কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / দ্বিতীয় সংখ্যা / ১৪১

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / দ্বিতীয় সংখ্যা / ১৪১

সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬

সুপর্ণা বোস

 

কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৪৬


নীল চড়াই

ভোরেই উঠে পড়েছে সমর্পিতা। দুদিনের মধ‍্যে একগোছা প্রজেক্টের খাতা দেখে শেষ করতে হবে। এমনিতেও  এখনকার ছেলেমেয়েরা সরাসরি চ‍্যাটজিপিটি থেকে  টোকে। সেদিন এক ছাত্র তো মোলার সল‍িউশনের

জায়গায় মোলার টিথ নিয়ে গড়গড়িয়ে লেখা প্রিন্ট আউট জমা করে চলে গেছে। সার্চ ইঞ্জিনে ওটাই আগে এসেছিল আর কি!

তবে পরীক্ষার হলে গার্ড দেয়ার ব‍্যাপারটায় সমর্পিতা বেশ স্ট্রিক্ট। যে ছেলেমেয়েগুলো কষ্ট করে পড়ে এসেছে তারা কী দোষ করেছে? সেদিন একটি মেয়ে পরীক্ষার হলে রীতিমত মাইক্রো-চিটস নিয়ে এসেছিল। পরীক্ষা শেষ হবার আধঘন্টা আগে ধরা পড়লে খাতা কেড়ে নিয়ে মেয়েটিকে বার করে দিলেও খাতাটা ক‍্যানসেল করা হয়নি। পরদিন সেই মেয়েটির মা এসে হুজ্জোতি করে গেল। রণোজয়কে ঘটনাটা বলায় সে বললো, 'যে পড়ে এসেছে সেও চাকরি পাবে না, যে পড়েনি সেও পাবে না।' 'তার মানে তুমি কী বলতে চাইছ রণো? পরীক্ষার হলটা কি চিটিং করার জায়গা? তাহলে যারা মন দিয়ে লেখাপড়াটা করছে তাদের কাছে মেসেজটা কী যাবে বলো তো?' সমর্পিতা বেশ সিরিয়াস। রণোজয়ের বেশ মজাই লাগছিল। সে বউয়ের সঙ্গে খুনশুটি করার জন‍্যে বলল, স্বয়ং বিবেকানন্দ বলেছেন, চালাকির দ্বারা কোনো মহৎ কার্য হয় না। আর পরীক্ষা কোনো মহৎ কর্ম নয়। বুঝলে?’ সমর্পিতা হেসে ফেলল।   

সমর্পিতা নিজের কাজে মন দেয়। বাবান এসে গলা জড়িয়ে ধরে বললো, 'মাম্মাম ব্লু স্প‍্যারো কী হয় জানো?' সমর্পিতা ছেলের একমাথা চুলে বিলিকেটে দিয়ে বলল, 'স্প‍্যারো তো ব্লু হয় না সোনা! তাহলে হয়ত তুমি অন‍্যকোনো নীল রঙের পাখি দেখেছ। নীলকন্ঠ হতে পারে কিম্বা পার্পল সানবার্ড জাতীয় কোনো। মাছরাঙা অবশ‍্য চড়ুইয়ের থেকে চেহারায় বড় আর আলাদাও! কিন্তু তুমি যে আজ খুব আর্লি উঠে পড়েছ দেখছি?'

বাবান ছটফটে গলায় বললো, কে বলেছে ব্লু স্প‍্যারো হয় না? এই দেখো ব্লু স্প‍্যারো বলে দৌড়ে গিয়ে টেবিল থেকে বাবার ফোনখানা নিয়ে এসে মেলে ধরল। সমর্পিতা দেখল একটা মিসাইলের ছবি খোলা আছে। ক‍্যাপসানে লেখা The Blue Sparrow is an advanced Israeli air-launched, medium-range ballistic missile. এটা নাকি নিজের দেশের ভিতরে যুদ্ধের অনুশীলনের জন‍্যে ব‍্যবহার করা হয়। সাত বছরের বাবান যেমন হাতে খেলনা পিস্তল নিয়ে মুখে ঠাইঠাই শব্দ করে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলে আর কি! সমর্পিতার মানসচক্ষে ভেসে উঠল, কতগুলো আদ্দামড়া লোক একটা টেলিস্কোপের মত দেখতে অথচ মস্তবড় জিনিস নিয়ে  আকাশের তারা দেখার পরিবর্তে আকাশ এফোঁড় ওফোঁড় করে শিশুর ফুলপাখি আর চাঁদতারার পৃথিবীকে ধ্বংস করছে! এই তাদের খেলা!

সমর্পিতা ছেলেকে কোলের কাছটিতে বসিয়ে বলল, 'জানো বাবান, আমরা যখন ছোটো ছিলাম তখন শীতের ছুটি পড়লে মা বাবার সঙ্গে পাখি দেখতে যেতাম বর্ধমানে পূর্বস্থলীতে। সেখানে গঙ্গানদীর চরায় 'চুপীর  চর' নামে একটা জায়গা আছে। শীতকালে কত দূর দেশ থেকেও পাখিরা উড়ে আসে ডিম পাড়বে বলে। তোমাকে একবার সেখানে নিয়ে যাব, কেমন?'


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন