কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / নবম সংখ্যা / ১৩৬

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / নবম সংখ্যা / ১৩৬

বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর, ২০২৫

<<<< সম্পাদকীয় >>>>



 


কালিমাটি অনলাইন / ১৩৬ / ত্রয়োদশ বর্ষ : নবম সংখ্যা

 


বিগত ২০২৩ সালের ৬ ডিসেম্বর উত্তরপ্রদেশের কানপুর থেকে প্রকাশিত ‘দূরের খেয়া’ পত্রিকার সুবর্ণজয়ন্তী সংখ্যা প্রকাশ উপলক্ষ্যে পত্রিকা সম্পাদক বাপী চক্রবর্তী একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন তাঁর বর্তমান বাসস্থান পশ্চিমবঙ্গের কোন্নগরে। বাপী একসময় কর্মসূত্রে কানপুরে ছিলেন এবং সেখানেই সাহিত্যমনস্ক কয়েকজনের সহযোগিতায় একটি সাহিত্যচর্চার পরিমন্ডল গড়ে তোলেন। এই পরিমন্ডল থেকেই ‘দূরের খেয়া’ পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশের শুভসূচনা, যা আজও নিয়মিত সময়ের নির্দিষ্ট ব্যবধানে প্রকাশিত হয়ে চলেছে। সম্প্রতি আমার হাতে এসেছে পত্রিকার ৫২তম সংখ্যা, প্রকাশিত হয়েছে এবছর শারদীয়া সংখ্যা রূপে।

২০২৩ সালের ৬ ডিসেম্বর আমিও আমন্ত্রিত ছিলাম কোন্নগরে ‘দূরের খেয়া’র সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে। মানসিকভাবে আমি খুবই আগ্রহী ও উৎসাহিত ছিলাম এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য। কিন্তু শারীরিকভাবে আমি তখন ছিলাম একান্তই শয্যাশায়ী। নিরামিষ একটি দূর্ঘটনার সূত্রে আমার কোমর গেছিল ভেঙে, যা মেরামত করে সেরে উঠতে দেড়বছর সময় অপব্যয় করতে হয়েছিল। তবে আরও পঁচিশ বছর আগে, কোনোরকম অহেতুক ঝামেলায় জড়িয়ে না পড়ার দরুন ‘দূরের খেয়া’ পত্রিকার রৌপজয়ন্তী উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আমি উপস্থিত থাকতে পেরেছিলাম কানপুরে। মনে পড়ে, ‘দূরের খেয়া’র আমন্ত্রণে কানপুরে বহির্বঙ্গের বাংলা সাহিত্যসেবীদের দারুন জমাট সম্মেলন হয়েছিল। এই সম্মেলনে বহির্বঙ্গের শ্রেষ্ঠ লিটল ম্যাগাজিন সম্মানে ‘কালিমাটি’ পত্রিকাকে পুরস্কৃত করা হয়েছিল। এছাড়া বহির্বঙ্গের শ্রেষ্ঠকবি হিসেবে কবি সুকুমার চৌধুরীকে এবং শ্রেষ্ঠ গদ্যকার হিসেবে অজিত রায়কে পুরস্কৃত করা হয়েছিল। জীবনের এমনই পরিহাস, ‘দূরের খেয়া’র সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে তাঁরা দুজনেই অনুপস্থিত ছিলেন, একান্তই অপ্রত্যাশিত মৃত্যু তাঁদের দুজনকেই অসময়ে কেড়ে নিয়েছিল আমাদের কাছ থেকে। এবং শুধু সুকুমার আর অজিতই নয়, বরং পত্রিকার রৌপ্যজয়ন্তী অনুষ্ঠানে কানপুরে আরও যাঁরা যাঁরা উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের মধ্যে আরও কয়েকজন আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন – নবকুমার শীল, জ্যোতির্ময় দত্ত, দীপক চট্টোপাধ্যায়, প্রণব ধর, কমল চক্রবর্তী। তবে কমল চক্রবর্তী প্রয়াত হয়েছেন সম্প্রতি, ‘দূরের খেয়া’র সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বহির্বঙ্গের বাংলাসাহিত্যের সেই অনবদ্য সম্মেলনে বিভিন্ন রাজ্য থেকে উপস্থিত ছিলেন রবীন্দ্র গুহ, অমলেন্দু চক্রবর্তী, অরূপ দত্ত, প্রাণজি বসাক, দীপককুমার মাহাতো এবং আরও অনেকে।  

‘কালিমাটি অনলাইন’ ব্লগজিনের পক্ষ থেকে সবাইকে জানাই শুভেচ্ছা শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা।

আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের ই-মেল ঠিকানা :

kajalsen1952@gmail.com / kalimationline100@gmail.com

দূরভাষ যোগাযোগ : 9835544675

 

 


<<<< কথনবিশ্ব >>>>

 

কথনবিশ্ব


শিবাংশু দে

 

ব্যারেল, বরবর্ণিনী ও একটি নদী

 


শ্রদ্ধেয় মান্না দে অধীর বাগচী মশাইকে দিয়ে একটা গান রেকর্ড করিয়েছিলেন। পুলকবাবুর লেখা। 'যখনই গানের মুখ মনে আসে না, তোমার মুখটি মনে করি'। এ'রম একটা ব্যাপার আমার সঙ্গেও হয়। একটা লেখা নিয়ে বসেছি। বিষয় যা কিছু হতে পারে। কিন্তু কীভাবে শুরু করবো, কিছুই মনোমত হচ্ছে না। আমি তখন ঘনাদার মতো সিগারেট 'ধার' করার প্রমাণিত লাইন ধরে 'আরণ্যক' নিয়ে বসি। যেকোনও একটা পাতা খুলে। ঘন্টাখানেক ধরে তা পড়ে গেলেই উর্বর শব্দ ও বাক্যবন্ধনীর মুখপাতগুলি পর পর মনে এসে যায়। এবার শুধু লেখার অপেক্ষা। আমরা বনেদি জংলি জনতা। 'বন-পাহাড়'-এর গল্প যে কেমন হয়, কেমন হওয়া উচিত, সেটা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে বুঝতে পারি। 'সাজানো' জঙ্গলের গল্প একেবারে টানে না। ফাঁকিবাজি ধরা পড়ে যায়। যেখানে গল্পের গরু গাছ থেকে আম পেড়ে খায়, গল্পের বাঘ ছররার পিছনে দৌড়োয়, সেসব আমরা খেতে পারি না। বিভূতিবাবুর  'আরণ্যক'-এর 'পবিত্রতা' সব প্রশ্নের ঊর্ধ্বে। 'সৎ' সাহিত্য যেমন হয়।

বাঙালির পর্যটন-প্রিয়তা এক বিখ্যাত পিছুটান। দুটি গন্তব্য নিয়ে বঙ্গীয় জনতার রোমাঞ্চ কিছুতেই কাটতে চায় না। প্রথমটি 'বরফ', দ্বিতীয়টি 'জঙ্গল'। সমতল, জনপদ-প্রধান অঞ্চলের  বাসিন্দা এই জাতির লোকজন  ‘বরফ’ দেখলেই ঊর্ধ্ববাহু হয়ে নৃত্য করতে শুরু করে।  স্বীকার করি, গন্তব্য পাহাড়ের চূড়ায় বরফ, পদতলে বরফ, সবারই এক ধরনের শ্বেত রোমাঞ্চ রয়েছে। কিন্তু তাহা সৌন্দর্যের 'শেষ সত্য' নয়। পাহাড়-পর্বতের অনন্ত রহস্য। তুষার স্বর্গের ছলনা তার মধ্যে একটি গৌণ পর্যায়। শৈল-রোমাঞ্চকে বিষয় করে বাংলায় ধারাবাহিক লেখালেখির দিকপাল জলধর সেন, উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, প্রবোধ সান্যাল, শঙ্কু মহারাজ। এঁরা ব্যতিরেকে কিছু লেখক আছেন, যাঁরা এই রোমাঞ্চকে  আংশিক ধরতে পারেন। অপ্রাসঙ্গিক বোধে তাঁদের উল্লেখ আর করছি না।

প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে দ্বিতীয় বঙ্গীয় প্রপঞ্চটি 'জঙ্গল'। বন-পাহাড়-জল-মাটি-রোদ-সবুজ এবং কিছু অংশে বনবাসীদের বৈচিত্র্য। বাঙালি আঁকড়ে থাকে। বিভূতিভূষণের বহু রচনায় এরা  আসাযাওয়া করেছে। কিন্তু সর্ব অর্থে সম্রাটের সিংহাসনে আসীন যে গ্রন্থ, তার নাম  'আরণ্যক'। এই বইয়ের প্রসঙ্গ এসে গেলেই অরণ্য সাহিত্যের শিখর কীভাবে ছোঁয়া যায়, তার পাকদণ্ডী স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পাঁচ দশকেরও বেশি হলো।আমি ইশকুল শেষ, বা  সদ্য কলেজ। সেই সময়, সেই বয়স আলাদা। একেবারে। সময়কালটি মনে পড়ে যায়। কীভাবে বাংলায় আখ্যান লেখা উচিত  তা নিয়ে বন্ধুদের মধ্যে যখন কথাবার্তা হতো, তিন-চারজন যুবা কথাকার এগিয়ে এসে সামনে দাঁড়াতেন। দুজন গঙ্গোপাধ্যায় এবং জনৈক মুখোপাধ্যায় তখন 'ভৈরব হরষে' মাঠে এসে গিয়েছিলেন। জনৈক 'বসু' ধীরে ধীরে তাঁদের জন্য জায়গা ছেড়ে দিচ্ছিলেন। কিন্তু তাঁর রাজত্ব শেষ হয়ে যায়নি। বাংলা গদ্যের মূল স্রোত তাঁদের হাতেই নতুন পথ খুঁজছিলো সেই সময়। সুনীল, শ্যামল এবং শীর্ষেন্দুর দুর্ভেদ্য ত্রিভুজ বা সমরেশের বাইরে জনপ্রিয় বাংলা লেখকের অভাব ছিলো না।  কিন্তু 'জনপ্রিয়' লেখকদের গদ্য শরৎচন্দ্র, বিমল মিত্র, তারাশঙ্করের ঘরানার বাইরে বেরোতে পারছিলো না। এরকম একটা সময়ে মাঠে একটি উপন্যাস নেমে পড়ে। স্বল্পায়তন রচনাটি লিখেছিলেন বুদ্ধদেব গুহ। পটভূমি পলামুর জঙ্গল। নাম 'কোয়েলের কাছে' (১৯৭০)। 'ভিনি-ভিডি-ভিসি' বললেও কম বলা হবে। উপন্যাসটি বাঙালি পাঠকের কছে অসম্ভব  মাত্রায় সমাদৃত হয়েছিলো। জনপ্রিয়তার বিচারে একটা 'কাল্ট' লেখা বলা যায়। আমি তখনও ইশকুলে।

আমরা সময় নষ্ট না করে ‘বুগু’ (বুদ্ধদেব গুহ) পড়তে শুরু করে দিই। 'খেলা যখন' নামের রূপকথাটি, বা 'বাতিঘর', শারদীয় সংখ্যায় বাঙালির চমক। আমাদের সেই বয়সে বাম্পার হিট। না পড়লে মনে হতো, পাঠক কী হারাইতেছেন, আপনি জানেন না। নাগরিক রূপকথার বাইরে দেশি বন-পাহাড়ের কথা বলতে গেলে তাঁর  'জঙ্গলমহল' সেকালে ছিলো প্রথম পছন্দ।  বেশ কিছুদিন ধরে 'লবঙ্গীর জঙ্গলে', 'বাংরিপোশির দুরাত্তির',  ইত্যাদি বাজারে আসতে থাকে। পরের লেখাগুলোতে এসে আমাদের ব্রেক লেগে যায়। 'বুগু' আর 'বিভূ'র ফারাকটা এতো প্রকট হয়ে ওঠে যে আর এগোতে পারিনি। কদিন আগে আবার 'আরণ্যক' পড়তে পড়তে মনে হলো পঞ্চাশ বছর তো হয়ে গেলো প্রায়, আরেকবার 'কোয়েলের কাছে' ট্রাই করা যায়? ইতোমধ্যে আপাদমস্তক বদলে গেছে দুনিয়া। আমরাও নই 'সে তুমি'। দেখি না আরেকবার। এই সময়ের মধ্যে আমি সশরীরে পলামুর জঙ্গলমহল তন্ন তন্ন  খেপ মেরেছি। কিছুটা মিলিয়েও দেখা যেতে পারে। সেকালের পাঠকের মনে যে প্লাবিত বিস্ময়বোধের প্রকাশ দেখা যেতো, তার  কোনও ঔচিত্য কি খুঁজে পাওয়া যাবে?  এতো দিন পর?

বই 'পড়া', ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে, বই 'লেখা'র মতোই একটা শ্রমসংকুল কাজ। জীবনের শুরুতে পাঠকের মন থাকে অসংস্কৃত, একটা খনিজ পাথরের মতো। ক্রমাগত ভাবে তার উপর দিয়ে যখন পঠন-পাঠনের স্রোতধারা বয়ে যায়, পাথরের রুক্ষ ত্বক মসৃণ হয়ে ওঠে। তাতে পালিশ পড়ে। বিমূর্ত কোনও অবয়বী চেতনা রূপ পেতে থাকে। এ এক অনিঃশেষ খেলা। শুরুটা হয়তো মনে পড়ে। বেঁচে থাকতে শেষটা আর ঠাহর হয় না। যে আমি পঞ্চাশ বছর আগে বুগু পড়ে মুগ্ধ হতো, 'মাধুকরী', 'চাপরাশ',  আরও কিছু লেখাজোখা, তাতে মস্তো ফুলস্টপ লাগিয়ে চলে গেছে।

'কোয়েলের কাছে' যথেষ্ট 'মন' দিয়ে পড়েও ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে শেষ হয়ে গেলো। কী পেলুম? এখনও যা কিছু ভালো লাগলো, সেটা লিখি আগে,

- প্রকৃতি আর জঙ্গলের বর্ণনা ভালো। মানে বেশ ভালো। এখনও পড়া যায়।
-পলামুর ভূগোল আর ইতিহাস নিয়ে দেওয়া তথ্যগুলি মোটামুটি নির্ভুল।

যা নেওয়া যায় না, তার লিস্টিটা বেশ বড়ো-  
- সঞ্জীব চাটুজ্যের 'পালামৌ' আর বুগু'র 'কোয়েল', দুই লেখকেরই দৃষ্টিভঙ্গি এক। অর্থাৎ আদত বাঙালির 'ড্যাঞ্চি' বাবুর আলখাল্লা পরে পলামুকে বোঝার চেষ্টা। এটা পাল্টায়নি একশো বছরে।

- শরৎচন্দ্রের ইন্দ্রনাথ, মহিম ও সব্যসাচী চরিত্রগুলি ভালো করে মন্থন করে একটি 'নায়ক' চরিত্র সৃষ্টি। সঙ্গে শ্রীকান্ত ও নতুনদা চরিত্ররাও এসেছে। বস্তুত তাঁর কথকতার ভঙ্গিটিই 'শ্রীকান্ত' ঢং-এর। কিন্তু সেই গভীরতায় পৌঁছোতে পারে না।

- নায়িকারাও শরৎচন্দ্রের হেঁসেল থেকে এসেছে। রাজলক্ষ্মী থেকে কমল, সবই। তবে তারা 'মেড ইন সাউথ কলকাতা'। তাদের লক্ষণগুলি  দক্ষিণ কলকাতার  বালিগঞ্জ, সানি পার্ক, একডালিয়া, সিংহীপার্ক, ল্যান্সডাউন, গড়িয়াহাট টাইপ হয়ে রয়ে গেছে। বুগু শরৎচন্দ্রের ঢং-কে, বাণিজ্যের ভাষায় 'আপগ্রেড' করেছিলেন।

- পরবর্তীকালে বুগু'র কাছে যেটা অবসেশন হয়ে দাঁড়িয়েছিলো, অর্থাৎ বন্দুকের ব্যারেলের মাপ ও বাঙালিনীদের বিপজ্জনক ভাইটাল মাপজোপ আকড়ানো বর্ণনার পদশব্দ অন্য সব লেখার মতো এখানেও বেশ মুখর।

- বেশ কিছু জায়গায় অপ্রয়োজনে জীবন 'দর্শন' ধরতে গিয়ে অত্যন্ত কাঁচা বক্তব্য ও ভাষা ব্যবহার মনস্ক পাঠককে ক্লিষ্ট করে। 'বিভূ'র থেকে দূরত্বটা পলকে বোঝা যায়। যদিও কোনও মাথার দিব্যি নেই যে বুগু'কে বিভূ হয়ে উঠতে হবেই। তবে পাঠকের একটা আশা থাকতেই পারে। আর কাউকে তো এ লাইনে আসতেই দেখলুম না।

-  অপ্রাসঙ্গিক শিকারের গল্প শোনানোর প্রবল তাড়না। জঙ্গলের সঙ্গে শিকার খেলা’কে জড়িয়ে ফেলার দুর্বলতা অতি বিপজ্জনক। করবেট সাহেব কী শেখালেন তবে?

- থ্রিল আনতে গিয়ে ভোজপুর-শাহাবাদ থেকে পলামু আসা পাঁড়ে-দুবে-বাবুসাবদের ঠিকেদারি মাফিয়ার সঙ্গে ঢিসুম-ঢিসুমের চিত্রনাট্য।

দূরেই থাকতুম। এতোদিন পর 'কোয়েলের কাছে' এইভাবে বুগু'র থেকে এতো দূরে নিয়ে যাবে, ভাবিনি। একথা ঠিক, তাঁকে কখনও বিমল কর বা  রমাপদ চৌধুরীর আসনে বসাবার ধৃষ্টতা করিনি। আবার একথাও ঠিক, এই দুজন কথাশিল্পী বুগু'র প্রজন্মের লেখকদের জন্য বাতিঘরের কাজ করে এসেছেন।  উপযুক্ত উত্তরসূরিদের কাছে গুরু'র দক্ষতার কিছুটা আশা করা তো অন্যায় নয়।  শুধু 'কোয়েলের কাছে'তে উঁকি দিয়ে একটা অবস্থান নেবার আগে জোয়ান বয়সের মুগ্ধতাটুকুও একটু ঝালিয়ে এওয়া দরকার। ভাবলুম একবার  'একটু উষ্ণতার জন্য'  পড়ে নিই। 'কোয়েলের কাছে' ১৯৭০ সালে বই হিসেবে প্রকাশিত হলেও তার আগে  'অমৃত' সাপ্তাহিকে ধারাবাহিক প্রকাশিত হতো বছর দেড়েক ধরে। তখনই প্রথম পড়া।  প্রথম কৈশোরের কালে পাঠকের মগজে ধূসর কোষের থেকে অন্তঃস্রাবী গ্রন্থির প্রতাপ অনেক বেশি থাকে। আমিও ব্যতিক্রম ছিলুম না। বই হিসেবে পড়েছিলুম বছর দশেক পরে। তখন অভিজ্ঞতাটি ছিলো 'মিশ্র'। বাংলা 'রোমান্টিক' আখ্যানের একটা জনপ্রিয় মডেল হিসেবে তাকে রেখে দেওয়া যায়। এরকমই মনে হয়েছিলো। কিন্তু এবার এতোটা নিরাশ হবার পর মনে হলো চার-পাঁচ দশক আগের আমি পাঠক হিসেবে কি এই পর্যায় অপরিণত ছিলুম? দীর্ঘকাল ধরে যতোদিন লিখেছেন, তাঁর জনপ্রিয়তা নিয়ে কোনও প্রশ্ন উঠবে না। বহু পাঠককে (বিশেষত 'পাঠিকা'দের ) তাঁর নামে 'শপথ' নিতে দেখেছি। তাঁরা এখনও আছেন। অতএব তাঁর লেখা নিয়ে কোনও পাঠ-প্রতিক্রিয়া (যদিও একান্ত ব্যক্তিগত) নিতে হলে একটু 'এগিয়ে'ও দেখা উচিত। বুগু'র একটি ব্লকবাস্টার লেখা ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত হয়, 'একটু উষ্ণতার জন্যে'। এটি যখন প্রথম পড়তে গিয়েছিলুম, তখন আমি তিরিশ পেরিয়ে গিয়েছি। দশ-বারো পাতা পড়ে ক্ষান্তি দিয়েছিলুম এটুকুই মনে আছে। এইবার 'গবেষক' হিসেবে মানসিক ভাবে 'প্রস্তুত' হয়ে প্রথম বার পুরোটা পড়লুম। কী বলি? বেশ কষ্ট হলো। কৃত্রিম সাজানো  চরিত্র, ফিলমি সেট আপ, যাত্রা টাইপ ক্লাইম্যাক্স এবং কথা, কথা এবং কথা। উদ্দাম জ্ঞানবর্ষা। কেউ বলছে, কেউ লিখছে, কেউ ভাবছে। সবটাই এতো শূন্যগর্ভ, কৃত্রিম, কষ্ট হলো। মানুষের প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে যে এতো ভাসন্ত, ফোঁপরা, অগভীর আখ্যান যে বাংলায় লেখা যায়, ভাবা যায় না। একালের বিস্মরণ চক্রবাত নিঃসন্দেহে এই ঘরানারই ফসল।

আক্ষেপের বিষয় হলেও এটা সত্যি যে আমার কাছে যা 'গ্রহণযোগ্য' মনে হয় না, সেটাই বুগু'র ইউএসপি। একই পটভূমি, অর্থাৎ জঙ্গল নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বুগুকে আগেই (১৯৬৮) টেক্কা দিয়েছিলেন 'অরণ্যের দিনরাত্রি' নামক কাহিনি লিখে। সুনীলের প্রতিষ্ঠা, জনপ্রিয়তা নিয়ে বুগুর মনে ক্ষোভ ছিলো শুনেছি। কিন্তু শোনা যায়, সেকালে বাঙালি মেয়েরা রণে-বনে-অরণ্যে 'যশয়ন্ত বোস' নামক 'অরণ্যদেব'কে  খুঁজে ফিরতো। এখনও কি ফেরে? সুকুমার বোস-রমা-ছুটি ত্রিভুজ নিয়ে যে অর্থপূর্ণ কোনও কথাসাহিত্য হতে পারে, তা বোঝাও আমার নাগালের বাইরে। শরৎচন্দ্রের প্রতি আমার আনুগত্য বিরাট চোট খেয়েছিলো 'শেষ প্রশ্ন' পড়তে গিয়ে। গরম হাওয়ার ফানুসের মতো শুধু ভারি ভারি সংলাপের ভারে দীর্ণ একটি অতি বৃহৎ 'উপন্যাস'। বাস্তব জীবনে মানুষ যেভাবে ভাবে না , যেভাবে কথা বলে না, যেভাবে 'চিঠি' লেখে না সেই সব সংলাপ, বর্ণনা, ভাব সম্প্রসারণ। 'উপন্যাস' আদর্শ প্রচারের মাধ্যম নয়। শ্রীকান্তের স্রষ্টা  কীভাবে নিজের কবজির জোরের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছিলেন, দেখে কষ্ট হয়েছিলো। বুগু'র কবজির জোর নিয়ে নাহয় মৌনই থাকলুম। তিনি হয়তো জনপ্রিয় এখনও। থেকেও  যাবেন বহুদিন। 'জনপ্রিয়'তা পেয়েছিলেন, পাঠকের মেধাপ্রিয় হতে পারেননি। পারবেনও না হয়তো আর। তাহাতে এ জগতে ক্ষতি কার?

পাঠকের  ঈশ্বর বিভূতিবাবুর  অরণ্য জগৎ ছিলো ভাগলপুর, সাঁওতাল পরগনা আর সিংভূমের পাহাড়-জঙ্গলের তল্লাট। তিনি পলামুর দিকে যাননি। ব্যক্তি আমার ঘনিষ্ট ঘোরাফেরা  এই চারটি জায়গাতেই হয়েছে। এখনও হয়। শেষবার যখন 'কোয়েলের কাছে' গিয়েছিলুম, তার কিছু ছবিছাবা থাক এখানে। দুচার টুকরো ম্যাকক্লাস্কিও। অক্ষর  পেরিয়ে যে দৃষ্টির দুনিয়া তার ইশারা পাওয়া যাবে এই সব পটে।

বুগু'র ক্ষুব্ধ অনুরাগীরা মার্জনা করবেন।


অভিজিৎ মিত্র

 

সত্যজিৎ, চোখ ও জীবন

 


আমি স্বপ্নে রোজ একজোড়া চোখ দেখি। সোজাসুজি। অনেক জিজ্ঞাসা। ভালবাসা, আদর। ভয়, আশঙ্কা, রাগ। হতাশা, স্বপ্নভাঙা, হাহুতাশ। কখনো খুনসুটি, শাসন, মমতা, গড়ে তোলার ইচ্ছে। সকালে, দুপুরে, সন্ধের টুইলাইটে, রাতের পেঁচায়। এপাশে, ওপাশে, সামনে, চার্পাশে, হাতে হাত, পিনড্রপ সাইলেন্স। কলকাতা বোলপুর দুর্গাপুর, যদি একটা ত্রিভুজ টানি। স্পর্শচোখ। গন্ধচোখ। হৃদয় অব্ধি নাদেখা ইথার কান্ট্রি রোডসে্‌র তার গেঁথে দেয়। ভাঙাচোরা চোখ, এক নতুন কনস্ট্রাকশন উঠে আসছে, যেন পিকাসো, কিউবিজম। যেন যামিনী রায়, চোখের ফোক কথকতা।

স্বপ্ন ভাঙে। দেখি সামনে ছ’ফুট চার ইঞ্চির সত্যজিৎ রায় পায়চারী করছেন আর তার কোন্‌ সিনেমায় কোন্‌ চরিত্রের চোখ দিয়ে কী দেখাবেন, সেটা নোটবুকে টুকে রাখছেন। আমি দেখতে থাকি, শিখতে থাকি, বুঝতে  পারি না জেগে আছি না অবচেতনে।

প্রথমে মাথার পাতায় কিছু সিনেমা উঠে আসে। সত্যজিতের মাইলস্টোন কিছু। পথের পাঁচালী (১৯৫৫), অপুর সংসার (১৯৫৯), দেবী (১৯৬০), তিনকন্যা (১৯৬১), অভিযান (১৯৬২), মহানগর (১৯৬৩), চারুলতা (১৯৬৪), নায়ক (১৯৬৬), অরন্যের দিনরাত্রি (১৯৭০), সীমাবদ্ধ (১৯৭১), অশনি সঙ্কেত (১৯৭৩), ঘরে বাইরে (১৯৮৪), গণশত্রু (১৯৯০), শাখা প্রশাখা (১৯৯০), আগন্তুক (১৯৯১)। সিনেমা সম্বন্ধে সত্যজিতের কিছু কথা। সিনেমা সেলুলয়েডের পর্দায় জীবনের কিছু দিক ফুটিয়ে তোলে। ‘One quality which is sure to be found in a great work of cinema is the revelation of large truths in small details’। তাহলে? ধরা যাক, চোখের মধ্যে দিয়ে গোটা এক চরিত্রের মধ্যে ঢুকে যাওয়া যায়। ভাবুন, এক ক্যানভাসে কালো রং চড়িয়ে তার মাঝে কিছু চোখ আপনার মানসজার্নিতে উঠে এল। ওপরের এইসব ছবির লিড রোল বা সাইড রোলে কিছু নারীর চোখ। রহস্য অথবা প্রাণখোলা।

একজন সমালোচক হিসেবে দেখতে পাই, সত্যজিতের এইসব ছবিতে কোন না কোন চোখ কোন এক স্পেসে কিছু না বলেও সিনেমার অনেক ডায়লগ বলে দিয়েছে। যেমন - সর্বজয়ার চোখ, দুর্গার চোখ, অপর্ণার চোখ, দয়াময়ীর চোখ, রতনের চোখ, মণিমালিকার চোখ, মৃন্ময়ীর চোখ, গুলাবি আর নিলির চোখ, আরতি আর চারুলতার চোখ, অদিতির চোখ, দুলির চোখ, তুতুলের চোখ, ছুটকির চোখ, বিমলার চোখ, ইন্দ্রাণী বা তাপ্তি বা অনিলার চোখ। কোন্‌ চোখ কোন্‌ সিনেমার, পাঠকেষু।

কাট্‌ কাট্‌। এবার একটু ডিটেলে যাব। পথের পাঁচালীর দুর্গার পাইপের মধ্যে দিয়ে জিজ্ঞাসু তাকানো বা দুর্গা  যখন অপুর চুল আঁচড়ে দিচ্ছে, তখন সর্বজয়ার অপত্য স্নেহে তাকানো, ভোলা যায়? দেবী ছবির দয়াময়ীর চোখ প্রতি ক্লোজ শটে আস্তে আস্তে জীবন্ত থেকে নিষ্প্রাণ হয়ে ওঠার সেলুলয়েড। অন্ধকারের লং শটে তিনকন্যার মণিমালিকার চোখে গয়নার প্রতি লোলুপতা, গায়ে কাঁটা দেয়নি? অথবা তিনকন্যার আরেক কন্যা মৃন্ময়ীর চোখেমুখে ছড়িয়ে থাকা গ্রাম্য সরলতা আর আকুতি। গুলাবির চোখে নরসিং-এর কাছে আত্মসমর্পণের আকুতি, ভালবাসার প্রতীক্ষা। আরেকটু এগোলে দেখা যাবে মহানগরের আরতি আর চারুলতা  কত ভিন্ন প্রকৃতির। একজন অফিসের কর্মী, একইসঙ্গে গৃহবধূ। আরেকজন শুধুই গৃহবধূ। কিন্তু তাদের চাহিদা যেন চোখের আয়নায় অহরহ, মনে পড়ে? পালামৌ-এর জঙ্গলে সাঁওতাল মেয়ে দুলির চোখে হাঁড়িয়ার জন্য আর্তি। আবার আগন্তুকের অনিলার চোখে সভ্যতার লজ্জা, যে লজ্জা তথাকথিত সভ্য কিন্তু নির্লজ্জ মানুষেরা দেখতে পায় না।

আমি এইসব চোখ দেখতে দেখতে ভুলে যাই যে দয়াময়ী বা অপর্ণা বা অদিতি বা তুতুলের চোখ আসলে শর্মিলা ঠাকুরের। মৃন্ময়ী মানে তো অপর্ণা সেন, গুলাবি আর কেউ নয় - স্বয়ং ওয়াহিদা রহমান, আরতি বা  চারুলতা মানে মাধবীর চোখ, দুলি হল সিমি গারেয়াল। ইন্দ্রাণী, তাপ্তি বা অনিলা আসলে মমতাশংকর।  ভাবুন তো, চারুলতায় মাধবী দোলনায় দুলে চলেছে, ক্যামেরা তার সঙ্গে সঙ্গে মুভ করছে যেন গোটা পৃথিবী দুলছে অথবা অরণ্যের দিনরাত্রি-তে শর্মিলা ঠাকুর হাতে বালি তুলে ঝুরো করে উড়িয়ে দিচ্ছে, চোখ একটু  নিচে। কি অদ্ভুত রোমান্টিক! আমি যেন এই সমস্ত শটে একজনকেই দেখতে পাই – ক্যামেরার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মানুষটা। সত্যজিৎ রায়। যার জন্য এইসব চরিত্রগুলো সেলুলয়েড ছেড়ে রক্তমাংসে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে আমার আপনার পাশে হেঁটে এইমাত্র চলে গেল। এরা কেউ স্টার নয়, এরা শুধু বিভিন্ন সময়ে জীবনের একেক চাউনি, একেক পরিচয়।

সত্যজিৎ কিছু চোখ অমর করে গেলেন। আর আমি, পাগল ফকির। ভাবছি পথের পাঁচালীর কান্ট্রি রোড, নোটবুকে হিজিবিজি। নো লাইট, নো সাউন্ড, নো ক্যামেরা, নো অ্যাকশন – শুধু চোখ থেকে ধূপ ছড়িয়ে যাচ্ছে দেখছি, আমার জীবনে, এক সিলুয়েট। The sound of silence. আমি তো আজন্ম চাতক...।


প্রদোষ ভট্টাচার্য

 

বড় পর্দায় হিন্দী ছবি - পর্ব ১১ – ২০১৭ থেকে ‘থ্রিলার’

 


২০১৭ সালের ইত্তেফাক ছবির কাহিনী অভিনবত্বের দাবী রাখে। সাধারণ অপরাধমূলক কাহিনী যেভাবে শেষ হয় তার সম্পূর্ণ বিপরীতে গিয়ে এই ছবির অপরাধী দু-দুটি হত্যা করেও অনুসন্ধানকারী পুলিশ অফিসারকে বোকা বানিয়ে, নিজের অপরাধের সবচেয়ে অপরিহার্য প্রমাণ – দুটি মৃতদেহের প্রথমটি – লোপাট করে অবলীলাক্রমে দেশ ছেড়ে চলে যায়। প্রথম হত্যার কারণও ছিল অপরাধীর আরেক গর্হিত কর্ম – পুরোপুরি নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এক গণধর্ষিতা মহিলার পরিচয় সর্বসমক্ষে রাষ্ট্র করে দেওয়া, এবং এই কাজের বিরূপ প্রতিক্রিয়া এড়াতে সচেষ্ট থাকা। অপরাধী যে শুধু নিজে পালিয়ে যায় তা নয়, তার আগে সে মিথ্যা প্রমাণ সাজিয়ে তার দ্বিতীয় শিকারের স্বৈরিণী স্ত্রী এবং তার প্রেমিককে সেই দ্বিতীয় শিকারের হত্যাকারী সাব্যস্ত করে পুলিশের হাতে বন্দী করায়!

মূল চরিত্রগুলির রূপায়ণে আছেন সিদ্ধার্থ মালহোত্রা, অক্ষয় খান্না, সোনাক্ষী সিনহা এবং মন্দিরা বেদী।

প্রসঙ্গত, অভয় চোপড়া পরিচালিত ইত্তেফাক-এর সঙ্গে যুক্ত ছিল বি আর চোপড়া সংস্থা, যারা ১৯৬৯ সালে একই নাম দিয়ে রাজেশ খান্না ও নন্দা অভিনীত এক অপরাধ কাহিনী চিত্রায়িত করেছিল!

দুটি ছবিরই উৎস ১৯৬৫ সালের হলিউডি ছবি Signpost to Murder, যার পেছনে আছে ১৯৬২ সালে ব্রিটিশ নাট্যকার মন্টে ডয়েল রচিত ঐ নামেরই এক নাটক।



২০১৮-য় মুক্তিপ্রাপ্ত শ্রীরাম রাঘবন পরিচালিত আন্ধাধুন (অর্থ ‘অন্ধ’, ‘বাছবিচারহীন’ এবং ‘বেপরোয়া’)  অপরাধ কাহিনী হবার সঙ্গে-সঙ্গে এক অতি-উপভোগ্য, এবং নির্মম, ‘ব্ল্যাক কমেডি’। পরিচালক ২০১০ সালে নির্মিত স্বল্প দৈর্ঘের ফরাসী ছবি L’accordeur (The Piano Tuner) থেকে দৃষ্টিহীন পিয়ানো-বাদকের চরিত্রটি নেন। পুণে শহরে আকাশ সরাফ (আয়ুষ্মান খুরানা) নিজের পিয়ানো-বাজানোতে উৎকর্ষ আনতে অস্বচ্ছ ‘কন্ট্যাক্ট লেন্স’ পরে অন্ধের জীবন যাপন করে। সোফি নামের একটি মেয়ে (রাধিকা আপ্তে) তার দু-চাকার যান দিয়ে আপাত-অন্ধ আকাশকে ধাক্কা দিয়ে ফেলার ফলে আকাশ অনুতপ্ত সোফির বাবা ফ্র্যাঙ্কোর রেস্তোরাঁয় পিয়ানো বাজাবার বরাত পায় এবং সোফির সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। রেস্তোরাঁয় হিন্দী ছবির প্রাক্তন নায়ক-অভিনেতা প্রমোদ সিনহা (অনিল ধাওয়ান) আকাশের বাজনা শুনে মুগ্ধ হয়ে তাকে বলেন নিজের বিবাহ-বার্ষিকীতে আকাশ যেন তাঁর ফ্ল্যাটে গিয়ে তাঁর স্ত্রী সিমিকে (টাবু) পিয়ানো বাজিয়ে শোনায়।

নির্দিষ্ট দিনে আকাশ প্রমোদের ফ্ল্যাটে পৌঁছলে সিমি তাকে প্রথমে ঢুকতে দিতে চায় না। যখন আকাশ সিমিকে  বোঝায় যে সে অন্ধ তখন উল্টো দিকের ফ্ল্যাটের  প্রতিবেশিনী মিসেস ডি’সার কৌতূহল এড়াতে সিমি আকাশকে  ঢুকতে দেয়। পিয়ানো বাজাতে-বাজাতে আকাশ ফ্ল্যাটে এক মৃতদেহ (প্রমোদের) দেখে। বাথরুম যাবার অছিলায় সে বাথরুমে এক পিস্তলধারী পুরুষকেও লুকিয়ে থাকতে দেখে। এই ব্যক্তি হলো মনোহর (মানব ভিজ), সিমির প্রেমিক। প্রমোদ দুজনকে হাতেনাতে ধরে ফেলায় তারা প্রমোদকে হত্যা করেছিল।

ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে পুলিশে খুনের অভিযোগ জানাতে গিয়ে ‘অন্ধ’ আকাশ দেখে যে থানার ইন্সপেক্টার সেই মনোহর! আকাশ তখন অন্ধত্বের ভান করে নিজের বেড়াল খুন হবার গল্প ফাঁদে। প্রমোদের দেহ নদীতে পাওয়া যাবার পর (মনোহরই সেটি সুটকেসে ভরে নিয়ে গিয়ে সেখানে ফেলে দিয়েছিল) আকাশ প্রমোদের মেয়েকে পিয়ানো শেখাবার দায়িত্ব পায়। আবার প্রমোদ-সিমির ফ্ল্যাটে গিয়ে সে দেখে যে সিমি মিসেস ডি’সাকে বহুতলের বারান্দা থেকে নীচে ঠেলে ফেলে দিচ্ছে, কারণ তিনি পুলিশকে প্রমোদের মৃত্যুর দিন ফ্ল্যাটে এক অজানা ব্যক্তির (মনোহর) ঢোকার কথা বলে দিয়েছিলেন।

এবার সিমি আকাশের ফ্ল্যাটে গিয়ে কৌশলে জেনে ফেলে যে আকাশ দৃষ্টিহীন নয়, এবং মন্দিরের প্যাঁড়ার সঙ্গে বিষ মিশিয়ে খাইয়ে আকাশকে সত্যিই অন্ধ করে দেয়। ইতিমধ্যে সোফি সেখানে উপস্থিত হলে সিমি ভান করে যে সে আকাশের শয্যাসঙ্গিনী। ক্ষুব্ধ সোফি আকাশের সঙ্গে সম্পর্কছেদ করে এবং রেস্তোরাঁতে তার পিয়ানো বাজাতে আসাও বন্ধ করে।

এবার সিমি মনোহরকে আকাশের ফ্ল্যাটে পাঠায় আকাশকে খুন করতে। আকাশ দৃষ্টিহীন অবস্থাতেও কোনরকমে পালিয়ে রাস্তায় টেলিফোন পোলে ধাক্কা খেয়ে জ্ঞান হারায়। জ্ঞান ফিরলে সে দেখে সে ডাঃ কৃষ্ণ স্বামীর (জাকির হুসেন)  ক্লিনিকে শয্যাশায়ী যেখানে ডাক্তার দুই সহচর মুরলী আর সখুকে নিয়ে দেহাংশ পাচারের বেআইনি ব্যবসা চালান। নিজের দুই মূত্রাশয় রক্ষা করতে আকাশ তাদের বুদ্ধি দেয় সিমিকে অপহরণ করে মনোহরকে এক কোটি টাকার ‘ব্ল্যাকমেল’ করতে। মনোহর টাকা দিতে আসার ভান করে মুরলীকে গুলি করে, সখু বহুতলের লিফটের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে লিফটের মধ্যে মনোহরকে আটকে দেয়। ক্ষিপ্ত মনোহর অন্ধকার লিফটের বন্ধ দরজায় গুলি করলে, সেই গুলি ফেরত ছিটকে এসে মনোহরকেই শেষ করে! মুরলীর প্রেমে পাগল সখু মনোহরের দ্বারা গুলিবিদ্ধ মুরলীকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে দেখা যায় যে মনোহর ব্যাগে ভরে বেশীর ভাগ জাল টাকা এনেছিল!

ডাঃ স্বামী এবার অপহৃতা, তাঁর ভাষায় ‘লেডি ম্যাকবেথ’ সিমিকে, গাড়ির বুটে পুরে আকাশকে নিয়ে বিমানবন্দরের দিকে রওনা দেন। সিমির যকৃত তিনি বিক্রী করবেন মধ্যপ্রাচ্যের এক কন্যার কোটিপতি পিতাকে, চোখের তারাদুটি পাবে আকাশ আর মূত্রাশয় দুটি ডাক্তার ছেড়ে দেবেন খোলা বাজারে সর্বোচ্চ দরদাতার উদ্দ্যেশে! মাঝপথে গাড়ি থামিয়ে সিমিকে ঘুমের ইনজেকশন দেবার জন্য বুট খুলতেই সিমি ডাক্তারকে পরাভূত করে গাড়ির চালকের আসনে এসে আকাশকে নেমে যেতে বাধ্য করে। এবার সে গাড়ি দিয়ে আকাশকে পিষে দেবার উপক্রম করে।

দু’বছর পর পূর্ব ইউরোপের কোন এক শহরে সোফি দেখে আকাশ পুরো বাদকের দল নিয়ে পিয়ানো বাজাচ্ছে আর শ্রোতাদের বাহাদুরি কুড়াচ্ছে। আকাশের কাছে সোফি সমস্ত ঘটনা শোনে।

ছবির শুরুতে আমরা দেখেছি একটা খরগোশ বাঁধাকপির খেতে ফসল নষ্ট করছে আর বন্দুকধারী এক পাহারাদার তাকে গুলি মারবার চেষ্টা করছে।

যখন সিমি আকাশকে চাপা দেবার উপক্রম করছিল, আকাশ সোফিকে বলে যে বন্দুকের গুলি ছোটে আর সেই লম্ফমান শশক গুলিবিদ্ধ হয়ে ছিটকে এসে সিমির চালানো গাড়ির কাঁচের পর্দায় ধাক্কা মারে, গাড়ি উল্টে পঞ্চত্ব প্রাপ্তি ঘটে সিমির!

যাবার আগে সোফি বলে যে আকাশের ডাঃ স্বামীর কথা শুনে এই নরঘাতিনী সিমির দেহাংশ নিজের কাজে লাগানোই সমুচিত হতো।

এবার আকাশ তার অন্ধের ছড়ি নিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে ছড়ির এক বাড়ি মেরে রাস্তায় পড়ে থাকা একটা টিনের ক্যান সরিয়ে দেয়। সে কি আগের মতো অন্ধত্বের ভান করছে? অর্থাৎ সে কি সিমির চোখের তারা ব্যবহার করে দৃষ্টি ফিরে পেয়েছে?

ছবির নামকরণ একেবারে যথার্থ। দু’রকম অন্ধত্ব – আসল ও নকল – আছে; সিমি-মনোহরের আচরণ আক্ষরিক অর্থে বেপরোয়া, কিন্তু তাদের ক্রিয়াকর্মের পরিণাম তাদের হিসেবের সঙ্গে মেলে না, ভাগ্যও আক্ষরিক অর্থে বাছবিচারহীন, যার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ, আমার কাছে, বিদ্যুৎহীন বন্ধ লিফটে ক্ষেপে গিয়ে মনোহরের গুলি ছোঁড়া আর  সেই গুলিই ছিটকে এসে মনোহরের পটল তোলা। আরও আছেঃ রাস্তায় পোলে ধাক্কা খেয়ে সংজ্ঞাহীন আকাশের দেহাংশব্যবসায়ীদের খপ্পরে পড়া, আবার সিমির দেহাংশের কল্যাণে আকাশের দৃষ্টি ফিরে পাওয়া, ইত্যাদি।

আন্ধাধুন ২০১৮-র তৃতীয় সফলতম ছবি।



২০১৩ সালের মালয়ালম ছবি দৃশ্যম ২০১৫-তে হিন্দীতে নিশিকান্ত কামাতের পরিচালনায় পুনর্নির্মিত হয়।(দাবি করা হয় যে ছবির কাহিনি ২০০৫ সালের জাপানী উপন্যাস The Devotion of Suspect X অনুপ্রাণিত, যদিও মালয়ালী পরিচালক জীতু জোসেফ একথা অস্বীকার করেছেন।) ২০২১ সালে এই অসাধারণ ও রূদ্ধশ্বাস থ্রিলারের দ্বিতীয় অংশ মালয়ালমে আসে এবং ২০২২-এ তা বলিউড পুনর্নির্মাণ করে। আমার বক্তব্য অভিষেক পাঠক পরিচালিত হিন্দী দৃশ্যম ২ নিয়ে, কারণ ২০২২-এর এই দ্বিতীয় সফলতম ছবিটিই আমি বড় পর্দায় দেখেছি। রহস্যের ঘোরপ্যাঁচ যাঁরা ছবিদুটি দেখেননি, তাঁদের জন্য ফাঁস করব না। বরং কেন এই ছবিদুটি আমার কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, তাই নিয়ে বক্তব্য রাখব।

"কুপুত্র যদি বা হয় কুমাতা কখনো নয়" – একটি সর্বৈব মিথ্যা প্রবচন, যার অসারতা খবরের কাগজের অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্ব দেওয়া, মধ্যের পাতার দিকে নজর রাখলে বারবার প্রকট হবে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ভুবনের মাসীর কথা বলেই ক্ষান্ত দিয়েছেন, কিন্তু বাস্তব জীবনে ভুবনদের কুকীর্তি এবং তার থেকে তাদের প্রাপ্য শাস্তি থেকে তাদের রক্ষা করতে তাদের মায়েরা অনেক বেশী দৃশ্যমান। ২০১৭ সালে – যে বছরে মালয়ালী দৃশ্যম ২ আত্মপ্রকাশ করে – নিউ ইয়র্ক টাইমস প্রতিবেদন রাখে যে একজন নয়, একদল মহিলা ধৃতরাষ্ট্র তাঁদের গুণধর পুত্রদের সমর্থনে বাজার গরম করেন। এই ছেলেগুলি বিভিন্ন কলেজে মেয়েদের ওপর যৌন আক্রমণ চালিয়েছিল। প্রতিবেদনে এক ‘নারীবাদী’ বলে পরিচয় দেওয়া মা এও বলেন, “সত্যিই আমাদের ছেলেদের ধর্ষণ না করার শিক্ষা দেবার প্রয়োজন নেই!” "We don't really need to teach our sons not to rape.”

আমাদের দেশে বিহারের প্রাক্তন সংসদ হেমলতা যাদব তার পুত্র মৃত্যুঞ্জয় ওরফে বাবলুকে প্রতিবেশিনী চম্পা বিশ্বাসকে ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৭-এর মধ্যে একাধিকবার ধর্ষণ করতে সাহায্য করে। মাতা-পুত্রদ্বয় তিন বছরের ওপর জেলের ঘানি টেনেছে।

অষ্টম পর্বে ২০১৬-র কাপুর এ্যান্ড সনস ছবিতে এক কুমাতার কথা বলেছি।

দৃশ্যম­-এ আমরা কী দেখি? ‘ফোর্থ গ্রেড ফেল’ বিজয় সালগাওঁকার (অজয় দেবগণ) গোয়ার পোন্ডালেমে কেবল টিভির ব্যবসা করে সংসার চালায়। বাড়িতে আছে তার স্ত্রী নন্দিনী (শ্রীয়া সরন), পালিতা কন্যা অঞ্জু (ঈশিতা দত্ত) আর ছোট মেয়ে অনু (মৃণাল যাদব)। ইস্কুল থেকে অন্যান্য ইস্কুলের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ক্যাম্পে থাকাকালীন গোয়ার ইন্সপেক্টার-জেনারেল মীরা দেশমুখের (টাবু) কুপুত্র স্যাম/সমীর (ঋষভ চাড্ডা) অঞ্জুর নগ্ন অবস্থায় স্নানরত ভিডিও তোলে। অঞ্জু বাড়ি ফেরার পর স্যাম তাকে নিজের ফোনে সেই ভিডিও দেখায়। ২রা অক্টোবর রাতে সে বিজয়ের বাড়িতে বিজয়ের অনুপস্থিতিতে এসে অঞ্জু এবং নন্দিনীকে ভিডিওটি গণমাধ্যমে ছড়িয়ে দেবার শাসানি দিয়ে যৌন ব্ল্যাকমেল করে। স্যাম এবার তার মাকেও তার কু-উদ্দেশ্যের লক্ষ্য করেছে দেখে দিশেহারা অঞ্জু স্যামের ফোন কেড়ে নেবার চেষ্টায় তাকে এক লোহার রড দিয়ে আঘাত করতে যায় আর দৈবদুর্বিপাকে সে রড স্যামের মাথায় লেগে স্যামের মৃত্যু ঘটায়।

বাকী ছবি জুড়ে আছে বিজয় কিভাবে তার পরিবারের সকলের ঢাল হয়ে দাঁড়ায় তার চমকপ্রদ এবং রূদ্ধশ্বাস চিত্রণ।

এখানেই আসরে অবতীর্ণ হয় হিংস্র প্রকৃতির ‘ক্ষমতায়িতা’ নারী মীরা। আপাত-নিরুদ্দেশ ছেলের ব্যাপারে যেহেতু বিজয় এবং তার পরিবারই সন্দেহের তালিকায়, মীরা দাঁড়িয়ে থেকে দুর্নীতিগ্রস্ত সাব-ইন্সপেক্টার গাইতোন্ডেকে দিয়ে – যে নানা কারণে বিজয়ের প্রতি চরমভাবে বিরূপ – বিজয়, নন্দিনী, অঞ্জু, এমনকি শিশু অনুর ওপরেও বীভৎস শারীরিক নিপীড়ন চালায়, যা চরমে ওঠে যখন মীরা স্যামের সহপাঠীর কাছ থেকে নিজের ছেলের করা ভিডিওটি দেখে। এবার তো মীরা নিশ্চিত যে স্যামকে হত্যা করেছে এই পরিবারই, তা সে ছেলে অঞ্জুর নগ্নাবস্থার চলমান ছবি তুলেছিল তো কী!

দৃশ্যম-এর শেষে ‘ফোর্থ গ্রেড ফেল’ বিজয়ের বুদ্ধিমত্তার কাছে হার মানতে বাধ্য হয় মীরা, তার স্বামী মহেশ (রজত কাপুর), গাইতোন্ডে, সকলে।

দৃশ্যম ২-এর কাহিনি শুরু হচ্ছে আট বছর পর। সমাজে বিজয় এবং তার পরিবার কিন্তু নিন্দিত। অঞ্জুর বিয়ের সম্বন্ধ ভেঙে যাচ্ছে কারণ জনশ্রুতি বলে স্যাম ছিল ‘ভালো ছেলে’ অঞ্জুই তাকে প্রলুব্ধ করে বাড়িতে নিয়ে আসে, তারপর বিজয় বেগতিক দেখে স্যামকে খুন করে! বিজয় এরপর বুদ্ধি খাটিয়ে পুলিশকে ব্যর্থ করে, যার মূলে ছিল স্যামের দেহ লোপাট করা। এবার সেই দেহ পুনরাবিষ্ক্রিত হওয়ার উপক্রম। কোথায় বিজয় স্যামের দেহ পুঁতে রেখেছিল এবং প্রতিহিংসাকামিনী মীরা আর সাত বছর সাসপেন্ড থাকা গাইতোন্ডের হাত থেকে সে নিজেকে আর পরিবারকে কীভাবে রক্ষা করে তা জানতে হলে ছবিটি দেখুন। এবারেও আবার গাইতোন্ডেকে দিয়ে নন্দিনী, মৃগীরোগাক্রান্ত অঞ্জু (কারণ আগের ‘ট্রোমাটিক’ অভিজ্ঞতা) এবং অনুকে নির্মমভাবে প্রহার করাবে কুমাতা মীরা! মীরার বিশেষ লক্ষ্য এবার অঞ্জু কারণ সে আন্দাজ করে ফেলেছে যে স্যামের কীর্তির ফলে অঞ্জুর হাতেই ছেলের মৃত্যু ঘটেছিল। গাইতোন্ডের প্রহারের ফলে অঞ্জু পুলিশ স্টেশনেই মৃগী-আক্রান্ত হয়ে পড়ে, যা তার পক্ষে মারাত্মক হতে পারে বলে এর আগে ডাক্তার বিজয় আর নন্দিনীকে সাবধান করেছিলেন।

এক পিতা স্ত্রী এবং কন্যাদ্বয়কে রক্ষা করার কাজে নিজের বুদ্ধিমত্তা উৎসর্গ করেছে; আর নিজের নীচ স্বভাবের পুত্রের কুকীর্তি জেনেও তার মা’র একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে সেই পিতার এবং তার পরিবারের সর্বনাশ করা।

প্রবচনটি এবার সংশোধন করে বলতে হবে, ‘কুপুত্র যেমন হয়, কুমাতাও কম নয়!’



২০২৪-এ মুক্তিপ্রাপ্ত, শ্রীরাম রাঘবন পরিচালিত এবং ফ্রেদেরিক দার রচিত ফরাসী উপন্যাস Le Monte-charge (The Bird Cage) আধারিত মেরি ক্রিসমাস আপাত দৃষ্টিতে দৃশ্যম আর দৃশ্যম ২ থেকে সম্পূর্ণ অন্যরকম এক রহস্য কাহিনি। কিন্তু, মন দিয়ে দেখলে তিনটি ছবির গল্পে একাধিক সমান্তরলতা প্রকট হয়। দৃশ্যম ছবিদুটিতে এক কুমাতার দাপট দেখেছি, যার বিরুদ্ধে আছে (অনিচ্ছাকৃত) অপরাধে জড়িয়ে পড়া এক পরিবারের চার সদস্য যাদের প্রতি দর্শক সহানুভূতিশীল। মেরি ক্রিসমাস-এ এক কু-পিতা আছে, এবং তার বিপরীতে আছে তার স্ত্রী, কন্যা, এবং স্ত্রীর দ্বারা ঘটনাচক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া এক ব্যক্তি। দর্শক কিছুক্ষণের মধ্যেই স্ত্রী মারিয়ার (ক্যাট্রিনা কাইফ) মুখ থেকে সেই ব্যক্তি, অ্যালবার্টের (বিজয় সেতুপতি) সঙ্গে জানতে পারবে যে মারিয়ার স্বামী জেরোম (লিউক কেনি) তাদের শিশুকন্যা অ্যানির (পরি মহেশ্বরী) ওপর পাশবিক অত্যাচার করেছিল, যার ফলে অ্যানি হয়ে গেছে মূক! জেরোমকে আমরা প্রথম দেখি তার আর মারিয়ার ফ্ল্যাটে মৃত অবস্থায়, এবং তখন মনে হয় যে সে আত্মহত্যা করেছে। অ্যালবার্ট সেখানে উপস্থিত থাকা সত্বেও পুলিশ ডাকতে অস্বীকার করে। সে মারিয়াকে জানায় যে সে নিজের বান্ধবী রোজিকে (রাধিকা আপ্তে) হত্যার অপরাধে সাত বছর জেল খেটে সেই দিনই (দিনটি বড়দিনের আগের দিন) ছাড়া পেয়েছে। অতএব পুলিশ এলে জেরোমের মৃত্যুকে আত্মহত্যা নয়, তার আর মারিয়ার মিলে করা হত্যাকাণ্ড মনে করবে।

এরপর মারিয়া অ্যালবার্টকে ফ্ল্যাট থেকে বার করে দেয়। কিছুক্ষণ পর, রাস্তায় কফি খেতে খেতে অ্যালবার্ট অবাক হয়ে দেখে যে মারিয়া অ্যানিকে নিয়ে আবার বেরিয়েছে (এর কিছু আগে অ্যালবার্টের সঙ্গে মারিয়া আর অ্যানির দেখা হয়েছিল প্রথমে এক রেস্তোরাঁয় এবং তার পরে এক সিনেমা হলে।) এবার চার্চে গিয়ে অসুস্থ হবার ভান করে মারিয়া আরেকজন পুরুষকে ফাঁদে ফেলে, তার নাম রনি (সঞ্জয় কাপুর)। ঠিক অ্যালবার্টের মতো রনিকে মারিয়া নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে যায় এবং জেরোমের মৃতদেহের সামনে ফেলে। রনি পুলিশ ডাকে। পুলিশ ইন্সপেক্টার পরেশ কামদার (বিনয় পাঠক) এবং মহিলা কনস্টেবল লক্ষ্মী (প্রতিমা কাজমী) দুজনেই সন্দেহ করে যে রনি আর মারিয়া মিলে পরকীয়াসুখের জন্য জেরোমকে খুন করেছে। থানায় রনি অ্যালবার্টের কথা বলতে (অ্যালবার্ট রনি আর মারিয়ার সঙ্গে দ্বিতীয়বার ফ্ল্যাটে গিয়েছিল, যে কথা প্রথমে পুলিশকে জানানো হয়নি) সেও জেল-ফেরত খুনের আসামী হিসেবে সন্দেহের তালিকায় চলে আসে।

অবশেষে একের পর এক চমক দিয়ে প্রায় তিন মিনিটের সংলাপহীন, শুধু আবহসঙ্গীত সম্বলিত এক দৃশ্যে কীভাবে ছবি শেষ হয় নিজেরাই দেখুন। দৃশ্যম-এর মতো দর্শক সহানুভূতি কিন্তু আপাত-অপরাধীর দিকেই।

চারটি রহস্য-চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা করলাম। এর মধ্যে একটিতে অপরাধী দুটি খুন করে পুলিশকে প্রথমে বোকা বানিয়ে ও পরে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যায়। আরেকটিতে অনিচ্ছাকৃত মৃত্যু ঘটাবার ফলে এক পরিবার বিপদে পড়ে, আর আমরা মনেপ্রাণে চাই যে উক্ত পরিবার হিংস্র এবং দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশের হাত থেকে মুক্তি পায় – এবং তাইই ঘটে। শেষ ছবিতেও আমাদের সহানুভূতি আপাত-অপরাধীদের দিকেই; যাদের মৃত্যু তারা ঘটিয়েছে, তাদের একজন এক পশ্বাধম পিতা (জেরোম) আর অপরজন এক পরকীয়ায় লিপ্ত পরস্ত্রী (রোজি) যে তার স্বামী এবং তার প্রেমিককে (অ্যালবার্ট) সমানভাবে শোষণ করেছে। একমাত্র আন্ধাধুন-এ আমরা অপরাধীর বিরুদ্ধে এবং কেন্দ্রীয় চরিত্রের পক্ষে, এবং অপরাধীরা দুজনেই অপঘাতে মারা যাচ্ছে।

(ক্রমশ)


শ্রেষ্ঠা সিনহা

 

‘জাহানারা-জাহানারা’; একই মুদ্রার দুই ভিন্নরূপের প্রতিস্বর



 

"পরেন বটে জুতো মোজা, চলেন বটে সোজা সোজা,

বলেন বটে কথাবার্তা অন্য দেশী চালে,

তবু দেখ সেই কটাক্ষ, আঁখির কোণে দিচ্ছে সাক্ষ্য

যেমনটি ঠিক দেখা যেত কালিদাসের কালে।

'কাল' চিরপ্রবাহমান, এবং মুহূর্তে মুহূর্তে তার নতুন ঢেউ। আর যুগের পরিবর্তন ঘটেছে সিঁড়ি ভাঙা নিয়মে...। বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে উন্নত হয়েছে মানুষের জীবনশৈলী, আমূল বদল ঘটেছে তার আচার-আচরণের, কিন্তু নারী জাতির প্রতি বদলায়নি সমাজের সেই ভ্রূ-কুঞ্চন। সভ্যতার আদি লগ্ন থেকে নিপীড়িত, শোষিত কেবলমাত্র নারীই। উনিশ শতকে নবজাগরিত সমাজে জন ড্রিঙ্ক ওয়াটার বেথুন সহ গৌরীশঙ্কর, পণ্ডিত মদনমোহন, নীলকমল বন্দোপাধ্যায়প্রমুখের উদ্যোগে নারীশিক্ষার প্রচলন হলেও বিষয়টিকে কেন্দ্র করে রক্ষণশীল সমাজের বিরূপ মনোভাবের পরিচয় মেলে। সাহিত্যে নারী বীরভজ্ঞা রূপে অঙ্কিত হলেও বাস্তবে সে চার দেওয়ালের বন্ধনে আবদ্ধ প্রাণীমাত্র। রবি ঠাকুরের 'সাধারণ মেয়ে' যতই 'সবলা' হয়ে উঠুক, সমাজের পরীক্ষায় সে বরাবরই অকৃতকার্য হয়েছে।

বাংলা নাট্য-সাহিত্যের ইতিহাস লক্ষ করলে দেখা যায়, নাটক মঞ্চায়নের পর্ব থেকেই নারীদের নামভূমিকায় পুরুষরাই মূলত অভিনয় করত। ১মে, ১৭৮৯ সালে মিসেস ব্রিস্টোর প্রাইভেট থিয়েটারেই প্রথম অভিনেত্রী গ্রহণ করা হয়। পরবর্তী সময় প্রতিষ্ঠিত থিয়েটারগুলিতে মেয়েরা অংশগ্রহণ করলেও সেখানকার সিংহভাগ অভিনেত্রীই ছিলেন পতিতা অর্থাৎ তথাকথিত সমাজ-বর্হিভূতা। সমাজপতিদের রক্তচক্ষু কখনোই যেকোনো ক্ষেত্রে সর্বস্তরের নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণকে মেনে নিতে পারেননি। তাই উচ্চস্তরীয় সমাজের মহিলারা বাংলা রঙ্গমঞ্চের বৃত্ত থেকে ব্রাত্য ছিলেন। পাশ্চাত্যে শেক্সপিয়ারের নাটকে দেখা যায় সেখানকার সব নারীচরিত্র একরকমের নয়। "নায়িকাদের মধ্যে যেমন রয়েছে ওফেলিয়ার মত দুর্বল মানুষ, তেমনি আবার আছে ডেসডিমোনার মত পিতৃআজ্ঞা অবজ্ঞাকারী কন্যা। কেউ জুলিয়েটের মত ঐকান্তিক, কেউ ক্রেসিডার মত পক্ষপরিবর্তনকারী। রজালিন্ড বিদগ্ধ, ক্যাথেরিনা ঝগড়াটে। লেডি ম্যাকবেথ বুদ্ধিমতী, গাট্রুডের মত সরল নয়, মিরন্ডা প্রায় কিছুই জানে না, বিয়েত্রিচ অনেক কিছুই জানে।” বৈচিত্র্যতাস্বরূপ শেক্সপিয়রের নাটকে নারী-পুরুষ সমানাধিকারের তত্ত্বটি প্রতিভাত হলেও তাঁর নায়িকাদের মধ্যে ঐক্যও লক্ষণীয়। "তাঁর নায়িকারা পুরুষের প্রাধান্য মেনে নেয়, মেনে নিয়ে বিয়ে করে কিংবা করতে চায়, আর বিবাহিত নারীরা স্বামীর অনুগামী হয়ে চরিতার্থতা খোঁজে।... তাদের চলাফেরা অনেক সীমিত। তাঁদেরকে কেউ দেখে কাম্যবস্তু হিসাবে। কেউ বা রাখতে চায় ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসাবে। লোভাতুর পুরুষের হাত থেকে বাঁচার জন্য নারীদের ছদ্মবেশ নিতে হয়।"

ইতিহাসে নারী এবং প্রতীক বা চিহ্ন হিসাবে নারীর ভূমিকা সম্পর্কে ঔপন্যাসিক ভার্জিনিয়া উল্ফের মন্তব্যটি এপ্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য: "Imaginatively she is of the highest importance. কিন্তু ব্যবহারিক ক্ষেত্রে নারী সম্পূর্ণ তুচ্ছ, নগণ্য। কবিতার বইয়ের মলাট থেকে সে জুড়ে থাকে; অথচ ইতিহাসে সে অনুপস্থিত। সে রাজা ও যুদ্ধজয়ী বীরদের জীবন নিয়ন্ত্রিত করে উপন্যাসে ও গল্পে। বাস্তবিক পক্ষে যে কোনো বালকের পিতামাতা যদি জোর করে তার আঙুলে আংটি পরিয়ে দেয়, সে হয়ে দাঁড়ায় তার ক্রীতদাস। সাহিত্যে কিছু কিছু অনুপ্রাণিত শব্দ, কোনো কোনো গভীর চিন্তা তার ঠোঁট থেকে ঝরে পড়তে পারে, কিন্তু বাস্তব জীবনে সে কোনো কথা উচ্চারণ করতে পারে না কারণ সে তার স্বামীরসম্পত্তি বিশেষ।"

কালপ্রবাহে মানুষের মননের পরিবর্তন ঘটলেও তার ভাবনার পরিসরের প্রসারণ ঘটেনি। যে কারণে একবিংশ শতাব্দীতেও একজন নারী তার জৈবিক অধিকার স্বরূপ নয়, ধর্ম এবং পেশার ভিত্তিতেই স্বীকৃতি পান।সমানাধিকার তত্ত্ব এক্ষেত্রে মরীচিকা স্বরূপ প্রতিভাত। যার প্রক্ষিপ্ত প্রতিফলন চন্দন সেন প্রণীত 'পছন্দের ৬ নাটক' গ্রন্থভুক্ত 'জাহানারা-জাহানারা নাটকে' দেখা যায়। নাটকটিতে নাট্যকার একাধারে যেমন একবিংশ শতাব্দীতে সমাজে জায়মান পুরুষতান্ত্রিকতার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছেন, ঠিক তেমনভাবেই স্রোতের বিপরীতে হেঁটে চলা জাহানারাদের প্রচ্ছন্ন প্রতিবাদকেও সুস্পষ্ট রূপদান করেছেন।

বাংলা থিয়েটারের অন্যতম জনপ্রিয় নাট্যকার চন্দন সেনের জন্ম ১৯৪৪ সালে। বাবার চাকরির সুবাদে গ্রাম-বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে অতিবাহিত হয় তাঁর ছেলেবেলা। ছেলেবেলা থেকেই পিতার নাট্যপ্রীতি তাঁকে থিয়েটারের প্রতি আকর্ষিত করে তোলে। পরবর্তীকালে অহীন্দ্র চৌধুরির 'সাজাহান' নাটক কিংবা উৎপল দত্তের 'সেতু', 'ক্ষুধা' প্রভৃতি নাটক তাঁর নাট্যচেতনাকে উদীপ্ত করে তোলে। নদীয়ার প্রতিভাবান নাট্য-নির্দেশক প্রয়াত অমল বিশ্বাসের সূত্রেই সত্তরের দশকে নাট্যকার হিসেবে চন্দন সেনের প্রথম পদার্পন। 'নিহত সংলাপ', 'ঝড়ের খেয়া', 'অরাজনৈতিক' দিয়ে তাঁর নাট্যজীবনের সূত্রপাত। আশির দশকের সূচনা থেকে 'দুই হুজরের গপ্পো', 'দায়বদ্ধ', 'কর্ণাবতী', 'অনিকেত সন্ধ্যা', 'স্পর্ধাবর্ণ' ইত্যাদি নাটকের মাধ্যমে চন্দন সেন এবং তাঁর লেখনী চার দশক ধরে বাঙালির নাট্য-অঙ্গনে বহুল আলোচিত ও সমাদৃত। নাটক রচনার পাশাপাশি ইংরেজি সাহিত্যে শিক্ষকতার সূত্রে শ্রী সেনের ভাবনায় ইউজিন, ব্রেখট, গলসওয়ার্দি প্রমুখের সৃজন তাঁর রচনায় বারবার ফিরে এসেছে। এছাড়া গেস্ট-লেকচারার হিসেবে অধ্যাপনা করেছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজনৈতিক বোধ আর সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্রোহ এবং সরকারের সংকীর্ণতা গুঁড়িয়ে দেবার স্পর্ধা বহুবর্ণী লেখার উৎস। 'শ্রুতি নাটক সমগ্র', 'কর্ণাবতী ও অন্ধগলি' এবং 'আমাদের থিয়েটার' চন্দন সেনের জনপ্রিয় শ্রুতি নাটক। হিন্দি, অসমিয়া, ওড়িয়া, তেলেগু প্রায় সব ভাষাতেই চন্দন সেনের নাটকগুলি ভাষান্তরিত হয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নাটক হল 'দুই হুজুরের গপ্পো', 'জ্ঞানবৃক্ষের ফল', 'ব্রেখটের পাঁচটি ছোট নাটক', 'সাধুসঙ্গ', 'দায়বদ্ধ', 'হিসেবের কড়ি', পঞ্চরঙ্গ', 'দেওয়াল লিখন', 'ফিরে এসো প্রেম' প্রভৃতি। নাট্যজগতে অসামান্য কৃতিত্বস্বরূপ সম্মানিত হয়েছেন দীনবন্ধু পুরস্কার, নাট্য আকাদেমি পুরস্কার, নাট্য-সঙ্গীত-নৃত্য-দৃশ্য-কলা আকাদেমি পুরস্কার, সত্যেন মিত্র পুরস্কার এবং পার্থপ্রতীম চৌধুরী পুরস্কারে।

উনিশ শতকে বাংলায় পাশ্চাত্য শিক্ষা অনুসৃত যে নবজাগরণ ঘটেছিল, তার প্রতিফলন ধরা পড়েছিল সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক নানা ধারার কর্মকান্ডের মধ্যে। পূর্ববর্তী যাবতীয় সাহিত্যকলা পদ্য মাধ্যমে রচিত হলেও; এই শতাব্দীর সূচনা পর্ব থেকে বাংলা গদ্যের বা নাটকের বিকাশ লক্ষ্য করা যায়। পাশ্চাত্য সাহিত্য সংরূপের অনুসরণে বাংলাসাহিত্যে ধীরে ধীরে জন্মলাভ করে বিভিন্ন প্রকার সাহিত্য সংরূপ; নাট্যসাহিত্যের ধারা তার মধ্যে অন্যতম। ফলে উনিশ শতকে রচিত বাংলাসাহিত্যের সকল সংরূপে অভিনবত্ব ও বৈচিত্র্যের পরিচয় পাওয়া যায়। সময়ের পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে পাশ্চাত্যসাহিত্যের ড্রামার প্রভাবে বাংলা সাহিত্যে নাটকের সূচনা হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্য পর্বে, তারাচরণ শিকদারের কলমে (ভদ্রার্জুন, ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে)। ওই বছরই প্রথম বাংলা ট্রাজেডি নাটক 'কীর্তিবিলাস' রচনা করেন যোগেন্দ্রচন্দ্র গুপ্ত। এরপর হরচন্দ্র ঘোষের 'ভানুমতিচিত্তবিলাস', 'চারুমুখ চিত্তহরা' ও উমেশচন্দ্র মিত্রের 'বিধবা বিবাহ' রচিত হয়। পরবর্তীকালে কালীপ্রসন্ন সিংহ, রামনারায়ণ তর্করত্ন, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, দীনবন্ধু মিত্র, মনমোহন বসু, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখের কলমে পরিপুষ্টতা লাভ করে বাংলা সাহিত্যের এই সংরূপটি।

রেঁনেশাপুষ্ট সময় থেকে পরবর্তী শতাব্দীতে ক্রমউত্তরণের ক্ষেত্রে যুগগত পরিবর্তনের পাশাপাশি মানুষের জীবনশৈলী এবং আর্থ-সামাজিক পটভূমিরও বিবর্তন সাধিত হয়েছে। স্বভাবতই নাট্যসাহিত্যের দর্পনেও প্রতিফলিত হয়েছে এই ক্রমবিবর্তনের রেখাচিত্র। সমকালীন সমস্যার সঙ্গে সঙ্গে নাট্যকারের কলমে স্থান পেয়েছে মানুষের মনের গহনকোণে থাকা সুপ্ত বাসনাসহ তার মনস্তাত্ত্বিক দ্বিধা-দ্বন্দ্বের কাহিনি। 'জাহানারা-জাহানার' নাটকটি প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখযোগ্য। এই নাটকের মূল কেন্দ্রে আছে ক্যানিং থেকে নাম বদলে কলকাতার 'ধর্মপ্রাণ' অভিজাত বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করতে আসা জাহানারা তথা তার মত নারীদের জীবন-কথা। সঙ্গে ইচ্ছেমৃত্যু বা মার্সিকিলিং-এর পরোক্ষে পাশে দাঁড়ানো এক যন্ত্রণা-দগ্ধ জীবনকথা। এছাড়া ‘শ্যামা’, ‘নীপা’, ‘রাজারাম’ কিংবা ‘প্রফেসর অমর্ত্য সান্যাল’ এবং ‘বিনীতার’ জীবনকথাও পাঠকের দৃষ্টি এড়ায় না। নাটকের প্রতিটি চরিত্রই সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধি স্বরূপ চিত্রিত। রেঁনেশাবিধৃত বাঙালি সমাজ নবজাগরিত হলেও তার মননে সেই সনাতনী ধর্মজ্ঞান বিরাজমান। যে কারণে জঠর-জ্বালা নিবারণের জন্য যে কারণে প্রতি মুহুর্তে ‘জাহানারা’ কিংবা ‘শামিমা’দের সত্ত্বাবদলের পথ অবলম্বন করতে হয়। ধর্মান্ধ সমাজপতিদের চোখে তাদের পরিচয় বিধর্মী, তাই স্রোতের অনুকূল প্রবাহে গা ভাসিয়ে জাহানারা কিংবা শামিমা সমধর্মী রঙিন মোড়কে আবৃত করে সমগ্র দুনিয়ার কাছে 'জুলি' কিংবা 'শ্যামা' হিসাবে পরিচিত হয়। দক্ষতা, যোগ্যতা কিংবা মনুষ্যত্ব নয়, সঙ্কীর্ণ ধর্মবোধই হয়ে ওঠে একজন মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা নিবারণের অপরিহার্য শর্ত। অথচ এই বিধর্মী নারীদের ভোগের বস্তু হিসাবে গ্রহণ করতে নারীপিপাসু সমাজের বিন্দুমাত্র সংকোচ বোধ হয় না। কিন্তু শুধুমাত্র কি বিজাতীয় ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ! জ্ঞানের ধ্বজাধারী শিক্ষিত সমাজ কী নিজেদেরকে সম্পূর্ণ শিক্ষিত করতে পেরেছে? পাঠক কে এ প্রশ্নে আর একবার ভাবিত করে প্রফেসর অমর্ত্য সেন ও তার পারবারিক পরিমণ্ডলের অধিবাসীরিরা। কালের প্রবাহমানতায় সময়ের পরিবর্তন হলেও পরিবর্তিত হয়নি মানুষের সংস্কারী রীতি-রেওয়াজ তথা মানসিকতার। বদল ঘটেনি রক্ষণশীলসমাজের বর্ণভেদ প্রথার। বিদ্যাসাগর সহ অন্যান্য সমাজসংস্কারকরা নারীপ্রগতিকে প্রাধান্য দিলেও পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারী বলতে কেবল 'নিত্যসুখ প্রদায়িনী' অন্তঃপুরিকাদের নির্দেশ করে। একজন অন্তঃপুরিকাও যে নিজগুণে পুরুষের সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারে দুনিয়া এ মতে বিশ্বাসী নয়।

যার প্রত্যক্ষ উদাহরণ অধ্যাপক সেনের স্ত্রী নীপার প্রতি প্রভাতরঞ্জন সান্যালের অবহেলিত আচরণ, "সান্যাল বাড়ির বউরা টাকার জন্য কখনো বাইরের কারোর কাছে আবেদন করে না।" প্রভাতবাবুর মতে তার পুত্র নাপিত বংশীয় সহপাঠিনীর সঙ্গে প্রণয়ালাপ করলেও অমর্ত্যবাবুর স্ত্রী রূপে একজন কুলীন ব্রাহ্মণ কন্যাই বাঞ্ছনীয়। ঘটনাক্রমে নীপা দেবী 'নাপিত বংশীয়' হওয়ায় শাস্ত্র মতে প্রায়শ্চিত্ত করিয়ে তাকে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে সান্যাল পরিবার। কিন্তু এখানেই থেমে থাকে না সান্যাল পরিবারের সনাতনী জ্ঞান; পারিবারিক যে কোনো অনুষ্ঠানে নীপা সান্যালের অংশগ্রহণ তাদের ভ্রু-কুঞ্চন বৃদ্ধি করে। যার দরুণ প্রফেসর সেনকে তার বাবার রক্ষণাবেক্ষণের কাজে 'একজন খাঁটি ব্রাহ্মণ ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাপয়েন্ট' করতে হয়। বিধর্মী সমাজের প্রতি বিদ্বেষ তো জগতের অন্যতম জায়মান সত্য। কিন্তু বিধর্মী নারীকে ভোগ করা কোনো ধারার অপরাধ নয়। অথচ একজন বারগণিকা মা-এর সন্তানকে মর্যাদা দিতে সেই পৃথিবীই লজ্জাকাতর হয়ে পড়ে। যার অন্যতম কারণ নবজাতকের পিতৃপরিচয় হীনতা। মাতৃগর্ভে একজন সন্তান দশমাস দশদিন ধরে লালিত হওয়ার পর পৃথিবীর আলো দেখলেও, সন্তানের পরিচয়ের ক্ষেত্রে আজ একবিংশ শতাব্দীতেও পিতৃপরিচয় অদ্বিতীয় শর্ত। তাই বারগণিকা ‘জুলি’ ওরফে জাহানারা খাতুনের সন্তান বিনীতাকে সম্পূর্ণ পরিচয়হীনভাবেই অরফ্যানেজহোমে কাটাতে হয় জীবনের ১২টা বছর।

স্রোতের বিপরীতে হেঁটে আত্মজার পরিচয় গঠনে ধনুকভাঙা লড়াই শুরু করে জাহানারা খাতুন। যে লড়াইয়ে নিজেকে বাজি রাখতেও পিছপা হয়না তার মাতৃসত্তা। সমাজ তাকে যৌনকর্মী ‘জুলি’ হিসাবে স্বীকৃতি দিলেও বস্তির কুঁড়েঘরে বসে জাহানারা বিনীতার আকাশছোঁয়া মুহুর্তের রেখাচিত্র অঙ্কন করে। এখানেই শেষ হয় না তার সংগ্রাম; নারীলোলুপ পিশাচদের দাঁত, নখ, শিকার থেকে বিনীতাকে রক্ষা করার জন্য সংহারিণী রূপধারী জাহানারার উক্তি সমগ্র মানবসমাজ কে আরও একবার প্রশ্নের সম্মুখীন করে, " আপনারা আমার মতো পাপী নষ্ট মেয়ের জন্য কোনো দোয়া মাঙবেন না, কিন্তু ওই বাচ্চা মেয়েটাকে দেখবেন... দেখবেন তো?...”

"ফুল ছুঁয়ে যায় চোখের পাতায়, জল ছুঁয়ে যায় ঠোঁটে

ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি রাত থাকতে ওঠে

শুকতারাটি ছাদের ধারে, চাঁদ থামে তালগাছে

ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি ছাড়া কাপড় কাচে

দু-এক ফোঁটা শিশির তাকায় ঘাসের থেকে ঘাসে

ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি ট্রেন ধরতে আসে

ঘুমপাড়ানি মাসিপিসির মস্ত পরিবার

অনেকগুলো পেট বাড়িতে, একমুঠো রোজগার

ঘুমপাড়ানি মাসিপিসির পোঁটলা পুঁটলি কোথায়?

রেল বাজারের হোমগার্ডরা সাত ঝামেলা জোটায়

সাল মাহিনার হিসেব তো নেই, জষ্টি কি বৈশাখ

মাসিপিসির কোলে-কাঁখে চালের বস্তা থাক

শতবর্ষ এগিয়ে আসে শতবর্ষ যায়

চাল তোলো গো মাসিপিসি লালগোলা বনগাঁয়"

'জাহানারা-জাহানারা' নাটকটির মূল কেন্দ্রে রয়েছে ক্যানিং থেকে নাম বদলে কলকাতার 'ধর্মপ্রাণ' অভিজাত বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করতে আসা এই রকমই 'মাসিপিসি' অর্থাৎ একশ্রেণির অসংগঠিত শ্রমিকদের জীবনপঞ্জি। নাটকটিতে জাহানারা চরিত্রটিকে বহুমুখীচরিত্র হিসেবে অঙ্কন করেছেন নাট্যকার চন্দন সেন। কোথাও সে এই সমাজের 'ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি' বা পরিচারিকাদের প্রতিনিধিত্ব করেছে। কোথাও বা বারগণিকাদের প্রতিনিধি আবার কোথাও স্বপ্নপ্রত্যয়ী মাতৃসত্ত্বার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে জাহানারা খাতুন চরিত্রের মধ্য দিয়ে।

আলোচ্য ক্ষেত্রে 'ওয়ার্ক অ্যাসিসটেন্ট' রূপে চিত্রিত জাহানারাদের পেশার দিকে লক্ষ করলে দেখা যায়, তাদের নির্দিষ্ট কোনো সংগঠন নেই, নেই কোনো কাজের নিশ্চয়তা। কেবলমাত্র কায়িক পরিশ্রমই তাদের উপার্জনের এক এবং অদ্বিতীয় পথ। স্রোতে শ্যাওলার মত ভেসে চলাই তাদের দিনলিপি; "রবীন্দ্রনাথ যাদের সভ্যতার পিলসুজ বলেছিলেন, তারা দেশের শ্রমজীবি, ভূমিজীবি মানুষ। কিন্তু প্রাত্যহিক সংসারের কাজের মাসি, ঝি-চাকর-ঠাকুর যারা, তাদের কথা তেমন বলেননি।” যুগ বদলেছে, পরিবর্তিত হয়েছে সমাজপ্রক্ষিতও। ঝি-এর আধুনিক নাম হয়েছে কাজের মাসি ওরফে পরিচারিকা। ফলে তাদের পরিধিরও কিছুটা প্রসারিত হয়েছে। তারা একাধারে ঠাকুর এবং ঘরকন্নার কাজ করে। সময়ের গতিতে পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গে এই অসংগঠিত শ্রমিকদের অবস্থানেও পরিবর্তন ঘটেছে। স্বাধীনতা ও মুক্তির স্বাদ স্পর্শ করেছে তাদের মরুপ্রান্তর। কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ তাদের সাময়িক স্বস্তির মত, পরিচারিকাদের অন্ধকারের কালো আকাশে সেই স্বস্তি যেন একফালি চাঁদের মত উঁকি মারে। যা তাদের পরিবারে নিয়ে আসে আশা-প্রত্যাশা তথা স্বপ্নপূরণের হাতছানি। কিন্তু আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার যুগেও কোনো মানুষের পেশাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে তার 'ধর্ম' অর্থাৎ তার ধর্মীয় পরিচয়ই প্রতিকূলতার সৃষ্টি করে।

উচ্চবর্গীয়দের মধ্যে এই অবস্থার অত্যাধিক প্রভাব দেখা না গেলেও; প্রান্তিক সমাজের মধ্যে এর গুরুতর প্রভাব লক্ষ করা যায়। প্রসঙ্গক্রমে এই অবস্থারই প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছেন নাটককার। জাহানারা থেকে কখনো 'জুলি' কখনোবা 'জুঁই ব্যানার্জী' প্রয়োজন মাফিক তার এই পরিচয়বদলের ঘটনাই এই ঘটনার স্বপক্ষে যুক্তি দেয়। কিন্তু আর পাঁচটা মায়ের মতন করে নয়, অগোচরে থেকেই জাহানারা প্রত্যাশিত ভোরের স্বপ্ন দেখে। একদিকে 'কর্ণে'র মতো বেড়ে চলে 'বিনীতা' ধীরে ধীরে পরিচিত হতে শুরু করে নিজ পরিচয়ে; অন্যদিকে 'কুন্তী'র মত দূর থেকে সন্তানের অজ্ঞাতবাসে বসে স্বপ্ন দেখে, "একটা নতুন ফ্ল্যাট কিনব দাদা...তার জন্য টাকা জমাচ্ছি... একটু বড় হলে ও নিজের ফ্ল্যাট থেকে কলেজ যাবে... চাকরি করবে...এই নরকের ঠিকানা তো সে কোনোদিন জানবে না... জানাবোই না।" তাই পরি বিনীতার স্বপ্ন-প্রত্যয়ী আশা-আকাঙ্খা পরিপূর্ণের জন্যে যে-কোনো মূল্যে অর্থ উপার্জনই জাহানারার একমাত্র লক্ষ্য, কারণ তার-

"মাথার উপরে কোনো সূর্য নেই, চন্দ্র নেই

ভূমি তলে কোনো বৃক্ষ নেই…’’

মহাকবি কালিদাস লিখেছিলেন--'অর্থো হি কন্যা পরকীয়া এব'; অর্থাৎ কন্যা মানে পরের সম্পদ। এই মনোভাব থেকেই কন্যা সন্তানকে অপরের সম্প্রদান করে ক্ষান্ত হন পিতামাতারা। যার ফলে সমাজ ও রাষ্ট্রের সার্বিক অগ্রগতি আজও চোরাবালি আচ্ছন্ন। কাজী নজরুল ইসলাম 'নারী' কবিতায় বলেছেন, "বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,/অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর'। অথচ মেয়েদের সার্বিক উন্নয়নে সমন্বিত না করে তাদের অসূর্যস্পশ্যা রূপে রেখে তাদের অন্তর্নিহিত শক্তির অপচয় সাধন করা হয়। সে যতই দেশ-কাল-সময়ের বিবর্তন ঘটুক না কেন নারী যে কেবলমাত্র ভোগ্যবস্তু হিসেবেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে এই বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।

"লিঙ্গ রাজনীতির চেনা ছকে সচেতনভাবে নারীত্বের যে অবয়ব গড়ে ওঠে সেখানে সে নিতান্তই 'মেয়েছেলে'। পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় নির্মিত 'নারী' এবং তার বিভিন্ন প্রতিশব্দের বুৎপত্তিতে রয়েছে তার 'পরনির্ভরতা' তার লতার মত বেষ্টনশীলতা তার সেবাপরায়ণতা-এককথায় তার অসম্পূর্ণতা। শাস্ত্রীয় অবরোধ ও সামাজিকীরণের সিলমোহর সহযোগে ভারতীয় প্রেক্ষিতে পুরুষতন্ত্র আবহমানকাল থেকেই নারীর 'ভুবন' নিয়ন্ত্রণ করেছে। প্রসঙ্গত, সিমোন দ্য বোভেয়ারের বিখ্যাত মন্তব্য স্মরণযোগ্য-'কেউ নারী হয়ে জন্মায় না, সমাজই তাকে নারী করে তোলে।' তাইতো সতীত্বের গৌরবে গরবিনী চিরকালীন নারীর 'আর্কেটাইপ' সীতার নিজের কোনো ঘর হয় না। মেয়েমাত্রই যেন চির উদ্বাস্তু, চির নির্বাসিত।”

পিতৃতান্ত্রিক সমাজের চোখে "নারীই সব। নারীর মধ্যেই থাকে আদিম landscape। এবার নগ্ন-নারীর মধ্যেই থাকে আদিম বন্যতা। নগ্নতা একটা আর্ট। মনের গহন থেকে উঠে আসা অনেকগুলো চেতনার, অনেকগুলো জমে থাকা গ্লানির যোগফল হল নগ্নতা।  ‘পছন্দের ৬ নাটক’-এ এই চিন্তাধারাই প্রতিফলন দেখা যায় 'জাহানারা-জাহানারা' নাটকের জাহানারা এবং শামিমা চরিত্রের মধ্যে। "সোনারপুর স্টেশনের আগে রেললাইনের পাশে গড়ে ওঠা বহুদিনের বস্তির মধ্যে হাল আমলে তৈরি টালি দেওয়া সিমেন্টের ঘরে থাকা জাহানারা বা শ্যামারা অস্তমিত সূর্যের সঙ্গে সঙ্গে জঠর পূর্তির সহ দৈনন্দিন চাহিদা পূরণের দায়ে বেশ কিছু পারভার্ট মানুষের কামনার শিকার হয়। যার একমাত্র উপহার অসম্মান, চক্ষুলজ্জা। অথচ ওইসব নারীপিপাসুরাই সমাজের বুকে তাদের ধর্মবোধের জ্ঞানাস্ফালন করতে পিছপা হন না। কারণ সমাজে তারা উচ্চস্তরে আসীন এবং একটি নির্দিষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণিভুক্ত। তাই তাদের আছে আত্মসমপর্ণের মাধ্যমে প্রাত্যহিক চাহিদা পূরণের জন্য ছদ্মবেশ ধারণ করতে হয় জাহানারা র মতন মেয়েদের; হয়ে উঠতে হয় জুলি কিংবা শ্যামা। শামিমাকে তাই সিঁথিতে লম্বা করে আর কপালে গোল করে সিঁদুর পরে আইন মতে, শাস্ত্র মতে 'শ্যামায়' রূপান্তরিত হতে হয়। তার জবানীতে ব্যক্ত হয় সে ঘটনারই প্রতিধব্বনি, "কত বিদ্বান বুড়ো ধাম্মিক বামনঠাকুর আমায় ইয়ে সিনেমায় ঢোকে...হলে লাইট নিভলে প্রথমেই নাম শুধোয়... শামিমা বললে ওদের হাত, ওদের পৈতে বাঁধা বডি বাওয়ালি করতে" পারবে না, বরফ হয়ে পড়বে। নারীলোলুপ সমাজের প্রতি ব্যঙ্গ করে বলে সে বলে, "ঠাকুরের জাততো...হোলডে কত্ত দেবতাকে পুজো চড়িয়ে ওঁরা সিনেমায় আসেন...ওদের হাত হায়ে লাগলেই মনে হয় গায়ে পুণ্যি লাগছে।... পদ্দার সামনে আমার গায়ে ঠাকুরের পুন্যি ধূপ, চন্দন-বেলপাতার গন্ধ মাখা হাত দিয়ে গঙ্গাজলের মতন আমায় ধুয়ে দিচ্ছে।”

একবিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানের উত্তাল অগ্রগতি ঘটলেও অপসৃত হয়নি গোত্রবাদ বা বর্ণমহিমা। "মুসলমানের খোদা তো নিরাকার, বিমূর্ত, শোনা যায় হিন্দুরও চূড়ান্ত ঈশ্বর নিরাকার; নিরাকার-নিরঞ্জন” আকাশলীনা সারা বিশ্ব এই সম্পর্কে অবগত হলেও তাদের সেই জ্ঞান পুথিগত বিদ্যার স্তূপে আবৃত। অধ্যাপক অমর্ত্য স্যানাল তার বাড়ির ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসাবে একজন 'খাঁটি ব্রাহ্মণ'কে নিযুক্ত করার বিষয়টিকে আলাদা করে দেখতে নারাজ। বর্হিবিশ্বের কাছে 'সাম্প্রদায়িকতা আর কুসংস্কার' সম্বন্ধে তিনি বাংলার সেরা বাগ্মী, তার পরিবার অশিক্ষিত না হলেও ভীষণ প্রাচীনপন্থী। অতএব পরিবারের এহেন মতাদর্শ তার কাছে অসঙ্গতিপূর্ণ নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত অধ্যাপক স্যানালের তথা ধর্মান্ধ মানুষের নজর এড়িয়ে, "ক্যানিং-এর জাহানারা খাতুন...সারারাত্রি ধরে মাংস খুবলাতে দেওয়া শরীরটাকে এই সালোয়ার, এই কামিজ, এই মাঞ্জামারা পোশাক, এই চাম্পু চশমায় সাজিয়ে বালিগঞ্জ স্টেশনের লেডিজ টয়লেটে ঢুকবে। শাড়ি পরবে, শাঁখা-সিঁদুর পরবে...সারাদিনের মতো জাহানারা হাত, পা, বডি, মাথা বন্ধক দিয়ে জুঁই ব্যানার্জী হয়ে বালিগঞ্জের সান্যাল বাড়িতে ল্যান্ড করবে। ৭৫ বছরের ধম্ম খুঁতখুঁতানি এক গস্তানিরের খিদমত খাটবে... ঠাকুরের ঘরের পুজোর বাসন মাজবে... শাঁখ বাজাবে, উলু দেবে... তারপর সন্ধ্যায় ঘরে ফিরবে জাহানারা আবার জুলি...।"

“যত্র নাৰ্য্য–পূজ্যন্তে রমন্তে তত্র দেবত : বা ‘নারী তু নারায়ণী’ শাস্ত্রে এমনতর আমাদের দেশে সে যুগেও ছিল--- এ সময়েও দুর্লভ নয়। কিন্তু প্রকৃত সত্যটা কি তা আমরা সকলেই জানি। অনিবার্যভাবে বিবাহ নামক সামাজিক ব্যবস্থাপনায় কথা আসে। বিবাহের সবকটি মন্ত্রেই উচ্চারণ করে বলা হয় স্ত্রী যেন চিন্তায় ও কাজে স্বামীর অনুবর্তিনী হয়, স্বামীর চিত্তের অনুগামিনী হয়। কোথাও বলা নেই, স্ত্রীরও চিত্ত বলে একটা কিছু আছে এবং স্বামীকে তার প্রতি অনুকূল হতে হবে। মধ্যে মধ্যে শোনা যায়,সুন্দরী বধূ স্বামীর প্রেম লাভ করে—(শতপথ ব্রাহ্মণ ১৩/১/৯৬)। এতে বধূকে দেহমাত্র সার করে দেখা হয় এবং তার যে অন্য কোনো আকর্ষণ থাকতে পারে সেকথা শাস্ত্রে কোথাও স্বীকৃতি পায়নি।”

সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে বসবাসকারী আপডেটেড আধুনিক সমাজ অসমধর্ম তো বটেই সমধর্মের মধ্যেও আতসকাচ নিয়ে বর্ণভেদ অন্বেষণে অগ্রণী। লালন ফকির যতই বলুন না কেন নারীর মধ্যেই রয়েছে মানুষের সম্পূর্ণতা, নারীর কোনো জাত নেই। কিন্তু "বেদ ও ধর্মাচারে শূদ্র ও নারীর অধিকার নেই। বিয়ে হলে নারীর গোত্র ও ধর্মবদল হয়। পুরুষের হয় না। নারীর মুসলমানি হয় না, পৈতে হয় না। উচ্চবর্ণে বিয়ে হলে নারী উচ্চবর্ণ লাভ করে।”আকাশলীনা উচ্চশিক্ষিত সমাজ যে এই বিষয়ে অতিরিক্ত অবগত তার জ্বলন্ত উদাহরণ অমর্ত্য সেনের স্ত্রী নীপা শীলের প্রতি সান্যাল বাড়ির অবহেলিত, অমানবিক আচরণ। আসলে নাপিত বংশীয় সহপাঠিনীর সঙ্গে প্রেম করলেও তাঁকে বিয়ে করাটা ‘সান্যাল বাড়ির’ পক্ষে অসম্মানজনক, তাই বিয়ের পরে পুত্রবধূকে শাস্ত্রমতে তাঁকে ‘শুদ্ধ’ প্রায়শ্চিত্ত করিয়ে নিয়েও ক্ষান্ত হননি প্রভাতরঞ্জন সান্যাল। বাড়ির একজন ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট ব্রাহ্মণ হওয়ার দরুণ যেটুকু অধিকার পায়, যেটুকু সম্মান পায় তার সিকিভাগও নীপাদেবীর প্রাপ্য নয়। প্রভাতবাবুতাই বলেন, “অমাবস্যা লেগে গেছে। এই সময় সিঁড়ি স্পর্শ করা কি ঠিক হল বউমা?”। অথচ প্রফেসর সেনের কাছে এটি অন্যান্য বিষয়ের মতনই সাধারণ একটি বিষয়। কারণ পাঁচ বছর আগে প্রভাতবাবুই ‘initial hesitation’-এর পরেও অমর্ত্য ও নীপার বিয়েটা মেনে নিয়েছিলেন।

তাই প্রভাতবাবুর এহেন সংস্কারের সঙ্গে আপোষই তাদের একমাত্র কর্তব্য বিষয়। কিন্তু শুধুমাত্র এখানেই সমাপ্তি পায় না কুসংস্কারের ঘেরাটোপ। তার রক্তচক্ষু ধীরে ধীরে গ্রাস করতে থাকে নীপা দেবীর ব্যক্তি-স্বাধীনতাকেও। প্রফেসর সেনের উক্তিতে সুস্পষ্ট হয় বিষয়টি, “সান্যাল বাড়ির একটা ঐতিহ্য আছে, আমার বাবা প্রভাতরঞ্জন সান্যাল এখনও জীবিত। তিনি বলেন, বাড়ির বউরা কখনও বাইরের কারোর কাছে আবেদন করে না। তোমার যা টাকা লাগবে মাসে মাসে তা তুমি নিয়ে যাও কিন্তু। প্লিজ, সান্যাল বাড়ির বউ হয়ে...।” “আসলে, প্রাচীন-মধ্যযুগীয় নারী কেন্দ্রিক ধর্ম-মনুবাদী পৈছিক ফতোয়ার সম্প্রসারণ হিসেবেই যেন উনিশ শতকীয় নব্য নীতিবাগীশতা গড়ে উঠলো। পাশ্চাত্য শিক্ষা ও খ্রিস্টীয় ভিক্টোরিয় মতাদর্শ নির্মিত নব্য নৈতিকতা নতুনভাবে মেয়েদের স্বভূমি নির্মাণে বিধিনিষেধ আরোপ করে। পাশ্চাত্য শিক্ষা একাধারে সেদিন বদ্ধ সমাজের অন্দরের দরজা খোলার প্রক্রিয়া যেমন শুরু করেছিল; তেমনই পোশাকবিধি, শ্লীলতা, শুচিবাই ইত্যাদি নব্য আইডিয়া দিয়ে মহিলাদের মানবিক ও শারীরিক চাহিদাগুলি নিয়ন্ত্রণ করা হতে থাকে। ভদ্রলোক বাঙালির ‘গৃহলক্ষ্মী’ আর ভিক্টোরিয়া ‘অ্যাঞ্জেল ইন দ্য হাউস’ মিলেমিশে একাকার হতে চায়। এরই ফলশ্রুতিতে ঔপনিবেশিক বাতাবরণে বাঙালি ভদ্রলোকেরা অন্দরমহলের সহজ চলাফেরাগুলি অবরুদ্ধ করতে থাকেন।” একদিকে পিতৃতান্ত্রিক স্টিরিওটাইপ রমণী নির্মাণের প্রক্রিয়ায় স্ত্রী শিক্ষাকে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে নস্যাৎ করার প্রবণতা যেমন ছিল ঠিক তেমনিভাবেই নারীদের জন্য নারী সম্পাদিত পত্রিকাগুলিতেও পিতৃতন্ত্র নির্ধারিত নৈতিক চিত্রায়ণ স্পষ্ট রূপে দেখা গিয়েছিল। সময়-কাল-যুগ পটভূমি অতিক্রম করে যার সুচিহ্নিত রেখা আজও সমাজে বিদ্যমান।

“ওই দেখ বেশ্যা যায়

বেশ্যার শরীর অবিকল মানুষের মতো,

মানুষের মতো চোখ, ঠোঁট,

মানুষের মতো হাত, হাতের আঙুল,

মানুষের মতো তার হাঁটা, পোশাক-আশাক

মানুষের মতো হাসে, কাঁদে, কথা বলে—

তবুও মানুষ না বলে তাকে বেশ্যা বলা হয়।

বেশ্যারা সকলে নারী, কখনো পুরুষ নয়!!”

পাঠককে প্রশ্নে আবারও ভাবিয়ে তোলে জাহানারা খাতুন ওরফে ইসলামপুর বস্তির জুলির কর্মজীবন। সমাজের কিছু হিংস্র জানোয়ারের জৈবিক প্রবৃত্তি মেটানোর জন্য এবং অন্নসংস্থানের জন্য বাধ্য হয়ে কিছু নারীকে বেছে নিতে হয় বেশ্যাবৃত্তিকে। কিন্তু তারাও যে অন্যান্য মানুষের মতই রক্ত-মাংসের জীব এই ধারণা সমাজ ভুলে যায়। কারণ “গোটা দুনিয়া শুধু শরীর চায়। নারী শরীরেরমাংস চায়।” শাপেমাচন তাকে রক্ষা করার ক্ষমতা সমাজের নেই, সে কেবল নারী মনের বলপরীক্ষা করতে সচেষ্ট। “ঋগবেদের যুগে অবশ্য নারীর অবস্থান কিছুটা উন্নত ছিল। লোপামুদ্রা, অপালা, মৈত্রেয়ী, যমী, বসুন্ধের পত্নী, সূর্যা, উর্বশী, পৌলমীদের কথা মনে পড়বে। পারিবারিক কাঠামোয় কর্তৃত্ব সে পূর্বে পুরুষের হাতে থাকলেও নারীরাই ছিল একান্তবর্তী পরিবারের অভ্যন্তরীণ কর্ত্রী। কিন্তু, উত্তর পর্বে ব্যবস্থাটির পরিবর্তন ঘটে। কৌম সমাজ ভেঙে গিয়ে গোষ্ঠীগুলি পিতৃতান্ত্রিক পরিবার ব্যবস্থায় পরিবর্তিত হয়ে গেল। এবং এই সময় থেকেই সমাজে নারীয়া অর্থনৈতিক দিক থেকে পুরুষের ওপর একান্ত নির্ভরশীল হতে শুরু করলো। স্বভাবতই নারীর সামাজিক অবমূল্যায়ন পর্বেরও সূত্রপাত ঘটেছে। বস্তুত, যাযাবর সমাজ কৃষিজীবী স্থিতিশীল হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই পারিবারিক সম্পদের সুরক্ষার জন্য পুত্র সন্তানের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে।

পুরুষ প্রধান সামন্ততান্ত্রিক সমাজে নারীরা শ্রমিক অবনমন তাই অনিবার্য হয়ে ওঠে। শতপথ ব্রাহ্মণের দৃষ্টান্ত দিয়ে দেখানো যায়—সেখানে নিজের শরীর বা উত্তরাধিকারে মেয়েদের কোনো অধিকার নেই। যাঙ্কমল্ক্য (বৃহদারণ্যক উপনিষদ) তো নারীকে দমন ও উপভোগ করার নানাবিধ উপায়ের কথা বলেছেন। রামায়ণ-মহাভারতেও নারীর অসম্মানের দৃষ্টান্ত কম নেই। পাশা খেলায় দ্রৌপদীকে পণরূপে উপস্থাপনা কিংবা সীতার প্রতি রামচন্দ্রের উচ্চারণ--- ‘নৈউৎসহ পরিভোগায়’...অর্থাৎ, নারী হল পুরুষের ভোগ্যা।...আসলে প্রাগাধুনিক পর্বে আমাদের সমাজ মেয়েদের তো কেবলমাত্র পুরুষের ‘বিনোদিনী’ এবং ‘রমণী’ রূপে দেখেছে। ‘লক্ষীমন্ত মেয়ে’ কিংবা ক্রীড়ানন্দের সেই সামাজিক নির্মাণের হাত ধরেই তাই একুশ শতকেও ‘সুন্দরী’, সুকেশী, রুচিশীলা গৃহকর্মে নিপুণা মেয়েদের চাহিদাই সর্বাধিক। স্বাধিকারপ্রমত্ত মেয়েরা তাই এখনও ‘দজ্জাল’ এবং ‘নারীবাদী’ নঞর্থকতায় অভিহিত(?) হয়।”

কিন্তু যেসব মেয়েদের পরিচয়টাই অস্তিত্বের সংকটাধীন, সমাজ যাদের ‘ধর্ম’-এর রাঙতা দিয়ে আবৃত করে বাধ্য করেছে অন্ধকারের পথ নির্বাচন করতে, তাদের ক্ষেত্রে সমীকরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। সময়ের স্রোতে তাদের জীবনে শ্যাওলার মত বাসা বাঁধে সুযোগ-সন্ধানীরা। নিত্যনৈমিত্তিক চাহিদাসহ জীবধারণের জন্য সেই ভার বহন করে তারা এগিয়ে চলে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে, আত্মবলিদান দিয়ে সামিল হয় আত্মজার স্বপ্নপূরণ কিংবা পারিবারিক চাহিদা নিবারণের পটভূমি রচনায়। নাটকে জাহানারা ওরফে জুঁই ব্যানার্জীর জীবন-সোপানের আরেকপ্রান্তে রয়েছে ইচ্ছেমৃত্যু বা মার্সি কিলিং-এর পরোক্ষে থাকা জুলির যন্ত্রণা-দগ্ধ জীবনকথা। এ যেন একই মুদ্রার দুই পিঠের গল্প। জাহানারার বাবা কান্তি মজুমদার আসলে কাশেম আলি মজুমদার। তার মা এটা জেনেই বিয়ে করে, “কিন্তু পরে জেনেছিল, কাসেমের যত গুণ পকেটে ততটা ঝুল নেই। রেগে কম, ব্যাস মুখার্জী বাড়ির মেয়ে ভুল শুধরাতে সময় নিল না। মুশিকল হল মেয়েটার। তার বাবা ঘৃণায় অপমানে আত্মহত্যা করল। মেয়েটা মাকে ছেড়ে চলে এল, প্রিয় বাবার অপমানের শোধ নিতে। ইচ্ছে করেই অনির্দিষ্টের জীবন ঝাঁপ দিল।”জাহানারা জীবন সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে জাহানারা এমন এক কূলে আশ্রয় নিল, “যে তার পেট করে দিয়ে নিজের পেট সামলাতে কোথায় চম্পট দিল। মেয়েটা এখন একাই বদলা নিচ্ছে।” এতৎসত্ত্বেও বস্তির ১০ ফুট বাই ১০ ফুট ঘরে যেখানে কিনা সূর্যের আলোর প্রবেশ বিধিবদ্ধ, সেখানে বসে জুলির ভিতরে থাকা মা জাহানারা স্বপ্ন দেখে মেয়ে বিনীতাকে নিয়ে। সমাজের বেড়াজালে তার জীবনটা নিঃশেষিত হলেও সে চায় বিনীতার প্রাতিষ্ঠানিক তথা সমাজসিদ্ধ স্বীকৃতিকে। সিনেমা গল্প- উদ্ভাসের ডকুমেন্টারী শুভঙ্করের জবানীতে, “বিনির স্কুলের খুব নামী...খরচা খুব বেশি...তুই কারোর সাহায্য নিবিনা এই ধনুকভাঙা পণ করেছিস...জানোয়ারেদের ঘরে ঢুকিয়ে শরীরটাকে খাবলাতে দিচ্ছিস।” সেইজন্যই জাহানারা বেছে নেয় এই ইচ্ছেমৃত্যুর পথকে, “ সারারাত্রি নেড়ে গেঁড়ের মধ্যে একডজন হাফ শুঁড়ো মাতাল তার বডি খাবলাবে...সেই টাকা শুদ্ধ হয়ে বিনির সরস্বতী পুজোয় লাগবে...।”জাহানারাজৈবিকভাবে তাদের মধ্যে  নাড়ীর টান থাকলে বাস্তবের দর্পণে “.জাহানারা খাতুন...আর ওই ১২ বছরের মেয়েটা বিনি-বিনি...বিনীতা মজুমদার ” দুজন সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুর দুইজন। ‘জাহানারা-জাহানারা’ নামকরণে নাট্যকার যেন দুই সত্তার মুখোমুখি সাক্ষাৎ ঘটিয়েছেন।

“আধুনিক নারীবাদী দৃষ্টিকোণ নির্মিত হওয়ার বহু পূর্ব থেকেই বঙ্গীয় সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তিতে নারীর নিজস্ব কণ্ঠস্বর এসেছে। সমাজ-শাস্ত্র লাঞ্ছিত মেয়েরা কখনো সরাসরি অথবা বক্রভঙ্গিতে তাদের দ্বিতীয় ভুবন গড়ে নেন। চর্যার বহুড়ীর বিধর্মী পদচারণা, রাধার প্রতিদ্বন্দিতা, মঙ্গলকাব্যের নারীদের পতিনিষ্ঠা মনে পড়ে।...মেয়েলি গান, কথকতা, প্রবাদ, ছড়া, হেঁয়ালির জগত একসময় মেয়েদের নিজস্ব কণ্ঠস্বর নির্মাণের মাধ্যম ছিল। পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় এগুলির মাধ্যমে নারীরা নিজেদের অবরুদ্ধ কামনা, যৌন প্রত্যাশা তথা চাহিদা ব্যক্ত করত। অশ্লীতার দোহাই দিয়ে উনিশ শতকের শিষ্ট সুশীল সমাজ পুরুষতন্ত্রের লিঙ্গ নির্মাণ প্রণালীর নিয়ম মেনে মেয়েদের সেই স্বাধীন ক্ষেত্র থেকে উৎখাত করল। একইসঙ্গে তাদের নিজস্বমানসিকতা ও শারীরিক স্বীকৃতিহীন ব্যবস্থাপনা মেনে নিতেও বাধ্য করা হয়। একবিংশ শতাব্দীর শিক্ষিত সমাজে উত্তরাধিকার সূত্রে সেই চিন্তাধারার প্রবাহই বর্তমান। আজও একজন সন্তানের সামাজিক স্বীকৃতির জন্য তার পিতৃপরিচয় থাকা বাধ্যতামূলক। সামাজিক নিয়মের এই বেড়াজালে একজন মা কে বিসর্জন দিতে হয় তার মাতৃসত্তা কে। জৈবিকভাবে বিনি এবং জাহানারার মধ্যে নাড়ীর টান থাকলে বাস্তবের দর্পণে “জাহানারা খাতুন... আর ওই ১২ বছরের মেয়েটা বিনি-বিনি...বিনীতা মজুমদার” দুজন সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুর দুইজন। কিন্তু এখানেই থেমে থাকে না স্রোতের বিপরীতে হেঁটে চলা জাহানারাদের লড়াই। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে তাদের জীবন খাতায় লিখিত হতে থাকে মার্সি কিলিং-এর পাশে দাঁড়ানো এক যন্ত্রণা দগ্ধ-কথাও।

নবজাগরণের আলোকপ্রাপ্ত সমাজ আজও জাতপাত-বর্ণভেদের অন্ধকূপে নিমজ্জিত। ফলস্বরূপ জাহানারাদের নিত্যনৈমিত্তিক চাহিদা পূরণের জন্য পরিচয় বদলের আশ্রয় নিতে হয়। কেবলমাত্র প্রান্তিক শ্রেণির মহিলারাই নন, সমাজের উপরিভাগে থাকা নারীরাও এহেন পরিস্থিতির শিকার। তাই নীপা দেবীর মত নারীদের প্রতি মুহূর্তে সামাজিক বঞ্চনার শিকার হতে হয়। নারী মাত্রই যেন পুরুষের পদতলে লুণ্ঠিত থাকা এক জড়বস্তুযে নিজের অধিকারে নয়, অন্যের দাসত্বে, অন্যের ইচ্চাধীন হয়ে কালযাপন করে চলাই কি তাদের জীবনের মূলমন্ত্র? পাঠক কে এই প্রশ্নে আর একবার ভাবিত করে চন্দন সেনের ‘জাহানারা-জাহানারা’ নাটকের কাহিনি। যেখানে একাধারে বর্তমান সমাজে প্রেক্ষিতে জায়মান পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব, সামাজিক বৈষম্য তথা জাতপাতের বেড়াজাল এবং প্রতিটি চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। এছাড়াও সামাজিক বিধি-নিষেধের বিপরীতে হেঁটে চলা নারীদের সংগ্রামের কথাও নাট্যকার তুলে ধরেছেন। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন নাটকের মধ্য দিয়ে লোকশিক্ষা হয়। শ্রী চন্দন সেন তাঁর নাটকে অর্থনীতি-সমাজনীতি-রাজনীতি—সব ক্ষেত্রেই বিচরণ করেন, উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত-নিম্ন মধ্যবিত্ত থেকে প্রান্তিক শ্রেণি সকলেই তাঁর নাটকে পরিষ্কার চেহারা পায়। কোনো বিশেষ রাজনৈতিক আনুগত্য ছাড়াই শ্রেণি-সংগ্রাম চরিত রচনায় চন্দন সেনের কলম বহমান। সেজন্যই তাঁর নাটকে জনসাধারণের মধ্যে প্রচলিত নানা শ্লোগানের ভাষ্যরূপ প্রতিফলিত হয়। নাট্যকারের নতুন ধরনের লেখনী পাঠককে শুধু ভাবিয়ে তোলে না, চিন্তার অতলান্ত গভীরতায় পৌঁছে দেয়। সময় উপযোগী বিষয়ের সঙ্গে চন্দন সেনের শৈলী পরিবর্তনের এই প্রবাহমানতা একুশ শতকের মোহনায় এসে মিলিত হয়।