![]() |
| কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৪৬ |
প্রত্যাবর্তন
কখনও ক্ষেতের আল বেয়ে, কখনও জংলা মাঠের ভেতর মেয়েদের মাথার মতো সরু সাদা সিঁথিপথ ধরে জ্যৈষ্ঠের দুপুরের তপ্ত আকাশের যাবতীয় উত্তাপ মাথায় নিয়ে একটার পর একটা গ্রাম পেরিয়ে চলেছিল দিবাকর। শারীরিক কষ্ট হচ্ছিল খুবই, কিন্তু কোনো কষ্টকেই আদৌ কষ্ট বলে মনে হচ্ছিল না মাধুরীর সঙ্গে পুনর্মিলিত হবার উত্তেজনায়। মাধুরী তাকে বলেছিল, যদি কোনোদিন আমার সঙ্গে আবার দেখা করতে চাও, তাহলে কিন্তু শহরে নয়, বরং তোমাকে আসতে হবে আমাদের গ্রামে। আমার পক্ষে আর শহরে থাকা সম্ভব নয়, আমি ফিরে যাচ্ছি আমাদের গ্রামে, যেখান থেকে আ্মরা একদিন এসেছিলাম এই শহরে, কাজের তাগিদে। অনেক হয়েছে, আর নয়, আমার শখ মিটে গেছে, আমি নিতান্তই ছা-পোষা ঘরের বউ হয়েই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে চাই। দিবাকর বলেছিল, সেখানে তুমি ফিরে যাবে কোন মুখে? একদিন তো সেই গ্রাম থেকে তাড়িয়েই দেওয়া হয়েছিল তোমাকে পরকীয়ার দায়ে। তোমার স্বামীই তোমাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছিল। তার কাছেই তুমি আবার ফিরে যেতে চাও? মাধুরী বলেছিল, তাছাড়া আর উপায় কী? শহরে শরীর বেচে আর কতদিন চলতে পারে? শরীরও তো চৌপাট হয়ে গেল! এরপর তো আমার আর কানাকড়িও দাম থাকবে না। দিবাকর বলেছিল, আমার কাছে চিরদিনই থাকবে। তুমি আরও কিছুদিন এখানে থেকে যাও। যে অভিযোগে আমাকে চক্রান্ত করে ফাঁসানো হয়েছে, তাতে বছর কয়েকের কারাবাস নিশ্চিত। তবে তোমাকে কথা দিচ্ছি, জেল থেকে মুক্তি পেলেই আমি তোমার কাছে আসব। মাধুরী দিবাকরের কথায় হেসেছিল। বিষণ্ণ হাসি। বলেছিল, একদিন গ্রামে তোমার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে গ্রাম থেকে বিতাড়িত হয়েছিলাম। তুমি কিন্তু তখন আমার পাশে দাঁড়াতে পারোনি। তোমারও সংসার ছিল। স্ত্রী-সন্তান ছিল। অথচ আমাকে ছেড়ে আসতে হয়েছিল দুই সন্তানকে। সন্তানসুখ আমার কপালে আর জুটল কই? শহরে আসতে বাধ্য হলাম। বেঁচে থাকার তাগিদে দেহব্যবসায় হারিয়ে গেলাম। সেখানেই তোমাকে আবার ফিরেও পেলাম। তুমি অবশ্য না জেনেই এসেছিলে সেই নিষিদ্ধপল্লীতে। দালাল পৌঁছে দিয়েছিল আমার ঘরে। আমাকে দেখে চমকে উঠেছিলে তুমি। বলেছিলে, তোমার স্ত্রী তোমাকে অস্বীকার করেছে। তুমি তাই গ্রাম ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়েছ।
এসব কয়েকবছর আগের কথা। মাধুরী তার নিষিদ্ধগন্ডী থেকে বেরোতে পারেনি। অন্যদিকে দিবাকর জড়িয়ে পড়েছিল বিভিন্ন সমাজবিরোধী কাজে। এর আগেও দিবাকর মাঝে মাঝেই কারাবাস করেছে। প্রতিবারই ছাড়া পেয়ে ফিরে এসেছে মাধুরীর কাছে। কিন্তু এবার যে অপরাধে সে ধরা পড়েছে, তাতে দীর্ঘ কারাবাস নিশ্চিত। না, মাধুরী আর সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেনি। শুনেছে, গ্রামে তার স্বামী এখন খুবই অসুস্থ এবং বৃদ্ধ। আর গ্রামের বাড়িটা তার স্বামীর নয়, বরং তার। সুতরাং গ্রামে ফিরে যাবার অধিকার আছে।
জেল থেকে সদ্য মুক্তি পেয়ে দিবাকরও। আজ আবার ফিরে যাচ্ছে নিজের গ্রামে। মাথার ওপর চাঁদিফাটা উষ্ণতা, পায়ের তলায় আগুনে মাটি, দিবাকর হেঁটে পেরিয়ে যাচ্ছে একটার পর একটা গ্রাম। যদিও সংশয়, তার স্ত্রী তাকে স্বীকার করবে কিনা!

খুব ভালো লাগল। শ্রাবণী।
উত্তরমুছুন