলের কাছে কিছু চায়নি কখনো। জমি, বাড়িযে  পারছে করে নিচ্ছে এই সুযোগে কিন্তু গণেশ! নেভার।

এটা তার চরিত্রের একটা দিক। এবং অবশ্যই সে উন্নাসিক, খুঁতখুঁতে, নাকউঁচু যার বহিঃপ্রকাশ ছিল

যাকে যা খুশি বলা। শুরুটা যদিও তেমন ছিল না, মানে যখন সে আগের শাসকদলে, অন্যায়ের প্রতিবাদের  রূপ ছিল অন্যরকম। মিছিলে গলা মেলাতো, গণসঙ্গীত আর বৈপ্লবিক পরিবর্তনের প্রতি তখন তার অগাধ আস্থা। একদিন মেহনতি মানুষের সরকার হবে এসবই ছিল তার জীবনের স্বপ্ন।

আজ পর্যন্ত, তার বাহান্ন বছরের জীবনে, রাজনীতির অনির্ণেয় জটিলতা, ধারাবাহিক অর্থহীন আধিপত্য আর এলোমেলো বিশৃঙ্খলা, যা শুধু তারই চোখে ধরা পড়ত অন্তত তার বৌ বা দুই মেয়ের সঙ্গে গণেশের এই প্রবণতার প্রাত্যহিক সংঘর্ষ বা বাদানুবাদের সার অংশটুকু ছিল এটুকু, — “কেউ তোমার মতো নয়  অথবা যতসব উল্টোপাল্টা কাজ আর ভুলভাল কথা” — সে যাই হোক, বর্তমান রাজনৈতিক ক্ষমতার স্তরে নিজের দলের মধ্যে সে এতটাই অবহেলিত যে, অন্যায়ের প্রতিকারের সবরকমের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে চিৎকার করা ছাড়া বিকল্প কিছু রইল না। অন্তত  পরবর্তীকালে সে ব্যাপারটা এভাবেই ব্যাখ্যা করেছিল।

হ্যাঁ, একথা ঠিক, সবাই গণেশ হয়নি। খারাপ লাগা, অপছন্দ হওয়া বা মেরে মুখ ফাটানোর মতন অবস্থাএমনকী রড দিয়ে মাথা ফাটানো ছাড়া বিকল্প কিছু নেই যেখানে, ---ঠিক সেইখানে --- দলের দায়িত্বশীল, অঢেল ক্ষমতা ও পদমর্যাদার নেতারা যখন কাম অ্যান্ড কোয়ায়েট, বিনয় প্রকাশে গলে পড়া মোম,  যে  কোন অবস্থায় অবিচলিত থাকার চেষ্টা সেখানে গণেশের এই এটিটিউড বাড়াবাড়ি তো বটেই, কিন্তু দলের  প্রশ্রয়ও ছিল। কারণ বেদে বস্তি আর ধাড়া পাড়ার প্রায় দেড় হাজার ভোট যাদের কাছে গণেশ ছিল সততার প্রতীক। সেখানে তার প্রভাব এতটাই,  তাদের  অন্যায় দেখলে শাসন করা বা বকাঝকা বা গালাগাল -- এ ছিল তার অধিকার, তা সত্বেও  তাদের সুখে দুঃখে সারাবছর লেপটে থাকার ফসল ওই দেড় হাজার ভোট।

গণেশ যে দলে,  ওই  ভোটও তার সঙ্গে সঙ্গে।

কিন্তু অপমান কেন? কেনই বা বকাঝকা? ওটা অভ্যাস। ওটা হয়ে যায়। ধীরে ধীরে। ক্রমে ক্রমে। কালে  কালে, দিনে দিনে, বছরে বছরে একথা গণেশ নিজেই বলেছিল। তার কৃতকর্মের জেরে, তার বিরুদ্ধে জনপ্রতিনিধির অভিযোগ ও নালিশের সামনে খোলসা করেছিল না বলে, বলা ভালো খোলসা হয়েছিল সবটুকু এবং তাতে তার ইচ্ছা বা অনিচ্ছা কিছুই ছিল না। সে সব বলেছিল কেন তার এই অপমানের ইচ্ছা যাকে সে আদৌ  অপমান বলে মনে করে না স্পষ্ট কথা বলা এর মাধ্যমে লোককে সবক শেখানো আর অন্যায়ের প্রতিবাদ আরো কথা, যা সে কোনদিন কাউকে, এমনকী নিজেকে বলেনি সেই কথাগুলো হরহর করে বের  হয়ে আসছিল।

স্কুল ছুটি হয়ে গেছে, ক্লাস ফাঁকা, অথচ দ্বারোয়ান পাখা বন্ধ করেনি। তার জন্য সে এ্যায়সা গালি খেল  গণেশের কাছে, একবার নয়, একই ভুল বারবার এবং যতবার ততবার বাপ মা উদ্ধার। চোখের জলে, নাকের জলে দ্বারোয়ান বেচারা নালিশ করার লোক খুঁজে পায়নি, যা পেয়েছিল ছোকরা গেম টিচার। স্কুলের মাঠে  জৈষ্ঠের রোদে ছাত্ররা পিটি করছে আর তিনি একটা জারুল গাছের ছায়ায় বসে আরাম করছেন। এসব মেনে  নেওয়া সম্ভব! গনেশের পক্ষে!  একরাশ কথা শুনিয়ে দিয়েছিল। গেম টিচারও সঙ্গে সঙ্গে হেডস্যারের ঘরে। গুছিয়ে নালিশ।

অমায়িক হাসি হেডস্যারের আমাকেও বলে।টা পাগল। অপছন্দের কিছু দেখলেই তবে স্কুলটাকে বড্ড ভালোবাসে, কী দরদ! ভাববেন না যেন, অপদস্থ করার জন্য বলেছে। ওই আর কী! পাগল ভাবুন, দেখবেন সমস্যা হচ্ছে না। অন্য টিচারদেরও কমবেশি এই অভিজ্ঞতা

পাড়ার ক্লাবের পাশ দিয়ে গণেশ ওদিকে শিবু, মদন, লাল্টু, বল্টু, দিলীপ, প্রদীপ নানান দরের এক

একটা ফিল্ডের ওস্তাদ সব। অথচ কী আশ্চর্য! গণেশকে দেখে খিস্তি বন্ধ, ক্যাওড়ামি বন্ধ, এমনকী

তাস, ক্যারম বন্ধ।

গণেশ কি আতঙ্ক? ত্রাসের কারণ?

হ্যাঁ, এরা কেউ ছাড় পায়নি। পূজো পার্বণে মাইক বাজানো থেকে গায়ের জোরে চাঁদা আদায়

স্বাধীনতা দিবসের মাইকে তারস্বরে উলাল্লা উলাল্লা ক্লাবের ছোটখাটো পিকনিকে ঢুকু ঢুকু রাম বা

সস্তার হুইস্কি খুব অ্যালার্ট থাকতে হয় গণেশের জন্য।  ক্লাবের ছেলেরা জুনিয়র  কিন্তু গণেশের মতই তারাও শাসক দলের সমর্থক, সে হিসেবে তাদেরও ছাড় পাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সিনিয়র লোক তার উপর দলের ইম্পরট্যান্ট ফেস! যে কারণে গণেশ তাদের কাছে ছাড় পায় অন্য কেউ এরকম মুখ ছোটালে থোবড়ার জিওগ্রাফি চেঞ্জ করে দেবার ক্ষমতা এদের আছে। তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ এদিক ওদিক ছড়ানো, সামান্য খোঁড়াখুঁড়ি করলেই টাটকা পচা গন্ধ নিয়ে উঠে আসবে, সেই তারাও, গণেশের কাছে কেঁচো!

বাজারেও গণেশের রণমূর্তি। সবজির ওজনে বা মাছের দামে অনাস্থা, তো শুরু করে দিত হম্বিতম্বি,

তর্জন-গর্জন, মুখ ঝামটা। বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ ছিল না, কারণ গনেশকে নির্বিচারে মেনে নেওয়াটাই রেওয়াজ।

বেদে বস্তি আর ধাড়া পাড়ার দেড় হাজার ভোট আর গণেশের ক্লিন ইমেজএর দাম দলের রাজনৈতিক  খেলাধুলায় খুব গুরুত্বপূর্ণ। গণেশ হিংস্র নয়, তার মুখ চলে কিন্তু হাত চলে নাঅথচ যেখানে হাড়-হাভাতে-মায়ে-খ্যাদানো-বাপে-খ্যাদানোদের দলেরও প্রয়োজন, গণেশের অবস্থান ঠিক তার বিপরীতেযেন সেতারের আলাপ অথবা খেয়ালের তান। অনেকটা সাংস্কৃতিক এরিয়া সে কভার করে। সংস্কৃতি বলতে এখানে উৎসবের এলাকা। চেঁচামেচি-হইচই-হুল্লোড়, তারই মধ্যে একটু রবীন্দ্রসঙ্গীত, পুরনো দিনের বাংলা গান। ক্লাবের ছেলেরা সংস্কৃতি কে এমনভাবে পেঁচিয়ে যা করে তাই সাংস্কৃতিক। নেতা দাদাদের এদিকটায় সতর্ক দৃষ্টি, কোনমতেই সংস্কৃতির আগে অ বা অপ শব্দটা যেন জুড়ে না যায়। আনকালচার্ড হওয়ার আশঙ্কায় দাদারা ভয়ে জড়োসড়ো। ভদ্দরলোকেরা ভাবেন, যা কিছু  ভালো, তা সংস্কৃতির মধ্যেকার; আর যা কিছু খারাপ, যা নিষিদ্ধ, যেমন চুরি-ডাকাতি, খুন-জখম, ধর্ষণ অন্তত আমাদের এরিয়াতে যেন না হয়। এমনিতেই রাতদিন লারেলাপ্পা, মাইকে গাঁকগাঁক ভদ্দরলোকেরা  এসব পছন্দ করেন না সে যতই রক্তদান বা কম্বল বিতরণ হোক অথবা বিনা পয়সায় পাঠ্যপুস্তক  বিতরণ রবীন্দ্র নজরুল হলে তবু রেহাই সেখানে ভদ্র পাড়ার ভদ্দরলোকেরা আসে, গান শোনে শ্যামা বা চিত্রাঙ্গদা দেখেকিন্তু মা শীতলা বা মনসায় তারা নেই, ওদিকে অবাঙালীদের জন্য আজকাল রামনবমী, গণেশ জয়ন্তীর জায়গা রাখতে হচ্ছে সংস্কৃতির এত জটিল অলিগলি কতরকমের বুদ্ধিজীবি, ভাবুক, কবি সেকারণে গণেশকে  তাদের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি হিসেবে দেখার অভ্যাস এবং দলের তাতেই সুবিধা।

এতদিনের এই অভ্যাসে টুবাই হয়ে দাঁড়াল গণেশের গলার কাঁটা। গণেশ অত বোঝেনি। স্কুলের অ্যানুয়াল  পরীক্ষায় সে গার্ড দিচ্ছিল আর টুবাই টুকলি করছিল। গণেশ যা বলে থাকে তার দশগুন সেদিন --  যা বলে না  তা- ---  যা বলা উচিত নয় সেসবও ---  কোথাও ছাড় দেয়নি। ঝেড়ে প্যান্ট খুলিয়ে পরীক্ষার হল থেকে টুবাইকে বের  করে দিয়েছিল।

কিন্তু টুবাই যে ছাড়বে না, তা কি গণেশ জানত? জানলে কি সে এড়িয়ে যেত? এই প্রশ্ন তাকে যখন

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি করেছিলেন, গণেশের উত্তর ছিল অসম্ভব।

আপনি যেভাবে অপমান করেছেন, দল কিন্তু মেনে নিচ্ছে না।

জনপ্রতিনিধির বৈঠকখানায় একান্তে, আমচা চামচা ছাড়া বেশ সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে আলোচনা। গণেশের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ করে এটা যে আসলে অন্যায় এবং এক্ষেত্রে  অপরাধ সেটা বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ছিল। দল যেহেতু ব্যাপারটা অনুমোদন করছে না, এরপর স্বভাব না  পালটালে রাস্তাঘাটে চড়চাপড়, কানচাপাটি  --- অনেক সৎ, সত্যনিষ্ঠ মানুষদলের অনুশাসন না  মেনে চলায় কী তার পরিণতি তার ফিরিস্তি।

এরপর আপনি ফেকলু হয়ে যাবেন। কেউ আর শ্রদ্ধা করবে না। আপনি টিকে আছেন, যেহেতু দল আপনার  পাশে আছে।

তারপর হঠাৎই কৌতূহল মেটাতে জনপ্রতিনিধির জিজ্ঞাসা,  এরকম করেন কেন? এ-তো পাগলামি?

আপনার সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো উচিত।

নপ্রতিনিধি অনেকক্ষণ একটানা। সে তো পাড়ার ছেলে, বয়সে অনেকটাই ছোট, সম্পর্কে টুবাইয়ের বাবা। এই টুবাইয়ের অন্নপ্রাশনে গণেশ তো কব্জি ডুবিয়ে খাসির মাংস, কাতলা, রসগোল্লা

হঠাৎই গণেশের বুকের ভিতরে একটা হিমশীতল স্পর্শ। চেয়ারে বসেই সে অনুভব করছিল তার  মাথা ঘুরছে। জনপ্রতিনিধির মুখটা কেমন আবছা। অস্পষ্ট। ক্ষীণ হতে হতে একটা ফুটকি, একটা ফোঁটা, একটা বিন্দু হয়ে সামনের দেওয়ালে নিবদ্ধ। তার মনে হচ্ছিল সে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সামনের দেওয়ালের  বিন্দুটা স্থির, অনড়। সেদিকে তাকানোর ক্ষমতা আছে না নেই, বোঝার ক্ষমতা তার রইল না।

তবু সে তাকিয়ে ছিল। বিন্দুটা বড়ো হচ্ছিল। একটা অবয়ব। মুখের। মুখটা গণেশের।আতঙ্কে সে কেঁপে উঠেছিল। নিজের মুখ! আজ সকালেও একবার পরিপাটি করে চুল আঁচড়ানোর সময়, তার আগে ছোট্ট কাঁচি দিয়ে গোঁফ ছাঁটার সময় বেশ কয়েকবার আয়নায় মুখ দেখেছিল।এটা তার প্রাত্যহিক শখ। অথচ সেই মুখশ্রী উধাও। দুই গাল বসে গিয়ে চোয়ালের সঙ্গে লেপটে গেছে। গোঁফ নেই, মাথার চুল পাতলা, চোখ দুটো ছোট হতে হতে মটর দানার মতো, নাক বাঁদিকে অস্বাভাবিক বাঁকা।

কী হল কিছু বলুন?  জনপ্রতিনিধি তাকে বলছে।

ভয় পাচ্ছেন?

গণেশের মনে হয়েছিল, অবাঞ্ছিত কেউ যেন তার গোপন ও ব্যক্তিগত জায়গায় ঢুকে পড়েছে। হাঁ

করে তার দিকে তাকিয়ে আছে।

সব তার হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। অন্য কেউ বেদখল করে নিতে চাইছে তার সমগ্র অস্তিত্ব। তার

বাড়ি ঘর, এক ফালি জমি, সবটুকু বেহাত হয়ে যাবে। তার ইউনিভার্সিটিতে পড়া দুই মেয়ের বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায়। অনেকদিন হয়ে গেল বৌয়ের হাঁটুতে ব্যথা। অপারেশন করাতে হবে, হাঁটু বদলের জন্য কয়েক  লাখ

সব হারানো, অসহায় সর্বস্বান্তের খড়কুটো আঁকড়ানোর অভিলাষে সে বলে ওঠে, তুমি চোখের সামনে যাকে দেখছ, সে-ই গণেশ। আর তোমার পিছনে, মানে আমার সামনের দেওয়ালের মুখটা, দেখতে আমার মতো  হলেও ওটা একটা ভাঁড়ের মুখ। ওই ভাঁড়টা আমাকে কিছু বলতে বলছে। তাই তোমাকে নয়, ওই ভাঙাচোরা বাঁকা বিকৃত মুখের ভাঁড়টাকে বলছি।

সে বলতে থাকে সঠিক কথা সঠিক সময়ে, সঠিক জায়গায় বলাকে এখন গালাগাল বলা হয়। সেই অর্থে আমি মাঝে মাঝেই গালাগালি করি। সেটা কিন্তু সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যমূলক। তোমার জানা উচিত আগের  শাসকদলের আমলেও আমার আচরণ ছিল একই রকম। কিন্তু ওই বেদে বস্তি আর ধাড়া পাড়ার হিসেবটা  ওদেরও ছিল।

আমি কোনদিন মানুষের মন জুগিয়ে কথা বলিনি। বলতে যে পারি না, তোমার থেকে ভালো কেউ জানে না।

লোক হাসানো আমার উদ্দেশ্য ছিল না কোনদিন,ক্ষতি যাতে না হয় তারই চেষ্টা করে গেছি এতদিন।

সে দেখতে পায়, দেওয়ালের গণেশের গালের চামড়ায় অসংখ্য ভাঁজ। কপালে হাসির রেখা।চোখের মটর দানায় কৌতুক নকশা। বাঁদিকের বাঁকা নাকটা সর্দিতে ভরভর করছে

মন দিয়ে ভালো করে শোন, আমি সত্যি কথা বলি। অন্যায় সহ্য করতে পারি না। কিন্তু ন্যায় অন্যায়ের  বোধ পালটে গেছে। সে কারণে মাঝে মাঝেই একটা শয়তান ভর করে আমার উপর।

এতদিন যা বলেছি সব সত্যি। শুধু টুবাইয়ের ব্যাপারটা মিথ্যে। কেন মিথ্যে? কারণ, আমার উচিত ছিল  ওকে টুকতে দেওয়া। শুধু তাই নয়, উচিত ছিল ওকে টুকতে সাহায্য করা। টুবাইয়ের ব্যপারটা মূর্খের প্রলাপ ভেবে নিলেই হবে। সে আমি টুবাইয়ের বাবাকে বুঝিয়ে বলব। আসলে আমি যে লোককে অপমান করি আর লোকে তা হজম করে, তার কারণ কী, তুমি অন্তত জানো। উদ্দেশ্য তো প্রতিবাদ। সমাজকে নিষ্কলুষ করার  জন্য প্রতিবাদ। মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিবাদ। আজ দল যদি আমার মাথা থেকে হাত তুলে নেয়, চারপাশের ছোটখাটো অন্যায়ের প্রতিবাদ কীভাবে হবে? দল পাশে না থাকলে আমার কথা কেউ শুনবে  না। হেনস্তা করবে। পাত্তাই দেবে না। এখনি পাগল বলে, এরপরে বলবে পাগলা, তার সঙ্গে জুড়ে দেবে একটা খিস্তি।

হ্যাঁ, বুঝতে পারছি, টুবাইয়ের ব্যাপারটায় আমার মাথায় শয়তান ভর করেছিল। তবে শয়তানটা ছোটখাটো। সেই জন্য অল্পের উপর দিয়ে গেল। টুবাইয়ের বাবাকে আমি বুঝিয়ে বলব।

আসলে শয়তানটা  ছোটখাটো। বড়োমাপের  হলে তো আমিও বড়মাপের কিছু একটা হতাম। বড়োমাপের শয়তানরা আরো ডেঞ্জারাস, তারা মন্ত্রীকে পর্যন্ত ছাড়ে না। এত সহজে তাদের বগলদাবা করা সম্ভব না। তারা সবাই বড়ো বড়ো  জায়গায় বাসা বাঁধে।

অনেকক্ষণ ধরে গনেশের মাথা চেয়ারের পিছনে এলানো। সিনিয়র মানুষটা শক পেয়ে মুষড়ে পড়েছে ভেবে  বেশ কয়েকটি জরুরি ফোন সেরে টুবাইয়ের বাবা ডাকল, গণেশদা!

কোন সাড়া ছিল না। একটা হাসি মুখ। মুখটা ঘাড় হেলিয়ে দেওয়ালের গণশার দিকে।

ডাক্তার এসেছিল।

ধুস, কিছু হয়নি। ঘুমিয়ে পড়েছে।

হাসতে হাসতে?

ডাক্তার হেসেছিল।

চোখ দেখেননি?

চোখ?

চোখে জল।

চোখের জল পরখ করার সময় টুবাইয়ের বাবার আঙুল ভিজে গিয়েছিল। আঙুল থেকে হাতের তালুচোখ থেকে এত জল! প্যান্টের ডান পকেটে রুমাল। ওদিকে ডান হাত ভিজে সপসপে হাত মোছার সংকট থেকে পরিত্রাণ পেতে এদিক ওদিক তাকানোর আগেই টুবাই তোয়ালেটা বাবার দিকে বাড়িয়ে দিয়েছিল

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন