![]() |
| সমকালীন ছোটগল্প |
৭১এর পা
গুলিটা ছকড়ি দাসের ডান পায়ের মালাইচাকির কেন্দ্রবিন্দুকে বিদ্ধ করে। এফোঁড় হলেও ওফোঁড় হয়নি। সেই থেকে গুলিটা দুই হাড়ের বন্ধনে বিষগোঁটার মত বন্দি হয়ে আছে। পা’টা ভাঁজ করতে পারে না ছকড়ি। চেষ্টা করতে তীব্র যন্ত্রণা বাধা দেয়। হাড়ের বন্ধন মচমচিয়ে ওঠে। যেন কেউ হাতুড়ি মেরে মেরে হাড় গুড়ো গুড়ো করে। পা’টা তার নিয়ন্ত্রণহীন জড় ঠেকো এক। উঠতে বসতে এক বেয়াড়া রকমের ফ্যাঁকড়া।
ভুট্টো সাহেবের যত জারিজুরি মাস
না ফুরোতেই শেষ। স্বাধীন বাংলাদেশ। হাতে হাতে স্টেনগান, মেশিনগান, পাইপগান, বন্দুক।
শূন্যে দুমদাম। বিজয় মিছিল। আনন্দ উৎসব। বাতাসে বারুদের গন্ধ। নদীতে ভেসে যায় লাশ।
গণ কবরে ঠাঁই হয়নি যাদের শিয়ালশকুনে ছিঁড়ে খায়। দ্রব্যমূল্য আকাশ ছোঁয়। প্রতিদিন
একটা দুটো ফরেন কান্ট্রির স্বীকৃতি জোটে। জয় বাংলা! জীবন বাঁচাতে, মাথার উপর ছাউনি
দিতে ঘটিবাটি, জমিজিরাত, সোনাদানা বেবাক মহাজনের গর্ভে যায়। বিদেশি সাহায্য শুকনো
বালিতে জলের ফোঁটা। তাও হাগুরেদের দোর পর্যন্ত পৌঁছয় না। তথাপি বুক বাঁধে জয়বাংলা।
মাথার উপর বঙ্গবন্ধু। কালো দিন সাদা হতে আর দেরি নেই। আশার আলোর আভাস বুকে উঁকি দেয়।
ছকড়ি দাসের তখন অন্য চিন্তা। গুলিটা
ওফোঁড় হলে সে বেঁচে যেত। ঘা শুকিয়ে কবে দিব্যি সুস্থ হয়ে উঠতে পারত। এফোঁড়ে দগদগে
পচা ঘা। খালি রস চুঁয়ায়। যেখানেই যায় হাঁটুর চারপাশে ভনভন মাছি। দুহাতে কাচিয়েও
রেহাই হয় না। বেখেয়ালি হলে ঘেঁয়ো কুকুর মুখ বাড়িয়ে গন্ধ শোঁকে। চেটে খেতে লোভের
জিভ বাড়াতে যায়। ছকড়ি তখনই জখম পায়ে ভর করে বাঁ পায়ে ক্যাঁৎ করে লাথি কষায়।
হালার কুত্তার বাচ্চা, আমারে একাত্তরের
লাশ পাইছস!
কুঁই কুঁই ডেকে ঘেঁয়োটা দুঠ্যাঙের
মাঝখানে লেজটা চালান করে অন্যত্র কেটে পড়ে।
ছকড়ির ঘর আছে সংসার নেই। কাছে
ডাকার কেউ নেই। যেন এই গোটা স্বাধীন বাংলাদেশে সে একা। সঙ্গি বলতে ওই মোক্ষম ঘা। দুর্গন্ধে
ধারেকাছে কেউ ঘেষে না। হাটের দিনে এখানে ওখানে কত তামাশা জমে। হাটুরেরা জমাট বেঁধে
মজা লোটে। ছকড়ির বড় সাধ হয় ওই দলে ভিড়ে বুকটা একটু হালকা করে। বেয়াক্কেলে কায়দায়
ভিড়ের দিকে এগিয়ে যায় ছকড়ি। আগেভাগে কেউ দেখে ফেলল তো হৈচৈ বাধায়।
এ্যাই, একাত্তরের পা, কাছে আইবি
না কিন্তু, কইয়া থুইলাম! হালার ঘায়ের গন্ধে টিকন যায় না। হালারে চাকা ম্যালা মাইরা
তাড়ান লাগে।
আরও কত কথার কষাঘাতে দুপায়ে গজাল
গেঁথে যায় ছকড়ির। দূরেই দাঁড়িয়ে থাকে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ঢিকিয়ে ঢিকিয়ে হেঁটে
দূরে কোথায় মিলিয়ে যায়। কোথায় আর যায়। নির্জন কীর্তিনাশার পাড়ে, কোনও মাঠের পাশে
কিংবা কোনও গাছের ছায়ায়। নিজেকে ধিক্কার দেয়, হায়রে আমার পাওখান, তুই আমার কপালে
আর কত ছিঃছিক্কার জুটাবি, ক! আর সে মাছি তাড়ায়। নাক নামিয়ে গন্ধ খোঁজে। কই বদ গন্ধ!
এ্যাই তো বুক ভইরা শ্বাস নিতাছি। এ্যাকটুও গন্ধ নাই! ঠিক যেন টলটলে বিশুদ্ধ বৃষ্টির
জলের গন্ধ। হালারা, আমার নামে মিছাই বদনাম দ্যাস্!
যুদ্ধ থামল। শীত পড়ল। হরিসভায়
বাৎসরিক ষোল রাত্রি অখন্ড হরিনাম সংকীর্তন লাগল। ছকড়ির মন নেচে উঠল। কীর্তন বড় ভালবাসে
ছকড়ি। অগতির গতি হরি, কৃষ্ণ ভজে ছকড়ি! শুদ্ধ বস্ত্র, গলায় মালা, চন্দনচর্চিত কপাল,
শুদ্ধ মন, ভক্তিভাবে উদ্বেলিত ছকড়ি। হরিসভায় অখণ্ড কাজ তার। ভক্তজনেরে চন্দনের ফোঁটা
পরানো, প্রণামী সংগ্রহ করা, কীর্তনের দলের ভালমন্দ দেখা, আলোর ব্যবস্থা ঠিক রাখা, চরণামৃত
বিতরণ, বাতাসা লোটা, সবেতেই ছকড়ি। হরিসভার মাথা ভজহরি ঘোষকে ছকড়ি বলে, আমি আইয়া
পড়ছি কত্তা। আপনের আর কোনও চিন্তা নাই। এ্যাই পাও লইয়াই দ্যাইখ্যেন ক্যামন সুন্দর
সবদিক সামলাই। মনে বড় খুশিভাব ছকড়ির।
ভজহরি ঘোষ বলে, এ্যাই পাও লইয়া
তুই না আইলেই ভাল করতিস ছকড়ি। তর ঘাও দিয়া যে পচা গন্ধ ছড়াইতাছে স্যাই উদ্দিশ পাস
না?
শুনে মনে বড় দাগা পায় ছকড়ি।
বলে, এ্যামন কইয়েন না কত্তা। এ্যাই ঘাওরে লোকে কত মান দেয়। কয়, একাত্তরের স্মৃতিচিহ্ন।
মুক্তিযুদ্ধের জ্যান্ত নমুনা!
অই হগল লোম্বার নমুনাটমুনা আমারে
দ্যাহাইস না। সাধে তরে সবাই আহাম্মক, গরু ছাগল কয়! এ্যাত্ত বড় এ্যাকটা যুদ্ধ গ্যাল
ঠাকুরের কিপায় গ্যারামের কাওর কোনও ক্ষতি হইল না, আর তুই এ্যাতগুলা মাইনষের বারণ না
শুইন্যা সংসার, পাও দুইটাই হারাইলি। পাকিস্তানি হানাদারগ গুল্লির ঘাও লইয়া এ্যাখন
একাত্তরের স্মৃতি ফুটাইতাছস! তর শরীলে যে বিষযন্তন্না হয় তার ভাগ কি কেউ নিব নাকি
নিতে পারব!
কথাটা মিথ্যা বলেনি ভজহরি ঘোষ।
মেনে নিয়েছিল ছকড়ি। এইসব স্মৃতিমিতি, নমুনা টমুনা, মানসম্মান, গর্ব অহংকারের কথা
তার মাথায় ঢোকায় ওই রশিদ ডাক্তার। নামের পাশে এমবিবিএস, ঢাকা, এফ আর সি এস, লন্ডন।
যুদ্ধ লাগে লাগে, রশিদ ডাক্তার পাড়ি দিলেন লন্ডনে। মেয়ের কাছে। বিবিসিতে স্বাধীন
রাষ্ট্র ঘোষণা শুনে পুলকিত হয়ে দেশে ফিরে এলেন। বিজয় মিছিলে পতাকা হাতে সবার আগে
হাঁটেন। লন্ডনে মেয়ের ফ্ল্যাটে ফায়ার প্লেসের পাশে বসে জন্মভূমির সাড়ে সাত কোটি
বীর সন্তানের মরণপণ লড়াইয়ের খবর শুনে উদ্বেলিত হতেন। আর আফসোস করে মেয়েকে বলতেন,
নাসরিন, যুদ্ধ সত্যই লাগব জানলে আমি কী আর এ্যাই দ্যাশে আসি! ভাই বেরাদাররা দ্যাশ স্বাধীন
করতে জান দিতাছে আর আমি হুদ্দাহুদ্দি এ্যাই দ্যাশে আটকা পইড়া আছি। নাসরিন আব্বুকে
সান্ত্বনা দিত, দুখ্য কইর না আব্বু।ডাক্তার মানুষ, দ্যাশে ফিইরা সাধারণ মাইনষের সেবা
করবা। তোমার সুনাম আছে। ইলেকশান জিইত্যা দ্যাশের কাজ করবা। মেয়ের কথা মনে ধরে ডাক্তারের।
দেশে ফিরে রাজনীতিটা জম্পেশ করে করার কথা ভাবেন। লেগে থাকলে মন্ত্রীত্বও জুটে যেতে
পারে। স্বাধীন দেশ! কীর্তিনাশার কোলে নিজের গ্রামদেশের কথা মনে পড়ে। ভোজেশ্বর, মশুরা,
পালং, নড়িয়া, আঙারিয়া,কোটাপাড়ার পথেঘাটে রক্তক্ষয়ী লড়াই। এই বুঝি, রেডিওতে তার
গ্রামের নাম বলে, টিভিতে ওই লড়াইয়ের দৃশ্য ফুটে ওঠে। চেনাজানা মুখ দেখতে পেলেন। হতাশ
হতেন। স্ত্রী জোহরা বেগম বলেন, নদীমাতৃক দ্যাশ, সব জায়গার খবর কি ন্যাওন যায়? স্ত্রীর
যুক্তি মেনে নেন রশিদ ডাক্তার। অবসরে বসে মনে মনে ছক কষেন, স্বাধীন দেশে ফিরে ক্ষমতাসীন
সরকারের একজন একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে কিছু মনকাড়া কাজকর্ম করে দেখাতে হবে তাকে। জায়গায়
জায়গায় যুদ্ধবিধ্বস্ত,অনাহারক্লিষ্ট দেশবাসীর জন্য লঙ্গরখানা খুলবেন। সেইসঙ্গে বর্ণাঢ্য
বিজয়মিছিল। এক খন্ড জমি কিনবেন। পাঁচ গ্রামের শহীদদের বেদী হবে সেখানে। বাইরে শ্বেতপাথরে
খোদাই করা থাকবে, ভুলি নাই,
শহীদ স্মৃতি বাগ,
স্বাধীনতা যুদ্ধ, ৭১
বাংলার ফুল ফলে ভরা থাকবে সে পবিত্র
ভূমি। বঙ্গবন্ধুকে দিয়ে উদ্বোধন করানোর চেষ্টার কসুর করবেন না।
দেশ স্বাধীন হল। হৃষ্টচিত্তে ফিরে
মন ক্লিষ্ট হতে বেশি সময় লাগল না রশিদ ডাক্তারের। যেন আকাশ থেকে নামলেন না, ধপাস্
করে মাটিতে পড়লেন! এত আশা আকাঙ্খার বেলুন মুহূর্তে দুমফটাস্। তবুও জনে জনে জিজ্ঞেস
করেন, কী কও, এত্ত বড় একটা যুদ্ধ গেল, পাঁচ গ্রামের কেউ একজন শহীদ হইল না!
কী কইরা হইব ডাক্তারসাহেব। পাকিস্তানি
হানাদাররা তো আমাগ এদিকে ঢোকলই না। ঢোকলে দুই একটারে কী আর মারত না! আল্লাহর সালামতে
আমাগ এদিকে যুদ্ধ নির্বিঘ্নেই কাটছে।
কেউ মুক্তিযুদ্ধেও নাম লেখায় নাই?
হ ডাক্তারসাহেব লেখাইছিল কয়জনে।
টেনিং নিয়া বন্দুকও পাইছিল। তাগ উপর দায়িত্ব ছিল নিজেগ এলাকা রক্ষা করনের। তা ডাক্তারসাহেব,
তাগ কান্ডকীত্তি শোনলে আপনেও হাসবেন। আপদবিপদের গন্ধ বাতাসের আগে দৌড়ায়। মাঝেমধ্যেই
রব ওঠে, পাকিস্তানি হানাদাররা জাহাজ বোঝাই হইয়া আইতাছে, নইড়া পয্যন্ত আইয়া পড়ছে।
আউজ্যাই এই এলাকায় আক্রমণ হইব। মানুষজন পরান বাঁচাইতে ভিটি ছাইড়া এখানে ওখানে লুকায়।
হের লগে মুক্তিবাহিনীর পোলাগুলাও লোং গুটাইয়া পলায়। বাঁশঝাড়ে বন্দুক লুকাইয়া রাইখা
পানাপুকুরে ডুব দেয়। মথুরা সেনের পোলা পরিমলরে তো আপনে চিনেন, সেও অই দলে নাম লিখাইছিল।
একদিন বাপের জোর ধমক খাইয়া সেই যে রাতারাতি বর্ডার পার হইয়া ইন্ডিয়ায় পলাইল আইজও ফিরল না। আর ফিরবও
না মনে লয়।
হতাশায় ভেঙ্গে পড়েন রশিদ ডাক্তার।
তাঁর এত সুন্দর সব প্ল্যান প্রোগ্রাম ওই লঙ্গরখানা আর বিজয় মিছিল পর্যন্ত এসে থমকে
থাকবে! একটাও শহীদের খোঁজ কি পাওয়া যাবে না! বঙ্গবন্ধু কি অধরাই থেকে যাবেন?
স্বাধীন দেশে প্রথম চেম্বার করতে
বসলেন রশিদ ডাক্তার। পচা পা বাগিয়ে ছকড়ি দাস হাজির। নাকে রুমাল চাপা দিয়ে ডাক্তারবাবু
গভীর নিরীক্ষা করে বললেন, এ যে দেখছি মারাত্মক ঘা!
হ ডাক্তারবাবু, গুল্লি খাইছি। গুল্লি
ভিতরেই আছে। কত্ত ডাগদারবদ্যি করলাম, ঘাও আর শুকায় না। কেউ কয়, গুল্লি বাইর না করন
পয্যন্ত ঘাও শুকাইব না। কেউ কয়, দামি দামি ইনজিকশান আর ওষুধ নিতে লাগব। টাকা দিতে
পারবা? আমার সংসার ঘটিবাটি ব্যাবাক গ্যাছে। এই পোড়াকপাইল্যা ঘাওখান ছাড়া আমার আর
কিস্যু নাই। আপনে আমারে এই যন্তন্না থিক্যা মুক্তি দ্যান।
বুক ঠেলে কান্না আসে ছকড়ির। তার
দুঃখে মাটি কেঁপে ওঠে। আর রশিদ ডাক্তার দেখেন আশার আলো। আনন্দে মন তাঁর নেচে ওঠে। চোখ
দুটো চকচক করে। যেন একজন শহীদের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। জিজ্ঞেস করেন, কিসের গুল্লি
এ্যাইটা?
একাত্তরের, ডাক্তারবাবু।
যুদ্ধের?
হ, ডাক্তারবাবু। হানাদাররা গুল্লি
করল আমারে। মইরাই যাইতাম। কপালজোরে বাঁইচ্যা গ্যাছি। দোষ আমারই। হুদাহুদি মাইনষে আমারে
বলদ কয়! এ্যাতগুলা মাইনষের মানা শোনলাম না। নতুন বউ, তার উপর পোয়াতি, বাপের বাড়ি
পইড়া আছে। মন মানল না। যামু মন করছি যখন যামুই! সেই কনকসার। যুদ্ধের মইধ্যে রিকশা
টিকশা ব্যাবাক বন্ধ। হাঁটাই লাগাইলাম।
পথ হাঁটে ছকড়ি দাস। মাথার উপর
গ্রীষ্মের টাটানো সূর্য। চারিদিক ফুটিফাটা। ফসলহীন ধু ধু উলঙ্গ প্রান্তর। বাতাসে বারুদের
গন্ধ। প্রশ্বাসে বিষক্রিয়া। মানুষজন চোখে পড়ে না। পশুপাখিরও সাড়াশব্দ নেই। ওরাও
বুঝে গেছে যুদ্ধ চলছে। সোনার বাংলা শ্মশান দেখে ছকড়ি দাস। মনে কু ডাকে, শ্বশুরবাড়ি
গিয়ে কী দেখবে সে। হানাদারদের গুলিতে হয়ত সবাই শেষ হয়ে গেছে। কিংবা আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।
কে কোথায় পালিয়ে বেঁচেছে। মনটা হু হু করে ওঠে ছকড়ির। তীব্র ভয় আর আশঙ্কা গ্রাস করতে
থাকে তাকে। অনেক দূরে কারা যেন পোকা হেঁটে যাওয়ার মত আরও দূরে মিলিয়ে যেতে থাকে।
ছকড়ির মন চায় জানতে, কারা ওরা? হাঁক দিয়ে ডাকে, তোমরা কে গো! বলে, হুইন্যা যাও,
এ্যাত্ত বড় দ্যাশে আমার বড় এ্যাকা লাগে! উত্তর পায় না ছকড়ি। তার সব কথা বাতাসেই মিলিয়ে
যায়। কখন শ্বশুরবাড়ির পাশের গ্রামে এসে পড়ে সে। আর সামান্য পথ। মনটা খানিক হালকা
বোধ করে। তখনই গুম্ গুম্ পায়ের শব্দ
পেয়ে হতভম্ব ছকড়ি দেখে, ধুলো উড়িয়ে বিকট দর্শন কটা মূর্তি সামনে এগিয়ে আসছে। পরনে জংলি পোশাক, মাথায় লোহার
টুপি, হাতে হাতে আগ্নেয়াস্ত্র। ছকড়ি ভাবে, এ্যারা কারা! মুক্তিবাহিনি ,না পাকিস্তানি
হানাদার ? এদের কাউকেই সে এখন পর্যন্ত দেখেনি। ভয়ঙ্কর আগ্রাসী হয়ে আরও কাছে আসতে
থাকে ওরা। ছকড়ি ওদের নিশ্চিত মুক্তিবাহিনিই মনে করে। এবং একসময় হঠাৎই প্রবল উৎসাহে
ওদের উদ্দেশ্যে জয় বাংলা ধ্বনি দিয়ে ওঠে।মুহুর্তে বাতাসে গুড়ুম গুড়ুম গুলির শব্দ।
আর ওদের বিভৎস চিৎকার। ছকড়ি বুঝে ফেলে, ওরা শত্রুপক্ষ! তার জয় বাংলা ধ্বনি ওদের বুকে
ক্রোধের আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। মুহুর্তের মধ্যে ছকড়ি ঘুরে দাঁড়ায়। সে দেখে, তার সামনে
অগুনতি পালানোর পথ। কিন্তু সে কোনদিকে পালায়! আদিগন্ত খোলা মাঠে নেমে পড়ে ছকড়ি।
দিকদিশাহীন, এলোপাতাড়ি দৌড়তে থাকে সে।কোনও দিকেই বেশিদূর এগোতে পারে না। যেন এক গোলক
ধাঁধাঁয় পড়ে দিশেহারা সে। পিছনে অবধারিত মৃত্যু!
হল্ট, নেহি তো গোলি মার দুঙ্গা!
ওদের বজ্রনির্ঘোষ হুকুম শুনে ছকড়ির দু পা পাথরভার হয়ে ওঠে। সে জানে না কী করে আত্মসমর্পণ
করতে হয়।খোলা মাঠে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে পড়ে। আর আতঙ্কে কুলকুল করে ঘামতে থাকে। মৃত্যুর মুখোমুখি ছকড়ি। এই দেহে প্রাণবায়ুটুকু
আর কতটুকু সময়ের জন্য!ওরা ছকড়িকে ধরে এনে রাস্তার পাশের একটা মাদার গাছের সঙ্গে ওরই
গামছা দিয়ে পিঠমোড়া করে বাঁধে। বুকের উপর বন্দুক উঁচিয়ে বলে, শালে, জয় বাংলা! বোল,
জয় পাকিস্তান! বলেগা কী নেহি?
জয় পাকিস্তান! বলে ছকড়ি। বাঁচার
জন্য কাকুতি মিনতি করে, আমারে ছাইড়্যা দ্যান সাহেব, ব্যাবাকে কয়, আমিও না বুইঝ্যা
কইয়া ফ্যালাইছি!দ্যাহেন, আমি হিন্দু, এ্যাই দ্যাহেন, ধুতি পরছি! এ্যাই দ্যাশ আমাগ
না। ইন্ডিয়া আমাগ দ্যাশ! আর এ্যাই দ্যাশ আপনাগ। অইসব মুক্তিবাহিনি, যুদ্ধটুদ্ধর মইধ্যে
আমরা নাই। আমারে ছাইড়্যা দ্যান সাহেব, ঘরে আমার পোয়াতি বউ। আপনাগ পায়ে পড়ি।
ওরা ছকড়ির ভাষা বোঝে না। কাকুতি
মিনতিকে পাত্তা দেয় না। ওকে নিয়ে নিজেদের মধ্যে রঙ্গতামাশা করে। উচ্চস্বরে হা হা,
হো হো হাসে। ছকড়ির বুক কেঁপে কেঁপে ওঠে। তেত্রিশ কোটি দেবতাকে ডাকে। বুকের ভেতরটা
শুকিয়ে ওঠে।
সাহেব, তিষ্ঠা পাইছে। এ্যাক্টু
জল দ্যান!
তিষ্ঠা তিষ্ঠা, হা হা হা, মতলব
তুঝে তিয়াস লাগা, না?
হ, সাহেব।
তুঝে তো মরনাই হোগা, তব তিয়াস
মিটানে সে কেয়া ফয়দা! উসসে পহলে গোলি সে মার দুঙ্গা তুঝে!
ছকড়ি বোঝে, মৃত্যু তার সামনে।
কাকুতি মিনতিতে কাজ হবে না।তাহলে দেশের জন্য লড়াই করেই মরি। তার মাথার ভেতর রক্ত চড়ে। বুকে দেশপ্রেম জাগে।
হুঙ্কার দিয়ে ওঠে ছকড়ি, আমার
বান্ধন এ্যাকবার খুইল্যা দে কুত্তার বাছ্ছারা, তগ ব্যাবাকগুলারে দ্যাহাইয়া দ্যাই...,
জয় বাংলা..., জয় বঙ্গবন্ধু..., জয় মুক্তিযুদ্ধ...। সেইসঙ্গে ওদের প্রতি অশ্রাব্য
সব গালাগালি দিতে দিতে মুখে ফ্যানা তুলে ফেলে। নিজেকে মুক্ত করতে আক্রোশে শরীরে মোচড়
দেয়। রোগে ভোগা দুর্বল শরীর। ধ্বস্ত হয়ে পড়তে বেশিক্ষণ লাগে না। ওরা বন্দুক উঁচিয়ে
অজস্র হায়নার হাসি হাসে। ছকড়ি তার ডান পা উঁচিয়ে স্পর্ধিত ঘোষণা ছাড়ে, শুয়ারের
বাছ্ছারা, তগ অই মুখে আমি লাথ্থি মারি!
গুড়ুম! বাতাস ঝলসে গুলিটা তার
শরীরের কোথায় যে লাগল হতভম্ব ছকড়ি যেন বুঝতে পারে না। মৃতবৎ দাঁড়িয়ে থাকে।
চুহাটা মরে গেছে মনে করে ওরা সামনে
এগিয়ে চলে। কতক্ষণ অজ্ঞান হয়ে ছিল, কে তার বাঁধন খুলে দিল, জানে না ছকড়ি। জ্ঞান
ফিরতে দেখে তার ডান পাটা আর চলে না, অসহ্য যন্ত্রণা। ঘাসে চাপ চাপ শুকনো রক্ত। না,
সে বেঁচে আছে! কোনও রকমে শ্বশুরবাড়ি পৌঁছয়। সব শ্মশান। এখানে ওখানে ছড়িয়ে মৃতদেহ।
বউয়ের লাশ জড়িয়ে ধরে হাপুস নয়নে কাঁদে ছকড়ি। সে কান্না আর কেউ শুনল না।
ঘটনা শুনে একরকম লাফ দিয়ে ওঠেন
রশিদ ডাক্তার। বলেন, এত্তবড় এ্যাকটা কম্ম করার পরেও যারা তরে বলদ কয় তারা নিজেরাই
জাত বলদ।
না না, ডাক্তারবাবু, অরা ঠিকই কয়,
এত্তবড় এ্যাকটা যুদ্ধ গেল, এ্যাকমাত্র আমার ছাড়া পাঁচ গ্রামের কার কোন ক্ষতিটা হইছে,
কন!
এ্যাইবার আমিই তরে বলদ কমু। এ্যারে
তুই ক্ষতি কস্! পাঁচ গ্রামের আর কে তর মত বুক ফুলাইয়া হানাদারগ লাথ্থি দ্যাখাইতে পারছে! সুমখে খাড়াইয়া
জয় বাংলা, জয় মুক্তিযুদ্ধ, জয় বঙ্গবন্ধু ধ্বনি দিতে পারছে! তর এ্যাই ঘাও একাত্তরের
স্মৃতি, মুক্তিযুদ্ধের নিশান। তুই আমাগ গর্ব। তুই মরলে রাষ্ট্রের উচিৎ তর এ্যাই পাওখান
সোনা দিয়া বান্দাইয়া মিউজিয়ামে রাখা! যদিও রশিদ ডাক্তার মনে মনে ভাবেন, গুলিটা ছকড়ির
বুকে লাগল না ক্যান! একজন শহীদ তো পাইতাম। অরে নিয়াই আমার, ভুলি নাই, শহীদ স্মৃতি
বাগ হইত।
রশিদ ডাক্তারের কথায় গর্বে বুক
ফুলে ওঠে ছকড়ির। ছয়ছোট্ট প্যাকাটি চেহারার মানুষটা যেন আকাশছুঁই লম্বা হয়ে ওঠে।
বলে, কী কন্ ডাক্তারবাবু, আমি এ্যাত্তবড় এ্যাকখান কাম কইরা ফালাইছি!
আলবাৎ করছস্। আর কেউ তরে বলদবুলদ
কইলে আমার কথাগুলান কইবি তারে। তর এ্যাই পাওখানে তারে কদমবুসি করাইয়া ছাড়ুম।
এ্যাই আপনে ঠিক বুদ্ধি করছেন। আমারে
তাইলে এ্যাকটু ওষুধ দ্যান। আর অপারিশনটা যাতে হয় তার এ্যাকটু ব্যবস্থা করেন। আপনে
লিইখ্যা দেন, এ্যাইটা একাত্তরের হানাদারগ গুলির জখম তাইলে আশাকরি সরকার থিইক্যা বিনা
পয়সায় চিকিৎসা হইব।
ছকড়ির হাউস শুনে রশিদ ডাক্তার
প্রমাদ গোনেন। মনে মনে বলেন, তুই বাঁইচ্যা থাকলে আমার কী লাভ। যত তাড়াতাড়ি এ্যাই দুনিয়াদারি
ঘুচাইয়া দিয়া উপরে যাইতে পারস ততই আমার ভাল। তুই মরলে দ্যাশের বড় বড় কাগজে খবরটা
দিমু, বীর স্বাধীনতা যোদ্ধার ইন্তেকাল। শোকমিছিল, স্মরণসভা করুম। ভুলি নাই, ছকড়ি দাস
বাগ করুম।
রশিদ ডাক্তার কিছু সস্তার ফ্রিস্যাম্পেল
ট্যাবলেট আর লিকুইড ছকড়ির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, এ্যাইটা এ্যাকটা কইরা দিনে তিনবার
খাবি আর এ্যাইটা তুলা দিয়া তিনবার লাগাবি।আর অপারিশনটার কী করতে পারি দ্যাখি।নাক থেকে
রুমাল নামান তিনি।
রশিদ ডাক্তার ভাল করেই জানেন, গুলিটা
যতদিন শরীরে থাকবে ততদিন এই ঘা শুকাবার নয়।
ঘাটা এখন তার রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা লাভের সোপান। আর ছকড়ির মৃত্যু তাকে চাঁদ ধরাবে।
তিনি আশায় বুক বাঁধেন, দিন গোনেন।
লোকে এখন আর ছকড়িকে বলদ, গাধা
ডাকে না। কেউ ডাকে, একাত্তরের স্মৃতি।কেউ ডাকে, মুক্তিযোদ্ধা। বেশিরভাগ লোকই ডাকে,
একাত্তরের পা বলে। গর্বিত ছকড়ি পাটা বাগিয়ে বুক ফুলিয়ে বাজারের মধ্যে দিয়ে হাঁটে।
দুর্গন্ধে লোকজন সরে গিয়ে পথ করে দেয়। তাতে করে ছকড়ি যেন আরও বেশি করে মহিমান্বিত
হয়।
ঘটনা আজ পেরোলে কাল স্মৃতি। যেকোনও
উন্মাদনা সময়ের সঙ্গে থিতিয়ে আসে। স্বাধীনতা লাভের উন্মাদনাও ফুরিয়ে এল একসময়।
এদিকে ছকড়ির পাটা একেবারে গেছে। রসিয়ে উঠে লাউয়ের মত ঢোল।ঘা ছড়িয়ে উই ঢিবি। রশিদ
ডাক্তারের দেওয়া এত ওষুধেও কাজ হয় না। তিনি অপারেশনটার জন্য উপর মহলের সঙ্গে চিঠি
চাপাটি করেই যাচ্ছেন। ছকড়িকে বলেন, আর দেরি নাই। বোঝসই তো, সরকারি নিয়মকানুনের কত
প্যাঁচপুরাণ, লালদড়ির গিঁড়া খোলানো বড় মুসিবতের কাম।
এদিকে যে আমার পাওখান পইচ্যাগইল্যা
হাড্ডি বাইর হওনের জোগাড় হইছে। যন্তনায় ঘুমাইতে পারি না। সারা রাইত খালি টাটায় আর
থাইক্যা থাইক্যা জিলিক মারে।
রশিদ ডাক্তার ধমক দিয়ে ওঠেন, খবরদার
ছকড়ি, অই পাওরে তুই ফের যদি পচাগলা কস্! জাইন্যা রাখ, মরা হাতির দাম লাখ টাকা। যন্তনায়
ঘুম আসে না তো বড়ি দিতাছি।রাত্রে খাইয়া শুবি।সামনের ইলেকশনে চ্যায়ারম্যানের পোস্টে
দাঁড়াইতাছি। তরে দিয়া আমার অনেক কাম। আল্লাহর রহমতে জিতুম আশা করি। ইনশাল্লাহ! তখন
তর এ্যাই অপারিশন কে ঠ্যাকায়!
গুলি খেয়ে কাজের ক্ষমতা হারায়
ছকড়ি। একটা যুদ্ধ তার ভেতর বার ধ্বসিয়ে দেয়। বড় খাটুনির কাজ ছিল তার। দই, ক্ষীরের
চাকন মাথায় করে লঞ্চে তুলে দেওয়া। লঞ্চ বোঝাই হয়ে সেসব ঢাকায় যায়। এমন কাজে একজোড়া
শক্তপোক্ত পায়ের খুব দরকার। সেই পাই তার অকেজো হয়ে গেল। গুলির ঘা থেকে গন্ধ ছড়ায়।
অন্য কোনও কাজ জোটে না। আত্মীয়স্বজন, পাড়াপড়শি কদিন আর দেখবে। সবারই টানাপোড়েনের
সংসার। দোকানে দোকানে হাত পাতে। হাটের দিনে সামনে গামছা বিছিয়ে একাত্তরের পাটা বাগিয়ে
নিয়ে বসে। থেকে থেকে বলে, একাত্তরের যুদ্ধে হানাদারগ বিরুদ্ধে লড়তে গিয়া আমার পাওখানের
এ্যাই দশা! আপনারা এ্যাখন স্বাধীন দ্যাশের মানুষ। এ্যাই মুক্তিযোদ্ধারে দয়া করেন।
হোটেলের বাসি খাবার, বাসি পাউরুটি
বিস্কুট জোটে ছকড়ির। একসময় স্নান করায় অনীহা আসে তার। চুলদাড়ি কাটে না, শরীরে নোংরা
জমে। নিজের ভিটি ভুলে যায়। এই বাজারই ঘরসংসার হয়ে ওঠে তার।দর্জিপট্টির যত ফেলনা টুকরোটাকরা
কাপড় পরনের ধুতিপাঞ্জাবির সঙ্গে সেলাই করে নেয়। সময়ের সঙ্গে বিচিত্র রঙে ভরে ওঠে,
একাত্তরের পা। রঙিন টুকরোর উপর টুকরো চড়ায় হারিয়ে গেল তার আসল পোশাক। গোদা পা আর
বিচিত্র পোশাকে কিম্ভূত দেখায়।
দাসপাড়া দিন দিন খালি হতে থাকে।
এক ঘর দুই ঘর করে ইন্ডিয়ায় পাড়ি দেয়। যুদ্ধের সময় যারা ইন্ডিয়ায় আশ্রয় নেয়
তারা আর ফেরেনি। এত বড় পাড়ায় এখন শ্মশানশূণ্যতা। ছকড়ি কার মুখে শোনে, অনঙ্গ দাস
ইন্ডিয়া চলে যাবে। বাজার থেকে দাসপাড়ায় ছুটে আসে সে। কথাবার্তা, আচার আচরণে অসংলগ্ন।
অনঙ্গ দাসের উদ্দেশ্যে বলে, জ্যাঠা, আমি যাম, আমি যাম আপনাগ লগে।
একই কথা বার বার বলে ছকড়ি। থামে
আর না। সে দূর সম্পর্কে অনঙ্গ দাসের ভাইবেটা। ছোটবেলা বাপ মা হারালে অনঙ্গ দাস তাকে
পালপোষ করে বড় করে।
অনঙ্গ দাসের বউ বলে, তুই অই দ্যাশে
গিয়া কী করবি বাবা? তুই মুক্তিযোদ্ধা, একাত্তরের পা বইল্যা এ্যাখানে তরে লোকে কত্ত
মান দেয়, খাইয়াপইরাও আছস এ্যাকরকম। অই দ্যাশে তর এ্যাই পাওয়ের কী দাম পাবি? না খাইয়া
মরতে লাগব।
আমি যাম। আমি যাম। বলেই চলে ছকড়ি।
যাবি যাবি। যেদিন রওনা দিম সেদিন
তো যাবি! অখনই যাম যাম কইরা মাথা গরম করতাছস ক্যান? অনঙ্গ দাস বোঝায়।
প্রতিদিন লঞ্চঘাটে গিয়ে বসে থাকে
ছকড়ি। জ্যাঠার সঙ্গে সে ইন্ডিয়ায় যাবেই। আর যেদিন অনঙ্গ দাস পরিবার নিয়ে চলে যাচ্ছে,
দূর থেকে দেখতে পেয়ে আগে ভাগে লঞ্চে চড়ে বসে ছকড়ি। দুর্গন্ধে সব যাত্রীরা হৈচৈ বাধিয়ে
দেয়। এক্ষুণি নামাও অরে! অনেক চেষ্টা করেও কিছু হওয়ার নয়। রশিদ ডাক্তার খবর পেয়ে
দুটো ষন্ডা চেহারার ছেলে পাঠালেন। বলেন, একাত্তরের পাওরে জোর কইরা ধইরা লইয়া আইবি।
সামনে ইলিকশন, অরে দিয়া আমার অনেক কাম!
ছকড়ির আর ইন্ডিয়া যাওয়া হল না।
চেয়ারম্যান পোস্টে দাঁড়িয়েছেন রশিদ ডাক্তার। মিটিং, মিছিল সমাবেশ তাঁর লেগেই আছে।
সঙ্গে ছকড়ি দাস। রশিদ ডাক্তার ছকড়ির কুৎসিত রঙদার পোশাকটা খুলিয়ে নতুন ধুতি, পাঞ্জাবি পরান। কম্পাউন্ডারকে দিয়ে পচাগলা
ঘাটাকে খুব ভাল করে ব্যান্ডেজ করিয়ে তার উপর বিলাতি সেন্ট ছড়িয়ে দেন। তাকে স্টেজে
তুলে পাশে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করেন, ছকড়ি দাস আমাগ পাঁচ গ্রামের গর্ব। সে বীর মুক্তিযোদ্ধা।
ওই বর্বর হানাদারগ বিরুদ্ধে লড়াই দিছে। অগ মুখের উপর এ্যাই পাও তুইল্যা লাত্থি দ্যাখাইবার সাহস দ্যাখাইছে। সেইসঙ্গে জয় বাংলা,
জয় মুক্তিযুদ্ধ, জয় বঙ্গবন্ধু আওয়াজ তোলছে। এ্যাই পাও আমাগ জাতীর গর্ব। এ্যাই রক্তে
আমাগ স্বাধীনতা।
মালা পায় ছকড়ি দাস। সে জোড়হাত
হয়ে পলকা ঠেকোর মত দাঁড়িয়ে। তার কানে অজস্র জয়ধ্বনি বর্শার ফলার মত বিঁধতে থাকে।
হৃদয়ে পশে না কিছুই। সেখানে শুধুই চাপ চাপ অন্ধকার।
ইলেকশনে বিপুল ভোটে জিতলেন রশিদ
ডাক্তার। নতুন পোশাক পরে, ব্যান্ডেজ পরা পাটা বাগিয়ে, দলের পতাকা হাতে বিজয় মিছিলের
সবার আগে ছকড়ি দাস। বড় করে খানা দিলেন রশিদ ডাক্তার। তাঁর বাগানবাড়ির দূরতম প্রান্তে
ছকড়ির জন্য একার খাওয়ার ব্যবস্থা। ভাল ভাল খাবার গোগ্রাসে গেলে ছকড়ি। পরিবেশন করে
যে সে ভুল করে ছকড়িকে গোমাংস দিয়ে দেয়। হুশবোধ শূন্য ছকড়ি গবগবিয়ে গেলে। পরিবেশনকারী
তার ভুল রশিদ ডাক্তারকে বলতে ডাক্তার হো হো হেসে বলেন, কিচ্ছু ভুল করস নাই তুই! অয়
মুক্তিযোদ্ধা, অর আবার হিন্দু মুসলমান কী! এ্যাগ কোনও জাত হয় না!
পরদিন রশিদ ডাক্তারের চেম্বারে
এল ছকড়ি। সে শুধু বলে, আমার পাওখান... পাওখান...
অনেকদিন পর ভাল করে পরীক্ষা করে
নাক থেকে রুমাল নামিয়ে রশিদ ডাক্তার বললেন, ইস্, এ্যা যে গ্যাংগ্রিন হইয়া গ্যাছে।
এরপর সারা দ্যাহে পচন ধরব। ইমিডিয়েট গোড়া থিক্যা কাইট্টা বাদ দ্যায়ন লাগব।
কুড়াল দিয়া কোপাইয়া বাদ দিয়া
দ্যান... বাদ দিয়া দ্যান, বলতে বলতে আপন খেয়ালে চেম্বার থেকে বেরিয়ে যায় ছকড়ি।
সে এখন নতুন পোশাকে ছিট কাপড়ের টুকরো জুড়ে জুড়ে নতুন একটা রঙিন পোশাক তৈরির চেষ্টায়
আছে। তার গ্যাংগ্রিনের পচন যত বাড়ে সে তত পাগল হয়ে ওঠে। শরীর মিইয়ে ওঠে। ধুঁকতে
ধুঁকতে চলাফেরা করে। খাওয়া দাওয়ায় রুচি নেই, পৃথিবীর সব টান থেকে উদাস।ভাষাহীন ঘোলাটে
দুচোখ। থেকে থেকে শুধু চিৎকার করে বলে, হালার স্মিতিমিতি, নিশানমিশান, গ্যাংগ্রিন...,
গ্যাংগ্রিন...!
লোকে বলে, একাত্তরের পাওয়ের আর
বেশিদিন নাই!
সেবছর শীত নামে অসহ্য কঠিন হয়ে।
তীব্রতম শীতের রাতভোরে কীর্তিনাশার পাড়ে মরে কাঠ হয়ে পড়ে থাকে, একাত্তরের পা!
নদী তখনও বয়ে যায়। দেহটা ঘিরে
হীমবাতাস খেলা করে। কাক পৃথিবীর বুকে নতুন দিন ঘোষণা করে। এই মৃত্যু নিয়ে মিটিং ডাকেন
রশিদ ডাক্তার। শোকমিছিল, শোকসভা হয়।
না হিন্দু না মুসলিম মতে কীর্তিনাশার
পাড়ের গভীরে শুয়ে থাকে বীর মুক্তিযোদ্ধা ছকড়ি দাস। দিন যায়, ভরা কোটালের খান্ডব
গ্রাস পাড়ের মাটি খায়। বেরিয়ে পড়ে লাশ। গুলিবিদ্ধ পাটা উঁচিয়ে চিরঘুমে, একাত্তরের
পা!
দেখে হতভম্ব হন রশিদ ডাক্তার।তিনি
শুধু ভাবেন, অই লাথ্থি ছকড়ি কারে দ্যাখায়!

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন