কিস্সা নৌসা কা
জুল্মৎকদে
মেঁ মেরে শব-এ-গম্ কা জোশ হ্যায়
ইক
শম্মা হ্যায় দলীল-এ-সহর সো খামোশ হ্যায়
আমার
আঁধার দিন ঘিরে, বিরহ-রাতের উপস্থিতি
একটি
প্রদীপ টলোমলো, তাও নিভে গেছে সম্প্রতি
বন্ধু,
চাঁদনিচৌক মেট্রো স্টেশনের বাইরে এসে, রাস্তা পেরিয়ে এপারে এসো। নতুন রাস্তার কাজ এখনও
শেষ হয়নি। সামান্য অসুবিধা হবে হয়তো! উপেক্ষা কোরো। ঈশ্বর সন্নিধানে যেতে হলে ফুল নয়,
কাঁটার ওপর দিয়ে হাঁটতে হয়। লালকেল্লাকে পেছনে রেখে, নানান রঙের পোশাক ঝুলতে থাকা কাপড়ের
দোকান দেখতে দেখতে নতুন রাস্তা বরাবর সোজা হেঁটে খারিবাওলি’র দিকে এগোতে থেকো। প্রায়
কিলোমিটার খানেক হাঁটার পর হঠাৎই পেয়ে যাবে বল্লীমারান। হে দর্শনার্থী, এবার বাঁ’দিকে
ফেরো। রঙের ঝলকানি একই থাকবে, শুধু উপকরণ যাবে বদলে। কাপড়ের যায়গায় এবার থাকবে জুতো’র
প্রদর্শনী। নানান রঙের, নানান ধরণের। এখানেই থেমো না বন্ধু। আস্তে আস্তে ঐ বাঁ-হাত
ধরেই এগিয়ে এসো। এক অত্যন্ত সুস্বাদু গন্ধ ভেসে আসবে বাতাসে। ছোটুমিঞা চাঁপ রাঁধছে।
একটু একটু করে যখন সন্ধ্যে নামবে, একজন দুজন করে নানান মানুষ জড় হবেন তার স্বাদ নিতে।
শুরু হবে নানান আলোচনা, জমে উঠবে আসর। না, তুমি এখানেও দাঁড়িও না। আরও কয়েক-পা হাঁটার
পর ডান হাতে ঐ যে রাস্তাটা এঁকেবেঁকে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে, ওর নাম গলীকাসিমজান। হে
আমার পথিক বন্ধু, সে পথ ধরে এঁকেবেঁকে তুমিও এগোতে থেকো। বাঁ-দিকে কয়েকটা দোকানের পর
প্রায় দৃষ্টিঅন্তরালে যে একটা বড় প্রবেশদ্বার দেখা যাচ্ছে, সেখানে দাঁড়াও। এখানেই একদিন
ঈশ্বর বাস করতেন। এই সেই মন্দির, যার জন্যে এতটা পথ আসা। ‘হাবেলি’, ২৪৬৯ বিরাদরি, গলীকাসিমজান,
বল্লীমারান, পুরানী দিল্লী – ১১০ ০০২। মালিক – মির্জা অসদুল্লাহ্ খাঁ গালিব। এবার
প্রণাম করার সময় হয়েছে বন্ধু। তিনি অবশ্যই সে সম্মানের অধিকারী। আর যদি তুমি শব্দ গেঁথে
তোড়া বানাবার কারিগর হয়ে থাক, তাহলে অর্চনা করে ভিক্ষা চেয়ে নাও। তা তোমার প্রয়োজন।
এবার তোমার ডানদিকে যে বন্ধ দরজাটা দেখছ, তা এখনই খোলার চেষ্টা কোরো না। বরং সে দরজায়
আলতো করে কান পাত, শোনার চেষ্টা কর। ভেতরে ঈশ্বর হয়তো নিজের এক টুকরো জীবন বৃত্তান্ত
পরিবেষণ করবেন। ফেলে আসা সুদূর অতীতকথার গজল শোনাবেন। ঐ কি কেউ গম্ভীর গলায় নিজের দৈনসার
কলকাতা বাসের মধ্যেও লুকিয়ে থাকা সুখস্মৃতি গেয়ে উঠলেন –
কলকত্তে
কা যো জিক্র কিয়া তুমনে হমনশীঁ
এক
তীর মেরে সিনে মেঁ মারা কে হায় হায়
ও
সব্জজার হায়, মতর্রা কে হ্যায় গজব
ও
নাজনীন বতাঁ-এ-খুদ-আরা কে হায় হায়
সর
অজমা ও উনকী নিগাহ্ হ্যায় কী হফ্ নজর
তক্তরুবা
ও উন্কা ইশারা কে হায় হায়।
যেই
না বলেছ কলকাতা কথা হে আমার প্রিয়তম
এ’ফোঁড়
ও’ফোঁড় করেছে হৃদয় তীর এক হায় হায়
সে
হরিৎ রূপ, শ্যামলী মধুর, দেখি নাই দেখি নাই
ঝলমেল
ঐ রমণী রতন কোথা আর হায় হায়
সবুর
কর হে, কি ধারালো তার দিঠি কটাক্ষ সেই
তার
ইশারার তীর বিঁধে আছে এ হৃদয়ে হায় হায়।
জানি
না আজ কতদিন হোল মির্জা দিল্লী ছেড়ে কলকাতা এসেছেন। প্রায় বছরখানেকের এই সফরে কত শহর, কত গ্রাম, কত
পথ, কত নদ, নদী, কানন, বীথী, পেরিয়ে তবে এই স্বপ্নের শহর কলকাতা পৌঁছানো! লোহারু, ফিরোজপুর,
ঝির্কা, কানপুর, লক্ষ্ণৌ, বাঁদা, এলাহাবাদ, বারানসী, মুর্শিদাবাদ হয়ে তবে কলকাতা পৌঁছনো। সন্দেহ নেই, বিপজ্জনক এবং প্রাণান্তকর সফর। এমনও নয় যে এই সমস্ত যায়গায় তিনি সবসময় যথেষ্ট সম্মান
পেয়েছেন! কোথাও কোথাও অসম্মানও সহ্য করতে হয়েছে বৈকি। কতবার কতজন দিল্লী ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে,
কিন্তু মির্জা নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থেকেছেন।
দৃঢ়চিত্তে এগিয়ে গিয়েছেন নিজের গন্তব্যের দিকে। শেষমেশ ১৮২৮ সালের এক আসন্ন বসন্তের ভরা দ্বিপ্রহরে
পা রাখলেন কলকাতার পথে।
ইদানীং
কলকাতায় আর সেভাবে বসন্তকে অনুভব করা যায় না।
রাস্তার দুধারে ফুলে-ফুলে ঝলমল করতে থাকা গাছগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। সেদিন এ শহরটা প্রাকৃতিকভাবে এমন দীন ছিল না। আস্তে আস্তে শীত তার ডানা গুটিয়ে নিচ্ছিল, দখীনা
বাতাস তার মিঠে আমেজে একটু একটু করে ভরিয়ে তুলছিল মানুষের মন। ঝরে যাওয়া হলুদ পাতাদের বদলে গাছে গাছে কিশলয়ের
দোল। নববধূর ঘোমটা তোলার মত করে অত্যন্ত সন্তর্পণে
কুঁড়িগুলো দল মেলছিল। চারদিকে সে যে কী এক
অপূর্ব শান্তি! বুকভরে শ্বাস নিলেন মির্জা।
হয়তো মনে মনে বলেও ফেললেন – ‘দিল্লীতে কোথায় এ সৌন্দর্য’!
তারপর
নানান চাপানউতোর, নানান টানাপোড়েন। না, কলকাতা
তাঁকে কোনোভাবেই তাঁর প্রাপ্য সম্মান দিতে পারেনি। না মুসায়রায়, না কাছারিতে। গজলের আসরে তাঁর ফার্সি জ্ঞান নিয়ে সমালোচনা করা
হোল, আর স্যার জন ম্যালকম’এর দরবার তাঁর সঠিক পেনশনের আবেদন সরাসরি খারিজ করে দিল। ফার্সি শিক্ষায় গভীর শিক্ষিত একটা মানুষ, লিখিতভাবে
ক্ষমা চেয়ে, মাথা নিচু করে, সমস্ত আশাভরসা জলাঞ্জলি দিয়ে, ফিরে গেল দিল্লী, যেখানে
তার জন্য অপেক্ষা করছিল এক চূড়ান্ত অসম্মানের জীবন। তাঁর ফিরে আসার অপেক্ষা করছিল খাতকের দল।
সুসংবাদ
পৌঁছোতে সময় লাগে, কিন্তু দুঃসংবাদ বাতাসের থেকেও দ্রুতগামী। মির্জা দিল্লী পৌঁছোনোর আগেই পৌঁছে গিয়েছে তাঁর
পরাজয়ের খবর। খাতকেরা সব দল বেঁধে কোর্টে পৌঁছে গিয়েছে। জজ সাহেব একতরফা ডিক্রি জারি করে তাঁর নামে ওয়ারেন্ট
বারকরে দিয়েছেন। বড় একা মির্জা তখন। প্রথমে বেশ কয়েকদিন নিজেকে গৃহবন্দী করে রাখলেন। ঘরের ভেতরে ঢুকে কাউকে বন্দী করার রেওয়াজ তখনও শুরু
হয়নি। কিন্তু কতদিন! কতদিন আর এভাবে থাকা যায়!
তাই একদিন বাধ্য হয়েই আত্মসমর্পণ করলেন। এবারে মামলা উঠল মুন্সি বদরুদ্দিন অজুর্দা’র
এজলাসে। খুব একটা কিছু তর্কাতর্কি হওয়ার তো কোনও কারণ ছিল না! হয়ওনি। মির্জার পক্ষে
কোনো কৌঁসুলিও ছিল না। কেবল সাজা শোনাবার আগে তাঁকে যখন আত্মপক্ষ সমর্থনের অনুমতি দেওয়া
হোল, মুচকি হেসে তিনি বললেন,
কর্জ
কী পিতে থে ম্যয় অঔর সমঝতে থে কী হাঁ
রঙ
লায়েগী হমারী ফাঁকা মস্তী একদিন।
ধার
করে মদ খেয়ে ভেবে গেছি মনেমনে আমি চিরদিন
সার্থক
হবেই জানি এই ফাঁকা উচ্ছলতা কোনো একদিন।
জজসাহেবও
মৃদু হাসলেন। নিয়মমত সাজাও শোনানো হোল। কিন্তু মির্জাকে বন্দী করা হোল না। বদরুদ্দিন সাহেব নিজের পকেট থেকে সাজার সমস্ত পয়সা
সরকারি তহবিলে জমা করার ব্যবস্থা করেছেন। মির্জা’র
শাস্তি হওয়া শুধু অন্যায়ই নয়, পাপ। জানিনা
অল্লাহ্পাক মুন্সিজী’কে জন্নত নসিব করেছিলেন কি না!
সে
ছিল এক খামখেয়ালী কবি’র তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া।
বাড়ি ফিরে অত্যন্ত অসময়ে কাল্লুমিঞাকে তাঁর দৈনন্দিন বরাদ্দ দু-পেয়ালার একটি
পরিবেষণের হুকুম দিলেন। যদিও এই ইংরিজি মদে
সেই মৌতাত হয় না, যা ফরাসী মদে হোত, কিন্তু কি আর করা যায়, ভিখারির অত বাছবিচার করলে
চলে না। দু-দিন পর হয়তো এও জুটবে না। এক চুমুকে সবটুকু খেয়ে নিলেন মির্জা। জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকলেন খানিকক্ষণ। উদাস দৃষ্টি।
যেন কোন সুদূর ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছেন। স্বপ্ন দেখতে চাইছেন নৌসামিঞা। চিরদিন তাই দেখে এসেছেন। মাত্র তের বছর বয়েসে মায়াঅঞ্জন চোখে, সভাকবি হওয়ার
স্বপ্ন নিয়ে দিল্লী এসেছিল যে তরুণ, নানান টানাপড়েনের দুর্গম পথ পেরিয়ে আজ সে প্রৌঢ়ত্ত্বেরও
প্রায় শেষ সীমায় উপনীত। তবু আজও স্বপ্ন দেখেন
তিনি। আসলে স্বপ্ন দেখতে ভালবাসেন তিনি। স্বপ্নবিলাসী নন, বরং স্বপ্নপ্রেমিক বলা যায়।
কতক্ষণ
এভাবে বসেছিলেন কে জানে! একসময় সূর্য পশ্চিমে পাড়ি দিয়েছে। দিনান্তের স্তিমিত আলোও গুটিয়ে আসছে সন্তর্পণে। ঘরের ভিতর অন্ধকার। কাল্লুমিঞা আলো দিয়ে যায়। তাকে এবার দ্বিতীয় পেয়ালা পরিবেষণের আদেশ দেন মির্জা। সারাদিন কিছু খাননি তিনি। কাল্লু সে প্রসঙ্গ তুলে তাঁকে কিছু খাওয়ার অনুরোধ
করায় তার দিকে এমনভাবে তাকান, যে সে ভয়ে আর কিছু বলতে পারে না। পেয়ালায় দ্বিতীয়বার শরাব ঢেলে, দেরাজে তালা দিয়ে
চাবি নিয়ে চলে যায় সে। এ তার দৈনন্দিন কাজ।এরপর মির্জা যতই গর্জন করুন বা আবেদন করুন না কেন,
কোনো অবস্থাতেই আর সে দেরাজ খুলবে না। মির্জা
জানেন সে কথা। কাল্লু চলে যাওয়ার পর আস্তে
আস্তে উঠে প্রথমে জানালা, ও তারপর দরজাটাও বন্ধ করে দিলেন। এ সময় কোনো অশান্তি চান না তিনি। ছোট্ট একটা চুমুক দিলেন পেয়ালায়। অনেকক্ষণধরে আদালতে বলা লাইন দুটো মাথায় ঘুরপাক
খাচ্ছে। কাগজ-কলমে মনোনিবেশ করলেন। নতুন এক সৃষ্টির স্বপ্নে ডুব দিলেন মির্জা অসদুল্লাহ
খাঁ গালিব।
হমসে
খুল যাও, বওয়ক্ত-এ-ম্যায়-পরস্তী এক দিন
ওয়ার্না
হম ছেড়েঙ্গে, রখকর উজ্র-এ-মস্তী এক দিন।
গর্র-এ-অওজ-এ-বিনা-এ-আলম-এ-ইমকাঁ
ন হো
ইস
বলন্দী কে নসীবোঁ মেঁ হ্যায় পস্তী এক দিন।
কর্জ
কী পিতে থে ম্যয় অঔর সমঝতে থে কী হাঁ
রঙ
লায়েগী হমারী ফাঁকা মস্তী একদিন।
নগমা
হায় গম কো ভী, এয় দিল, গনীমৎ জানিয়ে
বে
সদা হো জায়েগা ইয়ে সাজ-এ-হস্তী এক দিন।
ধৌল
ধপ্পা উস সরাপা-নাজ কা শোবা নহীঁ
হম
হি কর ব্যায়ঠে থে, গালিব, পেশ-দস্তী এক দিন।
নিজেকে
উজাড় কোরো সুরার আসরে ওগো কোনো একদিন
নাহলে
নেশার ঝোঁকে খুনসুটি করে যাব কোনো একদিন
অভিমানী
হোয়ো না গো কোনোদিন ছোঁও যদি সাফল্যের চুড়া
সব
শ্রী'র ভাগ্যে জেনো লেখা আছে ঝরেপড়া কোনো একদিন।
ধার
করে মদ খেয়ে ভেবে গেছি মনে মনে আমি চিরদিন
সার্থক
হবেই জানি এই ফাঁকা উচ্ছলতা কোনো একদিন।
বেদনাবিধুর
সুর পরম প্রাপ্তি বলে মেনে নিতে শেখ ওরে মন
নিস্তব্ধ
হবেই এই জীবনসঙ্গীত হায় ধীরে ধীরে কোনো একদিন
আপাদমস্তক
এক অভিমানী নারী সে যে কলহ স্বভাবা সে তো নয়
আমিই
করেছি আগে গোলযোগ, গালিব, সে কোনো একদিন।